📄 পুনজ্জীবিত অনাবাদি জমি
জমির ক্ষেত্রে কর ও অর্থনৈতিক দক্ষতার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে আবু ইউসুফ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে উদ্যত হন: অনাবাদি ও অব্যবহৃত জমির ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত করনীতি কী হতে পারে? নিষ্ফলা ভূমির আলোচনায় তিনি একটি সংজ্ঞা, বা শর্ত দিয়ে আলাপ শুরু করেন: এগুলো এমন জমি, যেগুলোতে কোনো স্থাপনা বা চাষাবাদের কোনো নামনিশানা নেই। অথবা জমিগুলো শহরের মানুষদের গণব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। যেমন নগরউদ্যান, কবরস্থান, বন, গবাদি পশু বা ভেড়ার চারণভূমি। তা ছাড়া এটি কারও মালিকানাধীনও হবে না। এরপর তিনি নিচের এই মত দেন: ➡ (ক) সাধারণ মূলনীতি হলো, যে এই জমি বা এর কোনো অংশকে পুনর্জীবিত করবে, সে এর বৈধ মালিক হয়ে যাবে, এবং
➡ (খ) খলিফা এই জমি থেকে যাকে ইচ্ছা দান করতে পারেন, ইজারা দিতে পারেন, অথবা এ দিয়ে উপকারী যে-কোনো কাজ করতে পারেন, কিন্তু
➡ (গ) মালিকানা দাবি করার উদ্দেশ্যে নিষ্ফলা ভূমিকে পুনর্জীবিত করতে হলে খলিফার থেকে অনুমতি নিতে হবে। অনুমোদন না নিয়ে থাকলে পুনর্জীবিতকারীর কাছ থেকে জমি কেড়ে নেওয়া হতে পারে। এখানে তিনি আবু হানিফার সাথে একমত। কিন্তু সুন্নাহয় উল্লেখিত ব্যাপকতার অন্যথা করেছেন। সুন্নাহয় সাধারণভাবে যে আবাদ করবে, সে জমির মালিক হয়ে যাবে বলা হয়েছে, যা পূর্বে গত হয়েছে। তাই নিজের মতটির কারণ ব্যাখ্যা করে দেন তিনি। বলেন যে, জমিটি নিয়ে স্বার্থের সংঘাত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকতে পারে। তাই খলিফার অনুমতি নেওয়া জরুরি।
তবে তার মতে কারও ক্ষতি বা লোকসান না হয়ে থাকলে, অথবা জমিটি নিয়ে কোনো বিবাদ না থাকলে, খলিফার অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই। নবি-এর সাধারণ কর্মপদ্ধতিটিই এখানে কার্যকর হবে। চাষাবাদের পর পুনর্জীবিত জমি উশর ভূমির শ্রেণিতে পড়লে কর আরোপিত হবে ১০% উশর হারে। আর খারাজ ভূমি হয়ে থাকলে আরোপিত হবে খারাজ কর। তা ছাড়া পুনর্জীবিত নিষ্ফলা ভূমিটি যদি বিজিত ভূমির অংশ হয়ে থাকে যা খলিফা বিজয়ীদের (মুসলিমদের) মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে রাষ্ট্রের পাওনা এক-পঞ্চমাংশ খুমুস বিয়োগ করার পর পুনর্জীবিতকারী ব্যক্তিটি সেচের অবস্থার ভিত্তিতে হয় উশর অথবা উশরের অর্ধেক কর পরিশোধ করবেন। পক্ষান্তরে জমিটি যদি বিজিত ভূমির অংশ হয়ে থাকে যা খলিফা সেটার আগের মালিকের (অমুসলিমদের) অধিকারে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে পুনর্জীবিত ভূমির ওপর পুনর্জীবিতকারী ব্যক্তি খারাজ কর দেবেন。
📄 ভূমিকরের ব্যবস্থাপনা
খারাজের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে আবু ইউসুফের মতামত এই যে, খলিফার অনুমতি ছাড়া কোনো খারাজ কর্মকর্তা বা প্রশাসক কারও খারাজ মওকুফ করতে পারবেন না। একইভাবে, খলিফার অনুমোদন ছাড়া কেউ কর মওকুফ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না। খারাজ কর থেকে কাউকে তখনই মুক্তি দেওয়া যাবে, যদি তা সমাজের জন্য কল্যাণকর হয়।
তা ছাড়া খারাজ ভূমিকে উশর ভূমিতে বা উশরকে খারাজে রূপান্তরিত করা বৈধ নয়। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রেই শুধু এই রূপান্তর ঘটানো বৈধ। ধরুন কারও মালিকানায় উশর ভূমি ছিল। সে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে একটি খারাজ ভূমি কিনে দুটি জমিকে একত্র করে দিল। তাহলে সে তাতে উশর পরিশোধ করবে। একইভাবে খারাজ ভূমির মালিক উশর ভূমি কিনে দুটোকে যুক্ত করে দিলে, সে খারাজ কর প্রদান করবে।
