📄 কৃষি
সমসাময়িকদের কারও কারও চিন্তার সংশোধন করতে গিয়ে শাইবানি প্রচণ্ডভাবে কৃষিকাজের সাফাই গেয়েছেন। এমনকি তার মতে এটি অন্যান্য উৎপাদন কর্মকাণ্ডের চেয়েও অনেক বেশি শ্রেয়। তার এই মতকে একটি হাদীসের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যাপারে নবি বলেছিলেন যে, 'এটা যে সম্প্রদায়ের ঘরে প্রবেশ করে, আল্লাহ সেখানে অপমান প্রবেশ করান।' (সহীহ বুখারি: ২৩২১) শাইবানি এই হাদীসের ব্যাখ্যায় তুলে ধরেন, এখানে সামরিক অভিযান তথা জিহাদ ছেড়ে দিয়ে গ্রাম্য এলাকায় থিতু হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তার এই ধর্মীয় প্রতিযুক্তির ভিত্তিও বিভিন্ন হাদীস, যেগুলোতে কৃষিকাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে বিপুল পরিমাণে। ইমাম মুহাম্মাদ একটি হাদীস বর্ণনা করেন, 'কৃষক তার রবের সঙ্গে ব্যবসা করে.' এমনকি ক্ষেত থেকে কোনো পাখি ফসল খেলেও তার জন্য কৃষকের সওয়াব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত আলোচনা আগের অধ্যায়ে (উদ্ধৃতি-সহ) আলোচিত হয়েছে। যে যুগে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ইসলামি আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সে সময়ে এরকম যুক্তি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাইবানি কৃষিকাজকে অন্য সব উৎপাদন কর্মকাণ্ডের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করার কারণ চারটি:
➡ প্রথমত, তার মতে এই খাতের ওপরই অন্যান্য উৎপাদন খাত প্রতিষ্ঠিত। কৃষি থেকে প্রাপ্ত কাঁচামালই শিল্পোৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। আবার কৃষিজ উৎপাদিত পণ্য দিয়েই করা হয় বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য। আবার যেসব বাণিজ্যের পণ্য শিল্পোৎপাদিত, সেগুলোও কৃষিজ কাঁচামাল ছাড়া তৈরি করা সম্ভব হয় না।
➡ দ্বিতীয়ত, অন্যান্য খাতের চেয়ে কৃষিখাতটি সাধারণ জনগণের জন্য তুলনামূলক বেশি উপকারী। বিশেষত জীবনধারণের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যেহেতু অন্যদের প্রতি উপকারকারীরাই শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে এগিয়ে এবং হাদীসে মানুষের জন্য উপকারী ব্যক্তিকেই শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, তাই কৃষিকাজে নিয়োজিত কৃষকরাও অন্যদের চেয়ে শ্রেয়।
➡ তৃতীয়ত, কৃষিকর্ম ও তা থেকে আহরিত পণ্যসমূহ মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীবের প্রয়োজনাদি পরিপূর্ণ করে। সেটা খাওয়ার মাধ্যমে হোক, বা অন্য কোনো প্রয়োজনে।
◆ চতুর্থত, অন্যান্য শিল্প-বাণিজ্যিক পেশার বিপরীতে কৃষি নিজেই যাকাতের একটি উৎস। এই সবকিছুর ভিত্তিতে ইমাম মুহাম্মাদ নিশ্চিত করেন যে, সকল খাত অবিচ্ছেদ্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের মাঝে সহযোগিতা অপরিহার্য হলেও আপেক্ষিকভাবে কৃষিকর্ম শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী。
টিকাঃ
[১] বিস্তারিত আলোচনা দেখুন, কিতাবুল ইকতিসাব: ৪০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা। - সম্পাদক
📄 বাণিজ্য
সম্পদ বা আয়ের সৃষ্টি এবং কৃষি ও বাণিজ্যের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে শাইবানি দারুণ একটি বক্তব্য দিয়েছেন: কৃষির মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। কিন্তু বাণিজ্য ও বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পদ বিকশিত হয়। বক্তব্যটা যদিও সহজ-সাধারণ, কিন্তু এর প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে শাইবানি ফিজিওক্র্যাটদের চিন্তাকে তাদের দশ শতাব্দী আগেই লিখে দিয়ে গেছেন।
