📄 জীবিকা বা নিত্যপ্রয়োজনীয়ের পর্যায়
এই চাহিদা পূরণের ব্যাপারে ভোক্তা আসমানি বিধান অনুযায়ী বাধ্য। শুনে মনে হতে পারে জানা কথা আবার ঘুরিয়ে বলা হচ্ছে। কারণ প্রাকৃতিক কারণেই তো ভোক্তা তার এ চাহিদা পূরণ করবে। কিন্তু শাইবানির এই বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝা যাবে তিনটি বিষয় থেকে:
➡ প্রথমত, তার দৃষ্টিতে ভোক্তা কেবলই ভোক্তা নয়। বরং সে একজন গৃহস্থালি ভোক্তা, যার সাথে তার স্ত্রী ও তার ওপর নির্ভরশীল সন্তান-সন্ততি ও পিতামাতাও অন্তর্ভুক্ত।
➡ দ্বিতীয়ত, শারীরবৃত্তিয় চাহিদার মধ্যে পোশাক ও আবাসনও অন্তর্ভুক্ত। তিনি এভাবে বলেছেন, “খাদ্য, পানীয়, পোশাক এবং ঠাণ্ডা ও তাপ থেকে আশ্রয়।”
➡ তৃতীয়ত, কোনো মিথ্যে ধার্মিকতার চাদরে এসব চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকাকে তিনি মোটেও সমর্থন করেন না। তাই এই পর্যায়ের ভোগ বর্ধিত হয়ে এতে অন্য অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আনুভূমিকভাবে এতে রয়েছে আবাসন (পরিবার এবং পিতামাতার যদি অন্য কোনো সহায় না থাকে, তাহলে তারা সহ), এবং উলম্বভাবে রয়েছে আরও একগুচ্ছ চাহিদা। শাইবানির চোখে এই পর্যায়ের চাহিদা পূরণ করাটা একটি প্রথম সারির ধর্মীয় দায়িত্ব। ভোগের এই পর্যায়টির এসকল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার গুরুত্ব দুই প্রকার: (ক) এই পর্যায়ের চাহিদা পূরণ না করলে ভোক্তা আসমানি শাস্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই ক্ষেত্রে যত কম ভোগ, তত শাস্তি, এবং (খ) ভোক্তাকে এসব চাহিদা পূরণে উপার্জনের মাধ্যম অনুসন্ধান করতে হবে আর এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া একটি প্রথম সারির দ্বীনি দায়িত্ব।
📄 মধ্যমপন্থার পর্যায়
ভোক্তাকে গৃহস্থালি হিসেবে বিবেচনা করার ধারণাটি মাথায় রেখেই ভোগের দ্বিতীয় পর্যায় মধ্যমপন্থাকে বুঝতে হবে। শাইবানির ভাষ্যে, এটি মা'রুফ পর্যায়। তার সংজ্ঞামতে এই পর্যায়টি অপব্যয়ের নিচে এবং কৃপণতার ওপরে—দুনাস সারাফ ওয়া ফাওকাত তাকতীর। এই পর্যায়ের পণ্যসমূহ প্রথম পর্যায়ের মতোই ব্যাপক, কিন্তু পরিমাণ ও প্রকারভেদ হতে পারে বেশি এবং মান হতে পারে উচ্চতর। উপার্জনের ব্যাপারে বলা যায়, ভোক্তাকে এসব চাহিদা পূরণের জন্যও উপার্জনের মাধ্যম খুঁজতে হবে। কিন্তু অতিরিক্ত উপার্জন না করার কোনো (শারঈ) কারণ থাকলে এসব চাহিদা অপূর্ণ রাখার জন্য সে ঐশী শাস্তির যোগ্য হবে না। (শারঈ) কারণ হতে পারে— ইলম অর্জন ও আলিম হওয়ার জন্য সময় ব্যয় করা, আল্লাহর রাস্তায় সময় দেওয়া। এক্ষেত্রে এটি পূর্ববর্তী পর্যায়ের থেকে আলাদা, যেখানে চাহিদা পূরণ না করলে শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।
📄 অপব্যয়ের পর্যায়
তৃতীয় পর্যায় হলো অপব্যয়, এবং তা নিষিদ্ধ। এই পর্যায়টি মধ্যমপন্থার ওপরে অবস্থিত। তবে উপার্জনের ক্ষেত্রে এর অর্থ এই না যে, মধ্যমপন্থার পর্যায়ের চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে ভোক্তা এর চেয়ে বেশি আর আয় করতে পারবে না। শুধু সেই অতিরিক্ত আয় অপব্যয়ের কাজে ব্যবহৃত হতে পারবে না, ব্যস। কুরআন বলে, অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। তাই অতিরিক্ত উপার্জনটুকু ব্যয় করা যেতে পারে অসহায়দের সাহায্যে, নির্ভরশীল উত্তরাধিকারীদের জন্য, উৎপাদনের পুঁজি সরবরাহের উদ্দেশ্যে, জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে, আল্লাহর রাস্তার খরচের উদ্দেশ্যে ইত্যাদি। কিন্তু উপার্জন বেহুদা উদ্দেশ্যে খরচ করা যাবে না। কারণ অপব্যয় হলো নিস্ফল খরচ।
ভোগের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাপারে শাইবানির এই বিশ্লেষণ তার পরবর্তী অনেক ইসলামিক অর্থনীতিবিদের জন্য সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক সময়ের অর্থনীতিবিদগণও এর অন্তর্ভুক্ত, যারা ভোক্তার আচরণকে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন (দ্রষ্টব্য অধ্যায় ৯)। অবশ্য কথা উঠতে পারে যে, ভোগের এসব পর্যায় কাল ও সমাজভেদে বিভিন্নরকম হতে বাধ্য। প্রয়োজনীয়তার পর্যায়টি হয়তো তুলনামূলক অপরিবর্তনশীল, কারণ এই পর্যায়টিই দেহ ও আত্মাকে এক রাখে। কিন্তু মধ্যমপন্থার পর্যায় এবং এই পর্যায়ের সাথে অপব্যয় পর্যায়ের পার্থক্যরেখা যুগ ও সমাজের ওপর ভিত্তি করে অধিকতর পরিবর্তনশীল। শাইবানি হয়তো তার বিশ্লেষণের এই পরিবর্তনের সাথে দ্বিমত করতেন না। তিনি নিজেই দেখিয়েছেন যে, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে মানুষের ভোগ তার প্রত্যাশিত মধ্যমপন্থার পর্যায়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেমন উৎসবের মৌসুম এবং অনুষ্ঠানাদি। লোক-দেখানো ও অহংকারিতার পর্যায়ে না চলে গেলে এগুলোও গ্রহণযোগ্য।
তা ছাড়া ভোগের উপর্যুক্ত পর্যায়গুলোর পুরো বিশ্লেষণজুড়ে শাইবাণি উপযোগের বিষয়টিকেও নিরীক্ষণ করেছেন। নিশ্চিত করেছেন যে, অতিরিক্ত পণ্য ভোগ করার ফলে উপযোগ ধ্বংস হয়ে যায়—আজকের যুগে এটিকেই আমরা উপযোগ ধ্বংসের সূত্র হিসেবে চিনি।