📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মানবীয় চাহিদাসমূহ: ভোগ

📄 মানবীয় চাহিদাসমূহ: ভোগ


ভোক্তা হিসেবে মানুষের চাহিদার ওপর আল-আসফাহানি দৃষ্টিপাত করেন এবং মানবীয় চাহিদাকে ভাগ করেন সেসব চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে। তার দৃষ্টিতে মানবীয় চাহিদা দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: শারীরবৃত্তীয় চাহিদা এবং আত্মিক চাহিদা, যেগুলো নৈতিক ও নীতিগত মূল্যবোধ পূরণের সাথে সম্পর্কিত। শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনের তালিকায় খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের পাশাপাশি বিবাহকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন লেখক। এর মাধ্যমে তালিকাটি মানবীয় চাহিদার সকল দিককে স্বীকৃতি প্রদান করে। একজন ধর্মানুরাগী মুসলিম বিশেষজ্ঞের দ্বারা উদ্ধৃত এই ব্যাপারটি ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মৌলিক চাহিদার ধারণাটিরও প্রতিফলন। আল-আসফাহানি বলেন যে, এই চাহিদাগুলো পূরণ হয় বা পূরণ করতে হয় আল্লাহর বিধানাবলি ও আদেশসমূহ তথা শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। শরীয়তের বিধান পূর্ণ করা হলে প্রথম ধরনের আত্মিক চাহিদাও পূরণ হয়ে যায়। ইবাদত ও অন্যান্য ধর্মীয় দায়িত্ব ঠিক রাখার মাধ্যমে আরও বেশি করে পূরণ হবে আত্মিক চাহিদা। আত্মিক চাহিদার মধ্যে আরও রয়েছে ধর্মীয় ও জাগতিক ব্যাপারে শেখা ও জ্ঞান অর্জন করার চাহিদা। ভোগের পর্যায়গুলোকে আল-আসফাহানি অন্য অনেক ফকিহের মতো ভাগ করেছেন চরম, সর্বনিম্ন, কাঙ্ক্ষিত, প্রাচুর্য ও মাত্রাতিরিক্ত শ্রেণিতে। প্রতিটি পর্যায় পরিমাণ ও মানের বিচারে তার আগের পর্যায়টির সম্প্রসারণ। মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়টি তার মতে সম্পদের অপব্যয়মূলক ব্যবহার, যা স্বভাবতই আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী হারাম।
মোটকথা, আল-আসফাহানি খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের পাশাপাশি আরও দুটি চাহিদার ওপর জোরারোপ করেছেন: (ক) তিনি বিবাহকে মৌলিক মানবীয় চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, এবং (খ) মানসিক কৌতূহলকে শাস্ত্রীয় স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা ও জ্ঞানান্বেষণকে মৌলিক মানবীয় চাহিদার অংশ বলে ঘোষণা করেছেন। মানবীয় এসকল চাহিদা পূরণে ব্যক্তি, সমাজ, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ভূমিকা নির্ধারণে আল-আসফাহানির এই শ্রেণিবিন্যাসকরণ বহুবিধ গুরুত্বের অধিকারী। যেমন: রাষ্ট্র যদি এসকল চাহিদা পূরণ করার ভূমিকা ধারণ করে থাকে, তাহলে তা শুধু খাওয়ানো, পরানো ও মাথার ওপর ছাদ প্রদান করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মানুষের বিয়ে তথা পরিবার নির্মাণ এবং শিক্ষান্বেষণ নিশ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এগুলোকে চাহিদা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ফলেই তারা এমনসব অগ্রাধিকার লাভ করবে, যা অন্যথায় প্রদান করা হতো না。

