📄 গ্রন্থকার
তাকিউদ্দীন আহমাদ ইবনু তাইমিয়্যা ৬৬১ হি./১২৬৩ খ্রি. সালে হারানে জন্মগ্রহণ করেন। ৭২৮ হি./১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দামিশকে মৃত্যুবরণ করেন। এই হাম্বলি আলিম পুরো ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের একজন।
খুব অল্প বয়সেই তিনি হাম্বলি মাযহাবের ফকিহ এবং মুহাদ্দিসে পরিণত হন। ইবনু তাইমিয়্যার অনন্যতা হলো তার ছিল উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি। ইসলামি চিন্তাকে তিনি কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার বিশুদ্ধ ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে জানতেন। চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতার জন্য কষ্টও ভোগ করতে হয়েছে তাকে। তিনি অনেক বছর কারাগারে অতিবাহিত করেন। ইসলামি চিন্তা ও চর্চার বিভিন্ন ময়দানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিপুল সংখ্যক বই তিনি রচনা করেছেন। ইসলামি সমাজবিজ্ঞান শাখায় তার আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম একটি অন্যতম প্রধান অবদান হিসেবে গণ্য হয়। বইটিতে তিনি এর তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আর্থ-সামাজিক কার্যাবলি ব্যাখ্যা করেছেন। এই বইতে তার মূল প্রতিপাদ্য হলো "মারুফ (উত্তম, ভালো, সঠিক ও যথাযথ)-এর আদেশ এবং মুনকার (মন্দ, অন্যায়, ভুল ও অযথার্থ)-এর নিষেধ." হল্যান্ডের ভাষ্যমতে, এই ময়দানে অত্যধিক উদ্যম কাউকে কাউকে দিশেহারা করতে পারে, আবার কারো আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই কাজের যদি কোনো প্রভাব থেকে থাকে, তা হলো আতঙ্কগ্রস্তদের সাহস জোগানো এবং উগ্রপন্থিদের রশি টেনে ধরা। কারণ ইবনু তাইমিয়্যা এক মধ্যমপন্থি ও বাস্তববাদী পদ্ধতির দিকে আহ্বান করেন। তার সাথে জোর দিয়েছেন জ্ঞান, নম্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, ও দয়াশীলতার ওপর (Holland, 1983)1
📄 গ্রন্থের আলোচনা
হিসবাহর ওপর ইবনু তাইমিয়্যার বইটি দশটি অধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত। এতে রয়েছে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো:
* হিসবাহর মৌলিক নীতিমালা,
* ব্যবসা ও অর্থনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণে নৈতিক দিকনির্দেশনা,
* সামষ্টিক কল্যাণ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব
* মূল্য নিয়ন্ত্রণ: কিছু বিতর্কিত বিষয়
* অপরাধ ও শান্তি
* ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ
* সংস্কারের কৌশল
* মানুষ ও আন্দোলন
* সমাজ ও নেতৃত্ব
* জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা, এবং শাসক ও শাসিতের দায়িত্বের সারকথা
এ বিষয়ক অন্য সকল লেখকের মতো হিসবাহ গ্রন্থে ইবনু তাইমিয়্যার প্রথম বিবেচ্য হলো ব্যবসার নৈতিক বিষয়াদি। তার আগের ও পরের লেখকদের মতো তিনিও সঠিক ওজন ও পরিমাপের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাসমূহ পুনরুদ্ধৃত করেছেন। যথারীতি বাজারের এসব দিক তদারকিতে মুহতাসিবের ভূমিকাও আলোচিত হয়েছে।
পণ্য ও বাজার উভয়ের ব্যাপারে প্রদত্ত তথ্যের পরিমাণ ও মানের ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো তথ্যের ইচ্ছেকৃত গোপনকরণের ফলে বাজারে উদ্ভূত ত্রুটিগুলো প্রতিরোধ করা। এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ইচ্ছেকৃত ভুল তথ্য প্রদান করলে তা চুক্তিকারীদের মতামতের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য সংযোজনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া চুক্তি বাতিল হিসেবে গণ্য, তা সেই অসততা ক্রেতার পক্ষ থেকে করা হোক বা বিক্রেতার পক্ষ থেকে হোক। মুহতাসিবের কাজ হলো বাজারত্রুটির এই দিকটি বন্ধ করার চেষ্টা করা এবং উভয় পক্ষের দাবির সত্যতা তদন্ত করা। এসকল ত্রুটির একটি উদাহরণ হলো—বাজারে পৌঁছানোর আগেই লেনদেন এবং প্রচলিত দর সম্পর্কে ধারণা লাভ করার আগেই বিক্রির চুক্তি করা। এরকম হলে নতুনরূপে লেনদেন কার্যকর করার অধিকার অপরপক্ষের জন্য সাব্যস্ত হবে। এর উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে সুরক্ষা দেওয়া। বিভিন্ন মাযহাবের ফকিহগণ এতে ছোটখাটো কিছু শর্ত যোগ করেছেন। বাজারে নবাগতদেরও সুরক্ষা দিতে হবে। বাজার-পরিস্থিতি জানতে পারার আগে তাদের সাথে দামাদামিতে তাড়াহুড়ো করা যাবে না।
বাজারত্রুটি প্রতিরোধের একই তাড়না থেকে পণ্য মজুদ করার বিষয়টিও বন্ধ করতে হবে। বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদকরণ। ইবনু তাইমিয়্যা তো এও বলেছেন যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জরুরি চাহিদা থাকাকালীন বিক্রেতাকে সেসব পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করার জন্য কর্তৃপক্ষ তথা মুহতাসিব বাধ্যও করতে পারবেন।
সংকট তৈরি হওয়া এবং তার সুযোগ নিয়ে চড়া মূল্যে বিক্রি করা পর্যন্ত পণ্য জমিয়ে রাখতে দেওয়া যাবে না বিক্রেতাকে। অর্থনীতিকে এলোপাতাড়ি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয় এই মত থেকে। এর উদ্দেশ্য হলো ভোক্তা ও উৎপাদককে অর্থনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া (Holland, 1983)। ইসলামি অর্থনীতিতে যে মুক্তবাজার পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, ইবনু তাইমিয়্যার কিছু মতকে সেটার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন বিশেষ পরিস্থিতি সাপেক্ষে। একচেটিয়া কর্মকাণ্ডের দ্বারা যখন মুক্তবাজার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তখনই এরকম হস্তক্ষেপ করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, যদি একচেটিয়া কর্মকাণ্ডের শিকার পণ্যটি জনসমাজের জন্য অত্যাবশ্যক জিনিস হয়ে থাকে, তাহলেই কেবল রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ প্রযোজ্য হবে। কোনো পণ্য জনসমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কি না, এই মানদণ্ডটি মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়েও ইবনু তাইমিয়্যার আলোচনাতে প্রতিফলিত হয়েছে। নিচে আমরা সেটাই দেখব。
📄 মূল্য নিয়ন্ত্রণ
দর নির্ধারণের ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়্যার দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি বাজারব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বাজারশক্তির (বিশেষত দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে) ভিত্তিতে যে মুক্ত বাজার-পরিস্থিতির নির্দেশনা নবি দিয়ে গেছেন, তার মতে সেটি নিঃশর্ত নয়। বিবেচ্য শর্তটি হলো বাজারশক্তির মাধ্যমে দর নির্ধারণের ফলে জনগণের ক্ষতি হচ্ছে কি না। তাই কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দর নির্ধারিত করে দেওয়া হতে পারে অবৈধ ও ভুল কিংবা ন্যয়সঙ্গত ও বৈধ। ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, "যদি দর নির্ধারণ করলে মানুষের [বিক্রেতাদের] ক্ষতি হয়ে থাকে এবং বিনা কারণে তাদের অসম্মতিপূর্ণ দরে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা অবৈধ। কিন্তু এর কারণ যদি মানুষের মাঝে ন্যায়ানুগ লেনদেন, অর্থাৎ ন্যায্য মূল্যে লেনদেন করতে তাদের বাধ্য করা, এবং ন্যায্য অংশের চেয়ে বেশি নেওয়ার মতো অবৈধ কাজকর্ম প্রতিহত করা হয়, তাহলে তা বৈধই নয়, আবশ্যকও বটে”। অতএব, দর নির্ধারিত করে দেওয়ার মাধ্যমে বাজারশক্তিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক। যদিও তা শর্তসাপেক্ষে।
ইবনু তাইমিয়্যা ব্যাপারটিকে আরও কিছু দূর ব্যাখ্যা করেছেন। বিক্রেতারা যদি তাদের পণ্য যথাযথভাবে বিক্রি করতে থাকেন, দরদামে কোনো কৃত্রিম বিকৃতি না আনেন, এবং বর্তমান মূল্যের বৃদ্ধির কারণ যদি পণ্যের সংকট বা চাহিদা বৃদ্ধি হয়ে থাকে, তাহলে এগুলো হলো বাজারের (স্বাভাবিক) পরিস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট কোনো মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা অযৌক্তিক ও ভুল। কিন্তু বিক্রেতাগণ যদি জরুরি চাহিদার সময়ে দাম বাড়ার অপেক্ষায় বর্তমানে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে তাদের কাজটি ভুল। কারণ এর মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির জন্য তারা বাজারশক্তিকে প্রভাবিত করছেন। "দর নিয়ন্ত্রণের একমাত্র অর্থ হলো ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা”।
ইবনু তাইমিয়্যা সব ধরনের একচেটিয়াপনাকে তিরস্কার করেছেন। লক্ষণীয়, কতিপয়ের বাজারও (Oligopoly) এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে মারাত্মক প্রকৃতির জালিয়াতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। "আরও মারাত্মক ব্যাপার হয়, যেখানে মানুষ নির্দিষ্ট একটি দ্রব্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার খাটায় এবং তা শুধুমাত্র তাদের কাছেই বিক্রি ও তাদেরই দ্বারা বিতরণ হয়”। এর ফলে “যে-কোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে হয় কঠোরভাবে বাধা আরোপের মাধ্যমে নয়তো তার চেয়ে শিথিলতর কোনো মাধ্যমে আটকে দেওয়া হয়”। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়া একেবারে আবশ্যক, “দর অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারীরা শুধু ন্যায্য মূল্যেই বিক্রি করতে পারে এবং মানুষও শুধুমাত্র ন্যায্য মূল্যেই পণ্য ক্রয় করে.” (প্রাগুক্ত)। এর কারণ “একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের যদি তাদের ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাতে দেওয়া হয়, তাহলে জনগণ দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—একদিকে তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে চাওয়া বিক্রেতাগণ, অপরদিকে তাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে চাওয়া ক্রেতাগণ.” (প্রাগুক্ত)।
বাজার পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে বৈধতা প্রদানে ইবনু তাইমিয়্যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাজারশক্তিকে প্রভাবিত করার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক বেইনসাফি দূর করা। তার মতে রাষ্ট্র কর্তৃক মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা শুধুমাত্র অধিকারই নয়, বরং আবশ্যক দায়িত্বও। অবশ্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে সুশৃঙ্খল করতে ইবনু তাইমিয়্যা ছয়টি শর্ত প্রদান করেছেন। আপাতদৃষ্টে এর লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের এ অধিকারকে সীমিত রাখা। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপের শর্তগুলো হলো:
১. বাজার জালিয়াতির সংশ্লিষ্ট পণ্যটি অবশ্যই গণহারে ভোক্তাদের একটি অত্যাবশ্যক জিনিস হতে হবে। তার মানে বিলাসব্যসনের ব্যাপারে তিনি ততটা চিন্তিত নন। সচ্ছল ভোক্তারা সেগুলো সহজেই কেনার সামর্থ্য রাখেন।
২. বাজারে কোনো অন্যায় প্রভাব তৈরি হতে হবে। সেটা হবে ভবিষ্যতে পণ্যের জোগানে সংকট সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় বর্তমানে বিক্রি থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। এটা হলো জোগানশক্তির ওপর অন্যায় প্রভাব।
৩. বাজারশক্তির ওপর একচেটিয়া কর্মকাণ্ডের প্রভাব, যার ফলে পণ্যের উৎপাদনের ব্যাপারে ভোক্তা ও উৎপাদক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়।
