📄 মুদ্রা
বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রা ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করেন লেখক। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ব্যক্তির চাহিদার উদ্ভব এবং আরেক ব্যক্তি কর্তৃক পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা একই সময়ে ঘটে না। লেনদেনের প্রয়োজনাধীন পণ্য বা সেবার পরিমাণও সমান নয়। এক পণ্যের সাপেক্ষে আরেক পণ্যের মূল্যমান অজানা। আর লেনদেন না-হওয়া বাকি পণ্যের মূল্য অন্য পণ্যের সাপেক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। অতএব, এমন কিছু দরকার, যার মাধ্যমে সকল পণ্য ও জিনিসের ওপর মূল্য আরোপ করা সম্ভব এবং যার মাধ্যমে এক পণ্যের সাপেক্ষে আরেক পণ্যের মূল্য পরিমাপ করা যায়"। পণ্যের ওপর মূল্য আরোপের জন্য যে জিনিসটি ব্যবহার করতে হবে, সেটা হওয়া চাই দামি কোনো ধাতু। আর এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্বর্ণ, ও রৌপ্য। স্বর্ণের উপযোগিতা হলো "এটি নষ্ট হয় না, লোহা ও তামার মতো মরিচা ধরে না, সীসার মতো রঙ পালটায় না, সীসার মতো বেশি নরম না, নিয়ন্ত্রণযোগ্য, মূল্যের কোনো হ্রাসবৃদ্ধি না করেই একে পুনরাকৃতি দেওয়া সম্ভব। এর কোনো গন্ধ নেই, এটি দেখতে সুন্দর। মূল্য বা সৌন্দর্যের ক্ষতি না করেই মাটিচাপা দেওয়া যায়। মুদ্রা তৈরির সময় তাতে ছাপানো মার্কা অক্ষত থাকে”। এসব কারণেই টাকা তৈরি করার ধাতু হিসেবে মানুষ সোনা ও রুপা ব্যবহার করতে সম্মত হয়। মূল্যের আকর প্রসঙ্গে আদ-দিমাশকি বলেন, “যে এই ধাতু অর্জন করেছে, সে ওই সকল পণ্য, সেবা ও সম্পদ লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছে, যেগুলো এই ধাতুর বিনিময়ে অর্জন করা যায়। তাও আবার যখন ইচ্ছে, তখন”, (পৃ. ২১)।
📄 উৎপাদনের ব্যয় ও মূল্য
ব্যবসায়িক সচেতনতার কারণে আদ-দিমাশকি দেখান যে, পণ্যের মূল্য তিনটি প্রধান নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে: উৎপাদনের ব্যয়, সংশ্লিষ্ট শ্রমের পরিমাণ, এবং পণ্যের চাহিদা। সংশ্লিষ্ট শ্রমের পরিমাণের উদাহরণ হিসেবে তিনি পান্নার কথা তুলে আনেন। এর সাথে যুক্ত কর্মের পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার মাত্রার ভিত্তিতে এর মূল্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। “সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে পান্নার দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে”, বলেন তিনি (পৃ ৩৬)। আদ-দিমাশকি ব্যয় ও উৎকর্ষের মাত্রার ব্যাপারে সচেতন তো বটেই, পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যয়ের সাথে সাথে পরিবহন খরচ ও শুল্ক মাশুলকেও বিবেচনায় নিয়েছেন তিনি। এ যেন এক হিসাববিদের পাক্কা হিসেব (পৃ ৭৪)। পণ্যের দামের ওপর চাহিদার অবস্থার প্রভাব সম্পর্কেও জানা আছে তার। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তার একটি উপদেশ থেকে এই ব্যাপারটি আঁচ করা যায়। যে পণ্যের চাহিদা নেমে গেছে, সেটি কিনতে তাদের তিনি মানা করেছেন (পৃ ৮১)। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, “পণ্যের প্রাচুর্যের কারণে এর দাম বাড়ে না। চাহিদার তুলনায় জোগানের ঘাটতির কারণে দাম বাড়ে” (পৃ ৭০)।
📄 চাহিদা, জোগান ও দাম
