📄 মুদ্রা
সকল দামি জিনিস তিন শ্রেণির যে-কোনো একটিতে পড়ে: (ক) নিজস্ব স্বতন্ত্র মূল্যের কারণে যা অন্বেষণ করা হয়, (খ) উদ্দেশ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে যা কিছু তালাশ করা হয়, (গ) উভয়টির জন্যই যা অন্বেষণ করা হয়। উদ্দেশ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে অন্বেষণ করা হয় স্বর্ণ ও রৌপ্য, যেগুলো ধাতব টুকরো। আল্লাহ যদি সেগুলোকে জিনিসপত্র ক্রয় করার উপকরণ না বানাতেন, তাহলে এদের মূল্যও সাধারণ পাথরের সমানই হতো।
চতুর্থ খণ্ডে গাযালি মুদ্রার কাজ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। মুদ্রাকে তিনি বিনিময়ের মাধ্যম ও মূল্যের আধার হিসেবে দেখেন। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রা লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করে। এ ব্যাপারে গাযালি বলেন, “সোনা ও রুপা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার এবং এদের সাহায্যে সকল জাগতিক কাজকর্ম মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়। মানুষ সেগুলোর অধিকারী হতে চায়, যেহেতু এগুলোর লেনদেনের মাধ্যমেই জাগতিক পণ্যদ্রব্য ক্রয় করা সম্ভব”, (খণ্ড ৪, পৃ. ৯৫)। তিনি ব্যাপারটি দুই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। একজনের কাছে খাবার আছে, কিন্তু উট নেই। আরেকজনের উট আছে, কিন্তু খাবার নেই। তাই তাদের মাঝে “এই দুটি জিনিসের বিনিময় এবং মূল্য নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়”। কিন্তু “এই দুটো জিনিসের মূল্য সমান নয়। তাই সোনা ও রুপা সকল জিনিসের বিচারক হিসেবে কাজ করে। এটি মূল্য ঠিক করে দেয় এবং তাদের মাধ্যমে পণ্য হস্তগত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়”।
মূল্যের মানদণ্ড হিসেবে এগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, “ধরা যাক একটি উটের মূল্য ১০০ দিনার, এবং ১০০টি মুরগির মূল্যও একই। তাহলে সোনা ও রুপার সাহায্যে সেগুলোর দাম ঠিকঠাক করা হয়, যেহেতু সোনা-রুপার নিজস্ব কোনো দাম নেই। সকল জিনিসের মূল্য ও দর নির্ধারণ এবং লেনদেনের জন্য আল্লাহ এগুলোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিযুক্ত করেছেন”। মূল্যের ধারক প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “সোনা ও রুপা মানুষের কাছে প্রিয়। যার এগুলো আছে, সে এগুলোর মাঝেই সারা দুনিয়া দেখতে পায়”। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ভঙ্গিমায় তিনি রূপক দিয়ে এর ব্যাখ্যা করেন, “আয়নার নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। কিন্তু তার মূল্য এখানেই যে, সকল জিনিসের চিত্রকে সে ধারণ করে” (খণ্ড ৪, পৃ. ৯২)।
টাকার জোগান ও মূল্যমানের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন যে, রাশি রাশি সোনা ও রুপা জমা করার মাধ্যমে এগুলোর সৃষ্টিগত উদ্দেশ্যের অপব্যবহার করা হয়। যে ব্যক্তি স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে, সে “অবিচার করে এবং আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তা থমকে দেয়”। এগুলো ব্যক্তির জন্য নয়, বরং পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য। তা ছাড়া তৈজসপত্র, পেয়ালা ইত্যাদি হিসেবে এসব দামি ধাতুকে ব্যবহার করে সেগুলোর জোগান বাধাগ্রস্ত করা একটি পাপকাজ। এই কাজে লিপ্ত ব্যক্তি “এসব বস্তুকে সৃষ্টিগত উদ্দেশ্যের বিপরীতে ব্যবহার করে” এবং “সে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ, পাপাচারী”। (প্রাগুক্ত)
বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বা রুপার বিনিময়ে রুপা বিক্রি করে মুনাফা করা নিন্দনীয় কাজ। এটি এমন এক লেনদেন, যার “কোনো অর্থ নেই”, কারণ এটি এসকল ধাতুর বিনিময়-মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াকে সীমিত করে দেয়। অবশ্য সোনার বিনিময়ে রুপা বা রুপার বিনিময়ে সোনা বিক্রি করা বৈধ। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, কিছু কমদামি জিনিস স্বর্ণ দিয়ে কেনা যায় না। সেগুলোর জন্য রুপা প্রয়োজন। সোনার বিনিময়ে রুপা কিনলে সেসব লেনদেন সহজ হয়। আবার উল্টোটাও সত্য, (খণ্ড ৪, পৃ. ৯২)।