শাইবানি ও ফিজিওক্র্যাটদের মাঝে কৃষি-সংক্রান্ত চিন্তার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য একটু হলেও আলোচনার দাবি রাখে। ফিজিওক্র্যাট মতাবলম্বীদের উদ্ভব অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে। তাদের মতে কৃষিকর্মই মোট উৎপাদ (Produit net) উৎপাদনে সক্ষম একমাত্র খাত। ফলে তারা মার্কেন্টাইলিস্টদের এই ধারণার বিরোধিতা করেন যে, লেনদেন বা বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি হয় ও বৃদ্ধি পায়। উদ্বৃত্তের উৎস হিসেবে Produit net-কে উদঘাটিত করার পর তারা এতে আরেকটি বিষয় যোগ করেন। সেটির উল্লেখ পাওয়া যায় কোয়েসনে-প্রণীত Tableau economique গ্রন্থে। এটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মাঝে সম্পদ পরিবণ্টনের একটি বিশ্লেষণ (রোল, ১৯৭৩)।
ফিজিওক্র্যাটদের মতে, কৃষিকর্মীরা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আর যা কিছু উৎপন্ন করে, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যকর্মীরা ঘুরেফিরে সেটার ওপরই নির্ভরশীল। আরেকভাবে বললে, শ্রমের উৎপাদনশীলতার মাত্রা দিয়েই উদ্বৃত্তের উদ্ভব সম্ভব হয়। আর শ্রমের প্রথম উদ্ভব ঘটে কৃষিতে (প্রাগুক্ত)। অতএব, কৃষি হলো উদ্বৃত্তের একমাত্র প্রকার। ফলে শিল্পোৎপাদনের উন্নতির জন্য গৃহীত পদক্ষেপসমূহ অসার।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাণিজ্য, তথা লেনদেনের সাথে কোনো মূল্য সম্পর্কিত নয়। অবশেষে টার্গোট এসে বিনিময়-মূল্য (Valeur-exchange) ধারণাটির প্রবর্তন ঘটান। টার্গোট একে বলতেন (Valeur appreciative)। তিনি বলেন যে, এটি নির্ধারিত হয় লেনদেনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনুমিত মূল্যের গড় দিয়ে।
ইমাম শাইবানির সঙ্গে অবশ্য কিছুটা পার্থক্য আছে তাদের। তিনি কোয়েসনের Tableau economique-এর মতো অত দূর পর্যন্ত যাননি। আর ফিজিওক্র্যাটদের সঙ্গে তার অমিলের জায়গাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ:
➡ (ক) তিনি অন্য সকল খাতকে নিষ্ফলা এবং কৃষিকে একমাত্র উৎপাদনশীল খাত বলে দাবি করেননি, এবং
➡ (খ) শুরু থেকেই তিনি বাণিজ্যের বিনিময়-মূল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছেন: "বাণিজ্য জীবন-জীবিকা সরবরাহ করে না। কিন্তু বাণিজ্যের মাধ্যমেই সম্পদ বা উপার্জন বিকশিত হয়,” বলেন তিনি। যদিও তিনি ফিজিওক্র্যাটদের মতো বিশদভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেননি, কিন্তু এ বিষয়ে পরিচ্ছন্ন চিন্তা ও মৌলিক ধ্যানধারণার উদ্ভব ঘটিয়েছেন বটে। ফিজিওক্র্যাটদের সমানতালে এগুলোকে পরবর্তীকালে আরও বিকশিত করা সম্ভব ছিল।
এ অর্থে বলা যায় যে, বিনিময়-মূল্য বা Valeur-exchange সংক্রান্ত গবেষণায় তিনি টার্গোটের (Turgot) চেয়ে অগ্রগামী।
টিকাঃ
[১] প্রাগুক্ত: ৪১।
📄 অন্যান্য বিষয়
উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি শাইBlni অন্য আরও বিষয়েও সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
স্বেচ্ছায় বেকারত্ব বেছে নেওয়া মানুষদের মারাত্মকভাবে সমালোচনা করেন তিনি। বিশেষত ভণ্ড সুফিদের। সুফিগণ সেই যুগে আবির্ভূত একটি ধর্মীয় ধারা। তারা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মনিবেদন এবং জাগতিক বিষয়াদি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করার আহ্বান জানান। অন্যান্য ধর্মের সন্ন্যাসীদের সাথে তাদের মিল আছে। শাইবানির প্রশ্ন: কাজ করে খাওয়াকে তারা যেখানে বাঁকা চোখে দেখেন, সেখানে কর্মমুখর মানুষগুলোর হাদিয়া তারা গ্রহণ করেন কোন যুক্তিতে?
