📄 তুর্কি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
তুর্কি প্রভাবের সূচনা হয়, যখন খলিফা আল-মুস্তাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.) ৪০০০ তুর্কি সেনা দিয়ে নিজেকে ঘিরে ফেলেন। ট্রান্সঅক্সিয়ানা¹ থেকে এদের আনা হয়েছিল সেনাবাহিনীতে পারসিক প্রভাব নস্যাৎ করার জন্য। খিলাফত নিয়ে হারুনুর রশীদের দুই ছেলের মাঝে দ্বন্দ্বের অপরিহার্য ফলাফল ছিল পারসিক প্রভাব। ফারসি মায়ের সন্তান মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) পারসিকদের সাহায্য চান তার ভাই আল-আমিনের (৮০৯-৮১৩ খ্রি.) বিরুদ্ধে, যার মা ছিলেন আরব (আত- তাবারি)। মামুনের বিজয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পারসিকরা ধরেই নেয় খলিফা তাদের কাছে এ বিজয়ের জন্য ঋণী। কিন্তু তুর্কি রক্ষীবাহিনী আমদানি করার ফলে এই ধারণার বিপরীত কিছু প্রমাণিত হয়। তুর্কি প্রাধান্য-বিশিষ্ট রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা অচিরেই খলিফাকে ছাড়িয়ে যায়। ৮৬১ সালে খলিফা মুতাওয়াক্কিল তার ছেলের ষড়যন্ত্রে দেহরক্ষীদের হাতে খুন হন।
তুর্কি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রথম সাক্ষী মিশর। ফাতিমিদের আগে তুলুনি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আহমাদ ইবনু তুলুনের হাতে। তার তুর্কি পিতাকে ৮১৭ সালে বুখারার শাসক দাস হিসেবে মামুনের (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) কাছে উপহার পাঠান। রাজবংশটি ৯০৮ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর ৯০৫ সালে তা আব্বাসি খলিফার কাছে ফিরে যায়। সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে তুলুন রাজবংশ ৮৭৭ সালে সিরিয়া শাসন করে। সেসময় ইবনু তুলুন কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই এই এলাকা দখল করে নেন। মিশরের সেই ফিরাউনি সরকারের আমলের পর এই প্রথমবারের মতো আহমাদ ইবনু তুলুন একইসাথে মিশর ও সিরিয়া—উভয় প্রদেশ শাসন করেন। পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে সিরিয়া শাসিত হতে থাকে নীলনদের পাড় থেকে (Hitti, 1963)।
তুলুনি শাসনাধীন মিশর কিছু ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও শৈল্পিক কার্যক্রম দেখতে পেয়েছে। মিশরের অর্থনীতিতে কৃষিকাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তুলুনিরা সেচব্যবস্থা এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ নজর দেন। আহমাদ ইবনু তুলুনের মসজিদ আজও কায়রোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্য-নিদর্শন এবং পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে। কিন্তু তুলুনি রাজবংশ ছিল স্বল্পস্থায়ী। মাত্র দুই প্রজন্ম নিয়ে গঠিত এটি। প্রতিষ্ঠাতা পিতা, উত্তরাধিকারী এক ছেলে, দুই নাতি এবং প্রতিষ্ঠাতার আরেক ছেলে। রাজবংশটির ওইরকম গভীর রাজনৈতিক বা ঐতিহ্যগত শেকড় ছিল না, যা মিশরের মাটিতে তাদের অস্তিত্বকে শক্তিশালী করতে পারত। বিদেশ-বিভুঁই থেকে আমদানিকৃত দেহরক্ষী ও সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং ধর্মতাত্ত্বিক কোনো দর্শন না থাকার (তা যতই বিতর্কিত হোক না কেন) ফলে রাজবংশটি বহুল প্রয়োজনীয় জনগণের সমর্থনটা পায়নি। বড় কোনো বংশীয় ভিত্তি না থাকা এবং শাসকবর্গের ধর্মতত্ত্বের প্রতি ভিন্নরকম দৃষ্টিভঙ্গি থাকার ফলে হয়তো-বা শাসক ও প্রজা—উভয়ের পক্ষ থেকেই একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। আমদানিকৃত এক শক্তিশালী সেনাদলের অধিকারী হওয়া, বাগদাদের মুমূর্ষু খলিফার প্রতি নামমাত্র আনুগত্য এবং উর্বর কৃষিজ ভূমি ছাড়া সেখানকার শাসকবর্গ ও অধিবাসীদের মাঝে তেমন কোনো শক্ত সম্পর্ক ছিল না। এই আমদানিকৃত দেহরক্ষী ও সেনাবাহিনীর একটা সমস্যা রয়েছে। জনসমাজের সাথে ঐক্যের অভাবে শাসকবর্গকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারে বটে, কিন্তু তাদের এই আনুগত্য শুধু সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতার সাথেই সম্পর্কিত। নেতৃত্ব পালটে গেলে বাহিনীর আনুগত্যও সেভাবে ঘুরে যায়। ইখশিদিদের মাধ্যমে তুলুনিদের সাথে আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই ঘটে।
