📄 গ্রন্থকার
আল-আগানি বইটির জন্য বিখ্যাত যে আসফাহানি, তিনি এই ব্যক্তি নন। আলোচ্য লেখকের পুরো নাম আবুল কাসিম আল-হুসাইন ইবনু মুহাম্মাদ ইবনুল মুফদাল রাগিব আল-আসফাহানি। তার এই নামের কারণ হলো আসফাহান শহরের সাথে তার সম্পর্ক। একাদশ শতাব্দীর প্রথমাংশে তিনি আসফাহান ও বাগদাদে বাস করেছেন। তার জন্ম-তারিখ সম্ভবত অজানা, যদিও মৃত্যুসন হিসেবে ৫০২ হিজরি/১১০৮ খ্রিষ্টাব্দের কথা বলা হয় (আল-আগামী, ১৯৮৫)। তিনি সুন্নি ও শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কেউ কেউ তাকে শিয়া হিসেবে অভিহিত করেন, যেহেতু তার লেখালেখিতে আলি-এর পরিবারের খুব প্রশংসা দেখতে পাওয়া যায়। রাজনৈতিকভাবে তিনি নিজে সুন্নি বা শিয়া—কোনো পক্ষপাতের কথা উল্লেখ করেননি। আসলে তৎকালীন মুসলিমদের মাঝে চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে কোনো আগ্রহই প্রকাশ করেননি তিনি। আর যদি সেসময়কার বুদ্ধিজীবীদের নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রশ্ন আসে, সেক্ষেত্রে কেউ কেউ তাকে মুতাযিলি বলে উল্লেখ করেন। কারণ তার চিন্তার বড় একটি অংশ জুড়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক যুক্তিবুদ্ধি-সংক্রান্ত আলোচনা। কেউ কেউ আবার তাকে আশআরি বলে থাকেন, যাদের ধর্মীয় ভাষ্য ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি মুতাযিলিদের বিপরীত।
তা ছাড়া রাগিব আল-আসফাহানির কাজগুলোকে নীতিশাস্ত্রীয় দর্শন শিরোনামের অধীনেও আনা যায়। কারণ তিনি তার অর্থনীতি-সংক্রান্ত ও অন্যান্য ধারণাকে নৈতিক ও নীতিগত বিষয়াদির সাথে মিশ্রিত করতেন। এখনকার পরিভাষায় একে বলা চলে নৈতিক অর্থনীতির শুরুর দিকের ইতিহাস। অবশ্য নৈতিকতার ওপর জোর দেওয়া হলেই একে নৈতিক দর্শনের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া সমীচীন নয়। কেননা, কুরআনের আয়াতে জাগতিক বিষয়াদিকে নৈতিক মূল্যবোধের থেকে আলাদা করতে খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু আল-আসফাহানি ও অন্যদের কাজগুলোকে এই শ্রেণিভুক্ত করাটা হতে পারে গ্রিক দর্শনের প্রভাবের ফল, যা তৎকালীন মুসলিম দার্শনিকগণের চিন্তায় লক্ষণীয় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।
📄 গ্রন্থের আলোচনা
ইসলামি অর্থনীতির সাথে প্রাসঙ্গিকতা-সম্পন্ন বইটির নাম আয-যারিআহ ইলা মাকারিম আশ-শারীআহ, অর্থাৎ শরীয়তের মহৎ বিষয়গুলো হাসিলের পথ। বইটির শিরোনাম যদিও আলাদাভাবে ইসলামি অর্থনীতির ব্যাপারে নয়, কিন্তু এর মূল পাঠ্যের ভেতর এই বিষয়-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি রয়েছে। বইটি যে সাতটি অধ্যায় নিয়ে গঠিত, এর মধ্যে দুটি শুধুই অর্থনীতি নিয়ে। বাকি অধ্যায়গুলোতেও অর্থনীতি-সংক্রান্ত জিনিস রয়েছে। যেমন: ভোক্তার আচরণ। বইটিতে আলোচিত বিষয়গুলোকে সব মিলিয়ে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণিবিন্যস্ত করা যায় (Donia, 1984):
➡ ১. মানুষ: তার গুরুত্ব, কার্যাবলি ও চাহিদাসমূহ
➡ ২. উৎপাদন কর্মকাণ্ড: উৎপাদন, সমবায় ও বিশেষায়ণের গুরুত্ব, উৎপাদনের মাধ্যমসমূহ, চাকরি ও বেকারত্ব, অর্থনৈতিক কার্যাবলির পরিসর।
➡ ৩. সম্পদ ও এর উৎসসমূহ: সম্পদ, ধন, দারিদ্র্য, টাকার সাথে মানুষের সম্পর্ক।
➡ ৪. ব্যয়: ব্যয় ও ভোগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও ভারসাম্যহীনতা।
যারিআহ শুরু হয় মানুষ-সংক্রান্ত অধ্যায় দিয়ে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ ইসলামে মানুষকেই সৃষ্টিজগতের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার জন্য আল্লাহ অন্য সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ এবং তার প্রকৃতি, সৃষ্টি, দায়িত্ব, চাহিদা ও উদ্দীপনার আলোচনা দিয়ে বইটি শুরু করায় বোঝা যায় যে, মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থানকে আল-আসফাহানি বুদ্ধিদীপ্তভাবে উপলব্ধি করেছেন। অর্থনীতি-সংক্রান্ত একটি বইয়ের বিষয়সূচি বিন্যাস অনুযায়ীও এটি যৌক্তিক। কারণ মানুষই ভোক্তা, উৎপাদক, বণ্টনকারী, বিনিয়োগকারী, সম্পদ অন্বেষণকারী, উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্তগ্রহীতা ইত্যাদি। তার মানে মানুষ সেই কেন্দ্র, যাকে ঘিরে অর্থনৈতিক সকল সিদ্ধান্ত আবর্তিত হয়। এমনকি ইসলামি অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত নয়, এরকম সাধারণ অর্থনৈতিক বইয়ের ক্ষেত্রেও এই সরল বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই।