📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মানুষ: অর্থনৈতিক সমন্বয়

📄 অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মানুষ: অর্থনৈতিক সমন্বয়


পেশাগত বিশেষায়ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা আলোচনার সময়েই আল-আসফাহানি অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কথা তুলে আনেন। প্রতিটি শিল্প কিভাবে অন্যান্য শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর আলোকপাত করেন তিনি। প্রত্যেকেই হয় অন্যের প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদক ও অন্যের উৎপাদিত পণ্যের ব্যবহারকারী। যদিও তিনি কোন শিল্প কোথায় কী অবদান রাখে সে ধরনের অর্থনৈতিক ছকের প্রসঙ্গে যাননি, তবুও ঐচ্ছিক ও বাধ্যতামূলক শিল্পগুলো কিভাবে সমন্বিত হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন বটে।
লক্ষণীয় যে, আশ-শাইবানির (যার রচিত কিতাবুল কাসব পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে) মতো আল-আসফাহানি কিন্তু কৃষিকাজকে অন্য সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরে স্থান দেননি। তার মতে কৃষি ও শিল্প-সহ সকল কর্মকাণ্ডই সমপরিমাণ গুরুত্ববাহী। কোনোটি অপরটির ওপর বিশেষ প্রাধান্যের অধিকারী নয়। অবশ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর মাঝে তিনটি নিয়ামকের ভিত্তিতে পার্থক্য করেছেন তিনি:
➡ (ক) কাজটির জন্য প্রয়োজনীয় কষ্ট ও প্রচেষ্টার প্রকৃতি এবং সেটা কি পুরোটাই শারীরিক, মানসিক, না উভয়টির সমষ্টি,
➡ (খ) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আগত ফলাফলের প্রকৃতি এবং তা কি বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা দলের কাজে লাগে, না সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের। উপকারের পরিসর যত প্রশস্ত, ওই কর্মকাণ্ড তত উত্তম,
➡ (গ) কর্মকাণ্ডটিতে প্রয়োজনীয় কাজের সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাটিকে স্বকীয় গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় কি না।
কৃষি ও শিল্প নির্বিশেষে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আল-আসফাহানির কাছে সমান গুরুত্ব পাওয়াটা তার সমসাময়িক অর্থনৈতিক পরিবেশের ফলাফল হয়ে থাকতে পারে। যে আসফাহান শহরে তিনি বাস করতেন, তা ছিল নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। ইসলামি বিশ্বের প্রসিদ্ধতম শহরগুলোর একটি ছিল আসফাহান (ল্যাম্বটন, ১৯৮১)।
এর চতুর্পার্শ্বে ছিল দারুণভাবে কর্ষিত এক এলাকা আর আশপাশের জেলাগুলোতে ছিল সমৃদ্ধ চারণভূমি। আসফাহান তার প্রতিবেশী গ্রাম এবং অনেক ছোট ছোট শহরের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। যোগাযোগের জন্যও এর অবস্থান ছিল একদম আদর্শ। শহরটি যে শুধু গুরুত্বপূর্ণ দূরবর্তী বাণিজ্যেই সংশ্লিষ্ট ছিল—তা না। সেটি নিজেই বিভিন্ন স্থানীয় শিল্পের কেন্দ্র। বিশেষত তৈরি পোশাক, যা বিলাসদ্রব্যের সাথে মিলে পৃথিবীর সকল প্রান্তে প্রেরিত হতো (বাহার, ১৯৩৯)। এরকম এক শহরে বেড়ে ওঠা ও জীবনযাপনের ফলে এমনটাই স্বাভাবিক যে, আল-আসফাহানি সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একই পাটাতনে স্থাপন করবেন。

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মানুষ ও মনস্তত্ত্ব: কর্মের উদ্দীপনা

📄 মানুষ ও মনস্তত্ত্ব: কর্মের উদ্দীপনা


পণ্যের চাহিদা ও তার সীমিত জোগানের মাঝে সম্পর্ককে প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি দিয়েছেন আল-আসফাহানি। তিনি বলেন যে, চাহিদা সত্ত্বেও পণ্যের জোগানের অভাবের ভীতি থেকে কাজ ও উৎপাদনের জন্য তাড়না তৈরি হয়। অর্থনৈতিক পণ্যের ধারণাটিকে হয়তো এই বক্তব্য থেকে চিহ্নিত করা যায়। 'দারিদ্র্য ও এর ভীতিই সেই তাড়না, যার ফলে অন্যের জন্য উপকারী জিনিসকে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে উৎপন্ন করতে কঠোর পরিশ্রম করার প্রেরণা তৈরি হয়.' (আল-আসফাহানি)

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মানুষ ও মুদ্রা

📄 মানুষ ও মুদ্রা


সুন্দর একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুদ্রা-সংক্রান্ত আলোচনাটি সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও আল-আসফাহানি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তুলে এনেছেন (ডোনিয়া, প্রাগুক্ত)।
➡ প্রথমত, অর্থনীতিতে অর্থের অপরিহার্য অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, 'পার্থিব জীবন যেসব ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার মাঝে একটি হলো মুদ্রা।'
➡ দ্বিতীয়ত, তিনি মুদ্রা ও পণ্যের প্রাপ্যতার সম্পর্ক স্বীকার করেন। বলেছেন, 'মুদ্রার মূল্যমান যদি বেড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে জীবনকে সহজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অর্জন করা কষ্টকর হয়ে যায়।'
➡ তৃতীয়ত, বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার কার্যকর ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, 'অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয়েছে মুদ্রার ব্যবহারের মাধ্যমে। যার কাছ থেকে কোনো উপকার চাওয়া হয়, তাকে সেই উপকারপ্রার্থী মুদ্রা প্রদান করে। উক্ত উপকারকারী আবার নিজে অন্য কোনো উপকার ভোগের জন্য আরেকজনের সাথে সেই মুদ্রা বিনিময় করে। ফলে অর্থনৈতিক কার্যাবলী মসৃণভাবে চলতে থাকে।'
➡ চতুর্থত, মুদ্রার জোগান এবং দাম বৃদ্ধির মাঝে সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি বলেন, 'মানুষের লেনদেনে মুদ্রাকে ব্যবহৃত হতে না দিয়ে সেটাকে জমা করতে থাকা মানে তাদের স্বার্থ কুক্ষিগত করতে থাকা, যেহেতু মুদ্রার মাধ্যমে তাদের (অর্থনৈতিক) জীবন সচল থাকে। তা ছাড়া এজন্যেই হাদীসে স্বর্ণ ও রৌপ্যকে তৈজসপত্র হিসেবে ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এতে করে এসব ধাতুকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে লেনদেন সহজ করার সহজলভ্যতা কমে যায়। এতে কঠিনতা চলে আসতে পারে মানুষের জীবনে.' (আল-আসফাহানি, পৃ. ২৭৩)
➡ পঞ্চমত, তিনি সবশেষে উল্লেখ করেন যে, মুদ্রা স্বকীয়ভাবে প্রয়োজনীয় নয়। বরং এটি যে উদ্দেশ্য পূর্ণ করে, তার জন্য প্রয়োজনীয়, 'আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য টাকা সৃষ্টি করেছেন, সেজন্যই একে ব্যবহার করতে হবে.' (প্রাগুক্ত)
পরবর্তীকালে গাযালির মতো প্রাজ্ঞ লেখকদের প্রভাবিত করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আল-আসফাহানিকে। তিনি আল-আসফাহানির আয-যারিআহকে খুবই সম্মানের চোখে দেখতেন (আল-আগামি, ১৯৮৫)। আমাদের পরবর্তী আলোচ্য গাযালিরই একটি বই ইহইয়া উলুমুদ্দীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00