📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য

📄 বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য


এ যুগের ইসলামি অর্থনীতি-সংক্রান্ত লেখালেখি যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ থেকে উঠে আসে, তাতে চারটি স্বকীয় প্রভাবশালী উপাদান হলো: ইসলামি ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শনের প্রসার, গ্রিক দর্শনের সমালোচনায় ক্রমবর্ধমান আগ্রহ, ইসলামি বিচারিক দর্শনের উন্নতি এবং ইসলামি রাষ্ট্রের ভেতর বিচ্ছিন্ন কিছু আন্দোলন। প্রথম তিনটি নিয়ে ওপরে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। শেষের উপাদানটির প্রভাব আরও একটু নিরীক্ষণের দাবি রাখে।
আব্বাসি খিলাফতের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন কি ইসলামি ভূমির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে প্রভাবিত করেছিল? যদি করেই থাকে, তাহলে কি তা ইতিবাচক না নেতিবাচক?
ঢালাও মন্তব্য করা কঠিন। তাও অবাক-করা ব্যাপার হলো, খিলাফত পতনের দুয়ার উন্মোচিত করা এসব আন্দোলনের প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি বরং আরও ত্বরান্বিতই হয়। ব্যতিক্রমের সংখ্যা খুবই অল্প। প্রত্যাশার সাথে এই ফলাফল একেবারেই বিপরীত।
বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামগ্রিক বিকাশের ভিত্তি এবং প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সংশ্লিষ্ট রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার সাংস্কৃতিক চরিত্র ও পটভূমি। যেমন: কিছু আন্দোলন নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ ও বুদ্ধিবৃত্তির বদলে শুধুই প্রতিষ্ঠাতার সামরিক ক্ষমতার কারণে আবির্ভূত হয়েছে। সেগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনের খাতাও শূন্য। এগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সাফারি রাজবংশ, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একটি অপরাধী। গোষ্ঠীর নেতা। পুরো পারস্য থেকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত তারা শাসন করেন ৮৬৭ থেকে ৯০৮ সাল পর্যন্ত। এই শাসনামলে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো অগ্রগতিই হয়নি। একইরকম দৃষ্টান্ত দেখা যায় মিশরের ইখশিদিদের ক্ষেত্রেও। এই তুর্কি দাস রাজবংশ ৯৩৫ থেকে ৯৬৯ সাল পর্যন্ত মিশর শাসন করেছে। স্বল্পস্থায়ী এই শাসকবংশও তেমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন রেখে যাননি।
কিন্তু সাফারি ও ইখশিদিদের বাদ দিলে দেখা যায় বাকি রাজবংশগুলো নিজেদেরকে কবি, বিজ্ঞানী ও উলামার বহর দিয়ে ঘিরে রাখতেন। সাফফারিদের হাত থেকে ৯০০ সালে খুরাসান অধিকার করা সামানিদের প্রতিষ্ঠাতা জরুস্ত্রিয়ান অভিজাত ব্যক্তিটি এর এক যোগ্য উদাহরণ। সামানিগণ শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন এবং আরব ও অনারব বুদ্ধিজীবীদের রাখতেন নিজেদের কাছাকাছি।
আমরা আগেই দেখেছি এই রাজবংশটি শিক্ষার প্রসার, পাঠশালা ও মাদ্রাসা নির্মাণে গৌরব ও আগ্রহ বোধ করতেন। দ্বীন ইসলামের প্রতিরক্ষায় তাদের আগ্রহ ছিল বা অন্তত নিজেদের আগ্রহী দেখাতে তারা তৎপর ছিলেন। যেসব রাজ্যের সীমার ভেতর মক্কা ও মদীনার পবিত্র স্থানগুলো পড়ে না, তাদের কাছে ইসলামকে রক্ষা করার বিকল্প পদ্ধতি হলো শরীয়ত সংরক্ষণ করা। অন্তত জনগণকে দেখানোর জন্য হলেও শরীয়তের সুরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন রাজসভাকে শরীয়ত-বিশেষজ্ঞ তথা উলামা দিয়ে ঘিরে রাখা। রাজবংশটির রাজসভায় আলিমদের সংযোজনের ফলে শাসকরা ধর্মীয় বিষয়ে বহুল প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পথনির্দেশ পেয়ে থাকেন। এটি প্রয়োজনের সময় ফতোয়া প্রণয়নেও সাহায্য করে। তা ছাড়া রাজসভায় উলামার উপস্থিতির ফলে জনগণের সামনে এমন চিত্র উপস্থাপিত হয় যে, ধর্মীয় নেতাগণ এই শাসকের পক্ষে আছেন। ফলে শাসকবর্গের ধর্মীয় বৈধতা বৃদ্ধি পায় এবং জনসমর্থন জোরদার হয়।
