📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অর্থনৈতিক সমন্বয়

📄 অর্থনৈতিক সমন্বয়


একদম শুরুর দিকেই ইবনু খালদুন অর্থনৈতিক সমন্বয়কে সামাজিক জীবনধারণের একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও উদাহরণ দেন রুটি বানানোর—এমন এক প্রক্রিয়া, যাতে বহু মানুষের সমন্বিত কাজের প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক। সমাজে বাস করতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের সহযোগিতা করতেই হবে। অর্থনৈতিক সমন্বয় এই সহযোগিতার জন্যই প্রয়োজন হয়, আবার এরই ফলে তৈরিও হয়। বিশেষত যদি জটিলতর উৎপাদন কর্মকাণ্ডের দরকার পড়ে, তখন। যেমন আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির উৎপাদন।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শাসক (সরকার) কর্তৃক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড

📄 শাসক (সরকার) কর্তৃক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড


ইবনু খালদুনের দৃষ্টিতে শাসকের নিজস্ব বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড তার প্রজাদের জন্য ক্ষতিকর এবং করব্যবস্থার জন্য ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ। প্রজাদের ক্ষতি বহুবিধ।
প্রথমত, প্রাণিসম্পদ এবং ব্যবসায়িক সম্পদ কেনা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কৃষি ও বাণিজ্যের জন্য দরকারি জিনিসগুলো সস্তায় কিনতে পারবে না তারা। শাসক যেহেতু প্রজাদের চেয়ে আর্থিকভাবে অনেক বেশি সক্ষম, সেহেতু প্রতিযোগিতার সাধারণ মূলনীতি ব্যাহত হবে। প্রজারা যা কিনতে পারে না, রাজা তা সহজেই কিনে নেবে।
দ্বিতীয়ত, বিশাল পরিমাণ কৃষিজ উৎপাদ ও প্রাপ্ত ব্যবসায়িক পণ্য শাসক ইচ্ছেমতো বণ্টন করে দিতে পারেন। সেটা হতে পারে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অথবা নামমাত্র মূল্যে জিনিস ক্রয় করার মাধ্যমে। কেউ তার বিপরীতে গিয়ে মূল্য হাঁকাতে পারবে না। উল্টো তিনি আবার দাম কমানোর জন্য বিক্রেতাকে চাপও দিতে পারবেন।
তৃতীয়ত, ব্যবসায়ীদের শাসক বাধ্য করতে পারেন তার কাছ থেকে ক্রয় করার জন্য। তাও আবার উচ্চতম মূল্যে। এর ফলে ব্যবসায়ীর তরল নগদ অর্থ নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং দেখা দেবে তারল্য সমস্যা ও জীবিকা নির্বাহে কঠিনতা। শাসকের কাছ থেকে কেনা পণ্য হয়তো তারা নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করতে বাধ্য হবেন নগদ অর্থের প্রয়োজনে। ফলে একসময় বাজার থেকেই হটে যাবেন শাসক ছাড়া বাকি ব্যবসায়ীরা।
জনগণের সাথে রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার ফল হতে পারে কর্মে অনীহা এবং অর্থকাঠামোর সর্বনাশ। কর ও শুল্ক মাশুল থেকে প্রাপ্ত আয়ের বেশির ভাগ অংশ যেহেতু আসে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, সেহেতু কৃষকরা কৃষিকাজ ও ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ছেড়ে দিলে বিপজ্জনকভাবে কমে যাবে সেই আয়। করের ঘাটতির সাথে শাসক যদি নিজস্ব ব্যবসা থেকে অর্জিত যৎসামান্য মুনাফার তুলনা করেন, তাহলে টের পাবেন কত বড় জিনিস হারিয়েছেন। শাসকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সমৃদ্ধি ঘটে শুধুমাত্র কর থেকে প্রাপ্ত আয়ের মাধ্যমে। কোনো রাজকীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নয়। করের রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব সম্পদের অধিকারী জনগণের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ ও তাদের যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করার মাধ্যমে। এতে তাদের কাজ করার ও নিজেদের পুঁজি বিকশিত করার আকাঙ্ক্ষা ও প্রণোদনা বৃদ্ধি পায়। ক্রমে এটাই বৃদ্ধি করে কর রাজস্ব।
তা ছাড়া শাসক কর্তৃক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অপব্যবহারের ফলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং শাসক শ্রেণি ভেঙে পড়তে পারে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা যদি মুনাফার ক্রমশ ঘাটতির কারণে কৃষিকাজ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদের পুঁজি বৃদ্ধি করতে না পারেন, তাহলে পুঁজির পরিমাণ কমে যাবে। ব্যয়ভার বহনে ব্যবহৃত হতে হতে একসময় তা উধাও হয়ে যাবে। অর্থনীতি ধসে পড়বে।
অর্থনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ আছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তা হলো নিজের নির্ধারিত দামে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের থেকে পণ্য কিনে তা জনগণের কাছে উচ্চতর মূল্যে বিক্রি করা। এটা জনগণের স্বার্থের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক। ব্যবসায়ীদের মুনাফায় শাসকের ভাগ বসানোও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ। এর ফলে, কিছু কিছু ব্যবসায়ী লভ্যাংশের একটা অংশ শাসককে পরিশোধ করবেন ঠিক। কিন্তু সেটা তাদের নিজস্ব ফায়দার জন্য। শাসকের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় উচ্চতর মূল্যে অধিকতর মুনাফা করবেন তারা। এমনকি শাসককে দেওয়া অংশটির কারণে কর এবং শুল্ক মাশুল ফাঁকি দেওয়ার অনুমতিও পেয়ে যেতে পারেন।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উন্নয়ন, ভোগ, শ্রম ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি

📄 উন্নয়ন, ভোগ, শ্রম ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি


এই পর্যবেক্ষণ থেকে ইবনু খালদুন ভোগপ্রবণতার ব্যাপারে এক দুর্দান্ত সিদ্ধান্তে আসেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে শহর ও নগরের বিকাশে ভোগের একটি ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। উল্টো দিকে ভোগের অভাবের ফলে পড়তে পারে তার বিপরীত প্রভাব। সঞ্চয়ের প্যারাডক্স (The Paradox of Accumulation) যাকে বলে। প্রথমে তিনি শ্রমকে সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেন। কোনো শহর বা নগরে সামষ্টিক শ্রম যদি শ্রমিকদের চাহিদা ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ উৎপাদন করে, তাহলে উদ্বৃত্ত শ্রমটুকু দুটি জিনিস সরবরাহে ব্যবহার করা যায়: ➡ (ক) শহরের বিলাসিতার অবস্থা ও প্রচলন, এবং ➡ (খ) অন্যান্য শহরের অধিবাসীদের চাহিদা পূরণ।
এসব বিলাসী পণ্যের চাহিদা ও অন্যান্য শহরে রপ্তানিকৃত পণ্যের চাহিদা যত বাড়তে থাকবে, উদ্বৃত্ত শ্রমবিশিষ্ট শহরের সম্পদ তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কারণ এই লভ্যাংশ শ্রমেরই বাস্তবায়িত মূল্য। তার মানে দক্ষ শ্রমিকদের জন্য একটি চাহিদা সৃষ্টি হবে, যা প্রতিফলিত হবে শ্রমের দামের ওপর। এর ফলে সমৃদ্ধ হতে থাকবে শিল্পকারখানা ও কারুশিল্প। “এই শহরের উপার্জন ও ব্যয় বাড়বে এবং শ্রমের মাধ্যমে সেসব পণ্য উৎপাদনকারী শ্রমজীবীদের জীবনে সচ্ছলতা আসবে”।
জনসংখ্যা বাড়লে ওপরে বর্ণিত চক্র আরও পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। প্রাপ্ত শ্রম বাড়বে, বর্ধমান মুনাফার হাত ধরে বাড়বে বিলাসী দ্রব্যের চাহিদা। বিলাসী পণ্য লাভের জন্য সৃষ্টি হবে কারুশিল্প। সেখান থেকে বাস্তবায়িত মূল্যও বাড়বে। ফলে আবারও বহুগুণে বাড়বে শহরের মুনাফা। শহরটির উৎপাদন কর্মকাণ্ড আগের চেয়েও তীব্র গতিতে চলতে থাকবে।
মোটকথা, ইবনু খালদুন যেন বলছেন-জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর মোটাদাগে কোনো সমস্যা আরোপ করে না। উল্টো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে। ইবনু খালদুনের এই মতের প্রত্যুত্তরে কেউ বলতে পারে যে, এই তত্ত্ব বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগে অবশ্যই থাকতে হবে। নাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল হবে বেকারত্ব। এই তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য উৎপাদনকারীদেরকে কর্মের সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সরকারি খরচের প্রভাবের ব্যাপারে কেইনির তত্ত্ব, এবং উপার্জনের ওপর ভোগ-প্রবণতার প্রভাব সংক্রান্ত তত্ত্বকে এখানে ইবনু খালদুনের মতের সাথে তুলনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়। মজার ব্যাপার, ইবনু খালদুন তার এই পর্যবেক্ষণকে আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “প্রত্যেক শহরে উপার্জন ও ব্যয় পরস্পরের ভারসাম্য ঠিক রাখে। উপার্জন বড় মাত্রার হলে ব্যয়ভারও বড় মাত্রার হয়। উল্টোটাও সঠিক। আর যদি উপার্জন ও ব্যয়ভার উভয়টিই বড় মাত্রায় হয়, তাহলে অধিবাসীরা অধিক আরামদায়কভাবে বসবাস করতে পারে। শহরও সমৃদ্ধ হতে থাকে”.