জীবিকা উপার্জনের জন্য কর্মের মূল্যকে সাধুবাদ জানিয়ে সেটাকে ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত করেন তিনি। তিনি বলেন, ইবাদতের দায়িত্ব পরিপূর্ণ করার সামর্থ্য অর্জিত হয় কাজকর্মের মাধ্যমে। তাই উপার্জন করাটা প্রথম সারির ধর্মীয় দায়িত্ব। সুফিদের ব্যাপারে তিনি যা বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ-না-করা সকল মানুষের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হয়। তা ছাড়া যারা কাজ করতে সক্ষম হওয়ার পরও দান-খয়রাত গ্রহণ করে, তাদেরও তিনি আক্রমণ করেন।
শিক্ষাকে তিনি খুবই উঁচু দৃষ্টিতে দেখেন এবং এর ওপর জোরারোপ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন দিকের জন্য মূল্যবান: ধর্ম সম্পর্কেও যেমন শিক্ষা অর্জন করতে হয়, তেমনি বাণিজ্য ও পেশা সম্পর্কেও। তার মতে, শিক্ষা শ্রমের বণ্টনে সহায়তা করে। সেটা আবার সহায়তা করে কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের বেশির ভাগ অংশ যিনি শিক্ষার্জনের পেছনে ব্যয় করেছেন, তার পক্ষ থেকে শিক্ষার ওপর এই পরিমাণ গুরুত্ব প্রদান প্রত্যাশিতই বটে।
যাকাতের ব্যাপারে শাইবানি একটি দারুণ বক্তব্য এনেছেন। তিনি বলেন, দানশীল ধনীরা দানগ্রহীতা দরিদ্রদের মুখাপেক্ষী। দরিদ্ররা না থাকলে ধনীরা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে পারত না, দান করার সওয়াবও অর্জন করতে পারত না। তার মানে দরিদ্ররা ধনীদের উপকৃত করেছে! ধনীদের সম্পদে যে দরিদ্রদের অধিকার রয়েছে, শাইবানি এখানে সেই ইসলামি মূলনীতির পুনরাবৃত্তি করেছেন। কিন্তু ধর্মীয় দানের গ্রহীতা যদি উপার্জনক্ষম হওয়া সত্ত্বেও শুধু শুধু দান-সদাকা পাওয়ার দাবি করে, তাহলে সেটা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি তা ধনীকে দরিদ্রের চেয়ে নিম্নতর করে দেবে। তো ধনী আর দরিদ্র পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল-শাইবানির এই সিদ্ধান্ত খুবই কৌতূহলোদ্দীপক।
নিঃসন্দেহে ইসলামি অর্থনীতির ওপর ইমাম মুহাম্মাদ শাইবানি-এর লেখালেখি এই বিষয়টির বিকাশে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।