📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আলাভি আন্দোলন

📄 আলাভি আন্দোলন


আলাভিগণ উমাইয়্যা শাসনের উচ্ছেদে আব্বাসিদের পক্ষ নিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ আশা করেছিলেন বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে খিলাফত তাদের কাছে পুনরায় হস্তান্তরিত করা হবে, আর নয়তো কম করে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কোনো না কোনো ভূমিকা প্রদান করা হবে। কিন্তু ফলাফল হয় একেবারেই বিপরীত। দুটোর কোনোটিই হয়নি। বঞ্চিত আলাভিগণ নিজেদের ভাবতেন ভাবি খলিফা। তারা জ্ঞাতিভাই আব্বাসিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতেন না।
আব্বাসি রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে গুটিকতক প্রচেষ্টা আলাভিরা করেছে, তার মাঝে রয়েছে ফাতিমি আন্দোলন। নবি -এর কন্যা এবং চতুর্থ খলিফা আলি -এর স্ত্রী ফাতিমা -এর নামে পরিচালিত ফাতিমি আন্দোলন ছিল সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী এবং দীর্ঘজীবী। ফাতিমি আন্দোলনের ভিত্তি ছিল ইসমাঈলি শিয়া আন্দোলন, যার নামকরণ করা হয় শিয়াদের সপ্তম ইমাম ইসমাঈলের নামে। তিনি খলিফা আলির বংশধর। ইসমাঈলিরা সারা দেশজুড়ে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে ইমাম মাহদির প্রত্যাবর্তনের ধারণা প্রচারণা করে। তাদের মতে, নবি -এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ইসমাঈলের ছেলে মুহাম্মাদ আল-মাহদি ফিরে এসে ন্যায়বিচার পুনরুদ্ধার করবেন, অত্যাচার দূরীভূত করবেন এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। তারা ৯০১ সালে ইয়েমেনে সাফল্য লাভ করে, আর ৯০৮ সালে তিউনিসিয়ায় নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে ফাতিমি খিলাফত হিসেবে। তিউনিসিয়া থেকে তাদের শাসনসীমানা প্রসারিত হতে হতে ৯৬৯ সালে মিশর এবং ১০০৩ সালে সিরিয়া তাদের দখলে আসে (Hitti, 1963)। ফাতিমি আন্দোলনের ব্যাপারে একটি জিনিস লক্ষণীয়। এটিই একমাত্র আন্দোলন, যা আব্বাসিদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল তাদের নিজেদের যুক্তি দিয়েই। তা হলো, নবি -এর সাথে আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে খিলাফতের যোগ্যতা নির্ধারণ। তার মানে ফাতিমি খিলাফত আব্বাসি খিলাফতের অধীনে এমন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রও নয়, যা বাগদাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে যাবে। বরং সেটা সম্পূর্ণ স্বাধীন আরেকটি খিলাফত, যা বাগদাদের খিলাফতের ধর্মীয় বৈধতা স্বীকারই করে না। এর ভিত্তি ছিল এই শিয়া বিশ্বাস যে, নবি -এর মৃত্যুর পর থেকেই খিলাফত তাদেরই প্রাপ্য।
