📄 গ্রন্থকার
সুফি আলিম হিসেবে গাযালি অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে দেখেন একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে, তা হলো ধর্মীয় অনুরাগ। মানুষের আচরণের উদ্দেশ্য হবে শুধুই আল্লাহর অসন্তুষ্টি পরিহার করা, এটা অনুচিত। বরং এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পূর্ণ ধর্মানুরাগ সহকারে তাঁর ইবাদত করা। যেমন, ভোগের প্রকারভেদ করতে গিয়ে তিনি শুধু হালাল-হারামের পার্থক্য করেই ক্ষান্ত হননি। হালালের সাথে তাকওয়ার পার্থক্যও করেছেন। তার মতে ব্যক্তির সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ভোগ, উৎপাদন, সম্পদ জমাকরণ ইত্যাদির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যক্তিমানুষকে তাকওয়ার পর্যায়ে উন্নীত করা। এই পর্যায়টি নিতান্তই হালাল ও জায়েযের ঊর্ধ্বে। এটি তাকওয়াপূর্ণ ও নীতিপরায়ণ আচরণ। এ অর্থে গাযালি মুসলিম লেখকদের এক বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের লক্ষ্য মুমিনদের দ্বীনদারিতাকে একটি উচ্চতর পরিশুদ্ধির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
সুফি হওয়া সত্ত্বেও গাযালির দৃষ্টিভঙ্গী সেসকল গোঁড়া সুফিদের থেকে আলাদা, যারা দুনিয়াবি জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার কথা প্রচার করেন। এমনকি তাকে এই মতগুলোর প্রবলভাবে নিন্দা করতেও দেখা যায়। গোটা জীবনকে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োগ করার জন্য যারা দান-খয়রাতের ওপর ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদেরকে তিনি প্রচণ্ড তিরস্কার করেছেন।
ইমাম আবু ইউসুফের লেখা খারাজের মূল আলোচ্য ছিল রাষ্ট্রের অর্থায়ন এবং মুহাম্মাদ আশ-শাইবানির লেখা কাসবের বিষয় ছিল উপার্জন। গাযালির অর্থনীতি বিষয়ক লেখা তাদের থেকে আলাদা। মানুষ ও বিশ্বজগতে তার সামগ্রিক ভূমিকার ব্যাপারে তার অবস্থান আল-আসফাহানির কাছাকাছি। কিন্তু আল-আসফাহানির আলোচ্য-বিষয় যেখানে ছিল হালাল ও হারামের পার্থক্য, গাযালির সেখানে তাকওয়া ও তাকওয়াহীনতার পার্থক্য। অর্থনীতি বিষয়ক হোক বা না হোক, মানুষের আচরণ বিশ্লেষণে গাযালির মৌলিক পদ্ধতি হলো—হালালের বদলে তাকওয়াকে ভিত্তি হিসেবে ধরা। লেখালেখির কোনো অংশেই তিনি এই বিষয়টি থেকে বিচ্যুত হননি। গাযালির চার-খণ্ডবিশিষ্ট সুবিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়া উলুমুদ্দীন-এ তার যে প্রধান প্রধান মতামত উঠে এসেছে, পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা সেগুলোই আলোচনা করব।
📄 লেখক
আবু হামিদ মুহাম্মাদ গাযালি সাধারণত ইমাম গাযালি নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ৪৫০ হিজরি তথা ১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের খুরাসানের তাউস জেলার তাবেরান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই ৫০৫ হিজরি/১১১১ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। বলা হয়ে থাকে, নিজের মৃত্যুর দিনে তিনি ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করেন। এরপর নিজের কাফনের কাপড় আনিয়ে নেন এবং তা নিজের চোখ পর্যন্ত তুলে বলেন, 'অনুগত অবস্থায় মহান রাজার দরবারে প্রবেশ করছি'। কথাটি বলে তিনি পা লম্বা করে শুয়ে পড়েন এবং সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
খুবই তরুণ বয়সে তিনি তুর্কি শাসক কর্তৃক বাগদাদের নিযামিয়্যা বিদ্যাপীঠে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে ইহুদি খ্রিষ্টান-সহ নানা ধর্মের ও গোষ্ঠীর মানুষদের সাথে তিনি মেশেন। নিয়োগের পর তিনি শাফিয়ি মাযহাব চর্চার চেয়ে সুফিবাদের দিকে বেশি ঝোঁকেন। বাগদাদের লোভনীয় পদ ছেড়ে দেন, সুফি পোশাক পরিধান করেন এবং দামেশক, জেরুসালেম, মক্কা ও মদীনার মাঝে স্থানান্তরিত হতে থাকেন। অন্যান্য ধর্মের মানুষের সাথে মেলামেশা তার লেখালেখিকে প্রভাবিত করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। ইহইয়া গ্রন্থে তিনি নবি-এর বাণী এবং কুরআনের উদ্ধৃতির পাশাপাশি অন্যদের, যেমন ঈসা-এর উক্তিও উল্লেখ করেছেন। আবার "বর্ণিত আছে, জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন” কথাটিও এসেছে তার লেখায়।
তার রেখে যাওয়া বইয়ের সংখ্যা বিশাল। এগুলোর বিষয়বস্তু প্রধানত ধর্মতত্ত্ব, ফিক্হ, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, আকিদা এবং তাফসির। আমাদের আলোচ্য ইহইয়া উলুমুদ্দীন গাযালির প্রসিদ্ধ কর্ম।