এই শাসকবর্গের বিদ্যানুরাগের একটি প্রত্যক্ষ নিদর্শন হলো বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন। জনগণের অবস্থা উন্নয়নে তাদের সদিচ্ছার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখান থেকে। শিক্ষা ও শিক্ষণের প্রতি উল্লেখযোগ্য সুনজর প্রদানকারী রাজবংশের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ ফাতিমিগণ। যেমন, আজ পর্যন্ত টিকে থাকা প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় আল-আযহার নির্মিত হয়েছিল ফাতিমিদের হাতে, ৯৭২ সালে। তাদেরই হাতে ১০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল হিকমাহ। পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি কায়রোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান দুটো এখনো তাদের মূল কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সতর্কতা সহকারে হলেও এই দাবি করা যায় যে, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবক্ষয়, ইসলামি বিশ্বের ধর্মীয়-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভেদের ফলে ইসলামি অর্থনীতি-বিষয়ক রচনা তার বিকাশের জন্য আদর্শ পরিবেশ পায়নি। এ ধরনের নানা কারণে এই যুগে ইসলামি অর্থনীতি-বিষয়ক লেখালেখির গতি ধীর হয়ে আসে। বলা চলে, রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ফলে রাষ্ট্র এই ময়দানের বিশেষজ্ঞদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দিতে ব্যর্থ হয়। তবে এই দাবি বুঝেশুনে করতে হবে। কারণ একে পর্যবেক্ষণযোগ্য উপায়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, যেহেতু এর সাথে তুলনা করার মতো অন্য কোনো ঘটনাবিন্যাস নেই। তাই আমরা বড়জোর অনুসিদ্ধান্ত পর্যন্ত যেতে পারি। আরেকটি কারণ হিসেবে বলা যায়, গ্রিক দর্শনের প্রতি মনোযোগ হয়তো এমন অনেক বিশেষজ্ঞকে সেদিকে সরিয়ে নিয়ে গেছে, যারা অন্যথায় অর্থনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারতেন। তা ছাড়া ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যস্ততাও আলিমগণের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হয়ে থাকতে পারে। ফলে অর্থনীতির বিকাশে তাদের অবদান সীমিত হয়ে পড়ে। মূলত এ সকল নিয়ামকই একসাথে প্রভাব ফেলেছে এই-বিষয়ক লেখালেখির গতির ওপর।
তো কথা হলো, ইসলামি বিশ্বের অস্থিতিশীলতার প্রতিফলনস্বরূপ নিয়মিত বাধা আসা সত্ত্বেও লেখালেখি থেমে থাকেনি। যেমন: ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেড আক্রমণের সময়ও গাযালি (১০৫৮-১১১১ খ্রি.) তাঁর মহত্তম রচনাকর্ম আল-ইহইয়া লিখেছেন। মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞের সময় ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.) লিখেছেন আল-হিসবাহ। তাঁদের কাজগুলো পরবর্তী অধ্যায়ে পর্যালোচিত হবে।
মোটকথা, তৎকালীন যেসব কাযী বা ফকিহ উলামাদের ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লেখার কথা, তারা বেশ কয়েকটি কারণে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে ওই যুগে ইসলামি অর্থনৈতিক রচনাবলিকে আরেকটু অগ্রগতি প্রদান করা যায়নি। প্রধান প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক উদ্ভব, যাদের দাবিদাওয়াকে খণ্ডন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। আনকোরা এক শাস্ত্র হিসেবে গ্রিক দর্শনের আগমনে সেটাকে কৌতূহলবশত ঘেঁটে দেখা এবং ইসলামি পন্থায় তার জবাব প্রদান করাও আরও একটি ব্যস্ততার কারণ। তার ওপর ছিল প্রতিবেশী শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে মুহুর্মুহু সামরিক আগ্রাসন। এই কারণগুলো সম্ভবত কেন্দ্রীয় খিলাফত সরকারের ভাঙনের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী ছিল।
সীমাবদ্ধতা উদ্রেককারী নিয়ামকগুলো সত্ত্বেও কিছু আলিম আমাদের জন্য অর্থনীতি-বিষয়ক দারুণ লেখালেখির ধারাকে সজীব রেখেছেন। ইসলামি অর্থনীতিশাস্ত্রকে সমৃদ্ধকারী এরকম কয়েকটি কাজ নিম্নে আলোচিত হলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00