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মানবীয় ভূমিকা: উৎপাদন

📄 মানবীয় ভূমিকা: উৎপাদন


বিশ্বজগতে মানবসন্তানের তিন রকমের কাজ রয়েছে বলে আল-আসফাহানি উল্লেখ করেছেন: প্রথমত, বিশ্বজগতের উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য কাজ করা; দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ইবাদত; এবং তৃতীয়ত, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা। তিনি এই শ্রেণিবিন্যাসের যথার্থতা তুলে ধরতে কুরআন থেকে দলিল পেশ করেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসব কাজের মধ্যে একদম প্রথমটি, কারণ এতে মানবীয় চাহিদাগুলোর জীবিকা নিশ্চিত হয়। পৃথিবীকে সভ্য করা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণ করার কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আসবে আল্লাহকে তাঁর সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো ও তাঁর সাহায্য কামনার্থে তাঁর ইবাদত করা।
এই ইবাদতের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে উন্নয়নের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে আল্লাহর আদেশসমূহ মান্য করা এবং সেগুলোর ফলাফল আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক উপায়ে বণ্টন করার মাধ্যমে। এভাবে মানবজাতি পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত থাকবে, যা শুধুমাত্র শরীয়তের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আল্লাহর বিধান ও আদেশ মান্য করে পৃথিবীর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমেই সম্ভব। লক্ষণীয় যে, আল-আসফাহানির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির সংজ্ঞা শুধুমাত্র শারীরবৃত্তিক প্রয়োজন পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে আরও রয়েছে 'জীবনকে সুবিধাপূর্ণ করা ও উপকরণসমূহ সহজলভ্য করা'। এর মানে হলো প্রাপ্ত জিনিসের উপযোগ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জীবনের মান শারীরিক ও আত্মিকভাবে উন্নত করা।
বিশ্বজগতে মানবজাতির কার্যক্রম উল্লেখের ক্ষেত্রে আল-আসফাহানি সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেছেন অর্থনৈতিক কাজকর্মকে। বৈরাগ্যবাদি সুফি চিন্তাধারার বিপরীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আগে যেমনটি বলা হলো (পঞ্চম অধ্যায়ে), সুফিগণ ইবাদতকে অন্য সকল কাজের চেয়ে আগে স্থান দেন, এমনকি মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করার চেয়েও।
পূর্বসূরি ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শাইবানির মতো আল-আসফাহানিও এর সাথে দ্বিমত করেন। ইবাদতের খাতিরে কর্ম ও জীবিকার মাধ্যম অন্বেষণ পরিত্যাগ করার বিরোধিতা করেছেন তিনি। দেখে মনে হয় যেন চরমপন্থি সুফিদের বিরুদ্ধাবস্থান নিতে গিয়ে আল-আসফাহানি আরেক প্রান্তিকতায় লিপ্ত হয়ে গেছেন। অর্থাৎ, পৃথিবীর উন্নয়নের উদ্দেশ্যে জীবিকার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা করাকে ইবাদতের আগে স্থান দিয়েছেন। তার যুক্তি, অনাহারে মরে গেলে তো ইবাদত করার জন্য আর মানুষটার কিছু বাকিই থাকবে না। তাই ইবাদত করার জন্য জীবনধারণ শর্ত, এমনকি জীবিকা উপার্জনকে এক ধরনের ইবাদত বলে বিবেচনা করলেও কথাটি যৌক্তিক।
এ ছাড়াও, উৎপাদনের ব্যাপারে আল-আসফাহানির দৃষ্টিভঙ্গিকে এভাবে তুলে ধরা যায় (Donia, 1984):
উৎপাদন-কার্য এবং পণ্য ও সেবার মূল্যকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে শ্রমের গুরুত্বের ওপর জোর দেন তিনি।
বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তাগাদা দেন যে, উৎপাদনে প্রতিটি ব্যক্তির অবদান যেন অন্তত তার ভোগের চাহিদার সমপরিমাণ হয়। এই অবদানের চেয়ে বেশি সে যা ভোগ করবে, তা অন্য নাগরিকদের ওপর তার পক্ষ থেকে কৃত অবিচার।
তিনি বেকারত্বের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেন। বেকারত্বের সাথে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবনযাত্রা কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখান। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, বেকারত্ব শুধু বেকার ব্যক্তিটিরই ক্ষতি করে না; বরং এটি একটি সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক সমস্যা।
যে সুফিগণ উৎপাদন-কর্মের ওপর ইবাদতের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করেন, তাদের প্রবলভাবে সমালোচনা করেছেন লেখক। শরীয়তের উৎসগুলো থেকে তাদের দাবিগুলোর বিরুদ্ধে প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন যে, সুফিদের দ্বারা উৎসাহিত ইচ্ছেকৃত বেকারত্ব সমাজের প্রতি অন্যায়। আর রাষ্ট্রের উচিত অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব দূরীকরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সমাজে মানুষ: সহযোগিতা

📄 সমাজে মানুষ: সহযোগিতা


শিল্প, উপার্জন ও ব্যয়-সংক্রান্ত অধ্যায়ের শুরুতে এক ভূমিকামূলক বক্তব্যে আল-আসফাহানি বলেন যে, মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য তাদের মাঝে সহযোগিতা আবশ্যক। তিনি এক টুকরো রুটি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে দেখান যে, এখানেও বিভিন্ন মাধ্যম ও সক্ষমতার অধিকারী একদল মানুষের একত্রে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে। তুলে ধরেন নবি -এর বাণী, 'বিশ্বাসীগণ একটি দালানের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে মজবুত করে.' (সহিহ বুখারি, ২৪৪৬) সহযোগিতার গুরুত্বকে আরও জোরারোপ করে তিনি বলেন, 'সবাই যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টায় থাকে, তাহলে এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে.' (আল-আসফাহানি)

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অর্থনৈতিক দক্ষতায় মানুষ: বিশেষ দক্ষতা

📄 অর্থনৈতিক দক্ষতায় মানুষ: বিশেষ দক্ষতা


সহযোগিতা থেকে তিনি পেশাগত বিশেষায়ণ প্রসঙ্গে গমন করেন। তিনি বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন যে, এর ফলে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। মানুষের সক্ষমতা, প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ধরনের পেশাগত কাজের আকাঙ্ক্ষা নানারকম হয়ে থাকে। এর ফলে তারা নিজেদের সেরাটা দেখাতে সক্ষম হয়। অন্যথায় যদি তাদের কোনো পেশায় জোর করে ঢোকানো হয়, তাহলে বিরক্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কর্মদক্ষতাও হারাবে তারা। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীর সামর্থ্য, ঝোঁক ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের নকশা বানাতে হবে। ধর্মীয় দিক থেকে তিনি দেখান যে, সামর্থ্য ও ইচ্ছের বৈচিত্র্য আল্লাহর একটি অনুগ্রহ, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ উৎপাদন-কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00