📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 গ্রন্থকার

📄 গ্রন্থকার


আবদুল্লাহ আল-হারিস ইবনু আসাদ আল-মুহাসিবি দরিদ্রতার কারণে সুফি হননি। তিনি স্বেচ্ছায় দুনিয়াত্যাগ করেছেন। তিনি এক ধনাঢ্য বাবার সন্তান, যার ছিল পরিবারকে সচ্ছল জীবনধারা প্রদান করার মতো উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও উপার্জন। তার পরবর্তীকালে বেছে নেওয়া জীবনপদ্ধতির সাথে এটি চরম বৈপরীত্যমূলক। পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে আল-হারিসের যা পাওয়ার কথা, সেটা তিনি গ্রহণ করে নিলে বাকি জীবন সম্পদ আর সুখ্যাতিতে ডুবে কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পুরো সম্পদ প্রত্যাখ্যান করে এমন এক জীবন বেছে নেন, যা তাকে দরিদ্রদের মাঝে স্থান দেয়। আর আমরা আজ যে প্রসিদ্ধ সুফিকে চিনি, সেই ব্যক্তিতে পরিণত করে। পিতার অনুসৃত কাদরি ধারা পুত্র আল-হারিসের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই ভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শের অনুসারী পিতার জীবদ্দশার অবস্থা বা মৃত্যুর পরে রেখে যাওয়া সম্পদ, কোনোটিকেই নিজের অধিকারভুক্ত বলে মনে করেননি তিনি (আল-খি, ১৯৮৩)। এটি এক উদ্যমী বিশ্বাসীর সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়, এবং এমনটাই ছিলেন আল-হারিস আল-মুহাসিবি।
ধর্মীয় মতানৈক্যের ভিত্তিতে আল-হারিস তার বাবার সম্পত্তি পরিত্যাগ করার ব্যাপারটা আমাদের কাছে এক বিশেষ অর্থ বহন করে।
➡ প্রথমত, এ থেকে বোঝা যায়, তিনি মন থেকে নিজের মতাদর্শ অনুসরণ করা একজন মানুষ। এর জন্য বিপুল সম্পদ বলি দিতেও তিনি দ্বিধা করেননি। এভাবে তত্ত্ব ও চর্চার মাঝে, মুখে বলা ও বাস্তবে করা কাজের মাঝে পার্থক্য অনেকখানি কমিয়ে এনেছেন তিনি।
➡ দ্বিতীয়ত, তিনি নিজের চিন্তাধারা অনুসরণকারী একজন আলিম। বাবার নিজের ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভেতর যথেষ্ট সুনাম থাকা সত্ত্বেও তার বিশ্বাসপন্থায় আল- হারিস প্রভাবিত হননি। এমনকি সমসাময়িক ধর্মীয়-দার্শনিক ধারা দিয়েও তিনি প্রভাবিত নন, অনুসরণ করেছেন নিজস্ব চিন্তাধারার। তিনি খাওয়ারিজ, মুতাযিলা, মুরজিয়া ও অন্যান্য গোষ্ঠীর ধ্যান-ধারণা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এদের সমালোচনা করেছেন জোরেসোরে। কিন্তু তার সমালোচনা ছিল নিরপেক্ষ। তিনি নিজের ও প্রতিপক্ষের মাঝে দ্বিমতগুলো উল্লেখ করতেন, ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতেন। তারপর সমালোচনা করতেন প্রচণ্ডভাবে। মুতাযিলাগণ নাকল (কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্য)-এর ওপর আকল (মানবীয় বিবেক)-কে প্রাধান্য দিতেন, খাওয়ারিজগণ প্রাধান্য দিতেন আকূলের ওপর নাকলকে। আল-হারিস এ দুইয়ের মাঝামাঝি একটি মধ্যমপন্থি চিন্তাধারা অনুসরণ করেন। সেটি হলো আহলুস সুন্নাহর চিন্তাধারা। বিবেকের শক্তিকেও প্রত্যাখ্যান করা যাবে না, আবার কুরআন-সুন্নাহর দলিলকেও অস্বীকার করা যাবে না। তার মতে আসলে এ দুটির মাঝে কোনো বিরোধ নেই। কুরআন ও হাদীসে উল্লেখিত বিধানাবলি সুস্থ বিবেক-বিবেচনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যশীল। এই চিন্তাপদ্ধতির বাস্তব প্রয়োগ ঘটেছে সুফিবাদ সম্পর্কে তার শিক্ষায় এবং আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা গ্রন্থে, যা তার লেখা তেত্রিশটি বইয়ের মাঝে একটি (আল-খিত, ১৯৮৩)।
তার জীবনীর ব্যাপারে আরেকটি তথ্য হলো তিনি ইরাকের বসরায় জন্ম নিয়েছেন। তাই তার নামের সাথে বসরি সংযুক্ত। তার সঠিক জন্মসাল সেভাবে জানা যায় না। যদিও আল-খিত প্রণীত একটি সাম্প্রতিক জীবনীগ্রন্থে (১৯৮৩) বলা হয়েছে তিনি হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষ তৃতীয়াংশে জন্মে থাকতে পারেন। একই গবেষণায় তার মৃত্যুর সাল বলা হয়েছে ২৪৩ হি. বা আনুমানিক ৮৫৭ খ্রি. (আল-খিত, ১৯৮৩)।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 গ্রন্থ পর্যালোচনা

📄 গ্রন্থ পর্যালোচনা


আলোচ্য গ্রন্থটির পূর্ণ শিরোনাম আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা ওয়াশ শুবুহাতি ওয়া বায়ানু মুবাহিহা ওয়া মাহযুরিহা ওয়া ইখতিলাফুন নাস ফি তালাবিহা ওয়ার-রদ্ আলাল গা-লিতীনা ফিহ। এর অনুবাদ করা যেতে পারে, "উপার্জন ও তাকওয়া অবলম্বন, উপার্জনকে ঘিরে থাকা সন্দেহ, এর বৈধ ও অবৈধের ব্যাপারে ব্যাখ্যা, উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের বৈচিত্র্য এবং ভুলে পতিতদের পর্যালোচনা।” এই দীর্ঘ শিরোনামটি সংক্ষিপ্তাকারে "আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা" হিসেবে অধিক পরিচিত। আল-মুহাসিবির শিক্ষা হিসেবে এই বইটির যতটুকু আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তার কলেবর প্রায় ১০,৫০০ শব্দ। প্রায় ৪৩ পৃষ্ঠাজুড়ে হস্তলিখিত, প্রতি পৃষ্ঠায় বিশ লাইন, এবং লাইনপ্রতি গড় শব্দসংখ্যা ১২ (আল-খিপ্ত, প্রাগুক্ত)। মুদ্রিত সংস্করণটি প্রায় ১৩৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পৌঁছায়। তথ্যসূত্র হিসেবে আল-মুহাসিবি উল্লেখ করেছেন তিনি কুরআন ও সুন্নাহ, ইজমা, ফিকহি ইজতিহাদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কিয়াসের ওপর নির্ভর করেছেন।
বইটির গুরুত্বকে পূর্ণমাত্রায় বুঝতে হলে দেখতে হবে এটি কোন সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত। তৎকালীন সুফি চিন্তা প্রধানত আবর্তিত হতো জীবিকা উপার্জন পরিহার এবং তার বদলে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশকে কেন্দ্র করে। সুফিদের যুক্তি, ভক্তিসহকারে উপাসনার মাধ্যমে আল্লাহকে সম্মান করলে আল্লাহই জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবেন। পক্ষান্তরে কেউ জীবিকার জন্য যত চেষ্টাই করুক, আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি সে কিছুই পাবে না। একনিষ্ঠ সুফি আল-মুহাসিবি সুফি-শিক্ষার কেন্দ্র থেকে না সরেই একটি ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন।
উপার্জন যদিও নির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ীই আসে, কিন্তু তাতে উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করার ব্যাপারটি নাকচ হয়ে যায় না। এটি নিচে দেখানো হয়েছে। উপার্জন নিজে নিজে আসে না। আল্লাহ মানবজাতিকে আদেশ দিয়েছেন উপার্জনের মাধ্যম অন্বেষণ করার, যাতে আল্লাহর অনুগ্রহ সকলের কাছেই পৌঁছায়। উপার্জন আসে উপার্জনের মাধ্যম অন্বেষণ বা 'হারাকা'র মাধ্যমে। আল-মুহাসিবি এই বার্তাটাই জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন।
