📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শুল্ক মাশুল

📄 শুল্ক মাশুল


আবু ইউসুফ তার শুল্ক মাশুল সংক্রান্ত অধ্যায় শুরু করেন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে: “আমার মতে, আপনার উচিত একে সৎ ও তাকওয়াবান কর্মচারীদের হাতে অর্পণ করা। যাদেরকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেওয়া হবে, যেন তারা প্রজাদের ন্যায্য পরিমাণের অধিক কিছু চাপিয়ে না দেয়। আপনার আরও উচিত তাদের কাজকর্মের তদারকি করা, দুর্নীতিবাজদের বরখাস্ত করা, এবং সৎ ও ন্যায্যভাবে দায়িত্ব পালনকারীদের পুরস্কৃত করা"। এর পর তিনি প্রযুক্ত হার, করের ভিত্তি ও নিম্নসীমা সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রসর হন। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রগুলোও আলোচিত হয়: বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না, এমন প্রাণী (যেমন চরে বেড়ায় না এরকম ভেড়া, গবাদি পশু এবং উট); বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়, বরং বপনের জন্য রাখা শস্য; অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদ ও খেজুর, যেগুলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়নি, প্রত্যেকটির কথা তিনি উল্লেখ করেন।
মজার ব্যাপার, করের আওতা থেকে বের হওয়ার জন্য ওই ব্যক্তি তার ধর্ম অনুযায়ী শপথ নিলেই হবে। রাষ্ট্রের কাছে শপথ করতে হবে যে, এসব পণ্য বাণিজ্যের জন্য নয়। তবে কী পরিমাণ পণ্যকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বলে বিবেচনা করা যায়, সে ব্যাপারে কর্মচারীদের সজাগ থাকতে হবে। হয়তো এক্ষেত্রে ব্যক্তি-নির্ভর মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব হবে না, এজন্যই আবু ইউসুফ কর্মচারীদের ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার ওপর জোরারোপ করেন। একটা নিম্নসীমাও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। আধুনিক চর্চার বিপরীতে এই কর আরোপিত হতো বার্ষিকভাবে। প্রশ্ন আসতে পারে, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা যথাযথ আর্থিক নিয়ন্ত্রণের জন্য কী ধরনের নথিব্যবস্থা ব্যবহার করতেন? অবশ্য এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়।
শুল্ক মাশুলের প্রচলন করেছেন দ্বিতীয় খলিফা উমর। তিনি খেয়াল করেন যে, অন্য দেশগুলো তাদের সীমান্ত পারাপারকারী বাণিজ্যের ওপর মাশুল আরোপ করে। একদিক থেকে দেখলে পালটা জবাবমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই করের সূচনা হয়েছিল।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 জনপ্রশাসন “আইন ও শৃঙ্খলা”

📄 জনপ্রশাসন “আইন ও শৃঙ্খলা”


আবু ইউসুফের বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়কে এই শিরোনামের অধীনে আনা সম্ভব। সেগুলোর উদাহরণ হলো: আহলে কিতাব সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় উৎসব সংক্রান্ত আয়োজন, গির্জা ও মঠ নির্মাণ, স্বীকৃত কোনো ধর্মগ্রন্থের অনুসরণ না করা জাতিসমূহ, বেশ্যালয় সংক্রান্ত অপরাধ, চুরি, ও নৈতিক অপরাধ, ধর্মত্যাগ, ও গোয়েন্দাবৃত্তি। এসব বিষয় করব্যবস্থা বা সরকারের অর্থায়নের সাথে সম্পর্কিত না হলেও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে আবু ইউসুফ এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। এখান থেকে আরও স্পষ্ট হয় যে, আবু ইউসুফের কাজটি শুধুই "ভূমিকর” সংক্রান্ত বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ভুল।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অন্যান্য বিষয়

📄 অন্যান্য বিষয়


রাষ্ট্রের অর্থনীতি সংক্রান্ত অন্য কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুজারাআ বা ইজারা

