📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সম্পদ

📄 সম্পদ


আদ-দিমাশকি পূর্বেকার লেখকদের মতো তার বইটি মানুষ, মানুষের প্রয়োজন, চাহিদা ও ব্যয় দিয়ে শুরু করেননি। তিনি বরং শুরু করেছেন "মাল" তথা সম্পদের সংজ্ঞা দিয়ে। তিনি যে আলিম হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর লোক, এটি তারই এক প্রতিফলন। "মাল"কে তিনি "অধিকারভুক্ত সম্পদে"র সাথে এক করে দেখেন, এর পরিমাণ যত কম বা বেশিই হোক না কেন। তার সম্পদের শ্রেণিবিভাগটি বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করে। সম্পদ হিসেবে বিবেচিত জিনিসটি নতুন সম্পদ উৎপাদনে সক্ষম কি না, তারই ভিত্তিতে করা হয়েছে এই শ্রেণিবিভাগ। হিসাববিজ্ঞানের ভাষায়, আলোচ্য জিনিসটি স্থায়ী সম্পদ (Fixed asset) নাকি চলতি সম্পদ (Current asset)-সেটাই আদ-দিমাশকির শ্রেণিবিভাগের ভিত্তি। আরেকভাবে বলা যায়, যে সম্পদ থেকে নতুন সম্পদ উৎপন্ন করা যায় না, সেটাই চূড়ান্ত ব্যবহারের জন্য তৈরিকৃত সম্পদ।
সম্পদকে তিনি চারভাগে বিভক্ত করেছেন: ➡ ১. যা কিছু বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, যদিও সেগুলো বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে বটে। যেমন, মুদ্রা,
➡ ২. যা বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। যেমন: মজুদ, পরিবহনযোগ্য পণ্য, ধাতু এবং ধাতু হতে উৎপাদিত জিনিসপত্র,
➡ ৩. জমিজমা জাতীয় সম্পত্তি। এগুলো আবার দুই প্রকার। প্রথমটিকে বলা চলে ছাদবিশিষ্ট। যেমন: ঘর, হোটেল, দোকান, গণ গোসলখানা, কারখানা, বেকারি। দ্বিতীয় প্রকারটি চাষকৃত। যেমন: উদ্যান, বাগান, চারণভূমি, বন, ও নদী ব্যবহারের অধিকার, এবং
➡ ৪. যেগুলোকে লেখক জীব হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যেমন: পশুপাখি ও দাসদাসী।
তার শ্রেণিবিন্যাসটি ব্যবস্থাপনাগত ধাঁচের বলে মনে হয়। এর মূল মনোযোগ সম্পদের ব্যবহারের ওপর নয়, বরং অতিরিক্ত সম্পদ তৈরি করতে পারার ভূমিকা ও কার্যকারিতার ওপর। আদ-দিমাশকির শ্রেণিবিভাগের একটি অংশ গতিশীল, চলমান বা স্বল্পমেয়াদি জিনিস, যেগুলো প্রধানত বাণিজ্যের কাজে ব্যবহারযোগ্য। অপর অংশটি স্থিতিশীল বা দীর্ঘমেয়াদি জিনিস, যেগুলো মূলত বাণিজ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়। হিসাববিজ্ঞান বা অর্থনীতি যে পরিভাষাই ব্যবহার করা হোক না কেন, আদ-দিমাশকি অনেকাংশেই আমাদের যুগের হিসাববিজ্ঞান ও অর্থনীতি-ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগের আদিরূপ দেখিয়ে গেছেন। তাও আবার এগুলোর উদ্ভবের কয়েক শতাব্দী আগেই। সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে এই কাজ করে দেখানো থেকেই বোঝা যায় তিনি সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কতটা দূরদর্শী ছিলেন। ব্যবসায়িক সম্পদের কাঠামো ঠিকভাবে বুঝতে পারাটা উদ্যোক্তার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এটি সম্পদের খুবই উল্লেখযোগ্য এক শ্রেণিবিন্যাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকদের কাছে যেটার গুরুত্ব অনেক।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সম্পদের উৎসসমূহ