গ্রন্থটি একটি ভূমিকা ও পনেরোটি অধ্যায়ে বিভক্ত। নিম্নে তা দেখানো হলো: • ভূমিকা; • অধ্যায় ১: আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা বা তাওয়াক্কুল এবং উপার্জন; • অধ্যায় ২: উপার্জনের মাধ্যম অন্বেষণ বা আল-হারাকাহ—এর ভালো ও মন্দ; • অধ্যায় ৩: উপার্জনের মাধ্যমে অন্বেষণ পরিত্যাগ—এর ভালো ও মন্দ; • অধ্যায় ৪: ধর্মানুরাগ বা ওয়ারা'র অর্থ, ধর্মানুরাগের সংজ্ঞায়নে আলিমগণের মতামতসমূহ, খাবার ও পোশাকের ক্ষেত্রে ধর্মানুরাগ; • অধ্যায় ৫: জালিমদের সাহায্য করা ও সাহায্য গ্রহণ করা; • অধ্যায় ৬: জালিম পিতার উত্তরাধিকার; • অধ্যায় ৭: সন্দেহযুক্ত ইনকামের ব্যাপারে আলিমগণের মতামত; • অধ্যায় ৮: "অন্যায় ও অবিচারে একে অন্যকে সাহায্য কোরো না”—এই আয়াতের ব্যাখ্যা; • অধ্যায় ৯: হালাল ও হারাম; • অধ্যায় ১০: সুলতান বা শাসকদের দেওয়া পুরস্কার গ্রহণ; • অধ্যায় ১১: বরকতময় খাবার অনুসন্ধান; • অধ্যায় ১২: ক্ষুধা ও একে ইবাদতের অংশ বলে দাবিকারীদের জবাব; • অধ্যায় ১৩: জীবিকার উৎসের ব্যাপারে আলোচনা; অধ্যায় ১৪: ফাই ও খারাজ ভূমি
• অধ্যায় ১৫: অন্যায়ভাবে বলপূর্বক গৃহীত জমিতে নামাজ।
ওপরের সবগুলোই যে “অধ্যায়” শিরোনামে এসেছে, তা নয়। চতুর্থ অধ্যায়ের পরের অংশগুলোতে “অধ্যায়” (আরবি “বাব”) কথাটি নেই। এর বদলে সেগুলো এরকম কোনো শ্রেণিবিন্যাস ছাড়াই লিখা হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য বিষয়গুলোর একটির সাথে আরেকটির সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আমরা ওপরে এদের আলাদা অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করার এটাই কারণ।
এখন আমরা উপর্যুক্ত অধ্যায়গুলোর বিষয়বস্তুর দিকে নজর দিব। উদ্ভূত প্রয়োজন অনুযায়ী একেকটির ওপর প্রদত্ত গুরুত্বের মাত্রা বিভিন্ন হবে।
সূচনা হিসেবে ভূমিকা অংশটি দরকারি। এখানে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের প্রসঙ্গ সহকারে উপার্জন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। নিচে তা দেখানো হলো:
প্রথমত, বিশ্বজগত, আসমান, জমিন, এদের মধ্যবর্তী এবং বহিঃস্থ সবকিছুর সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। উপার্জন সংক্রান্ত বইয়ের জন্য এ এক যৌক্তিক সূচনা। কারণ সৃষ্টিকূলের জন্য আল্লাহ যা কিছু সহজলভ্য করেছেন, উপার্জন সেটার সাথে সম্পর্কিত।
➡ দ্বিতীয়ত, বুদ্ধি খাটানোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে এখানে। মুমিনদের যে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যাপারটি উল্লেখ করার কারণ হলো: (ক) তৎকালীন যে গোষ্ঠীগুলো ধর্মগ্রন্থের বিপরীতে বিবেকের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে, তাদের প্রতি জবাব, (খ) আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য চিন্তা ও ভাবনা করতে যেহেতু মানবীয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, তেমনি সুফিদেরও উচিত ইবাদতের অংশ হিসেবে জীবিকা উপার্জনের জন্য অনুরূপ প্রচেষ্টা করা।
➡ তৃতীয়ত, বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়ার জন্য মানুষকে শারীরিক চাহিদাসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহর যে উদ্দেশ্য, তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। আবারও সুফিদের প্রতি এ এক আগাম প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা।
➡ চতুর্থত, প্রতিটি মানুষ কতটুকু রিযিক উপার্জন করতে পারবে, সে ব্যাপারে আল্লাহ-প্রদত্ত নিশ্চয়তার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। এতে করে মানুষের অন্তর আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল থাকবে। তাঁর উপাসনা করতে গিয়ে উপার্জন্য নিয়ে খুব বেশি ব্যতিব্যস্ত বা চিন্তিত হবে না।
ভূমিকাটির মাঝে খুবই স্পষ্ট একটি বার্তা নিহিত বলে প্রতীয়মান হয়: আল্লাহ উপার্জনের যে পরিমাণ ভাগ্যে লিখে রেখেছেন, তাঁর সৃষ্টিকূল সেগুলো অর্জন করার জন্য যেন প্রচেষ্টা করে। অন্যান্য কড়া সুফিদের সাথে এই দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি সাংঘর্ষিক।