চাহিদা, জোগান ও দামের মধ্যকার সম্পর্ক আদ-দিমাশকি বেশ ভালোভাবে বোঝেন বলে প্রতীয়মান হয়। এই সম্পর্কটি বোঝাতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন “প্রাকৃতিক, আসমানি বা জাগতিক কারণে পরিবহণে বাধা, সরবরাহে বিলম্ব, চাহিদা বৃদ্ধি, বা পরিমাণে ঘাটতির ফলাফল হিসেবে কোনো পণ্যের দাম বাড়তে পারে” (পৃ ২৮-২৯)।
তা ছাড়া লক্ষণীয় হলো, আদ-দিমাশকি মূল্যবৃদ্ধিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন এবং সেগুলোকে বর্ণনা করেছেন ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষা দিয়ে। তার দৃষ্টিতে সূচনাবিন্দু যেটা, সেটাকে বিশেষজ্ঞদের ভাষায় বলা যায় গড় মূল্য। এটি নির্ধারিত হবে পণ্যের প্রকার, বাজারের অবস্থা, অঞ্চল এবং সে অঞ্চলের ব্যবসার সংস্কৃতির ভিত্তিতে। তিনি বলেন, “এই গড় মূল্যের চেয়ে দাম বাড়লে সেটাকে বৃদ্ধির পরিমাণের ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিভাষায় নামকরণ করা যায়।” এই বৃদ্ধিকে তিনি পাঁচটি ক্রমবর্ধমান পর্যায়ে বিভক্ত করেন: সরণ, বিক্রি, উন্নতি, ব্যয়বহুল বৃদ্ধি, এবং মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি। বিপরীত দিকের পরিবর্তনকেও একইভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে, “শান্ত” থেকে শুরু করে “পতন” পর্যন্ত যার সংখ্যা ছয়টি। মূল্যের হ্রাসবৃদ্ধিকে এভাবে শ্রেণিভুক্ত করা থেকে আদ-দিমাশকির চিন্তার অগ্রগামিতা আঁচ করা যায়। অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে তার উদ্যোক্তাসুলভ সচেতনতাও লক্ষণীয়।
📄 মূল্যায়ন
অঞ্চল ও দেশভেদে একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য উল্লেখের মাধ্যমে আদ-দিমাশকি মূল্যবৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার মতে, “পণ্যের মূল্য নির্ধারণ এবং বিশেষজ্ঞরা কোনটিকে গড়মূল্য ধরবেন, তা এলাকাভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। ভারতে একটি জিনিসের যে দাম, মরক্কোয় তার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। আবার তা ইয়েমেনে হতে পারে আরেক রকম। এর কারণ হলো উপকরণের উৎসের সাথে নৈকট্য এবং পণ্যটি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার পরিমাণ”। “একদর সূত্র” সত্ত্বেও পশ্চিমা লেখালেখিতে মূল্যবৈষম্যের ব্যাপারটিকে মূল্যসাম্যকে বাধাগ্রস্তকারী একটি নিয়ামক হিসেবে স্বীকার করা হয়। আদ-দিমাশকি কি তাহলে আধুনিক চিন্তার আগام আভাস দিয়ে গেছেন? হতে পারে।
লেখক বাজারে পণ্যের চাহিদা নিরীক্ষণ করে দেখেন। এই মর্মে মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির অবস্থাকে স্বীকৃতি দেন তিনি। বিলাসবহুল বা মর্যাদাবর্ধক পণ্যগুলো নির্দিষ্ট এক শ্রেণির ভোক্তারা ব্যবহার করেন, যেগুলোর উপযোগ শারীরবৃত্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক নয়। অধিক মাত্রায় সচ্ছল ক্রেতাগণের কাছে এগুলোর চাহিদা ব্যাপক। সেগুলোর দাম যত বাড়ে, চাহিদাও তত বাড়ে। সাধারণত এসব পণ্য কেনার প্রধান তাড়না হলো সামাজিক গর্ব বা লোক-দেখানো। তাই এই পণ্যগুলোর চাহিদা-মূল্য সম্পর্ক সাধারণ নীতির ব্যতিক্রম। এর বিপরীতটিও সত্য। দাম কমার সাথে সাথে চাহিদাসম্পন্ন পরিমাণ কমেও আসতে পারে। এ ব্যাপারে আদ-দিমাশকি বলেন, "রাজা ও সুলতানদের কাছে দামি রত্নপাথরের চাহিদা থাকতে পারে সেগুলোর অতিরিক্ত দামের কারণে। লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে অন্যদের কাছেও থাকতে পারে এগুলোর চাহিদা".