📄 মানবীয় ভূমিকা: উৎপাদন
বিশ্বজগতে মানবসন্তানের তিন রকমের কাজ রয়েছে বলে আল-আসফাহানি উল্লেখ করেছেন: প্রথমত, বিশ্বজগতের উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য কাজ করা; দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ইবাদত; এবং তৃতীয়ত, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা। তিনি এই শ্রেণিবিন্যাসের যথার্থতা তুলে ধরতে কুরআন থেকে দলিল পেশ করেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসব কাজের মধ্যে একদম প্রথমটি, কারণ এতে মানবীয় চাহিদাগুলোর জীবিকা নিশ্চিত হয়। পৃথিবীকে সভ্য করা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণ করার কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আসবে আল্লাহকে তাঁর সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো ও তাঁর সাহায্য কামনার্থে তাঁর ইবাদত করা।
এই ইবাদতের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে উন্নয়নের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে আল্লাহর আদেশসমূহ মান্য করা এবং সেগুলোর ফলাফল আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক উপায়ে বণ্টন করার মাধ্যমে। এভাবে মানবজাতি পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত থাকবে, যা শুধুমাত্র শরীয়তের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আল্লাহর বিধান ও আদেশ মান্য করে পৃথিবীর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমেই সম্ভব। লক্ষণীয় যে, আল-আসফাহানির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির সংজ্ঞা শুধুমাত্র শারীরবৃত্তিক প্রয়োজন পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে আরও রয়েছে 'জীবনকে সুবিধাপূর্ণ করা ও উপকরণসমূহ সহজলভ্য করা'। এর মানে হলো প্রাপ্ত জিনিসের উপযোগ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জীবনের মান শারীরিক ও আত্মিকভাবে উন্নত করা।
বিশ্বজগতে মানবজাতির কার্যক্রম উল্লেখের ক্ষেত্রে আল-আসফাহানি সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেছেন অর্থনৈতিক কাজকর্মকে। বৈরাগ্যবাদি সুফি চিন্তাধারার বিপরীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আগে যেমনটি বলা হলো (পঞ্চম অধ্যায়ে), সুফিগণ ইবাদতকে অন্য সকল কাজের চেয়ে আগে স্থান দেন, এমনকি মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করার চেয়েও।
পূর্বসূরি ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শাইবানির মতো আল-আসফাহানিও এর সাথে দ্বিমত করেন। ইবাদতের খাতিরে কর্ম ও জীবিকার মাধ্যম অন্বেষণ পরিত্যাগ করার বিরোধিতা করেছেন তিনি। দেখে মনে হয় যেন চরমপন্থি সুফিদের বিরুদ্ধাবস্থান নিতে গিয়ে আল-আসফাহানি আরেক প্রান্তিকতায় লিপ্ত হয়ে গেছেন। অর্থাৎ, পৃথিবীর উন্নয়নের উদ্দেশ্যে জীবিকার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা করাকে ইবাদতের আগে স্থান দিয়েছেন। তার যুক্তি, অনাহারে মরে গেলে তো ইবাদত করার জন্য আর মানুষটার কিছু বাকিই থাকবে না। তাই ইবাদত করার জন্য জীবনধারণ শর্ত, এমনকি জীবিকা উপার্জনকে এক ধরনের ইবাদত বলে বিবেচনা করলেও কথাটি যৌক্তিক।
এ ছাড়াও, উৎপাদনের ব্যাপারে আল-আসফাহানির দৃষ্টিভঙ্গিকে এভাবে তুলে ধরা যায় (Donia, 1984):
উৎপাদন-কার্য এবং পণ্য ও সেবার মূল্যকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে শ্রমের গুরুত্বের ওপর জোর দেন তিনি।
বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তাগাদা দেন যে, উৎপাদনে প্রতিটি ব্যক্তির অবদান যেন অন্তত তার ভোগের চাহিদার সমপরিমাণ হয়। এই অবদানের চেয়ে বেশি সে যা ভোগ করবে, তা অন্য নাগরিকদের ওপর তার পক্ষ থেকে কৃত অবিচার।
তিনি বেকারত্বের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেন। বেকারত্বের সাথে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবনযাত্রা কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখান। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, বেকারত্ব শুধু বেকার ব্যক্তিটিরই ক্ষতি করে না; বরং এটি একটি সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক সমস্যা।
যে সুফিগণ উৎপাদন-কর্মের ওপর ইবাদতের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করেন, তাদের প্রবলভাবে সমালোচনা করেছেন লেখক। শরীয়তের উৎসগুলো থেকে তাদের দাবিগুলোর বিরুদ্ধে প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন যে, সুফিদের দ্বারা উৎসাহিত ইচ্ছেকৃত বেকারত্ব সমাজের প্রতি অন্যায়। আর রাষ্ট্রের উচিত অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব দূরীকরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
📄 সমাজে মানুষ: সহযোগিতা