প্রথম অধ্যায়টি ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলে। সাধারণভাবে মানুষ ও আল্লাহর মাঝে সম্পর্ক এবং বিশেষত উপার্জনের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব-সম্পর্কিত। এটি তাওয়াক্কুল এবং তাওয়া-কুলের মাঝে পার্থক্য। পার্থক্যটা বানানে। যদিও বাংলায় মনে হতে পারে তেমন কিছুই না, কিন্তু আরবিতে এর গুরুত্ব অত্যধিক। তাওয়াক্কুল অর্থ জীবনের সকল কাজে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ নির্ভরতা ও আস্থা। উপার্জনও এর অন্তর্ভুক্ত। সেই সঙ্গে যা অর্জন করতে হবে, সেটার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা করে চলা।
উপার্জন অনুসন্ধানকে আল-মুহাসিবি বলেন আল-হারাকাহ। আল-মুহাসিবির ভাষায়, তাওয়াক্কুল হলো কর্ম বা হারাকাহ সহকারে বিশ্বাস। আর তাওয়া-কুল হলো হারাকাহ ছাড়াই বিশ্বাস। হারাকাহর সংজ্ঞা হলো জীবিকা বা যা কিছু অর্জনে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছুক, সেটার জন্য প্রচেষ্টা করা। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের আদেশ দিয়েছেন জীবিকা উপার্জনের জন্য তাঁর প্রতি নির্ভর করতে। কিন্তু এসকল উপার্জনের জন্য আল্লাহ যে সত্যিকার প্রচেষ্টা ও একনিষ্ট উদ্যোগ দাবি করেন, সেটা এই নির্ভরতার ফলে নাকচ হয়ে যায় না।
প্রথম অধ্যায়ে আল-হারিসের যুক্তিতর্ক শক্তিশালী ও প্রত্যয়জনক। অন্যদের সমালোচনার ক্ষেত্রে তার যে পদ্ধতি, এখানেও তা-ই। প্রথমে তাদের দৃষ্টিকোণকে ব্যাখ্যা করা, যা পুরোপুরি কুরআনের আয়াত দ্বারা সমর্থিত। অর্থাৎ, আল্লাহ সকলের প্রয়োজন অনুযায়ী রিযিক নির্ধারিত করে রেখেছেন। তারপর দারুণভাবে তাদের দৃষ্টিকোণকে খণ্ডন করা, সেটাও আবার কুরআন থেকে শক্ত প্রমাণ সহকারে। যুক্তির শক্তি ব্যবহার করে তিনি তার প্রতিপক্ষ ও সুফিদের কাছে ব্যাখ্যা করতে থাকেন কুরআনের আয়াতের উদ্দেশ্য, ঐশী বিধানের লক্ষ্য, এবং একেক আদেশের মাঝে আপাত সাংঘর্ষিকতা বলে মনে হওয়া বৈচিত্র্যগুলোর কারণ। তার সমসাময়িক সুফিগণ ইবাদতের খাতিরে উপার্জনের পেছনে ছুটে চলাকে পরিত্যাগ করেন। পক্ষান্তরে আল-মুহাসিবি কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি সহকারে দেখান যে, প্রথমত আল্লাহ উপার্জন-প্রচেষ্টাকে অনুমোদিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, বলে দিয়েছেন যে, এই অনুমোদনকে তাঁর আদেশ মান্য করা এবং ইবাদতের পথে বাধা বানানো যাবে না। তৃতীয়ত, উল্টো দিক থেকেও ব্যাপারটা ঠিক রাখতে হবে। এই অধ্যায়ে তার যুক্তিতর্কে দক্ষতা ও অপরের ব্যাপারে তার গভীর উপলব্ধির প্রতিফলনও দেখা যায়।
বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশে করা হয়েছে জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল ও হারাম সংক্রান্ত বিভিন্নতা সম্পর্কে আলোচনা। সাধারণভাবে, হালাল জীবিকা হলো যেটাতে আল্লাহর কোনো বিধান বা আদেশ অমান্য করা হয় না। পক্ষান্তরে যা কিছুতে আল্লাহর আদেশ থেকে বিচ্যুতি ঘটে, সেগুলো হারাম। জীবিকা উপার্জনে ব্যক্তির বাধ্যবাধকতার আরও একটি ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে এখানে, তা হলো পরিবারের প্রতি দায়িত্ব। যেসকল সুফি ইবাদতকে জীবিকা উপার্জনের চেয়ে শ্রেয় বলে বিশ্বাস করেন, এটা তাদের বিরুদ্ধে বিতর্কে আরও একটি সংযোজন। মূল বার্তা হলো পরিবারের ভরণপোষণ না দিয়ে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করলে পরিবার পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। আর এটা আল্লাহর আদেশের লঙ্ঘন। নবি ও সাহাবিগণের জীবন থেকে উদাহরণ এবং তাদের নৈতিক জীবিকা উপার্জনের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে আরও জোরদার করা হয়েছে যুক্তিটিকে।
অন্য সুফিগণের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের বিষয়টি এক বিশেষ মোড় নেয় চতুর্থ অধ্যায়ে এসে। এর আলোচ্য ব্যক্তি পারস্যের খুরাসানের শাকিক নামীয় এক বিখ্যাত সুফি। তার পুরো নাম শাকিক ইবনু ইবরাহীম ইবনু আলি আল-আযদি আল-বালখি। শাকিকের দাবিসমূহ উল্লেখ করে সেগুলোর জবাব দিয়েছেন আল-হারিস। শাকিকের দাবিগুলো প্রধানত: (ক) যদি কেউ প্রবলভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং তিনি যে বান্দার চাহিদাসমূহ পূরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাতে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও জীবিকা উপার্জনের কঠোর প্রচেষ্টা করে—তার মানে আল্লাহর রিযিক দানের সক্ষমতার প্রতি তার সন্দেহ আছে। (খ) আল্লাহ যা তাকদীরে নির্ধারিত করে রেখেছেন, সেটা উপার্জনের জন্য চেষ্টা করার অর্থ আল্লাহকে তাড়া দেওয়া। অথচ আল্লাহ তাঁর জ্ঞান অনুযায়ী সেটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতএব, এহেন চেষ্টা হারাম। (গ) জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা উদ্ভূত হয় মূলত ঈমানের দুর্বলতা থেকে। কারণ সত্যিকারের ঈমানের দাবি হলো, আল্লাহ যা দিয়েছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহর অনুগ্রহ এসে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
যেসকল মুসলিম আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য বসে আছে কিংবা যারা দুর্বল হৃদয়ের কারণে উপার্জনের কঠিনতার মুখোমুখি হতে অক্ষম, তাদের কাছে এইসব যুক্তি মানানসই হতে পারে। আল-হারিস এই দাবিগুলোর হাকিকত উন্মোচন করে দেন। যৌক্তিক ও সুসংলগ্ন উপায়ে কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবিদের চর্চা থেকে উদাহরণ-সহ প্রমাণ পেশ করেন। তার উল্লেখিত দারুণ একটি পয়েন্ট হলো-সুফিগণের হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ করা; অথচ সেগুলো এমন উৎস থেকে উপার্জিত হয়ে থাকতে পারে, যেগুলো আল্লাহর দৃষ্টিতে হারাম। এটি এমন এক মাধ্যম, যা তাদের লক্ষ্যের সঙ্গে যায় না।
বইটির বাকি অংশ হলো, উপার্জননের ওপর লেখা একটি নিবন্ধ। এখানে আলোচিত হয়েছে উপার্জন সংক্রান্ত বিভিন্ন নৈতিক বিষয়—উপার্জন, উৎপাদন এবং প্রয়োজন পূরণে সেটার ব্যবহার। একজন সুফির হাতে লিখিত হওয়ায় এই বইটি এরকম এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যাপারে আংশিকভাবে সুফিবাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। অর্থনীতির ওপর অন্যান্য নৈতিক লেখালেখি থেকে এটি ভিন্নতর এই অর্থে যে, এতে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর চোখে বিশুদ্ধতাবাদী দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়েছে। এর অনুসারীরা যতই চরমপন্থি হোক না কেন, সাধারণভাবে তাদের সর্বদাই উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অধিকারী হিসেবে দেখা হয়েছে। সুফিপন্থার শুদ্ধতাবাদী চেতনার একটি উদাহরণ দেখা যায় পুরো বইটি জুড়ে। একটি বিষয়ের ওপর বিশেষ আলোকপাতের দ্বারা। আর তা হলো, সরাসরি হারাম না হলেও যেসব জীবিকা সন্দেহপূর্ণ, সেগুলো পরিহার করার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে এখানে।
আলোচনাটি শুরু হয়েছে আল-হারিস এবং তার সমসাময়িক ও অতীতের সুফি শিক্ষকগণের দৃষ্টিতে ওয়ারা'র সংজ্ঞা দেওয়ার মাধ্যমে। বোধগম্যভাবে সংক্ষিপ্ত একটিমাত্র সংজ্ঞার মধ্যে যদিও বৈরাগ্যতাকে সীমাবদ্ধ করা কঠিন, তারপরও এটি হলো: “যেসব কথা, কাজ, চিন্তা, বাসনা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করতে পারে, সেগুলো পরিহার করা। আর কাজ, চিন্তা ও অনুভূতির ক্ষেত্রে আল্লাহর আদিষ্ট বিষয়গুলো ছেড়ে না দেওয়া।” আল-হারিস ও অন্য সুফিগণের মতে যুহুদের ধারণাটা হলো প্রকাশ্য ও গোপন জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহভীতি। অন্যথায় কোনো মুসলিমকে ওয়ারা' চর্চাকারী বলা যাবে না। এটা অ-সুফিদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে না-ও মিলতে পারে। কারণ মুসলিমরা শুধু সেসব জিনিসের জন্যই জবাবদিহি করতে বাধ্য, যেগুলো তারা আসলেই বলেছে বা করেছে। মুসলিমের মনে যেটা এসেছে কিন্তু কাজে সেটা প্রকাশ করেনি, সেটার জন্য শাস্তি দেওয়া বা না-দেওয়া আল্লাহর ইখতিয়ারে। নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সেটা মাফ করতেও পারেন বা না-ও করতে পারেন, যেমনটা কুরআনের সূরা বাকারার ২: ২৮৫-২৮৬ আয়াতগুলো আমাদের জানায়। কিন্তু সুফিদের চোখে যুহুদ, ধর্মানুরাগ বা ওয়ারা'র মধ্যে অন্তরাত্মা এবং সেসব চিন্তাও অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো সে প্রকাশ্য আচরণে আনেনি।
নিশ্চিত বিষয়ের বিপরীতে সন্দেহপূর্ণ বিষয় বা শুবুহাত পরিত্যাগ করাটা ওয়ারা'র একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটা হালাল জীবিকা যদি অন্যদের জন্য হারাম জীবিকায় নিপতিত হওয়ার মাধ্যমে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে দরকারে ওই হালাল মাধ্যমটি ছেড়ে দিতে হবে। তাকওয়ার উদাহরণ হিসেবে আল-মুহাসিবি উল্লেখ করেছেন, মদব্যবসায়ীরা আঙুর কিনে সেটার রস দিয়ে মদ বানাতে পারে, এই আশঙ্কায় এক মুসলিমের নিজের আঙুর বাগান পুড়িয়ে দেওয়া। এটা ধর্মীয় চরমপন্থার মতো শোনাতে পারে, কারণ মানুষ শুধু তার নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ, যেমনটা কুরআন আমাদের বলে (২:২৮৬)। আর এটা তাকওয়ার চরমপন্থি উদাহরণ। কিন্তু তারপরও সন্দেহজনক বিষয়কে পরিহার করার ব্যাপারে এটি অতি শুদ্ধতাবাদী নীতির দৃষ্টান্ত বটে। খুব সংক্ষেপে বললে আল-মুহাসিবির বক্তব্য হলো, জীবিকা উপার্জনের ময়দানে বা বাজারে মানুষকে আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে; কর্ম ও অন্তরের মাধ্যমে পালন করতে হবে তাঁর আদেশসমূহ।
আল-মুহাসিবির গ্রন্থটির গুরুত্ব তিন রকম: (ক) উপার্জনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যাপারে এটি সুফিবাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। (খ) অর্থনৈতিক আচরণের ব্যাপারে সুফিদের দাবিকে এখানে সমালোচনা করা হয়েছে, বিশেষত উপার্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে। এবং (গ) এটি অর্থনীতির ক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং নৈতিক আচরণের ব্যাপারে সমৃদ্ধ একটি রচনা।
এদিক থেকে আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা'কে ধরা যায় অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে শুদ্ধতাবাদীদের এক বিশাল অবদান হিসেবে। বিদিত আছে, আল-মুহাসিবি তার পরবর্তী অনেক প্রসিদ্ধ লেখককে প্রভাবিত করেছেন। যেমন- ইমাম গাযালি রচিত মাস্টারপিস ইহইয়া উলুমুদ্দীন-কে। পরের অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00