📄 পারস্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
আব্বাসি খিলাফতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলটি ছিল অনারব পারস্য ও তুর্কি আধা-স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর প্রধান এলাকা।
বাগদাদের পূর্বে অবস্থিত প্রথম অঞ্চলটির নেতৃত্বে ছিলেন তাহিরিগণ, যার নামকরণ করা হয়েছে খলিফা মামুনের (৮১৩-৯৩৩ খ্রি.) সেনাপ্রধানের নামে। খিলাফত নিয়ে দ্বন্দ্বে মামুনকে তার ভাই আল-আমিনের (৮০৯-৮১৩ খ্রি.) বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন তাহির। তিনি ছিলেন একজন পারসিক দাস। তাহিরি রাষ্ট্রের সীমান্ত ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাহিরিরা ক্ষমতায় ছিলেন ৮২০ থেকে ৮৭২ সাল পর্যন্ত (প্রাগুক্ত)।
আরেক পারসিক রাজবংশ সাফফারির প্রতিষ্ঠাতা হলেন এক চরমপন্থি গোষ্ঠীর নেতা। তারা ভারতীয় ভূখণ্ডের সীমানা পর্যন্ত পারস্য শাসন করেন ৮৬৭ থেকে ৯০৮ সাল পর্যন্ত।
এক অভিজাত জরুস্ত্রিয়ানের হাতে প্রতিষ্ঠিত সামানি রাজত্বের সূচনা হয়। সাফারিদের হাত থেকে ৯০০ সালে খুরাসান কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে। পরে তাদের রাজ্যসীমা আরও বৃদ্ধি পায়। পারস্য শক্তির পরবর্তী রাজবংশ ছিল তারাই। পূর্বসূরিদের বিপরীতে শিক্ষাদীক্ষার প্রতি তাদের ভালোই আগ্রহ ছিল। তাদের রাজদরবারে আরব-অনারব নির্বিশেষে বহু জ্ঞানী লোকের সমাবেশ ঘটে। এর মাঝে চিকিৎসাশাস্ত্রে ইবনে সিনা, সাহিত্যে আর-রাযি সহ অনেকেই প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। এই যুগেই প্রথমবারের মতো আরবি সাহিত্য ফারসিতে অনূদিত হয়। শিক্ষা ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে বাগদাদকে প্রায় ছাড়িয়েই যাচ্ছিল রাজধানী সমরকন্দ (Hitti, 1963)। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, শিক্ষার প্রতি সামানিদের এই আগ্রহ তাদের অভিজাত-বংশীয় প্রতিষ্ঠাতাদের গুণেরই প্রতিফলন। অন্যান্য অনারব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাগণ যেখানে দাস; সামানিগণ সেখানে একেবারেই উলটো।
সামানি যুগে তুর্কিদের ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এর শুরুটা হয় সামানি আর্মিতে নিযুক্ত তুর্কি দাসদের মাধ্যমে। সামানি সেনাদল ভরে গিয়েছিল তুর্কি দাসে। প্রায় নিয়মিত ঘটনা হিসেবে তারা ক্ষমতার সিঁড়ি আরোহণ করতে থাকেন এবং মনিবদের ছাড়িয়ে যেতে থাকেন। এভাবেই গজনবিদের দাপট শুরু হয়, যার শুরু হয় ৯৬২ সাল থেকে। শেষমেশ তা পরিণত হয় এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে। তাদের শাসনসীমা ১১৮৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবকে গ্রাস করে ফেলে। গজনবি সাম্রাজ্যের আসল প্রতিষ্ঠাতা সুবুক্তিগিন (৯৭৬-৯৯৭ খ্রি.)। তিনি সামানিদের অধীনে নিযুক্ত প্রশাসক আল্পতিগিনের দাস ও জামাতা (প্রাগুক্ত)।
সেই থেকে ইসলামি বিশ্বে বড় পরিসরে তুর্কি প্রভাব শুরু হয়। গজনবিদের দাপট অবশেষে ১১৮৬ সালে আফগানিস্তানের ঘুরিদের হাতে সমাপ্ত হয়।