📄 শিল্পসমন্বয়
কর্মকাণ্ড ছাড়া জাগতিক বিষয়াদি সুশৃঙ্খল হয় না। মানবীয় কর্মকাণ্ড তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত:
➡ (ক) প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে চারটি মৌলিক কর্মকাণ্ড, যেগুলো ছাড়া পৃথিবী চলতে পারে না। এগুলো হলো কৃষি, পোশাক উৎপাদনের জন্য বস্ত্রশিল্প, গৃহ নির্মাণের জন্য স্থাপত্যবিদ্যা, এবং শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা সহকারে বসবাস করার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারব্যবস্থা।
➡ (খ) দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে উল্লেখিত কর্মকাণ্ডগুলোকে সাহায্য করার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যেমন: লৌহশিল্প, বা কৃষি সরঞ্জাম, সুতা বুনন ও কাপড় সেলাইয়ের জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।
➡ (গ) তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত কর্মকাণ্ডগুলো উপর্যুক্ত প্রধান শিল্পগুলোর সাথে সম্পূরক হিসেবে কাজ করে। যেমন: খাওয়া ও পান করা, পোশাক বানানো, কাপড় সেলাই করা (খণ্ড ১, পৃ. ১৭)।
গাযালি আরও বলেন, “বিভিন্ন রকমের ব্যবসা ও শিল্প যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে যাবে এবং বেশির ভাগ মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে।” (খণ্ড ২, পৃ. ৭১)। অন্যত্র তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জাগতিক ব্যস্ততার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এগুলো হলো পাঁচটি প্রধান শিল্প: কৃষি, পশুপালন, শিকার, বুনন ও নির্মাণ, (খণ্ড ৩, পৃ. ২০৯)। মসৃণ জীবনযাপনের জন্য প্রশাসনিক, বিচারিক ও সামরিক কার্যক্রম প্রয়োজন। এই কাজগুলোর ভিত্তিতে মানবজাতি তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত: চাষী, শিল্পপতি, সৈনিক এবং সরকারি কর্মচারী। দ্বীনদারিতা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের ব্যাপারে লালিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ধার্মিক ব্যক্তিগণ আবার নানান শ্রেণিতে বিভক্ত, যা ওপরে বর্ণিত শ্রেণিগুলোর সাথে যুক্ত করা হয় (খণ্ড ৩, পৃ. ২০৯)।
জীবনধারণের জন্য যেমন দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রয়োজন, তেমনি মানবজাতির টিকে থাকার জন্যও ওপরের কর্মকাণ্ডগুলো দরকারি। গাযালি প্রধান প্রধান শিল্পগুলোকে তুলনা করেছেন হৃদপিণ্ডের সাথে। আর অন্যান্য সম্পূরক শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বলেছেন দেহের বিভিন্ন অঙ্গ। দারুণ এক উপমা দিয়েছেন তিনি। প্রথমে মৌলিক, তারপর সাহায্যকারী, তারপর সম্পূরক। গাযালি ব্যাখ্যা করেন, প্রশাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তার মতে এটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর কারণটা সোজাসাপ্টা: প্রশাসনের মাধ্যমেই শান্তি রক্ষিত হয় এবং শান্তিপূর্ণ বসবাস সম্ভব হয়। ইসলামি রাষ্ট্রে বিরাজমান তৎকালীন অস্থিতিশীলতার কথা মাথায় রাখলে, এ ধরনের চিন্তাই স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়। (খণ্ড ১, পৃ. ২৭)
📄 ভোগ ও ভোক্তার আচরণ
আল-আসফাহানির মতোই গাযালি ভোগকে বিভক্ত করেছেন প্রয়োজন থেকে মাত্রাতিরিক্ত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণিতে। ভোক্তাকে অবশ্যই প্রয়োজন পূরণ করতে হবে এবং এগুলো পূরণ করা তার একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এই অর্থে গাযালির অবস্থান চরমপন্থি সুফিদের বিরুদ্ধে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির খাতিরে মনের চাহিদাকে একেবারে অবহেলা করেন। গাযালি বলেন, "জ্ঞানীর লক্ষ্য হলো পরকালে আল্লাহর দিদার লাভ করা এবং তা অর্জন করার একমাত্র উপায় হলো আমল করতে থাকা— কিন্তু সুস্বাস্থ্য না থাকলে আমলের ওপর অবিচল থাকা সম্ভব নয়। আবার খাবার ও পানীয় ছাড়া সুস্বাস্থ্য অর্জনও সম্ভব নয়। তবে সেটা ওপরে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে" (খণ্ড ২, পৃ. ১)।
