📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 যাকাত

📄 যাকাত


করের ভিত্তি ও হার নিয়ে আবু ইউসুফের আলোচনা শুধু ভূমিকরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটার সীমানা ছাড়িয়ে যাকাত নিয়েও আলোকপাত করেন তিনি। তবে এই আলাপটি তিনি শুধু প্রাণীর ওপর যাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। করের ভিত্তি ও হারের নিরীক্ষণে ইমাম আবু ইউসুফ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শরীয়তের মূলনীতিগুলো উল্লেখ করেন। একটি নিম্নসীমা প্রদান করা হয় এবং প্রায় আনুপাতিক এক ধরনের হার প্রয়োগ করা হয়।
তবে ইমাম আবু ইউসুফ তার বইতে যাকাত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
➡ প্রথমত, প্রাণীর ওপর যাকাত আরোপিত হলে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে: (ক) নিম্নসীমা থেকে ফায়দা হাসিলের জন্য কর সংগ্রাহক বা করদাতা কেউই কোনো কারচুপি করতে পারবে না। যেসব প্রাণীর একসাথে থাকার কথা নয়, সেগুলোর পালকে একত্র করে ট্যাক্সের ভিত্তি বাড়িয়ে তুলবে না। আবার একত্র পালকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে করদাতা ট্যাক্সের ভিত্তি কমিয়ে আনবে না। (খ) যৌথ মালিকানাধীন পশুপালের ওপর যাকাত সকল অংশীদারের ওপর সমানভাবে বণ্টিত হবে, (গ) চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত প্রাণীর ওপর কোনো যাকাত আরোপিত হবে না; উৎপাদনে ব্যবহৃত সম্পদকে করের আওতার বাইরে রাখা হবে এবং (ঘ) এ প্রক্রিয়ায় প্রাণীর যত্নআত্তির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন- উৎকৃষ্ট বা নিম্নমানের প্রাণীর বদলে গড়পড়তা প্রাণীটিকে হিসেবে ধরা, শাবককে দুধ পান করানো প্রাণী না নেওয়া, খাবারের জন্য মায়ের ওপর নির্ভরশীল প্রাণী না নেওয়া, পরিবহনকালে প্রাণীর যত্ন নেওয়া ইত্যাদি। প্রাণীর যত্নআত্তির ব্যাপারে সম্ভবত প্রশাসনের মনোযোগ ছিল। প্রাণীদের প্রতি মুসলিমদের দয়াশীল হওয়ার আহ্বান জানানো বহু হাদীস যেহেতু রয়েছে, সেহেতু ব্যাপারটি অবাক-করা নয়।
➡ দ্বিতীয়ত, যাকাত সংগ্রহ ও এ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বণ্টনে প্রশাসনের দক্ষতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোকপাত করে বলেন, (ক) যাকাত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দলের নেতা হিসেবে একজন ন্যায়বান মানুষকে বাছাই করে খলিফা নিয়োগ দেবেন। (খ) এই সৎ ব্যক্তি প্রত্যেক শহরে তার আস্থাভাজন একজন করে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নিয়োগ করবেন। (গ) যাকাত সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা অন্যান্য করব্যবস্থাপনা থেকে আলাদা থাকবে। কারণ যাকাতের রাজস্বকে অন্যান্য রাজত্বের সাথে মেশানো যাবে না। অন্যান্য ট্যাক্স থেকে সকল সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ আসে। কিন্তু যাকাতের রাজস্ব ব্যয় করতে হয় কুরআনের নির্ধারিত খাতগুলোতে। (ঘ) কোনো এলাকার বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত যাকাতের রাজস্বকে একসাথে মিলিত করতে হবে এবং খরচ করতে হবে শুধু এসব খাতে-গরিব, মিসকিন, যাকাত সংগ্রাহক, মন জয় করা, বন্দিমুক্তি, ঋণমুক্তি, আল্লাহর রাস্তা, ও মুসাফির। (ঙ) যাকাত সংগ্রাহকদের ওই পরিমাণই দিতে হবে, যতটুকু তাদের জীবন চলার জন্য প্রয়োজন। এমনকি সেটা নির্ধারিত এক-অষ্টমাংশ থেকে বেশি হলেও। গরিব ও মিসকিনের ভাগটা দিতে হবে যাকাত যে অঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয়েছে, সেখানকার যোগ্য প্রাপকদের। অন্য এলাকায় নয়।
দারুণ ব্যাপার হলো, ইমাম আবু ইউসুফ যাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আলাদা অধ্যায়ের অধীনে আলোচনা করেছেন, 'সদাকার হ্রাস-বৃদ্ধি ও নষ্ট হওয়া'। এর মাধ্যমে ইমাম আবু ইউসুফ সঠিক যাকাতব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রতিপালন ব্যয়, প্রশাসনিক বোঝা, এবং করের মোট লভ্যাংশের ওপর যাকাত ও খারাজ উভয়ের ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু প্রভাব থাকার কথা। করের হার বা ভিত্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের অনুপস্থিতিতে করের মোট আয়কে বাড়ানো সম্ভব। সেটা করা যেতে পারে দক্ষতার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনাগত খরচ কমানো ও রাজস্বের সম্ভাব্য অপব্যয় রোধ করে। এতে সর্বমোট যাকাত রাজস্বের সর্বাধিককরণ হবে। এ থেকে মনে পড়ে যায়, দক্ষতা (Efficiency) হলো অ্যাডাম স্মিথের প্রস্তাবিত করব্যবস্থার চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের একটি। বাকি তিনটি হলো নিশ্চয়তা (certainty), ন্যায্যতা (fairness) ও স্পষ্টতা (clarity) (Adam Smith, Wealth of Nations)। ইমাম আবু ইউসুফ করব্যবস্থার ব্যাপারে তার বইয়ে যা কিছু লিখেছেন, সেগুলো মাথায় রাখলে নিঃসন্দেহে বলা যায়-অ্যাডাম স্মিথের চার উপাদানের প্রতিটিই কিতাবুল খারাজে রয়েছে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 জিযিয়া

📄 জিযিয়া


মুসলিমদের ওপর প্রযোজ্য যাকাত নিয়ে আলোচনার সাথে সাথে আবু ইউসুফ অমুসলিমদের জিযিয়া কর নিয়েও আলোচনা করেন। আগের মতোই এই করের ভিত্তি ও হারের ব্যাপারে শরীয়তের বিধানের পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। বলেন যে, এটি মাথাপিছু কর হয়ে থাকলেও করদাতার কর পরিশোধের সামর্থ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। ধনীদের জন্য বার্ষিক ৪৮ দিরহাম, মধ্য-আয়ের মানুষদের জন্য ২৪ দিরহাম, আর শ্রমিকরা সম্পদের মালিক না হলে তাদের জন্য ১২ দিরহাম। শিশু, নারী, দরিদ্র, সদাকাভোগী ও দরিদ্র সন্ন্যাসীরা এর আওতার বাইরে। সম্পদের পরিমাণ নিয়ে বিবাদ হলে এবং শক্ত প্রমাণ না থাকলে ব্যক্তিটির স্বধর্মের পবিত্র গ্রন্থ অনুযায়ী শপথ নিলেই যথেষ্ট। অন্যান্য যেসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো, মৃতের উত্তরাধিকার থেকে ঋণ হিসেবে জিযিয়া কর্তন করা হবে না; এক-বছর-মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে বা পরে ইসলামে দাখিল হলে তার বিধান কী হবে; এবং জিযিয়া আদায়ে নম্র ব্যবহারের গুরুত্ব। নবি যে মজলুম জিযিয়াদাতার পক্ষে বিচারদিবসে সাক্ষ্য দেবেন, সেসকল হাদীস উদ্ধৃত করা হয়।[১]
প্রশাসনের কথা আসলে যাকাতের মতো এখানেও আবু ইউসুফ জোর দেন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ঠিক রাখার ওপর। দেখবেন কোমলতার কথা তিনি বলেছেন শুধু জিযিয়া ম্যানেজম্যান্টের ব্যাপারেই। অমুসলিমরা যেহেতু সেখানে জাতিগত সংখ্যালঘু, সেহেতু সমাজে সাম্য ও সঙ্গতি রক্ষায় একজন প্রধান বিচারপতির যথেষ্ট জোর দেওয়াটাই স্বাভাবিক।[২]

টিকাঃ
[১] হাদীসগুলো দেখুন, কিতাবুল খারাজ: ১২৫। - সম্পাদক
[২] যাকাতের ব্যাপারেও কোমলতার ব্যাপারটি আলোচিত হয়েছে। ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আলোচনায় যেমনটি বলা হয়েছে, উৎকৃষ্ট পশু না নেওয়া, যাকাত বেশি গ্রহণের জন্য পশুপালকে একত্রিত না করা, এই জাতীয় বেশকিছু বিধান মুসলিমদের যাকাতের ব্যাপারেই সরাসরি হাদীসের নির্দেশ, যাতে যাকাতদাতা ও গ্রহীতার সঙ্গে অন্যায় আচরণ না করা হয়। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শুল্ক মাশুল

📄 শুল্ক মাশুল


আবু ইউসুফ তার শুল্ক মাশুল সংক্রান্ত অধ্যায় শুরু করেন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে: “আমার মতে, আপনার উচিত একে সৎ ও তাকওয়াবান কর্মচারীদের হাতে অর্পণ করা। যাদেরকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেওয়া হবে, যেন তারা প্রজাদের ন্যায্য পরিমাণের অধিক কিছু চাপিয়ে না দেয়। আপনার আরও উচিত তাদের কাজকর্মের তদারকি করা, দুর্নীতিবাজদের বরখাস্ত করা, এবং সৎ ও ন্যায্যভাবে দায়িত্ব পালনকারীদের পুরস্কৃত করা"। এর পর তিনি প্রযুক্ত হার, করের ভিত্তি ও নিম্নসীমা সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রসর হন। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রগুলোও আলোচিত হয়: বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না, এমন প্রাণী (যেমন চরে বেড়ায় না এরকম ভেড়া, গবাদি পশু এবং উট); বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়, বরং বপনের জন্য রাখা শস্য; অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদ ও খেজুর, যেগুলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়নি, প্রত্যেকটির কথা তিনি উল্লেখ করেন।
মজার ব্যাপার, করের আওতা থেকে বের হওয়ার জন্য ওই ব্যক্তি তার ধর্ম অনুযায়ী শপথ নিলেই হবে। রাষ্ট্রের কাছে শপথ করতে হবে যে, এসব পণ্য বাণিজ্যের জন্য নয়। তবে কী পরিমাণ পণ্যকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বলে বিবেচনা করা যায়, সে ব্যাপারে কর্মচারীদের সজাগ থাকতে হবে। হয়তো এক্ষেত্রে ব্যক্তি-নির্ভর মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব হবে না, এজন্যই আবু ইউসুফ কর্মচারীদের ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার ওপর জোরারোপ করেন। একটা নিম্নসীমাও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। আধুনিক চর্চার বিপরীতে এই কর আরোপিত হতো বার্ষিকভাবে। প্রশ্ন আসতে পারে, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা যথাযথ আর্থিক নিয়ন্ত্রণের জন্য কী ধরনের নথিব্যবস্থা ব্যবহার করতেন? অবশ্য এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়।
শুল্ক মাশুলের প্রচলন করেছেন দ্বিতীয় খলিফা উমর। তিনি খেয়াল করেন যে, অন্য দেশগুলো তাদের সীমান্ত পারাপারকারী বাণিজ্যের ওপর মাশুল আরোপ করে। একদিক থেকে দেখলে পালটা জবাবমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই করের সূচনা হয়েছিল।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 জনপ্রশাসন “আইন ও শৃঙ্খলা”

📄 জনপ্রশাসন “আইন ও শৃঙ্খলা”


আবু ইউসুফের বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়কে এই শিরোনামের অধীনে আনা সম্ভব। সেগুলোর উদাহরণ হলো: আহলে কিতাব সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় উৎসব সংক্রান্ত আয়োজন, গির্জা ও মঠ নির্মাণ, স্বীকৃত কোনো ধর্মগ্রন্থের অনুসরণ না করা জাতিসমূহ, বেশ্যালয় সংক্রান্ত অপরাধ, চুরি, ও নৈতিক অপরাধ, ধর্মত্যাগ, ও গোয়েন্দাবৃত্তি। এসব বিষয় করব্যবস্থা বা সরকারের অর্থায়নের সাথে সম্পর্কিত না হলেও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে আবু ইউসুফ এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। এখান থেকে আরও স্পষ্ট হয় যে, আবু ইউসুফের কাজটি শুধুই "ভূমিকর” সংক্রান্ত বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ভুল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00