খিলাফতের ওপর শিয়া পারসিকদের প্রভাব দেখা দিতে থাকে বুওয়াইহি রাজবংশের মাধ্যমে। আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাকফি (৯৪৪-৯৪৬ খ্রি.) এর আমলে ৯৪৫ সালে ইবনু বুওয়াইহ বাগদাদে প্রবেশ করেন। খলিফা তাকে সসম্মানে বরণ করে নেন। তার আগমনে তুর্কি প্রহরীকে পালাতে দেখে যেন কিছুটা খুশিই হন তিনি। ইবনু বুওয়াইহকে 'সেনাপতিদের সেনাপতি' এবং 'রাষ্ট্রের শক্তিদাতা' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বাগদাদে বুওয়াইহিদের ছিল একদম খোলামেলা স্বাধীনতা। খলিফাকে ছাড়াই শাসনকার্য চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল তাদের, যদিও নেতা হিসেবে খলিফার ধারণাটি তারা ঠিক রাখতেন। এক ঘটনায় একদিকে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি এবং অপরদিকে খিলাফতের ধর্মীয় বৈধতার মধ্যে জোট গঠন করার একটি প্রচেষ্টা দেখা যায়। এই জোটকে পাকাপোক্ত করার জন্য ৯৮০ সালে বুওয়াইহি আদুদুদ দাওলাহ (৯৪৯-৯৮৩ খ্রি.) খলিফা আত-তাই’র (৯৭৪-৯৯১ খ্রি.) মেয়েকে বিয়ে করেন।
খিলাফতের ওপর বুওয়াইহিদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল। যেসব খলিফা তাদের বিরোধিতা করার দুঃসাহস দেখাতেন, তাদের লাঞ্ছিত করে পদচ্যুত করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে অন্ধ করে দিয়ে ভিক্ষা করতেও বাধ্য করা হয়েছে। ৯৪৬ সালে ইবনু বুওয়াইহ’র হাতে আল-মুস্তাকফি অন্ধ ও পদচ্যুত হন। নতুন খলিফা নিয়োগ দেওয়া হয় তার জায়গায়। তার পূর্বসূরি দুই খলিফার ভাগ্যও এরচেয়ে ভালো কিছু ছিল না। তাদেরও অন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বাগদাদের রাস্তায় ভিক্ষা করতে দেখা যায়। দাপুটে এক শতাব্দী বা তারও বেশি সময় জুড়ে (৯৪৫-১০৫৫ খ্রি.) বুওয়াইহিগণ ইচ্ছেমতো খলিফা নিয়োগ এবং পদচ্যুত করে চলেন (Hitti, 1963)। ওই সময়ে তিনটি খিলাফত দাবিদার শক্তি বিরাজমান ছিল—বাগদাদে কেন্দ্রীয় জায়গায় আব্বাসি, কায়রোর ফাতিমি এবং কর্ডোভার উমাইয়্যা।
বুওয়াইহিদের ব্যাপারে লক্ষণীয় যে, তারা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের এক দীর্ঘ কার্যক্রম হাতে নেন। খাল, মসজিদ, হাসপাতাল, সরকারি ভবন, দশ হাজার বই ও আকাশ-নিরীক্ষণ কেন্দ্র-সহ একটি লাইব্রেরি নির্মিত ও মেরামত হয় তাদের হাতে। কবি ও সাহিত্যিকদের প্রতিও তারা নিজেদের হাত প্রসারিত করেন (প্রাগুক্ত)। ইসলামি অর্থনীতির জন্য তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুগেই রচিত হয় আল-মাওয়ারদির আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা (রাজনৈতিক বিধিবিধান)। মজার ব্যাপার হলো, আল-মাওয়ারদির বইটির শিরোনাম গৃহীত হয়েছে ধুঁকতে থাকা আব্বাসি খলিফার পক্ষ থেকে বুওয়াইহি শাসককে দেওয়া একটি উপাধি থেকে। কোনো শাসককে প্রথমবারের মতো ‘আস-সুলতান’ উপাধি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে তা বইয়ের শিরোনাম হিসেবে জায়গা পায়।' উল্লেখ্য, এই শব্দটির একটি আরবি ব্যুৎপত্তি রয়েছে। শব্দটি অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে আমদানি করা হয়েছে, এহেন দাবির বিরুদ্ধে তথ্যটি একটি প্রমাণ। এর উৎপত্তি 'সুলতান' বিশেষ্য থেকে, যার অর্থ ক্ষমতা, সামর্থ্য ও কর্তৃত্ব। কিন্তু শব্দটি কোনো বিশেষণ বা নাম বিশেষ্য নয়। হতে পারে এটি ভাষাগত পরিবর্তনের একটি নজির। অতিমাত্রায় সম্মানিত একজন সেনাপতির জন্য অতিমাত্রায় সম্মানজনক উপাধির খোঁজেই হয়তো এই পরিবর্তনটি সাধিত করা হয়েছে। আবার এর অর্থ এমনও হতে পারে যে, সেরকম নামের অধিকারী ব্যক্তিমাত্রই সেরকম ক্ষমতার অধিকারী: ক্ষমতা তথা সুলতানের অধিকারী নিজেই সুলতান। আল-মাওয়ারদির আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা একটু পরেই আলোচিত হবে।
পারিবারিক কলহ এবং শিয়া বুওয়াইহিদের প্রতি সুন্নিদের ঘৃণা এই রাজবংশের পতনের পথ করে দেয়। সেলজুক তুর্কি তাগরিল বেগ ১০৫৫ সালে বাগদাদে প্রবেশ করে বুওয়াইহি শাসনের সমাপ্তি ঘটান।
টিকাঃ
[১] জরথুস্ত্রবাদ, জরথুস্ত্রবাদ, ইংরেজি: Zoroastrianism বা Zarathustraism বা পারসিক ধর্ম। একটি অতিপ্রাচীন ইরানীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম। ভারতীয় উপমহাদেশে এটি পারসিক ধর্ম নামেও পরিচিত। জরথুস্ত্রীয় বা পারসিক ধর্মের প্রবর্তক জরথুস্ত্র। - সম্পাদক
[১] বইয়ের শিরোনামে ব্যবহৃত "সুলতানিয়্যা" শব্দটি বুওয়াইহি শাসকের উপাধি থেকে নেওয়া হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং শাব্দিক অর্থে শাসকসংক্রান্ত বিধিবিধান বুঝাতে ব্যবহৃত হওয়াই স্বাভাবিক।- সম্পাদক
📄 তুর্কি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
তুর্কি প্রভাবের সূচনা হয়, যখন খলিফা আল-মুস্তাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.) ৪০০০ তুর্কি সেনা দিয়ে নিজেকে ঘিরে ফেলেন। ট্রান্সঅক্সিয়ানা¹ থেকে এদের আনা হয়েছিল সেনাবাহিনীতে পারসিক প্রভাব নস্যাৎ করার জন্য। খিলাফত নিয়ে হারুনুর রশীদের দুই ছেলের মাঝে দ্বন্দ্বের অপরিহার্য ফলাফল ছিল পারসিক প্রভাব। ফারসি মায়ের সন্তান মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) পারসিকদের সাহায্য চান তার ভাই আল-আমিনের (৮০৯-৮১৩ খ্রি.) বিরুদ্ধে, যার মা ছিলেন আরব (আত- তাবারি)। মামুনের বিজয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পারসিকরা ধরেই নেয় খলিফা তাদের কাছে এ বিজয়ের জন্য ঋণী। কিন্তু তুর্কি রক্ষীবাহিনী আমদানি করার ফলে এই ধারণার বিপরীত কিছু প্রমাণিত হয়। তুর্কি প্রাধান্য-বিশিষ্ট রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা অচিরেই খলিফাকে ছাড়িয়ে যায়। ৮৬১ সালে খলিফা মুতাওয়াক্কিল তার ছেলের ষড়যন্ত্রে দেহরক্ষীদের হাতে খুন হন।