ক্ষমতার কেন্দ্র তাই বাগদাদ থেকে ফাতিমি খিলাফতের রাজধানী কায়রোতে সরে যায়। ফাতিমি খিলাফত ১১৬৭ সাল পর্যন্ত টিকে থাকার পর সর্বশেষ ফাতিমি খলিফাকে অপসৃত করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবি। ক্রুসেড তখন সবেমাত্র শুরু হচ্ছিল। সালাহুদ্দীনের এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল সঠিক ইসলামি নেতৃত্বের অধীনে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ক্রুসেডার সেনাবাহিনীর সামনে ইসলামের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন।
শিক্ষা ও শিক্ষণের প্রতি উল্লেখযোগ্য মনোযোগ প্রদান করেন ফাতিমিগণ। মিশরের ফাতিমিরা অসাধারণ সব বিজ্ঞানকেন্দ্র ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন, যেখানে গবেষকরা খুঁজে পান উন্নয়ন ও বিকাশের আদর্শ পরিবেশ। ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে আল-আযহার মসজিদ নির্মিত হয় এবং ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে। আল-আযহার পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজও মিশরে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দারুল হিকমাহ বা দারুল ইলম (প্রজ্ঞা বা বিজ্ঞানালয়) প্রতিষ্ঠিত হয় ১০০৫ সালে। এর তহবিল বিশেষভাবে শুধু গ্রন্থাদি এবং গবেষণার কাজেই ব্যবহৃত হতো। বিশেষ মনোযোগ প্রদান করা হয় বই লেখা, সংরক্ষণ ও মেরামতের ওপর। ফাতিমি-শাসিত মিশর থেকেই ইসলামি বই-বাঁধাইয়ের স্মরণকালের প্রাচীনতম ধারার সূচনা হয়। অনেকেই এর সময়কাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন অষ্টম বা নবম শতাব্দীর কথা। আল-মুনতাসিরের খিলাফত (১০০০-১০৯৪ খ্রি.) আমলে একটি রাজগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়, যাতে ছিল ২০০,০০০ এর মতো বই (Hitti, 1963)। তাই ফাতিমি আন্দোলন যদিও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সত্তা, কিন্তু এতে তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে কোনো দুর্বলতা আসেনি। তাদের শাসনাধীনে বিজ্ঞানীগণ নব্য খিলাফতের সহায়তাক্রমে পৃথিবীকে দেয় ইতিহাসের চমৎকার কিছু রেফারেন্স বই, যেগুলো সেই যুগের সমাপ্তির পরও বেশ কিছু বছর টিকে থাকে।
কিন্তু ফাতিমিদের হাতে বিজ্ঞান, কলা ও শিল্পকারখানার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রতি তাদের ব্যাপক উৎসাহ সত্ত্বেও এই যুগে ইসলামি অর্থনীতির ওপর কোনো বিশেষায়িত রচনা পাওয়া যায় না। একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে আল-মাওয়ারদি রচনা করেন তার আল-আহকাম গ্রন্থটি। এমন কোনো প্রমাণ মেলে না, যা থেকে বোঝা যায় তিনি ফাতিমি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। তা ছাড়া আল-মাওয়ারদি শিয়া আলিমও ছিলেন না, ছিলেন সুন্নি শাফিয়ি। মনে হয় যেন ফাতিমি ফকিহগণ অর্থনীতি-বিষয়ক পড়াশোনার চেয়ে বরং শিয়া ধর্মতত্ত্বের প্রচার-প্রসারেই অধিক মনোযোগী ছিলেন।