মাত্রাতিরিক্তের পর্যায়টি যথারীতি নিষিদ্ধ। অন্য অনেকের চেয়ে গাযালিকে যে বিষয়টি আলাদা করে, তা হলো—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য তিনি আহার্য খাবারের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন (খণ্ড ৩, পৃ. ৯৪)। অবশ্য এই পরিমাণগুলো তিনি নির্ধারণ করেছেন সুফি দৃষ্টিকোণ থেকে, যিনি খুব অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। তবে যিনি সুফি নন, পরিপূর্ণ চাহিদা মেটানোর জন্য হয়তো এর চেয়ে বেশি আশা তার থাকতে পারে। তা ছাড়া, এই সুফি দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী ভোক্তাকে সেসব জিনিস থেকেও বিরত থাকতে হবে, যেগুলো ফকিহগণের মতে হালাল হওয়া সত্ত্বেও সেটিকে ঘিরে কোনো না কোনো সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো বিশুদ্ধ তাকওয়ার পর্যায়টি। এটি নিহিত থাকতে পারে ওপরে বর্ণিত ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার মধ্যে, যাকে মধ্যমপন্থা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, রুক্ষ পোশাক পরা, অন্যদের চেয়ে কম খাওয়া এবং শারীরবৃত্তিক চাহিদা থেকে খুব বেশি তৃপ্তি অর্জন না করা। সুফিগণ হয়তো সাধারণ মুসলিমদের চোখে স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য না-ও হতে পারেন। পূর্বসূরি লেখকদের মতোই এখানে মৌলিক চাহিদা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বস্ত্র, বাসস্থান, খাদ্য ও পানীয়কে।
গাযালি ধার্মিকতাকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। প্রথমটি হলো সত্যকে স্বীকার করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ধার্মিকতা। দ্বিতীয়টি ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির ধার্মিকতা, যিনি হালাল-হারামের ব্যাপারে সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে চলেন। তৃতীয়টি আল্লাহভীরু মানুষের ধার্মিকতা, যিনি হারামে পতিত হওয়ার ভয়ে হালাল জিনিসও ছেড়ে দেন। চতুর্থ হলো চরম লেভেলের ধার্মিকতা, যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে সবকিছুই ছেড়ে দেন (খণ্ড ১, পৃ ৩৫)। বিবাহ গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু আল-আসফাহানির মতো এখানে সেটাকে অতটা স্পষ্টভাবে মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
📄 উপার্জন: ব্যবসা ও বাণিজ্য
ব্যবসা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত অধ্যায়ের শুরুতে গাযালি বলেন, "উপার্জন করা মানবজীবনের লক্ষ্য নয়, বরং লক্ষ্যে পৌঁছানোর মাধ্যম", (খণ্ড ২, পৃ. ৫৩)। এতে দুটি স্বতন্ত্র বার্তার ইঙ্গিত মেলে:
➡ ১. জীবিকা উপার্জনের পেছনে সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উচিত,
➡ ২. সম্পদকে জমা করা যাবে না কিংবা স্বকীয়ভাবে জমা করা যাবে না। সঠিক মানবীয় উদ্দীপনা কেবলমাত্র সম্পদ অন্বেষণের জন্য তাড়িত হবে না।
গাযালি বলেন, “মানুষ তিন ধরনের: (ক) এক ধরনের মানুষ আখিরাতের কথা ভুলে গিয়ে জীবিকা উপার্জনকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নেয়, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত। (খ) আরেক ধরনের মানুষ পরকাল নিয়ে ব্যস্ত হতে গিয়ে জীবিকাকে উপেক্ষা করেছে। (গ) তৃতীয় ধরনের মানুষ মধ্যমপন্থায় আছে, যারা আখিরাতের লক্ষ্যকে স্থির রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে”। বোঝা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্রকারটি আকাঙ্ক্ষিত রূপ। তা ছাড়া গাযালি যা বলেছেন, তা চরমপন্থি সুফিদের একটি সমালোচনাও বটে। তারা জীবনের পুরোটা সময় ইবাদতের পেছনে ব্যয় করে উপার্জন থেকে বিরত থাকেন এবং মানুষের দানের টাকায় বাঁচেন। অতএব, জীবিকা উপার্জন করা একটি দায়িত্ব।