তা ছাড়া ভূমিকর ও সার্বিকভাবে পুরো করব্যবস্থায় কোষাগার ও করদাতার মধ্যে কোনো মধ্যবর্তী প্রতিনিধি নিয়োগের বিরোধী ছিলেন আবু ইউসুফ। আগেই বলা হয়েছে যে, উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে এটি বেশ পরিচিত একটি চর্চা ছিল। একজন মধ্যবর্তী ব্যক্তি নির্ধারিত কর পরিশোধের ব্যাপারে দায়িত্বশীল থাকতেন। তিনি সরকারকে যথাসময়ে বা এমনকি অগ্রিম কর পরিশোধ করে দিতে পারতেন। তারপর মূল করদাতার কাছ থেকে নিয়ে নিতেন সেই পরিমাণ অর্থ। কোষাগারের জন্য ব্যাপারটা সুবিধাজনক ছিল। আর মধ্যবর্তী ব্যক্তি যদি অগ্রিম কর পরিশোধ করে দেয়, তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু কিছু বিরূপ প্রভাবও ছিল এ পদ্ধতিটির। মধ্যবর্তী প্রতিনিধি প্রায়শ মূল করদাতার থেকে প্রদেয় করের চেয়ে বেশি অর্থ নিতেন। কার্যত এটি জুলুম। ইমাম আবু ইউসুফ তাই এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। “এরকম ব্যবস্থার মাঝে দেশের ও প্রজাদের ক্ষতি নিহিত”। মধ্যবর্তী প্রতিনিধি-ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন তিনি।
📄 আহরিত পণ্যের ওপর অন্যান্য কর
এসব পণ্যকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়: (ক) কৃষি থেকে আহরিত পণ্য, (খ) ভূমি থেকে আহরিত পণ্য, এবং (গ) সাগর থেকে আহরিত পণ্য। কৃষি-আহরিত উৎপাদের ক্ষেত্রে আবু ইউসুফ মধু, বাদাম ও কাজুবাদামের প্রসঙ্গ আনেন। বলেন যে, এগুলোর ওপর কর আরোপিত হবে। লক্ষণীয় হলো, বেত, জ্বালানি কাঠ, ঘাস, খড়, ও তালগাছের শাখার ওপর তার মতে কর আরোপ করা যাবে না। কিন্তু বচের (Sweet flag) ওপর আরোপ করা যাবে, কারণ এটি ভক্ষণযোগ্য না হলেও ব্যবহারোপযোগী। ভক্ষণযোগ্য আখের ক্ষেত্রেও একই কথা। এ ছাড়া ভূমিতে প্রাপ্ত পেট্রোলিয়াম, আলকাতরা, পারদ, বা অ্যাসফাল্টের ওপর কোনো কর নেই।
সাগর থেকে আহরিত সকল পণ্যের জন্য এক-পঞ্চমাংশ খুমুসের প্রস্তাবনা রাখা হয়। যেমন গহনা ও অম্বর। অন্যান্য সামুদ্রিক পণ্যের ব্যাপারে ইমাম আবু ইউসুফ তার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফা -এর সাথে দ্বিমত করেন। আবু হানিফার মতে সামুদ্রিক কোনো কিছুই করযোগ্য নয়, কারণ সেগুলো মাছের মতোই। মাছের ওপর কর আরোপ হয় না। উমর ইবনু আবদুল আজিজ থেকে প্রমাণিত কর্মপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ইমাম আবু ইউসুফ মত দেন যে, সকল সামুদ্রিক পণ্যের ওপরই এক-পঞ্চমাংশ খুমুস আরোপিত হবে। আজকে যেরকম বৃহৎ বাণিজ্যিক পরিসরে তেল ও অন্যান্য খনিজের আহরণ করা হয়, সেটার কর নির্ধারণের ব্যাপারে আবু ইউসুফ কী মত দিতেন, তা ভাবনার খোরাক বটে।
📄 যাকাত
করের ভিত্তি ও হার নিয়ে আবু ইউসুফের আলোচনা শুধু ভূমিকরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটার সীমানা ছাড়িয়ে যাকাত নিয়েও আলোকপাত করেন তিনি। তবে এই আলাপটি তিনি শুধু প্রাণীর ওপর যাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। করের ভিত্তি ও হারের নিরীক্ষণে ইমাম আবু ইউসুফ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শরীয়তের মূলনীতিগুলো উল্লেখ করেন। একটি নিম্নসীমা প্রদান করা হয় এবং প্রায় আনুপাতিক এক ধরনের হার প্রয়োগ করা হয়।
তবে ইমাম আবু ইউসুফ তার বইতে যাকাত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