ইখশিদিগণ আরেকটি তুর্কি বংশ। তুলুনিদের পর ৯৩৫ সাল থেকে তারা মিশরকে আধা-স্বায়ত্তশাসনের মতো শাসন করতে থাকে। ফাতিমিদের হাতে ৯৬৯ সালে পরাজিত ও বিধ্বস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত টিকে থাকে তারা। তুলুনি পূর্বসূরির মতো এর প্রতিষ্ঠাতাও খলিফা কর্তৃক মিশর প্রদেশে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একইভাবেই সিরিয়াকে কব্জা করে সেটাকে শাসন করেন মিশর থেকে। কিন্তু পূর্বসূরির বিপরীতে গিয়ে মক্কা ও মদীনাকেও শাসনসীমায় অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য হলো, ইখশিদিরা কোনো শৈল্পিক বা জনসেবামূলক কাজের চিহ্ন রেখে যাননি। নিজস্ব কোনো শিক্ষাগত উদ্যোগও ছিল না তাদের (প্রাগুক্ত)।
আবারও বলতে হয়, তুলুনি বা ইখশিদি—কোনো আমলেই ভালো মানের কোনো লেখালেখির দেখা মেলে না। ইসলামি অর্থনীতি তো বহুত দূরের কথা। প্রশংসা ও বিদ্রূপ—উভয় প্রকারের সাহিত্যের দেখা অবশ্য মেলে। কারণ এর জন্য বিপুল পুরস্কার দেওয়া হতো। মজার ও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, উভয় ধরনের সাহিত্য একই শাসককে উদ্দেশ্য করে রচিত হয়েছে। ইখশিদ শাসক ও আবিসিনীয় খোজা আবুল মিসক কাফুর এবং সুবিখ্যাত প্রোপাগান্ডা কবি আল-মুতানাব্বির মাঝে প্রতিযোগিতা একটি সুপরিচিত উদাহরণ। কাফুরের সুনজর থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর আল-মুতানাব্বির প্রশংসামালা পরিণত হয় তিক্ত আক্রমণে। আরব সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এগুলো।
এই রাজসভাগুলোতে কাযীদের হটিয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন কবিগণ। কারণ তারা অধিক বিনোদন এবং তোষামুদ করতে পারত। তা ছাড়া শাসকের ভাবমূর্তি ফোলানো ফাঁপানো এবং তার পক্ষে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা তৈরি করার জন্য সে যুগের মিডিয়া হিসেবে কবিতাকে ব্যবহার করারও প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু তুর্কিদের ভাগ্যে লেখা ছিল, তারা ইসলামি ইতিহাসে বড়সড় ভূমিকা পালন করবে। এর শুরুটা হয় ৯৫৬ সালের দিকে, যখন সেলজুক নামক এক গোত্রনেতা তার যাযাবর গোত্রকে নিয়ে বুখারায় বসত গড়েন। তারা জযবা সহকারে ইসলাম কবুল করে নেন এবং পরিণত হন ইতিহাসের এক প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে। তারা ১০৫৫ সালের মধ্যে বাগদাদে প্রবেশ করেন, যেখানে খলিফা তাদের থেকে প্রাপ্ত নিরাপত্তা-অঙ্গীকারে খুশি হয়ে সাদরে বরণ করে নেন। সেলজুকদের ইতিহাস ইসলামি ইতিহাসের এক ঝলমলে অধ্যায়। পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত সকল দিকে তাদের বিজয়রথ প্রসারিত হয় (Hitti, ১৯৬৩)। সেলজুকদের মাধ্যমে যে তুর্কি প্রভাব শুরু হয়, ইসলামি ইতিহাসের আসন্ন শতাব্দীগুলোতে সেটাই হতে চলেছে দোর্দণ্ড তুর্কি প্রতাপের সূচনা।
টিকাঃ
[১] মাওয়ারাউন্নাহার বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা হল বর্তমান মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কিরগিজিস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিম কাজাখিস্তান ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলের প্রাচীন নাম। ভৌগলিক দিক বিবেচনা করলে এই অঞ্চলটিকে আমু দরিয়া (অক্সাস) এবং শিরদরিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল বলা যেতে পারে। - সম্পাদক