টিকাঃ
[১] মুহাম্মাদ আল-মাহদি শিয়া সম্প্রদায়ের ধারণামতে প্রতীক্ষিত ইমাম, তিনি আত্মগোপন করে আছেন, শেষ যুগে প্রত্যাবর্তন করবেন। আহলুস সুন্নাহর আকিদায় যে মাহদী আগমনের কথা বলা হয় ইনি সেই মাহদি নন। -সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আরব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন

📄 আরব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন


আব্বাসি সাম্রাজ্যের উত্তর ও উত্তর-পূর্বদিকে রয়েছে আরও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক চেতনাতাড়িত এবং অন্য একটি রাজবংশের শাসনাধীন রাষ্ট্র, যা অর্ধশতাব্দীকাল টিকে ছিল। এই শিয়া হামদানি' রাষ্ট্র প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর মেসোপটেমিয়াতে। এর রাজধানী ছিল মসুল বা আল-মাওসিল (৯২৯-৯৯১)। হামদানিরা ৯৪৪ সালে তাদের সীমানা বিস্তৃত করে উত্তর সিরিয়া পর্যন্ত। মিশরে প্রভাবশালী ইখশিদিদের' থেকে এই অঞ্চলটি নিয়ে নেওয়ার পর তারা তাদের সাথে মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসে। অন্যান্য রাষ্ট্রের বিপরীতে হামদানিরা ছিল আরব জনগোষ্ঠী। জাতির দিক থেকে তাগলিব গোত্রের বংশধর এবং ধর্মীয় দিক থেকে শিয়া। এ অর্থে হামদানিগণ দ্বিতীয় স্বাধীন শিয়া রাষ্ট্র, যা ফাতিমিদের আগে কিন্তু উত্তর আফ্রিকার ইদ্রিসিদের' পরে আবির্ভূত হয়। তারা ১০০৩ সাল পর্যন্ত টিকে থাকার পর ফাতিমি খিলাফতের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ফাতিমিরা ততদিনে ৯৬৯ সালেই ইখশিদিদের একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এটি সম্ভবত উত্তরের ছোট হামদানি রাজবংশ এবং দক্ষিণের উদীয়মান খিলাফতের মধ্যে একটি শিয়া রাজনৈতিক একীভূতকরণ।
হামদানি রাজদরবারের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ছিল খুবই সমৃদ্ধ। অনারব রাষ্ট্রগুলোর বিপরীতে তারা শিক্ষা কার্যক্রমকে দারুণভাবে উৎসাহিত করেন। নামকরা এক প্রাজ্ঞমহলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারা নিয়ে গর্ব করতেন তারা। সাইফুদ্দৌলা (রাষ্ট্রের তরবারি, ৯৪৪-৯৬৭) নিজেই একজন কবি হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। প্রাজ্ঞমহলে ছিলেন সুবিখ্যাত দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ আল-ফারাবি। ছিলেন সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ আল-আসফাহানি, যার বিখ্যাততম পাণ্ডুলিপি আল-আগানি আজও এই বিষয়ের সবচেয়ে খ্যাতনামা বই। বাগ্মী রাজপ্রচারক ইবনু নাবাতার ছন্দবদ্ধ গদ্যের খুতবায় শ্রোতারা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠত বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য। আর কবিগুরু আল-মুতানাব্বি ছিলেন শব্দঝংকার, সুচারু অলংকার, সুললিত রচনাশৈলী ও বুদ্ধিদীপ্ত রূপকের মিশেলে গঠিত আরবি ভাষার বিখ্যাত কবি (Hitti, 1963)। তালিকায় আরও আছেন কবি-দার্শনিক আবুল আলা আল-মাআররি (৯৭৩-১০৫৭), যিনি ইসলামে সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্যের এক যুগে সন্দেহবাদী নৈরাশ্যপ্রবণ অনুভূতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়ে গেছেন (প্রাগুক্ত)।

টিকাঃ
[১] বনু হামদান ছিল জাফরি শিয়া গোষ্ঠী। তাদের নেতা নাসিরুদ্দৌলা মসুলে এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু অংশ জুড়ে তাদের সাম্রাজ্য ছিল। - সম্পাদক
[২] ইখশিদিরা মিশর ও লেভান্টে আব্বাসি খলিফার গভর্নর হিসেবে শাসন করতেন। তারা তুর্কি মামলুক গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তাদের শাসনকাল ছিল ৯৩৫ থেকে ৯৬৯। তারা ফাতিমিদের হাতে পরাজিত হয়ে শাসনক্ষমতা হারান। - সম্পাদক
[৩] তারা ছিলেন যাইদি শিয়া সম্প্রদায়। প্রতিষ্ঠাতা ইদরিস বিন আবদুল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করে আদারিসাহ বা ইদ্রিসি নামে তারা প্রসিদ্ধ। তারা বর্তমান মরক্কো ও আলজেরিয়ার একাংশ শাসন করেন। -সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00