তুর্কি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রথম সাক্ষী মিশর। ফাতিমিদের আগে তুলুনি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আহমাদ ইবনু তুলুনের হাতে। তার তুর্কি পিতাকে ৮১৭ সালে বুখারার শাসক দাস হিসেবে মামুনের (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) কাছে উপহার পাঠান। রাজবংশটি ৯০৮ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর ৯০৫ সালে তা আব্বাসি খলিফার কাছে ফিরে যায়। সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে তুলুন রাজবংশ ৮৭৭ সালে সিরিয়া শাসন করে। সেসময় ইবনু তুলুন কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই এই এলাকা দখল করে নেন। মিশরের সেই ফিরাউনি সরকারের আমলের পর এই প্রথমবারের মতো আহমাদ ইবনু তুলুন একইসাথে মিশর ও সিরিয়া—উভয় প্রদেশ শাসন করেন। পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে সিরিয়া শাসিত হতে থাকে নীলনদের পাড় থেকে (Hitti, 1963)।
তুলুনি শাসনাধীন মিশর কিছু ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও শৈল্পিক কার্যক্রম দেখতে পেয়েছে। মিশরের অর্থনীতিতে কৃষিকাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তুলুনিরা সেচব্যবস্থা এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ নজর দেন। আহমাদ ইবনু তুলুনের মসজিদ আজও কায়রোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্য-নিদর্শন এবং পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে। কিন্তু তুলুনি রাজবংশ ছিল স্বল্পস্থায়ী। মাত্র দুই প্রজন্ম নিয়ে গঠিত এটি। প্রতিষ্ঠাতা পিতা, উত্তরাধিকারী এক ছেলে, দুই নাতি এবং প্রতিষ্ঠাতার আরেক ছেলে। রাজবংশটির ওইরকম গভীর রাজনৈতিক বা ঐতিহ্যগত শেকড় ছিল না, যা মিশরের মাটিতে তাদের অস্তিত্বকে শক্তিশালী করতে পারত। বিদেশ-বিভুঁই থেকে আমদানিকৃত দেহরক্ষী ও সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং ধর্মতাত্ত্বিক কোনো দর্শন না থাকার (তা যতই বিতর্কিত হোক না কেন) ফলে রাজবংশটি বহুল প্রয়োজনীয় জনগণের সমর্থনটা পায়নি। বড় কোনো বংশীয় ভিত্তি না থাকা এবং শাসকবর্গের ধর্মতত্ত্বের প্রতি ভিন্নরকম দৃষ্টিভঙ্গি থাকার ফলে হয়তো-বা শাসক ও প্রজা—উভয়ের পক্ষ থেকেই একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। আমদানিকৃত এক শক্তিশালী সেনাদলের অধিকারী হওয়া, বাগদাদের মুমূর্ষু খলিফার প্রতি নামমাত্র আনুগত্য এবং উর্বর কৃষিজ ভূমি ছাড়া সেখানকার শাসকবর্গ ও অধিবাসীদের মাঝে তেমন কোনো শক্ত সম্পর্ক ছিল না। এই আমদানিকৃত দেহরক্ষী ও সেনাবাহিনীর একটা সমস্যা রয়েছে। জনসমাজের সাথে ঐক্যের অভাবে শাসকবর্গকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারে বটে, কিন্তু তাদের এই আনুগত্য শুধু সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতার সাথেই সম্পর্কিত। নেতৃত্ব পালটে গেলে বাহিনীর আনুগত্যও সেভাবে ঘুরে যায়। ইখশিদিদের মাধ্যমে তুলুনিদের সাথে আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই ঘটে।
