📄 গ্রন্থকার
আবুল হাসান আলি ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হাবিব আল-মাওয়ারদি একজন শাফিয়ি আলিম। তাঁর জন্ম ৯৭২ সালে বসরায়। তাঁর সমসাময়িক বহু আলিমের মতো তিনি কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন শেষে ফিকহ অধ্যয়নে নিবিষ্ট হন। ফিকহ, আদব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সাহিত্যে তাঁর দক্ষতা তাঁকে দেয় বাগদাদে এক সম্মানজনক কর্মজীবন। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি নিয়োগ পান প্রধান বিচারপতি হিসেবে (রহিম, ১৯৯৩)।
আব্বাসি খলিফা আল-কাইম বি আমরিল্লাহ'র (১০৩১-১০৭৫ খ্রি.) শাসনামলে তিনি ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান এবং তা সম্ভবত বুওয়াইহিদের অনুমোদনক্রমেই। বেশ কয়েকটি দেশে বিশেষ কিছু উদ্যোগের প্রধান হিসেবে প্রেরণ করা হয় তাঁকে (যাহুর, ১৯৯৭)। ওই সময়টায় বুওয়াইহিগণই খিলাফতকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এরপর একটা সময়ে ১০৫৫ সালে তুর্কি সেলজুকরা তাদের দাপটের অবসান ঘটান। এদিক থেকে বলা যায়, ক্ষয়িষ্ণু আব্বাসি খিলাফতের সাথে উদীয়মান বুওয়াইহি ও সেলজুকদের মাঝে সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে আল-মাওয়ারদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বুওয়াইহিদের হাত থেকে সেলজুক তুর্কিরা যখন বাগদাদ অধিকার করে নেন, তখনো তিনি সেখানেই অবস্থানরত ছিলেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে আল-মাওয়ারদির অবদানস্বরূপ বেশ কিছু সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত কিতাবুল আহকাম আস-সুলতানিয়্যা, কানুন আল-ওয়াযারা এবং কিতাব নাইশাতুল মুলক। বইগুলোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনীতির মূলনীতিসমূহ আলোচিত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে খলিফা, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীর কার্যক্রম ও দায়িত্বসমূহ এবং জনগণ ও সরকারের মাঝে সম্পর্ক। এর মাঝে দুটি বই আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা এবং কানুন আল-ওয়াযারা মুদ্রিত ও নানা ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। আল-মাওয়ারদির একটি রচনা আল-হাওয়ি আল-কাবির সাধারণভাবে ফিকহের ওপর এবং বিশেষভাবে শাফিয়ি ফিকহের ওপর অত্যন্ত বিশদ একটি কিতাব। তিনি রাজনীতির ক্ষেত্রে 'প্রয়োজনবাদ'-এর সমর্থক ছিলেন। তাই তিনি গভর্নরদের হাতে অবারিত ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার বদলে একটি এককেন্দ্রিক শক্তিশালী খিলাফতের পক্ষপাতী। তাঁর মতে, অতিরিক্ত ক্ষমতা বণ্টনের ফলে নৈরাজ্য তৈরি হয়। তা ছাড়া খলিফা নির্বাচন ও নির্বাচকদের যোগ্যতা-সংক্রান্ত মূলনীতিও বর্ণনা করেছেন তিনি। এই যোগ্যতাগুলোর মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তি অর্জন এবং চারিত্রিক পরিচ্ছন্নতা।
ইমাম মাওয়ারদিকে মধ্যযুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিখ্যাত একজন চিন্তক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর মৌলিক কাজগুলো এই শাস্ত্রের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানের বিকাশকেও প্রভাবিত করে, যেটার পরবর্তী বিকাশ সাধন করেছেন ইবনু খালদুন। মাওয়ারদি ১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।