📄 জিযিয়া
মুসলিমদের ওপর প্রযোজ্য যাকাত নিয়ে আলোচনার সাথে সাথে আবু ইউসুফ অমুসলিমদের জিযিয়া কর নিয়েও আলোচনা করেন। আগের মতোই এই করের ভিত্তি ও হারের ব্যাপারে শরীয়তের বিধানের পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। বলেন যে, এটি মাথাপিছু কর হয়ে থাকলেও করদাতার কর পরিশোধের সামর্থ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। ধনীদের জন্য বার্ষিক ৪৮ দিরহাম, মধ্য-আয়ের মানুষদের জন্য ২৪ দিরহাম, আর শ্রমিকরা সম্পদের মালিক না হলে তাদের জন্য ১২ দিরহাম। শিশু, নারী, দরিদ্র, সদাকাভোগী ও দরিদ্র সন্ন্যাসীরা এর আওতার বাইরে। সম্পদের পরিমাণ নিয়ে বিবাদ হলে এবং শক্ত প্রমাণ না থাকলে ব্যক্তিটির স্বধর্মের পবিত্র গ্রন্থ অনুযায়ী শপথ নিলেই যথেষ্ট। অন্যান্য যেসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো, মৃতের উত্তরাধিকার থেকে ঋণ হিসেবে জিযিয়া কর্তন করা হবে না; এক-বছর-মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে বা পরে ইসলামে দাখিল হলে তার বিধান কী হবে; এবং জিযিয়া আদায়ে নম্র ব্যবহারের গুরুত্ব। নবি যে মজলুম জিযিয়াদাতার পক্ষে বিচারদিবসে সাক্ষ্য দেবেন, সেসকল হাদীস উদ্ধৃত করা হয়।[১]
প্রশাসনের কথা আসলে যাকাতের মতো এখানেও আবু ইউসুফ জোর দেন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ঠিক রাখার ওপর। দেখবেন কোমলতার কথা তিনি বলেছেন শুধু জিযিয়া ম্যানেজম্যান্টের ব্যাপারেই। অমুসলিমরা যেহেতু সেখানে জাতিগত সংখ্যালঘু, সেহেতু সমাজে সাম্য ও সঙ্গতি রক্ষায় একজন প্রধান বিচারপতির যথেষ্ট জোর দেওয়াটাই স্বাভাবিক।[২]
টিকাঃ
[১] হাদীসগুলো দেখুন, কিতাবুল খারাজ: ১২৫। - সম্পাদক
[২] যাকাতের ব্যাপারেও কোমলতার ব্যাপারটি আলোচিত হয়েছে। ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আলোচনায় যেমনটি বলা হয়েছে, উৎকৃষ্ট পশু না নেওয়া, যাকাত বেশি গ্রহণের জন্য পশুপালকে একত্রিত না করা, এই জাতীয় বেশকিছু বিধান মুসলিমদের যাকাতের ব্যাপারেই সরাসরি হাদীসের নির্দেশ, যাতে যাকাতদাতা ও গ্রহীতার সঙ্গে অন্যায় আচরণ না করা হয়। - সম্পাদক
📄 শুল্ক মাশুল
আবু ইউসুফ তার শুল্ক মাশুল সংক্রান্ত অধ্যায় শুরু করেন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে: “আমার মতে, আপনার উচিত একে সৎ ও তাকওয়াবান কর্মচারীদের হাতে অর্পণ করা। যাদেরকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেওয়া হবে, যেন তারা প্রজাদের ন্যায্য পরিমাণের অধিক কিছু চাপিয়ে না দেয়। আপনার আরও উচিত তাদের কাজকর্মের তদারকি করা, দুর্নীতিবাজদের বরখাস্ত করা, এবং সৎ ও ন্যায্যভাবে দায়িত্ব পালনকারীদের পুরস্কৃত করা"। এর পর তিনি প্রযুক্ত হার, করের ভিত্তি ও নিম্নসীমা সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রসর হন। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রগুলোও আলোচিত হয়: বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না, এমন প্রাণী (যেমন চরে বেড়ায় না এরকম ভেড়া, গবাদি পশু এবং উট); বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়, বরং বপনের জন্য রাখা শস্য; অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদ ও খেজুর, যেগুলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়নি, প্রত্যেকটির কথা তিনি উল্লেখ করেন।
মজার ব্যাপার, করের আওতা থেকে বের হওয়ার জন্য ওই ব্যক্তি তার ধর্ম অনুযায়ী শপথ নিলেই হবে। রাষ্ট্রের কাছে শপথ করতে হবে যে, এসব পণ্য বাণিজ্যের জন্য নয়। তবে কী পরিমাণ পণ্যকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বলে বিবেচনা করা যায়, সে ব্যাপারে কর্মচারীদের সজাগ থাকতে হবে। হয়তো এক্ষেত্রে ব্যক্তি-নির্ভর মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব হবে না, এজন্যই আবু ইউসুফ কর্মচারীদের ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার ওপর জোরারোপ করেন। একটা নিম্নসীমাও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। আধুনিক চর্চার বিপরীতে এই কর আরোপিত হতো বার্ষিকভাবে। প্রশ্ন আসতে পারে, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা যথাযথ আর্থিক নিয়ন্ত্রণের জন্য কী ধরনের নথিব্যবস্থা ব্যবহার করতেন? অবশ্য এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়।
শুল্ক মাশুলের প্রচলন করেছেন দ্বিতীয় খলিফা উমর। তিনি খেয়াল করেন যে, অন্য দেশগুলো তাদের সীমান্ত পারাপারকারী বাণিজ্যের ওপর মাশুল আরোপ করে। একদিক থেকে দেখলে পালটা জবাবমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই করের সূচনা হয়েছিল।
📄 জনপ্রশাসন “আইন ও শৃঙ্খলা”
আবু ইউসুফের বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়কে এই শিরোনামের অধীনে আনা সম্ভব। সেগুলোর উদাহরণ হলো: আহলে কিতাব সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় উৎসব সংক্রান্ত আয়োজন, গির্জা ও মঠ নির্মাণ, স্বীকৃত কোনো ধর্মগ্রন্থের অনুসরণ না করা জাতিসমূহ, বেশ্যালয় সংক্রান্ত অপরাধ, চুরি, ও নৈতিক অপরাধ, ধর্মত্যাগ, ও গোয়েন্দাবৃত্তি। এসব বিষয় করব্যবস্থা বা সরকারের অর্থায়নের সাথে সম্পর্কিত না হলেও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে আবু ইউসুফ এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। এখান থেকে আরও স্পষ্ট হয় যে, আবু ইউসুফের কাজটি শুধুই "ভূমিকর” সংক্রান্ত বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ভুল।
📄 অন্যান্য বিষয়
রাষ্ট্রের অর্থনীতি সংক্রান্ত অন্য কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়।