📄 মুজারাআ বা ইজারা


মাঠ ও খেজুরগাছে শ্রম ও ভূমি মূলধন ভাগাভাগি হলো মুজারাআ চুক্তি। মুজারাআর ওপর ইমাম আবু ইউসুফ আলোকপাত করেন। বিশেষ গুরুত্বারোপ ছিল ইজারার ভিত্তিতে নিষ্ফলা ভূমির চাষাবাদের ওপর। আবু ইউসুফ ব্যাখ্যা করেন যে, হিজাযের (মালিকি) ফকিহগণ কুফার ফকিহদের থেকে ভিন্নতর মত লালন করেন। হিজায ও মদীনার ফকিহগণ অংশীদারত্ব, অর্ধেক, বা এক-তৃতীয়াংশ ফসলের ভিত্তিতে নিষ্ফলা ভূমির মুজারাআ অনুমোদন করেন না। কারণ তাদের মতে নিষ্ফলা ভূমি উদ্যান বা বাগানের মতো নয়, যেগুলোর জন্য অংশীদারি ইজারা তাদের মতে বৈধ। কুফার কিছু ফকিহ উদ্যান ও অন্যান্য গাছের অংশীদারির অনুমোদন দিয়েছেন। উশর ভূমির ফসল অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ অনুপাতে ভাগাভাগি করা তাদের মতে বৈধ। অপর কিছু ফকিহর মতে আবার এগুলো অনুমোদিত নয়। ইমাম আবু হানিফা এ ধরনের ইজারার বিরুদ্ধে।
যেসকল ফকিহ এই লেনদেনের অনুমোদন দেননি, তাদের বিচারিক যুক্তি হলো অনিশ্চয়তার বিরোধিতা। নিষ্ফলা বা উষর ভূমির বর্গা থেকে প্রাপ্ত ফসল অনিশ্চিত। এ ধরনের লেনদেনে জড়িত হওয়ার এক বা একাধিক অংশীদারের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে এই চুক্তির অনুমোদন-দাতারা কঠোরভাবে নবি -এর কাজের ওপর ভিত্তি করে এই মত দিয়েছেন। নবিজি খাইবারের ভূমিগুলো খাইবারের অধিবাসীদের ইজারা দেন ফসল ভাগাভাগির ভিত্তিতে।
আবু ইউসুফের মতে এরকম সকল চুক্তি বৈধ ও অনুমোদিত। এগুলোকে অংশীদারি চুক্তির ভাগাভাগি হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি। এখানে একজন অংশীদার অংশ নেয় তার পুঁজির মাধ্যমে এবং অপরজন দেয় শ্রম ও দক্ষতা। লভ্যাংশ যদি আপাতত তাদের কাছে অজানাও হয়, তাও তা লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগি ভিত্তিতে তাদের মাঝে ভাগ করা হবে।
ইমাম আবু ইউসুফের দৃষ্টিতে নিষ্ফলা ভূমি, উদ্যান ও অন্যান্য গাছে এই চুক্তি অংশীদারি বিনিয়োগের মতো: ভূমি হলো পুঁজির অনুরূপ। এই মতকে জোরদার করতে আবু ইউসুফ খাইবারের ভূমির ব্যাপারে নবি -এর কর্মপদ্ধতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, অনুমোদনের সমর্থন জোগানো হাদীসগুলো নিষেধাজ্ঞার হাদীসগুলোর চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য ও সাধারণভাবে প্রযোজ্য। আবু ইউসুফ বিভিন্ন ধরনের চুক্তির বর্ণনা দেন। চুক্তির অংশীদারদের মধ্যে সম্পর্ক ও তাদের প্রত্যেকের কর সংক্রান্ত অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি সেখানে। তার করা শ্রেণিবিভাগ থেকে বোঝা যায়, আবু ইউসুফ বেশ কয়েক ধরনের কাঠামোর অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে ইজারার পরিসর প্রশস্ত করে দিয়েছেন। চুক্তিতে ঢোকার আগেই অংশীদাররা সে চুক্তির শর্তাদি একদম স্পষ্ট করে জানবে, এই মূলনীতিকে পরিত্যাগ না করেই তিনি জনস্বার্থকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়েছেন। আধুনিককালে যে আর্থিক ইজারা অথবা মূলধন ইজারার (Financial lease) সাথে অন্যান্য ইজারার পার্থক্য করা হয়, আবু ইউসুফের চিন্তার সাথে সেটা কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00