📄 সুফিবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব
সুফিবাদকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আপাত একটি সমস্যা দেখা দেয়। সুফিরা যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রচলিত জীবনধারাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভোগ ও উপার্জনের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব সংযমী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, তাহলে ম্যাক্রো পর্যায়ে কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হওয়ার কথা না। কিন্তু দুনিয়াবিরাগে ফিরে যাওয়ার আহ্বানটা যদি প্রকাশ্যে গণপরিসরে করা হয় এবং এটিকেই আল্লাহর আরাধনার আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুফিবাদের কিছু না কিছু প্রভাব থাকাটা অপরিহার্য। এর ওপর এভাবে আলোকপাত করা যায়:
➡ প্রথমত, স্ফীতিমূলক অর্থনীতিতে যেখানে সংযম নীতি পছন্দনীয় বা কখনো কখনো বাঞ্ছনীয়ও বটে, হ্রাসমূলক অর্থনীতিতে সেটা আবার কাঙ্ক্ষিত নয়। স্ফীতিমূলক অর্থনীতিতে সংযম চাহিদা-আকর্ষণের শক্তি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। প্রাপ্য পণ্য ও সেবার সামষ্টীক চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে এর উদ্ভব হয়। কিন্তু অর্থনীতি যখন প্রাপ্য পণ্য ও সেবার জোগানের প্রতি যথেষ্ট চাহিদা না থাকার ফলে হ্রাসমূলক অবস্থায় থাকে, তখন অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকা সাপেক্ষে সুফি অর্থনীতির প্রভাবে হ্রাসমূলক প্রভাবের আরও অবনতি হওয়ার কথা। সেখানে বরং সামষ্টিক চাহিদা সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে সরকার প্রায়শ এমন এক বা একাধিক নীতি অনুরসণ করে, যার ফলে চাহিদা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে ভাউচার মানির সরাসরি প্রবেশন, যার বিশেষ লক্ষ্য হয় ভোগ বৃদ্ধি করা, সঞ্চয় বৃদ্ধি না করে।
➡ দ্বিতীয়ত, পণ্য ও সেবার জন্য সামষ্টিক চাহিদা সীমিত হয়ে গেলে বিক্রি কমবে। এর ফলে উদ্যোগের মুনাফা কমবে এবং ক্ষতি উৎপন্ন হবে। এমনটা চলতে থাকলে উদ্যোগসমূহ ব্যবসার ময়দান থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবে। কারণ তারা তাদের খরচ পোষাতে পারছে না। সেইসাথে পুঁজির খরচের তুলনায় মুনাফা কম। এর ফলাফল হবে উৎপাদন হ্রাস। বিক্রি কমে যাওয়ার ফল হিসেবে একটা সময় পর উৎপাদন কমে আসবে। উৎপাদনকারী উদ্যোগগুলো বাজার থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হওয়া এবং টিকে থাকা উদ্যোগের উৎপাদন কমে যাওয়ায়-অর্থনীতির সাকুল্য উৎপাদন কমে যাবে। অতএব, পণ্য ও সেবার সামষ্টিক জোগানও কমবে। সামষ্টিক চাহিদা ও সামষ্টিক জোগান উভয়টিই কমে আসায় দামও কমে আসতে পারে বটে। কিন্তু সেটা হবে দরিদ্র অর্থনীতিতে দাম কমার ঘটনা।
➡ তৃতীয়ত, বেশির ভাগ সুফির কথামতো সমাজ যদি তাদের উপার্জনক্ষমতাকে কোনোমতে বেঁচে থাকার পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তাহলে উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে যাবে। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, বিকাশের জন্যও তেমন সুযোগ থাকবে না।
➡ চতুর্থত, যাকাত যেহেতু প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে, ফলে কোষাগারে আদৌ কিছু রাজস্ব এলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্যান্য সরকারি সেবা এবং সমাজের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গঠনের জন্য যথেষ্ট তহবিল ইসলামি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না। প্রতিরক্ষা-বাজেট প্রায় শূন্য বা যৎসামান্য হওয়ার কারণে প্রতিরক্ষার অস্তিত্বও থাকবে না থাকার মতো। ফলে প্রতিবেশী কোনো অনৈসলামি, বা অ-সুফি শক্তির আক্রমণের সামনে ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে পড়বে একেবারেই দুর্বল।
➡ পঞ্চমত, খাদ্য ও মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের পেছনে খরচ করার মতো যথেষ্ট অর্থ না থাকলে ব্যক্তি অসুস্থতা ও দুর্বলতার শিকার হবে। তখন পূর্ণ ভালোবাসা সহকারে আল্লাহর ইবাদত করার পথে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই শাইবানির (৭৫০-৮০৪) মতো ব্যক্তিদের প্রান্তিক সুফিদের ভোগ ও উপার্জন সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণের সমালোচক হয়ে ওঠাটা খুব স্বাভাবিক। তেমনি এটিও স্বাভাবিক ব্যাপার যে, আল-মুহাসিবির মতো একজন সুবিখ্যাত সুফি তার রচিত গ্রন্থে অন্যান্য সুফির থেকে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন।