📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুকাদ্দিমা রচনায় তার গৃহীত পদ্ধতি

📄 মুকাদ্দিমা রচনায় তার গৃহীত পদ্ধতি


ইবনু খালদুনের বিশ্লেষণধর্মী পদ্ধতি তার লেখাতে একেবারে স্পষ্ট। কথাটি তিনি নিজে উল্লেখও করেছেন, কাজের মাধ্যমে প্রমাণও রেখেছেন। তিনি বলেন, "ইতিহাস লেখা একটি শিল্প-যার জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী মন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষণ। এটা ইতিহাসবিদকে নিয়ে যাবে সত্যের দিকে-যেখানে স্রেফ আরেকজনের কাছ থেকে এনে এনে বর্ণনা করলে তাতে থাকতে পারে ভুল ত্রুটি ও বিচ্যুতি"। তার মতে, ভ্রান্তি পরিহারের জন্য ইতিহাসবিদদের উচিত ঘটনা পরিক্রমাকে সমসাময়িক নীতিমালা, রাজনীতির অনস্বীকার্য বাস্তবতা, সভ্যতার বিকাশ ও সমাজের গড়ে ওঠার প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত করা। বিজ্ঞানমনস্ক চেতনা থেকে তিনি মত দেন, ঐতিহাসিক তথ্যের অপব্যবহারের বহুবিধ কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো:
➡ বিভিন্ন মতবাদ ও ঘরানার প্রতি পক্ষপাতিত্ব,
➡ অনুসন্ধান ছাড়াই তথ্য ছড়ানো,
➡ কোনো ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অসচেতনতা,
➡ কোনো ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অনুমান,
➡ বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা,
➡ উচ্চপদস্থ মানুষদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা,
➡ সভ্যতার প্রকৃতি ও তার মাঝে উদ্ভূত বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা
বইটি রচনার উদ্দেশ্য হিসেবে ইবনু খালদুন বলেন, "আমাদের এই প্রথম খণ্ডটি এর লক্ষ্যের বিচারে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র। এটির উদ্দেশ্য মানবসভ্যতা ও সামাজিক গঠনবিন্যাস। এর রয়েছে স্বকীয় সমস্যাসমূহ। তা হলো সভ্যতার মূলকথার সাথে সংশ্লিষ্ট অবস্থাগুলোর ব্যাখ্যা”। সভ্যতা তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তার মত অনুযায়ী, “সকল শাস্ত্র, আইন, বিধান ও নীতিমালা, এমনকি ঐশী আদেশমালা ও ধর্মীয় মতাদর্শের লক্ষ্য থাকে সভ্যতাকে সংরক্ষণ করা”।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ইবনু খালদুন সভ্যতার ধারণাটির একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। নিজের লেখালেখিতে একে ব্যবহার করেছেন। তার মতে এর অর্থ, "মানুষকে একসাথে বাস করতে হয়। সঙ্গলাভের স্বস্তি ও মানবীয় চাহিদা পূরণের জন্য দলবেঁধে থিতু হতে হয় নগরে ও পল্লীতে। কারণ, জীবনধারণের জন্য সহযোগিতার প্রতি মানুষের স্বভাবজাত ঝোঁক রয়েছে”। তার মতে সভ্যতা জিনিসটা শুধুমাত্র স্থায়ী জনবসতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, যেগুলো পাওয়া যায় "শহরে, গ্রামে, মফস্বলে, ও ছোট লোকালয়ে, যা দেয়ালঘেরা হওয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করে"। বেদুইন সভ্যতার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, “যেমনটা পাওয়া যায় সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও পাহাড়ে, প্রত্যন্ত মরু এলাকায় চারণভূমির কাছে.”
তার মানে ইবনু খালদুনের মূল আলোচ্যবিন্দু জনসমাজের অস্তিত্ব, হোক তা শহরে, বন্দরে, মরুদ্যানে বা পাহাড়ের পাদদেশে। সম্ভবত তার মতে ঐক্যবদ্ধ সমাজে বসবাসই হচ্ছে সভ্যতার ভিত্তি। সমাজে বাস করার জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ ও সহযোগিতা। এর ফলে তৈরি হয় অর্থনৈতিক সমন্বয়। পর্যায়ক্রমে এরই ফলে সৃষ্টি হয় মানবীয় স্বস্তি, সঙ্গলাভ এবং চাহিদার পূরণের আকাঙ্ক্ষা। আলোচনাটি পুরো বইয়ে তিনি উপস্থাপন করেছেন ছয়টি আলাদা অধ্যায়ে: • সাধারণ মানবসভ্যতা, এর বিভিন্ন ধরন ও পৃথিবীর সভ্য অংশ • শৃঙ্খলা-বহির্ভূত জাতি ও বেদুইন সভ্যতা • শাসনরত রাজবংশ, খিলাফত, রাজকর্তৃপক্ষ, ও সুলতান • স্থায়ী সভ্যতা, দেশ ও শহর • কারুশিল্প, জীবিকা অর্জনের পথ, ও উপার্জনের মাধ্যম • বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্র, সেগুলোর অর্জন ও শিক্ষা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00