📄 মূল্য নিয়ন্ত্রণ
দর নির্ধারণের ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়্যার দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি বাজারব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বাজারশক্তির (বিশেষত দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে) ভিত্তিতে যে মুক্ত বাজার-পরিস্থিতির নির্দেশনা নবি দিয়ে গেছেন, তার মতে সেটি নিঃশর্ত নয়। বিবেচ্য শর্তটি হলো বাজারশক্তির মাধ্যমে দর নির্ধারণের ফলে জনগণের ক্ষতি হচ্ছে কি না। তাই কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দর নির্ধারিত করে দেওয়া হতে পারে অবৈধ ও ভুল কিংবা ন্যয়সঙ্গত ও বৈধ। ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, "যদি দর নির্ধারণ করলে মানুষের [বিক্রেতাদের] ক্ষতি হয়ে থাকে এবং বিনা কারণে তাদের অসম্মতিপূর্ণ দরে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা অবৈধ। কিন্তু এর কারণ যদি মানুষের মাঝে ন্যায়ানুগ লেনদেন, অর্থাৎ ন্যায্য মূল্যে লেনদেন করতে তাদের বাধ্য করা, এবং ন্যায্য অংশের চেয়ে বেশি নেওয়ার মতো অবৈধ কাজকর্ম প্রতিহত করা হয়, তাহলে তা বৈধই নয়, আবশ্যকও বটে”। অতএব, দর নির্ধারিত করে দেওয়ার মাধ্যমে বাজারশক্তিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক। যদিও তা শর্তসাপেক্ষে।
ইবনু তাইমিয়্যা ব্যাপারটিকে আরও কিছু দূর ব্যাখ্যা করেছেন। বিক্রেতারা যদি তাদের পণ্য যথাযথভাবে বিক্রি করতে থাকেন, দরদামে কোনো কৃত্রিম বিকৃতি না আনেন, এবং বর্তমান মূল্যের বৃদ্ধির কারণ যদি পণ্যের সংকট বা চাহিদা বৃদ্ধি হয়ে থাকে, তাহলে এগুলো হলো বাজারের (স্বাভাবিক) পরিস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট কোনো মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা অযৌক্তিক ও ভুল। কিন্তু বিক্রেতাগণ যদি জরুরি চাহিদার সময়ে দাম বাড়ার অপেক্ষায় বর্তমানে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে তাদের কাজটি ভুল। কারণ এর মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির জন্য তারা বাজারশক্তিকে প্রভাবিত করছেন। "দর নিয়ন্ত্রণের একমাত্র অর্থ হলো ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা”।
ইবনু তাইমিয়্যা সব ধরনের একচেটিয়াপনাকে তিরস্কার করেছেন। লক্ষণীয়, কতিপয়ের বাজারও (Oligopoly) এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে মারাত্মক প্রকৃতির জালিয়াতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। "আরও মারাত্মক ব্যাপার হয়, যেখানে মানুষ নির্দিষ্ট একটি দ্রব্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার খাটায় এবং তা শুধুমাত্র তাদের কাছেই বিক্রি ও তাদেরই দ্বারা বিতরণ হয়”। এর ফলে “যে-কোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে হয় কঠোরভাবে বাধা আরোপের মাধ্যমে নয়তো তার চেয়ে শিথিলতর কোনো মাধ্যমে আটকে দেওয়া হয়”। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়া একেবারে আবশ্যক, “দর অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারীরা শুধু ন্যায্য মূল্যেই বিক্রি করতে পারে এবং মানুষও শুধুমাত্র ন্যায্য মূল্যেই পণ্য ক্রয় করে.” (প্রাগুক্ত)। এর কারণ “একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের যদি তাদের ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাতে দেওয়া হয়, তাহলে জনগণ দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—একদিকে তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে চাওয়া বিক্রেতাগণ, অপরদিকে তাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে চাওয়া ক্রেতাগণ.” (প্রাগুক্ত)।
বাজার পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে বৈধতা প্রদানে ইবনু তাইমিয়্যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাজারশক্তিকে প্রভাবিত করার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক বেইনসাফি দূর করা। তার মতে রাষ্ট্র কর্তৃক মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা শুধুমাত্র অধিকারই নয়, বরং আবশ্যক দায়িত্বও। অবশ্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে সুশৃঙ্খল করতে ইবনু তাইমিয়্যা ছয়টি শর্ত প্রদান করেছেন। আপাতদৃষ্টে এর লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের এ অধিকারকে সীমিত রাখা। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপের শর্তগুলো হলো:
১. বাজার জালিয়াতির সংশ্লিষ্ট পণ্যটি অবশ্যই গণহারে ভোক্তাদের একটি অত্যাবশ্যক জিনিস হতে হবে। তার মানে বিলাসব্যসনের ব্যাপারে তিনি ততটা চিন্তিত নন। সচ্ছল ভোক্তারা সেগুলো সহজেই কেনার সামর্থ্য রাখেন।
২. বাজারে কোনো অন্যায় প্রভাব তৈরি হতে হবে। সেটা হবে ভবিষ্যতে পণ্যের জোগানে সংকট সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় বর্তমানে বিক্রি থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। এটা হলো জোগানশক্তির ওপর অন্যায় প্রভাব।
৩. বাজারশক্তির ওপর একচেটিয়া কর্মকাণ্ডের প্রভাব, যার ফলে পণ্যের উৎপাদনের ব্যাপারে ভোক্তা ও উৎপাদক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়।
৪. বাজারে প্রভাব ফেলাটা হতে হবে পণ্যের ন্যায্যমূল্যের চেয়ে চড়া কোনো দাম অর্জন করার উদ্দেশ্যে।
➡ ৫. ক্রেতা ও বিক্রেতা, ভোক্তা ও উৎপাদক উভয় পক্ষের জন্য ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়ার কাজটা ন্যায়ানুগভাবে করতে হবে। ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম যে-কোনো দর নির্ধারিত করে দেওয়া অবৈধ।
➡ ৬. মূল্য নির্ধারিত করার চূড়ান্ত লক্ষ্য জনসমাজ থেকে জুলুম অপসারণ। এসব শর্ত ও উদ্দেশ্যের অনুপস্থিতিতে বাজারশক্তিতে হস্তক্ষেপ করা অবৈধ。
📄 অত্যাবশ্যক জোগান নিশ্চিতকরণ
ইবনু তাইমিয়্যার মতে, উৎপাদন খাতে বাজার-শক্তিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আরেকটি রূপ হলো অত্যাবশ্যক পণ্যের জোগান নিশ্চিতকরণ। জনসমাজের কাছে যেসব পণ্য অত্যাবশ্যক, উৎপাদন খাত সেগুলো উৎপাদন করতে ব্যর্থ হলে তাদেরকে মুক্তভাবে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের চাহিদা থাকতে পারে। যেমন: কৃষি, সেলাই ও নির্মাণ। জনগণ যদি তাদের চাহিদার যথাযথ পরিমাণ আমদানি করতে না পারে, তাহলে কাউকে না কাউকে তো তাদের কাপড় সেলাই করে দিতে হবে”, (প্রাগুক্ত)। শিক্ষা সংক্রান্ত পদ্ধতিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, এসকল কর্মকাণ্ড শুরু করা ও চালু রাখা ফরজে কিফায়া। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এ কাজগুলো অবশ্যই করতে হবে। কারণ এই কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করা না হলে জনকল্যাণ অপূর্ণ থেকে যাবে। এ ধরনের ফরযিয়্যাতের প্রকৃতি হলো, সামষ্টিক এই দায়িত্ব কোনো একজন ব্যক্তি পালন করলে তার জন্য সেটাই ফরজে আইন হয়ে যায়। বিশেষত যদি অন্য কেউ তা করার সামর্থ্যবান না হয়, সেক্ষেত্রে। ব্যক্তিদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই শিল্পক্ষেত্রগুলো চলমান রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইবনু তাইমিয়া এমনটাই মনে করেন। তার ভাষায়, “জনগণের যদি কৃষি, তৈরি পোশাক বা নির্মাণশিল্পের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সেটা চালু রাখা সামর্থ্যবানদের জন্য অত্যাবশ্যক দায়িত্ব। ন্যায্য সম্মানি নির্ধারণ করে দেওয়ার পর যদি তারা এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ তাদের জোর করতে পারবে” (প্রাগুক্ত)। অতএব, রাষ্ট্রের ভূমিকা দ্বিমাত্রিক:
(ক) সমাজের এসব অত্যাবশ্যক চাহিদা মেটাতে যারা সামর্থ্যবান, তাদেরকে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করা। আর যৌক্তিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি-সহ তাদেরকে সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা প্রদান করা।
➡ (খ) এই পদক্ষেপ যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে যথেষ্ট পরিমাণ বলপ্রয়োগ করে এই কাজগুলো সামর্থ্যবান মানুষদের দ্বারা করিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে যথাযথ মজুরি প্রদান করার মাধ্যমে ওই ব্যক্তিদের ওপর অবিচারও পরিহার করতে হবে (Holland, 1983)।
রাষ্ট্র যদি এই ভূমিকা গ্রহণ করে, সে ক্ষেত্রে একটা শর্ত ইবনু তাইমিয়্যা বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন—এই সেবাগুলো প্রদানকারী মানুষেরা জনগণের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দাবি করার অধিকার রাখবে না। আবার জনগণও ন্যায্যমূল্যের চেয়ে কম প্রদান করে বা সরকার কম মজুরি দিয়ে তাদের ওপর অবিচার করবে না। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটেই কাজ করবে। তা হলো, বাজার-শক্তি যখন সমাজকে এর সামষ্টিক কল্যাণ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়।