৪. বাজারে প্রভাব ফেলাটা হতে হবে পণ্যের ন্যায্যমূল্যের চেয়ে চড়া কোনো দাম অর্জন করার উদ্দেশ্যে।
➡ ৫. ক্রেতা ও বিক্রেতা, ভোক্তা ও উৎপাদক উভয় পক্ষের জন্য ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়ার কাজটা ন্যায়ানুগভাবে করতে হবে। ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম যে-কোনো দর নির্ধারিত করে দেওয়া অবৈধ।
➡ ৬. মূল্য নির্ধারিত করার চূড়ান্ত লক্ষ্য জনসমাজ থেকে জুলুম অপসারণ। এসব শর্ত ও উদ্দেশ্যের অনুপস্থিতিতে বাজারশক্তিতে হস্তক্ষেপ করা অবৈধ。
📄 অত্যাবশ্যক জোগান নিশ্চিতকরণ
ইবনু তাইমিয়্যার মতে, উৎপাদন খাতে বাজার-শক্তিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আরেকটি রূপ হলো অত্যাবশ্যক পণ্যের জোগান নিশ্চিতকরণ। জনসমাজের কাছে যেসব পণ্য অত্যাবশ্যক, উৎপাদন খাত সেগুলো উৎপাদন করতে ব্যর্থ হলে তাদেরকে মুক্তভাবে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের চাহিদা থাকতে পারে। যেমন: কৃষি, সেলাই ও নির্মাণ। জনগণ যদি তাদের চাহিদার যথাযথ পরিমাণ আমদানি করতে না পারে, তাহলে কাউকে না কাউকে তো তাদের কাপড় সেলাই করে দিতে হবে”, (প্রাগুক্ত)। শিক্ষা সংক্রান্ত পদ্ধতিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, এসকল কর্মকাণ্ড শুরু করা ও চালু রাখা ফরজে কিফায়া। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এ কাজগুলো অবশ্যই করতে হবে। কারণ এই কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করা না হলে জনকল্যাণ অপূর্ণ থেকে যাবে। এ ধরনের ফরযিয়্যাতের প্রকৃতি হলো, সামষ্টিক এই দায়িত্ব কোনো একজন ব্যক্তি পালন করলে তার জন্য সেটাই ফরজে আইন হয়ে যায়। বিশেষত যদি অন্য কেউ তা করার সামর্থ্যবান না হয়, সেক্ষেত্রে। ব্যক্তিদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই শিল্পক্ষেত্রগুলো চলমান রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইবনু তাইমিয়া এমনটাই মনে করেন। তার ভাষায়, “জনগণের যদি কৃষি, তৈরি পোশাক বা নির্মাণশিল্পের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সেটা চালু রাখা সামর্থ্যবানদের জন্য অত্যাবশ্যক দায়িত্ব। ন্যায্য সম্মানি নির্ধারণ করে দেওয়ার পর যদি তারা এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ তাদের জোর করতে পারবে” (প্রাগুক্ত)। অতএব, রাষ্ট্রের ভূমিকা দ্বিমাত্রিক:
(ক) সমাজের এসব অত্যাবশ্যক চাহিদা মেটাতে যারা সামর্থ্যবান, তাদেরকে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করা। আর যৌক্তিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি-সহ তাদেরকে সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা প্রদান করা।
➡ (খ) এই পদক্ষেপ যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে যথেষ্ট পরিমাণ বলপ্রয়োগ করে এই কাজগুলো সামর্থ্যবান মানুষদের দ্বারা করিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে যথাযথ মজুরি প্রদান করার মাধ্যমে ওই ব্যক্তিদের ওপর অবিচারও পরিহার করতে হবে (Holland, 1983)।
রাষ্ট্র যদি এই ভূমিকা গ্রহণ করে, সে ক্ষেত্রে একটা শর্ত ইবনু তাইমিয়্যা বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন—এই সেবাগুলো প্রদানকারী মানুষেরা জনগণের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দাবি করার অধিকার রাখবে না। আবার জনগণও ন্যায্যমূল্যের চেয়ে কম প্রদান করে বা সরকার কম মজুরি দিয়ে তাদের ওপর অবিচার করবে না। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটেই কাজ করবে। তা হলো, বাজার-শক্তি যখন সমাজকে এর সামষ্টিক কল্যাণ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়।