📄 সম্পদের উৎসসমূহ


সম্পদ লাভের বিভিন্ন উৎসকে আদ-দিমাশকি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। এই উৎসগুলোর কোনোটা গ্রহণযোগ্য, কোনোটা নয়। প্রধান উৎস দুটি, যার মাঝে দ্বিতীয়টি আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত। ➡ প্রথম প্রকারটি দৈব। উত্তরাধিকার বা অনুরূপ কোনো মাধ্যমে হাতে চলে আসা সম্পদ এই উৎসের মধ্যে পড়ে। ➡ আর দ্বিতীয় প্রকারটিতে প্রচেষ্টা ও সে উদ্দেশ্যে কাজ করার ইচ্ছে প্রয়োজন। এই দ্বিতীয় প্রকারের উপধাপগুলো হলো: কর্তৃত্বমূলক, উদ্যোগমূলক, ও উভয়ের মিশ্রণ।
কর্তৃত্বমূলক উৎস আবার দুই ধরনের। একটি সরকারি (সুলতানিয়্যা), অপরটি বেসরকারি।
সুলতানিয়্যা উৎসগুলো হতে পারে তহবিল গঠনের সরকারি ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ (যেমন, কর গ্রহণ) ও সরকারি মালিকানাধীন ব্যবসা। আর বেসরকারি উৎস হলো চুরি-ডাকাতি, যেগুলো অবৈধ।
উদ্যোগমূলক উৎসের ধরন আবার তিনটি: ব্যবসা, বাণিজ্য ও শিল্প, এবং ব্যবসা ও শিল্পের সমন্বয়।
উদ্যোগ ও কর্তৃত্বের মিশ্রণমূলক উৎসের উদাহরণ হিসেবে আদ-দিমাশকি সুলতানের ব্যবসায়িক কারবারের কথা তুলে ধরেন। এখানে “লেনদেন বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কারণ কেউ সুলতানের চেয়ে বেশি দাম হাঁকাতে বা তার একচ্ছত্রতাকে সীমিত করে দিতে অপারগ”, (পৃ. ৬১)। তাই সুলতানের ব্যবসা এক ধরনের একচেটিয়া ব্যবসা, যা সেই যুগে বেশ জোরেসোরে চলত বলে প্রতীয়মান হয়। একইসাথে আরেকটি একচেটিয়া কারবারের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন লেখক। যেমন, মুষ্টিমেয় ধনী ব্যবসায়ীদের একচেটিয়াপনা, যারা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং “জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় ও বিক্রয় করার ক্ষমতা সীমিত করে দিতে” সক্ষম। বাজারের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক হতে পারে (ক) কোনো প্রভাবশালী বিক্রেতা, ও (খ) একদল ক্রেতা, ও (গ) একদল বিক্রেতা। আদ-দিমাশকির শ্রেণিবিন্যাসে এই বিষয়গুলো উল্লেখের পাশাপাশি বাজারের রূপভেদের প্রসঙ্গও টানা হয়েছে। এটি বাজারের অবস্থার আধুনিক শ্রেণিবিভাগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি বাজারশক্তির ব্যাপারে লেখকের অসাধারণ সচেতনতা ও সূক্ষ্ম জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত আট শতাব্দী আগের একজন লেখক এই বিষয়গুলো তুলে আনতে পারার কারণে উঁচু মাত্রায় কৃতিত্বের দাবিদার।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শ্রম

📄 শ্রম


পূর্বসূরিদের সাথে মিল রেখে তিনিও শ্রমের বিন্যাস, বিশেষায়ণ ও অর্থনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি শ্রমের বিন্যাস ও বিশেষ দক্ষতাকে ব্যক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত করেছেন। এটি যুগের সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তির জীবনকাল, এবং তার শিক্ষাগ্রহণের আগ্রহ ও প্রস্তুতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ব্যক্তির বহুমুখী চাহিদা এবং তার জ্ঞান অর্জনের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন পড়বে। মানবীয় চাহিদার বৈচিত্র্যের কারণে বিশেষ দক্ষতার জন্য একসময় প্রয়োজন পড়বে বিচিত্র রকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এটি অর্থনৈতিক সমন্বয়কে পরিচালনা করবে। পূর্বসূরি আল-আসফাহানি ও গাযালির মতোই আদ-দিমাশকি এই বিষয়টির ব্যাখ্যায় রুটি তৈরির উদাহরণ নিয়ে আসেন। পোশাক উৎপাদনের একটি উদাহরণও এর সাথে যোগ করেন তিনি。

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুদ্রা

📄 মুদ্রা


বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রা ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করেন লেখক। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ব্যক্তির চাহিদার উদ্ভব এবং আরেক ব্যক্তি কর্তৃক পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা একই সময়ে ঘটে না। লেনদেনের প্রয়োজনাধীন পণ্য বা সেবার পরিমাণও সমান নয়। এক পণ্যের সাপেক্ষে আরেক পণ্যের মূল্যমান অজানা। আর লেনদেন না-হওয়া বাকি পণ্যের মূল্য অন্য পণ্যের সাপেক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। অতএব, এমন কিছু দরকার, যার মাধ্যমে সকল পণ্য ও জিনিসের ওপর মূল্য আরোপ করা সম্ভব এবং যার মাধ্যমে এক পণ্যের সাপেক্ষে আরেক পণ্যের মূল্য পরিমাপ করা যায়"। পণ্যের ওপর মূল্য আরোপের জন্য যে জিনিসটি ব্যবহার করতে হবে, সেটা হওয়া চাই দামি কোনো ধাতু। আর এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্বর্ণ, ও রৌপ্য। স্বর্ণের উপযোগিতা হলো "এটি নষ্ট হয় না, লোহা ও তামার মতো মরিচা ধরে না, সীসার মতো রঙ পালটায় না, সীসার মতো বেশি নরম না, নিয়ন্ত্রণযোগ্য, মূল্যের কোনো হ্রাসবৃদ্ধি না করেই একে পুনরাকৃতি দেওয়া সম্ভব। এর কোনো গন্ধ নেই, এটি দেখতে সুন্দর। মূল্য বা সৌন্দর্যের ক্ষতি না করেই মাটিচাপা দেওয়া যায়। মুদ্রা তৈরির সময় তাতে ছাপানো মার্কা অক্ষত থাকে”। এসব কারণেই টাকা তৈরি করার ধাতু হিসেবে মানুষ সোনা ও রুপা ব্যবহার করতে সম্মত হয়। মূল্যের আকর প্রসঙ্গে আদ-দিমাশকি বলেন, “যে এই ধাতু অর্জন করেছে, সে ওই সকল পণ্য, সেবা ও সম্পদ লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছে, যেগুলো এই ধাতুর বিনিময়ে অর্জন করা যায়। তাও আবার যখন ইচ্ছে, তখন”, (পৃ. ২১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00