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 দর

📄 দর


দরের ওপর বাজারশক্তির প্রভাবের ব্যাপারে ইবন খালদুন দারুণভাবে সচেতন। তিনি বলেন যে, দাম প্রভাবিত হয় দুটি প্রধান নিয়ামক দ্বারা: চাহিদা ও জোগান। জোগানের অবস্থার ওপর উৎপাদনের খরচের প্রভাবও একইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, এই সবগুলোই সমৃদ্ধির অবস্থার ওপর নির্ভর করে। মৌলিক ও বিলাসী পণ্যের ওপর এদের প্রভাবের মাত্রা বিভিন্নরকম। কোনো জনসমাজ যদি সমৃদ্ধিশালী হয়ে থাকে, তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দর হবে কম। বিলাসী পণ্যের দাম হবে বেশি। সমৃদ্ধি না থাকলে হবে তার বিপরীতটা। কিন্তু পরিস্থিতি এ দুয়ের যেটাই হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয়ের দর নির্ধারণে এর চাহিদা ও জোগানের প্রভাবশালী ভূমিকা থাকবেই। প্রাচুর্যপূর্ণ অবস্থায় যথেষ্ট শ্রম ও উপযুক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ নিবেদিত করা হবে প্রাচুর্যশালী সমাজের চাহিদা পূরণ করার জন্য। আর এই সমাজে এসব পণ্যের চাহিদা যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে সম্পৃক্ত অবস্থার উপস্থিতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অনুপস্থিতি থাকা সাপেক্ষে পণ্যের জোগান সেটির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। ফলে দামও কমে আসবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে চাহিদার সাথে জোগানের ভারসাম্য হবে না। ফলে এসব মৌলিক দ্রব্যের দাম বাড়বে। জোগানের স্থিতিস্থাপকতা হিসেবে ধরা যায় এটাকে, যদিও ইবনু খালদুন সরাসরি এই পরিভাষা ব্যবহার করেননি। এসব প্রাচুর্যশালী সমাজে বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি হবে ভিন্ন: জোগান স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে এবং দুর্যোগ না আসলে এগুলোর দাম বেশি হবে। কিন্তু জোগান যদি অস্বাভাবিক অবস্থায় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে দাম কমে আসবে। আবারও জোগানের স্থিতিস্থাপকতার ধারণা পাওয়া গেল-মৌলিক পণ্যসমূহের জন্য স্থিতিস্থাপকতা কম, কিন্তু বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে বেশি। কিন্তু জোগানের স্থিতিস্থাপকতার এই অনুমিত অবস্থা অপরিবর্তনশীল নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাপেক্ষে এটি পরিবর্তনশীল বলে উল্লেখ করেন ইবনু খালদুন। তার ভাষ্যে, “কোনো শহরে যখন অধিক মাত্রায় উন্নত, প্রাচুর্যশালী সভ্যতা থাকে ও বিলাসী দ্রব্যে পরিপূর্ণ থাকে, তখন আরামদায়ক বস্তুর জন্য খুব ব্যাপক পরিসরে চাহিদা দেখা দেয়। নিজের পরিস্থিতির সাপেক্ষে একেকজন মানুষ সেগুলো যত বেশি পারা যায়, অর্জন করে নিতে চায়। ফলে এসব জিনিসের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়। অনেকেই কিনতে চাইবে, কিন্তু জোগান থাকবে কম। সেগুলোর প্রয়োজন হবে বিবিধ উদ্দেশ্যে। বিলাসী পণ্যের প্রতি অভ্যস্ত ধনবান লোকেরা মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দিতে চাইবে সেগুলোর জন্য। কারণ অন্য যে কারো চেয়ে এগুলোর প্রয়োজন তাদের বেশি। তাই, দাম বেড়ে যাবে”। এই ব্যাখ্যা থেকে পশ্চাতমুখী চাহিদার অবস্থা চিহ্নিত করা যায়। দাম বাড়া সত্ত্বেও চাহিদা বাড়তে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00