এই অধ্যায়ে গাযালি হালাল উপার্জন, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও দ্বীনদারিতা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করেন। এই বিষয়গুলোকে আরও পরিচ্ছেদে বিভক্ত করে বিস্তারিত তুলে ধরেন। যেমন, হালাল উপার্জনের পরিচ্ছেদগুলো হলো বেচা-কেনায় দামাদামি, ঋণের মাধ্যমে ব্যবসা, অগ্রিম মূল্য গ্রহণ, মজুরির জন্য কাজ করা ও ভাড়া নেওয়া, পুঁজি অগ্রিম প্রদানের মাধ্যমে অন্যদের সাথে ব্যবসা করা এবং নির্ধারিত শেয়ারে সম্মিলিত ব্যবসা ইত্যাদি। তার মতে এসব ব্যাপারে শরীয়তের বিধিবিধান শিখে নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই পরিচ্ছেদগুলোকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে সেগুলোর ওপরও বিশদ আলোচনা করেছেন তিনি। যেমন, বেচাকেনায় দরদাম পরিচ্ছেদে তিনি ক্রেতা ও বিক্রেতার অবস্থা, বিক্রয়যোগ্য পণ্য ও চুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন।
বাজারের অবস্থাকে ন্যায়পরায়ণতার ধারণার সাথে সংযুক্ত করে গাযালি বাজার ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন। এদেরকে ন্যায়সঙ্গত ব্যবসায় হস্তক্ষেপকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন। অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চার ফলে দুই ধরনের ক্ষতি হয়: বৃহত্তর অর্থে জনগণের ক্ষতি, এবং নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ক্ষতি। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য জমা করার ফলে সামগ্রিকভাবে জনগণের ক্ষতি হয়। তাই এই কাজটি ধিকৃত। শরীয়ত পণ্য জমা করাকে তিরস্কার করে। গাযালি অবশ্য বিষয়টিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে বলেন যে, খাদ্যদ্রব্য জমা করা শরীয়তে নিন্দিত হলেও যেসব জিনিস প্রধান খাদ্যদ্রব্য নয়, সেগুলো জমা করা নিষিদ্ধ নয়। যেমন, জাফরান। বাজারে আসবে এমন পণ্য তৈরি করতে দেরি করাও নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে, যদি এর ফলে জনগণের ক্ষতি হয়। তাসাউফপন্থি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গাযালি হুকুকের প্রতি অধিক সতর্ক ছিলেন। গাযালি হয়তো বাজারের অবস্থার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তার মতে এটি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছেই সহজলভ্য করা বাঞ্ছনীয়। ন্যায়সঙ্গত ব্যবসার অন্যান্য শর্তও আলোচনা করেছেন তিনি। যেমন মাপ ও ওজন সঠিকভাবে দেওয়া, জনগণের কাছ থেকে তথ্য গোপন না করা, বিক্রয়ের জিনিসটির ব্যাপারে ভুল মেসেজ না দেওয়া। বাজার-পরিস্থিতি নিয়ে গাযালির আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, একে যথাযথ বাজার-ব্যবস্থায় পরিণত করা, বা তার কাছাকাছি নিয়ে আসা। যাতে সবাই তার অধিকার ভোগ করার সুযোগ পায় ও ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
গাযালি মুনাফা বৃদ্ধির পক্ষে কথা বলেননি, যদিও একে তিরস্কারও করেননি। তিনি বলেন, “কম লাভ করা ইহসান, নেক আমল”, কিন্তু “বেশি লাভ করা হারাম নয়”। কারণ “বিক্রি জিনিসটাই ব্যবসায় লাভ করার জন্য। ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি না করলে লাভ হওয়া সম্ভবই নয়”, (খণ্ড ২, পৃ. ৬৭)। তবে, দরিদ্র ক্রেতাকে বিশেষ বিবেচনায় সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। এমনকি এর ফলে ক্রেতাকে কিছু ক্ষতি পোহাতে হলেও। "ক্রেতা যদি দরিদ্র কোনো বিক্রেতার থেকে ক্রয় করেন, তাহলে তার প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্য উচ্চতর মূল্যে ক্রয় করলেও কোনো সমস্যা নেই”, (খণ্ড ২, পৃ. ৭৩)। আর “বাজার ও ব্যবসায় লোভী হবেন না”, (খণ্ড ২, পৃ. ৭৩)। তাই যদিও তিনি একপ্রকার মুক্ত বাজারব্যবস্থার পক্ষপাতী। তবে ইসলামি ধারণা অনুসারে, তার কাঙ্ক্ষিত বাজার দরিদ্র ও অসচ্ছলদের প্রতি নির্দয় নয়। মুনাফার ব্যাপারে তার লক্ষ্য সর্বাধিককরণ নয়, বরং সন্তুষ্টকরণ। এটি সুবিবেচনাপূর্ণ এক মুক্তবাজার।
ন্যায়সঙ্গত বাজারব্যবস্থার আলোচনায় গাযালি জাল মুদ্রার প্রসঙ্গ তুলে আনেন। এগুলো ব্যবহার করা জনগণের প্রতি অবিচার এবং, "জাল মুদ্রা ব্যবহারকারী প্রথম ব্যক্তিটি তার পরবর্তী সকল লেনদেনকারীর গুনাহের ভাগিদার হবে", (খণ্ড ২২, পৃ. ৬৩)।