➡ প্রথমত, প্রাণীর ওপর যাকাত আরোপিত হলে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে: (ক) নিম্নসীমা থেকে ফায়দা হাসিলের জন্য কর সংগ্রাহক বা করদাতা কেউই কোনো কারচুপি করতে পারবে না। যেসব প্রাণীর একসাথে থাকার কথা নয়, সেগুলোর পালকে একত্র করে ট্যাক্সের ভিত্তি বাড়িয়ে তুলবে না। আবার একত্র পালকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে করদাতা ট্যাক্সের ভিত্তি কমিয়ে আনবে না। (খ) যৌথ মালিকানাধীন পশুপালের ওপর যাকাত সকল অংশীদারের ওপর সমানভাবে বণ্টিত হবে, (গ) চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত প্রাণীর ওপর কোনো যাকাত আরোপিত হবে না; উৎপাদনে ব্যবহৃত সম্পদকে করের আওতার বাইরে রাখা হবে এবং (ঘ) এ প্রক্রিয়ায় প্রাণীর যত্নআত্তির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন- উৎকৃষ্ট বা নিম্নমানের প্রাণীর বদলে গড়পড়তা প্রাণীটিকে হিসেবে ধরা, শাবককে দুধ পান করানো প্রাণী না নেওয়া, খাবারের জন্য মায়ের ওপর নির্ভরশীল প্রাণী না নেওয়া, পরিবহনকালে প্রাণীর যত্ন নেওয়া ইত্যাদি। প্রাণীর যত্নআত্তির ব্যাপারে সম্ভবত প্রশাসনের মনোযোগ ছিল। প্রাণীদের প্রতি মুসলিমদের দয়াশীল হওয়ার আহ্বান জানানো বহু হাদীস যেহেতু রয়েছে, সেহেতু ব্যাপারটি অবাক-করা নয়।
➡ দ্বিতীয়ত, যাকাত সংগ্রহ ও এ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বণ্টনে প্রশাসনের দক্ষতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোকপাত করে বলেন, (ক) যাকাত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দলের নেতা হিসেবে একজন ন্যায়বান মানুষকে বাছাই করে খলিফা নিয়োগ দেবেন। (খ) এই সৎ ব্যক্তি প্রত্যেক শহরে তার আস্থাভাজন একজন করে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নিয়োগ করবেন। (গ) যাকাত সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা অন্যান্য করব্যবস্থাপনা থেকে আলাদা থাকবে। কারণ যাকাতের রাজস্বকে অন্যান্য রাজত্বের সাথে মেশানো যাবে না। অন্যান্য ট্যাক্স থেকে সকল সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ আসে। কিন্তু যাকাতের রাজস্ব ব্যয় করতে হয় কুরআনের নির্ধারিত খাতগুলোতে। (ঘ) কোনো এলাকার বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত যাকাতের রাজস্বকে একসাথে মিলিত করতে হবে এবং খরচ করতে হবে শুধু এসব খাতে-গরিব, মিসকিন, যাকাত সংগ্রাহক, মন জয় করা, বন্দিমুক্তি, ঋণমুক্তি, আল্লাহর রাস্তা, ও মুসাফির। (ঙ) যাকাত সংগ্রাহকদের ওই পরিমাণই দিতে হবে, যতটুকু তাদের জীবন চলার জন্য প্রয়োজন। এমনকি সেটা নির্ধারিত এক-অষ্টমাংশ থেকে বেশি হলেও। গরিব ও মিসকিনের ভাগটা দিতে হবে যাকাত যে অঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয়েছে, সেখানকার যোগ্য প্রাপকদের। অন্য এলাকায় নয়।
দারুণ ব্যাপার হলো, ইমাম আবু ইউসুফ যাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আলাদা অধ্যায়ের অধীনে আলোচনা করেছেন, 'সদাকার হ্রাস-বৃদ্ধি ও নষ্ট হওয়া'। এর মাধ্যমে ইমাম আবু ইউসুফ সঠিক যাকাতব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রতিপালন ব্যয়, প্রশাসনিক বোঝা, এবং করের মোট লভ্যাংশের ওপর যাকাত ও খারাজ উভয়ের ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু প্রভাব থাকার কথা। করের হার বা ভিত্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের অনুপস্থিতিতে করের মোট আয়কে বাড়ানো সম্ভব। সেটা করা যেতে পারে দক্ষতার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনাগত খরচ কমানো ও রাজস্বের সম্ভাব্য অপব্যয় রোধ করে। এতে সর্বমোট যাকাত রাজস্বের সর্বাধিককরণ হবে। এ থেকে মনে পড়ে যায়, দক্ষতা (Efficiency) হলো অ্যাডাম স্মিথের প্রস্তাবিত করব্যবস্থার চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের একটি। বাকি তিনটি হলো নিশ্চয়তা (certainty), ন্যায্যতা (fairness) ও স্পষ্টতা (clarity) (Adam Smith, Wealth of Nations)। ইমাম আবু ইউসুফ করব্যবস্থার ব্যাপারে তার বইয়ে যা কিছু লিখেছেন, সেগুলো মাথায় রাখলে নিঃসন্দেহে বলা যায়-অ্যাডাম স্মিথের চার উপাদানের প্রতিটিই কিতাবুল খারাজে রয়েছে।