📄 দাম, ঘাটতি ও মান
বাজারশক্তির মাধ্যমে দাম নির্ধারণের সাধারণ মূলনীতিটি আবু ইউসুফ নিশ্চিত করেন। মানুষজন দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধ করলে নবি তা প্রত্যাখ্যান করেন, যা (উদ্ধৃতিসহ) পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পণ্যের দাম আলোচনার সময় আবু ইউসুফ একটি বিশেষ মন্তব্য করেন। এ ব্যাপারে তার ভাবনা হলো, জোগানের কারণে দর প্রভাবিত হয় না: পণ্যের জোগান ও পরিমাণ প্রচুর পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও দাম বেশি হতে পারে। আবার জোগান ও পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও দাম কম হতে পারে। টাকার জোগানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করেন তিনি। অবশ্য অ্যাডাম স্মিথ যেভাবে কাঁচির দাঁতের উদাহরণ টেনে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছেন, ইমাম আবু ইউসুফ সেরকম কোনো বিশদ ব্যাখ্যা দেননি। তিনি সম্ভবত শুধু জোগানের ব্যাপারটিতেই মনোযোগ রেখেছেন। চাহিদার দিকটি কি তার বক্তব্য থেকে অনুমান করে নিয়ে সমীকরণ পূর্ণ করা সম্ভব? আমরা জানি না। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে, তার দেওয়া সিদ্ধান্তটি পরবর্তীকালে একটি চলনসই যুক্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। তা হলো, জোগান নিজে কখনো দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বোঝা যায় যে, দরের ওপর জোগানের চেয়ে চাহিদার প্রভাবকে তিনি বড় করে দেখেছেন।
তা ছাড়া দর নিয়ে আলোচনার সময় ইমাম আবু ইউসুফ অর্থনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন। অর্থনৈতিক পণ্যে সংকট ও মূল্যের মাঝে সম্পর্ক। তাৎক্ষণিকভাবে সহজলভ্য কোনো পণ্যের জন্য কেউ দাম হাঁকাতে পারবে কি না, এ ব্যাপারটি আলোচনা করছিলেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেন পানির উদাহরণ। বলেন যে, বহমান নদীর পানির জন্য দাম হাঁকানো যায় না। কিন্তু নদী যেখানে বহমান নয়, সে জায়গায় পানি নিয়ে আসলে সেটার জন্য দাম নেওয়া যায়। কোনো পণ্যের মূল্য কিভাবে তৈরি হয়, সে ব্যাপারে পানির উদাহরণ ব্যবহার করে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকের কথা উল্লেখ করেন- ঘাটটি, সরঞ্জামের মূল খরচ এবং পরিবহন ব্যয়। মূল্যের ব্যাপারে অর্থনীতিতে যে মৌলিক বিশ্লেষণ রয়েছে, আবু ইউসুফের বিশ্লেষণ তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো আবু ইউসুফের আল-খারাজ গ্রন্থের প্রধান প্রধান আলোচ্য। এই বইয়ে ইমাম আবু ইউসুফ-সংক্রান্ত আলোচনার জন্য বেশ বড়সড় অংশ বরাদ্দ রেখেছি আমরা। এর কারণ বহুবিধ:
➡ (ক) এটি ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ,
➡ (খ) এই কাজটির ওপর কিছুটা বিস্তারিত আলোকপাত করার প্রয়োজন ছিল, কারণ এতে এই পরিসরের প্রথম ও প্রধানত মুসলিম লেখকের চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়, কেননা
➡ (গ) বইটি ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম সুপরিকল্পিত কাজ,
➡ (ঘ) রাষ্ট্রের অর্থায়ন ও জনপ্রশাসনের ব্যাপারে এ বইটি একটি বিশদ কাঠামো, বা বলা চলে পুরো একটি সংবিধান প্রদান করেছে, যার
➡ (ঙ) কলেবর বেশ ভালোরকমের বড়, এবং
➡ (চ) আজকের মানদণ্ডেও এ বইটিকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব। এজন্য আবু ইউসুফের বিশেষ মনোযোগ প্রাপ্য ছিল। তার পরবর্তী সকল লেখকের ব্যাপারে এতটা বিস্তারিত আলোচনা করা হবে না। তবে প্রয়োজনসাপেক্ষে তাদের যথাযোগ্য পরিসর প্রদান করা হবে, যা আমরা পরবর্তীকালে দেখব।
ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজের পর ইসলামি অর্থনীতির ওপর বিশেষায়িত লেখালেখি এক দারুণ মোড় নেয়। আবু ইউসুফের রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা থেকে সরে সেটা অনেকটাই উদ্যোগের আলোচনায় চলে আসে। আধুনিক পরিভাষায় যেটাকে বলা চলে Micro economic বা ব্যষ্টিক অর্থনীতি পদ্ধতি। উনবিংশ শতাব্দীর একটি পরিভাষা ধার করলে তেমন কোনো অত্যুক্তি ছাড়াই বলা চলে যে, সেটি ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর লেখালেখির সূচনা। এর একটি উদাহরণ শাইবানি রচিত "কিতাবুল কাসব" বা জীবিকা উপার্জন।