ইখশিদিগণ আরেকটি তুর্কি বংশ। তুলুনিদের পর ৯৩৫ সাল থেকে তারা মিশরকে আধা-স্বায়ত্তশাসনের মতো শাসন করতে থাকে। ফাতিমিদের হাতে ৯৬৯ সালে পরাজিত ও বিধ্বস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত টিকে থাকে তারা। তুলুনি পূর্বসূরির মতো এর প্রতিষ্ঠাতাও খলিফা কর্তৃক মিশর প্রদেশে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একইভাবেই সিরিয়াকে কব্জা করে সেটাকে শাসন করেন মিশর থেকে। কিন্তু পূর্বসূরির বিপরীতে গিয়ে মক্কা ও মদীনাকেও শাসনসীমায় অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য হলো, ইখশিদিরা কোনো শৈল্পিক বা জনসেবামূলক কাজের চিহ্ন রেখে যাননি। নিজস্ব কোনো শিক্ষাগত উদ্যোগও ছিল না তাদের (প্রাগুক্ত)।
আবারও বলতে হয়, তুলুনি বা ইখশিদি—কোনো আমলেই ভালো মানের কোনো লেখালেখির দেখা মেলে না। ইসলামি অর্থনীতি তো বহুত দূরের কথা। প্রশংসা ও বিদ্রূপ—উভয় প্রকারের সাহিত্যের দেখা অবশ্য মেলে। কারণ এর জন্য বিপুল পুরস্কার দেওয়া হতো। মজার ও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, উভয় ধরনের সাহিত্য একই শাসককে উদ্দেশ্য করে রচিত হয়েছে। ইখশিদ শাসক ও আবিসিনীয় খোজা আবুল মিসক কাফুর এবং সুবিখ্যাত প্রোপাগান্ডা কবি আল-মুতানাব্বির মাঝে প্রতিযোগিতা একটি সুপরিচিত উদাহরণ। কাফুরের সুনজর থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর আল-মুতানাব্বির প্রশংসামালা পরিণত হয় তিক্ত আক্রমণে। আরব সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এগুলো।
এই রাজসভাগুলোতে কাযীদের হটিয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন কবিগণ। কারণ তারা অধিক বিনোদন এবং তোষামুদ করতে পারত। তা ছাড়া শাসকের ভাবমূর্তি ফোলানো ফাঁপানো এবং তার পক্ষে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা তৈরি করার জন্য সে যুগের মিডিয়া হিসেবে কবিতাকে ব্যবহার করারও প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু তুর্কিদের ভাগ্যে লেখা ছিল, তারা ইসলামি ইতিহাসে বড়সড় ভূমিকা পালন করবে। এর শুরুটা হয় ৯৫৬ সালের দিকে, যখন সেলজুক নামক এক গোত্রনেতা তার যাযাবর গোত্রকে নিয়ে বুখারায় বসত গড়েন। তারা জযবা সহকারে ইসলাম কবুল করে নেন এবং পরিণত হন ইতিহাসের এক প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে। তারা ১০৫৫ সালের মধ্যে বাগদাদে প্রবেশ করেন, যেখানে খলিফা তাদের থেকে প্রাপ্ত নিরাপত্তা-অঙ্গীকারে খুশি হয়ে সাদরে বরণ করে নেন। সেলজুকদের ইতিহাস ইসলামি ইতিহাসের এক ঝলমলে অধ্যায়। পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত সকল দিকে তাদের বিজয়রথ প্রসারিত হয় (Hitti, ১৯৬৩)। সেলজুকদের মাধ্যমে যে তুর্কি প্রভাব শুরু হয়, ইসলামি ইতিহাসের আসন্ন শতাব্দীগুলোতে সেটাই হতে চলেছে দোর্দণ্ড তুর্কি প্রতাপের সূচনা।
টিকাঃ
[১] মাওয়ারাউন্নাহার বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা হল বর্তমান মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কিরগিজিস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিম কাজাখিস্তান ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলের প্রাচীন নাম। ভৌগলিক দিক বিবেচনা করলে এই অঞ্চলটিকে আমু দরিয়া (অক্সাস) এবং শিরদরিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল বলা যেতে পারে। - সম্পাদক