শিল্প, উপার্জন ও ব্যয়-সংক্রান্ত অধ্যায়ের শুরুতে এক ভূমিকামূলক বক্তব্যে আল-আসফাহানি বলেন যে, মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য তাদের মাঝে সহযোগিতা আবশ্যক। তিনি এক টুকরো রুটি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে দেখান যে, এখানেও বিভিন্ন মাধ্যম ও সক্ষমতার অধিকারী একদল মানুষের একত্রে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে। তুলে ধরেন নবি -এর বাণী, 'বিশ্বাসীগণ একটি দালানের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে মজবুত করে.' (সহিহ বুখারি, ২৪৪৬) সহযোগিতার গুরুত্বকে আরও জোরারোপ করে তিনি বলেন, 'সবাই যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টায় থাকে, তাহলে এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে.' (আল-আসফাহানি)
📄 অর্থনৈতিক দক্ষতায় মানুষ: বিশেষ দক্ষতা
সহযোগিতা থেকে তিনি পেশাগত বিশেষায়ণ প্রসঙ্গে গমন করেন। তিনি বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন যে, এর ফলে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। মানুষের সক্ষমতা, প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ধরনের পেশাগত কাজের আকাঙ্ক্ষা নানারকম হয়ে থাকে। এর ফলে তারা নিজেদের সেরাটা দেখাতে সক্ষম হয়। অন্যথায় যদি তাদের কোনো পেশায় জোর করে ঢোকানো হয়, তাহলে বিরক্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কর্মদক্ষতাও হারাবে তারা। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীর সামর্থ্য, ঝোঁক ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের নকশা বানাতে হবে। ধর্মীয় দিক থেকে তিনি দেখান যে, সামর্থ্য ও ইচ্ছের বৈচিত্র্য আল্লাহর একটি অনুগ্রহ, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ উৎপাদন-কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব।
📄 অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মানুষ: অর্থনৈতিক সমন্বয়
পেশাগত বিশেষায়ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা আলোচনার সময়েই আল-আসফাহানি অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কথা তুলে আনেন। প্রতিটি শিল্প কিভাবে অন্যান্য শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর আলোকপাত করেন তিনি। প্রত্যেকেই হয় অন্যের প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদক ও অন্যের উৎপাদিত পণ্যের ব্যবহারকারী। যদিও তিনি কোন শিল্প কোথায় কী অবদান রাখে সে ধরনের অর্থনৈতিক ছকের প্রসঙ্গে যাননি, তবুও ঐচ্ছিক ও বাধ্যতামূলক শিল্পগুলো কিভাবে সমন্বিত হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন বটে।
লক্ষণীয় যে, আশ-শাইবানির (যার রচিত কিতাবুল কাসব পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে) মতো আল-আসফাহানি কিন্তু কৃষিকাজকে অন্য সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরে স্থান দেননি। তার মতে কৃষি ও শিল্প-সহ সকল কর্মকাণ্ডই সমপরিমাণ গুরুত্ববাহী। কোনোটি অপরটির ওপর বিশেষ প্রাধান্যের অধিকারী নয়। অবশ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর মাঝে তিনটি নিয়ামকের ভিত্তিতে পার্থক্য করেছেন তিনি:
➡ (ক) কাজটির জন্য প্রয়োজনীয় কষ্ট ও প্রচেষ্টার প্রকৃতি এবং সেটা কি পুরোটাই শারীরিক, মানসিক, না উভয়টির সমষ্টি,
➡ (খ) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আগত ফলাফলের প্রকৃতি এবং তা কি বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা দলের কাজে লাগে, না সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের। উপকারের পরিসর যত প্রশস্ত, ওই কর্মকাণ্ড তত উত্তম,
➡ (গ) কর্মকাণ্ডটিতে প্রয়োজনীয় কাজের সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাটিকে স্বকীয় গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় কি না।
কৃষি ও শিল্প নির্বিশেষে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আল-আসফাহানির কাছে সমান গুরুত্ব পাওয়াটা তার সমসাময়িক অর্থনৈতিক পরিবেশের ফলাফল হয়ে থাকতে পারে। যে আসফাহান শহরে তিনি বাস করতেন, তা ছিল নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। ইসলামি বিশ্বের প্রসিদ্ধতম শহরগুলোর একটি ছিল আসফাহান (ল্যাম্বটন, ১৯৮১)।
এর চতুর্পার্শ্বে ছিল দারুণভাবে কর্ষিত এক এলাকা আর আশপাশের জেলাগুলোতে ছিল সমৃদ্ধ চারণভূমি। আসফাহান তার প্রতিবেশী গ্রাম এবং অনেক ছোট ছোট শহরের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। যোগাযোগের জন্যও এর অবস্থান ছিল একদম আদর্শ। শহরটি যে শুধু গুরুত্বপূর্ণ দূরবর্তী বাণিজ্যেই সংশ্লিষ্ট ছিল—তা না। সেটি নিজেই বিভিন্ন স্থানীয় শিল্পের কেন্দ্র। বিশেষত তৈরি পোশাক, যা বিলাসদ্রব্যের সাথে মিলে পৃথিবীর সকল প্রান্তে প্রেরিত হতো (বাহার, ১৯৩৯)। এরকম এক শহরে বেড়ে ওঠা ও জীবনযাপনের ফলে এমনটাই স্বাভাবিক যে, আল-আসফাহানি সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একই পাটাতনে স্থাপন করবেন。