📄 মুসলিমদের হাতে থাকা জমি
উশরের ভিত্তি হলো ইসলামি বিজয়ের আগে মুসলিমদের মালিকানাধীন ভূমি। অর্থাৎ, আরবের ভূমিসমূহ এবং বিজয়যাত্রা শুরুর আগে কেনা অনারব জমিসমূহ। দ্বিতীয় এই প্রকারটি উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগে দেখা গেছে। কিন্তু খলিফা উমর -এর যুগে এর অনুমোদন ছিল না। খেয়াল করুন, বিশেষ প্রেক্ষিতে খলিফা উমরের শাসনামলে মুসলিমদের আরবের বাইরে ভূমি কেনা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ বিজিত ভূমিগুলোতে সামগ্রিকভাবে সকল মুসলিমের হক রয়েছে বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু উমরের আমলের পর এই নিয়মটি শিথিল করে দেওয়া হয় বলেই প্রতীয়মান হয়।
জমি যদি বৃষ্টি বা খালের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে সেচপ্রাপ্ত হয়, তাহলে করের হার এক-দশমাংশ তথা ১০%। এর অর্ধেক বা ৫% হবে, যদি সেচকাজ কৃত্রিমভাবে করতে হয়। যেমন শ্রম বা যন্ত্রের ব্যবহার করা হলে, অথবা জমিতে যদি খরচ বেড়ে যাওয়ার মতো কোনো অতিরিক্ত কষ্ট করতে হয়। যেমন- খনন বা হালচাষ। হার যেহেতু নবি -এর জীবদ্দশায় নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে, তাই এটি আর পরিবর্তন করা হয়নি। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফের মতে আরবের বাইরের ভূমির মুসলিমদের জন্য হার পরিবর্তন করা বৈধ।
📄 আরবের আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমি
করব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরবকে একেবারেই আলাদা করে দেখা হয়, কারণ এর হার স্বয়ং নবি কর্তৃক নির্ধারিত। এই মতের পক্ষে ইমাম আবু ইউসুফ উল্লেখ করেন যে, হিজায, মক্কা, ও মদীনা, ইয়েমেন এবং নবিজির জয় করা আরবের ভূমিগুলোর কর বাড়ানো বা কমানো যাবে না। এ ব্যাপারে নবি নিজে আদেশ জারি করেছেন, তাই কেউ সেটা পরিবর্তনের অধিকার রাখে না। সেচের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সেই হার হয় এক-দশমাংশ উশর বা তার অর্ধেক। করসংক্রান্ত পরিভাষায় তাই এসব ভূমিকে বলা হতো উশর ভূমি। তবে অন্যান্য জাতির বিপরীতে আরব পৌত্তলিকদের সাথে ভিন্নভাবে আচরণ করা হতো। তারা কোনো একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারী নয়। তাই তাদের থেকে কোনো জিযিয়া গ্রহণ করা হবে না। তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে, নয়তো তরবারির নিচে পড়তে হবে। তাই তাদের ওপর খারাজ করও প্রযোজ্য নয়। আরবভূমের অন্তর্ভুক্ত ইয়েমেনের অধিবাসীরা আহলে কিতাব জাতি। তাই ব্যক্তি হিসেবে জিযিয়া এবং জমির ওপর উশর বা তার অর্ধেক পরিশোধ করার বিনিময়ে তাদের ধর্ম অক্ষুণ্ণ রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
মোটকথা, আরব উপদ্বীপে মানুষ হয় মুসলিম আর নয়তো ইহুদি বা খ্রিষ্টান। এই ভূমি থেকে স্বয়ং নবি যে হারে কর নিয়েছেন, সেই উশর অপরিবর্তিত থাকে। উল্টোদিক থেকে তাই প্রশ্ন করা যায়: আবু ইউসুফ অনারব ভূমির করব্যবস্থার ব্যাপারে যে মত প্রচার করেছেন, নবিজি কি আরবের ভূমির ব্যাপারে অনুরূপ কোনো পন্থা অনুসরণ করতে পারতেন? আমরা জানি না। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে দক্ষিণ আরবের ভূমিগুলোর উর্বরতা আরব উপদ্বীপের বাইরের অন্যান্য বিজিত ভূমির চেয়ে কম হওয়ার কথা না। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি কিভাবে এই অঞ্চলগুলো কৃষির ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলে এবং কিভাবে দক্ষিণ ও উত্তরের মধ্যকার বাণিজ্যপথগুলো ইসলামের আগমনের আগে ও পরে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। নবি -এর লক্ষ্য কি ছিল সাধারণভাবে সকল ভূমির কর নির্ধারণের ব্যাপারে সমান আচরণ করা? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে সেই সমতা কি ইসলামি রাষ্ট্রের পুরো ইতিহাস জুড়ে অপরিবর্তিত রাখা উচিত? নাকি তিনি আরব ভূমির কর নির্ধারণের ব্যাপারে এই নীতি ঠিক রেখে অনারবগুলোর ব্যাপারে ভিন্ন নীতির অনুমোদন দিতেন? ফকিহগণ এর উত্তর ভালো দিতে পারবেন। দুটির একটি প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা নেই এবং বিভিন্নরকমের উত্তর সম্ভব। তবে সামগ্রিকভাবে হানাফি প্রধান বিচারপতির যুক্তিতে "আইনি” নিশ্চয়তা রয়েছে বলেই মনে হয়।
📄 কাতাই ভূমি
ইমাম আবু ইউসুফ তারপর একটি গুরুত্বপূর্ণ করভিত্তির দিকে মনোনিবেশ করেন, যা সে-সময়কার হিসেবে বেশ সংবেদনশীল প্রকৃতির একটি ব্যাপার- জায়গীর। পরিভাষা দুটি সমার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়। কোনো ভূমি কোন শর্তে এই নামে পরিচিত হতে পারে, তা স্পষ্ট করার মাধ্যমে এই অংশের সূচনা করেন তিনি। শর্ত হলো এসব ভূমি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, যেগুলোর মালিক ছিল: (ক) পারস্যের রাজা, বা তার পরিবার, (খ) ওয়ারিশবিহীন অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যক্তি, (গ) শত্রুভূমিতে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি, (ঘ) পানির নিচের ভূমি, (ঙ) ডাক অধিদপ্তরের দালান, এবং (চ) যেসব ভূমির কোনো মালিক বা ন্যায্য ওয়ারিশ নেই, অথবা সেগুলোর মাঝে আবাদির কোনো চিহ্ন নেই।
এসব ভূমি বা এর কোনো অংশ যখন কোনো কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ কাউকে দান করা হয়, তখন নতুন মালিকের অধীনে এই ভূমিকে কাতাই বলা হয়। এক্ষেত্রে আবু ইউসুফ যুক্তি দেন যে, ইসলামের জন্য মূল্যবান অবদান রাখা ব্যক্তিকে শাসক রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি থেকে পুরস্কার দিতে পারবেন। আর একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক কোনো অন্যায্য পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই এ কাজ করবেন। যেসব ফকিহরা বলেন যে-এসব ভূমি সকল মুসলিমদের এবং তা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেওয়া যাবে না, তাদের সাথে দ্বিমত করেছেন আবু ইউসুফ। নবি বনু নাযিরের ভূমি এবং তাঁর অধীনে থাকা অন্যান্য ভূমির ক্ষেত্রে যেমনটি করেছেন, আবু ইউসুফের মতে যে-কোনো শাসক সেভাবে কাউকে জমি দান করতে পারবেন। পালটা যুক্তি আসতে পারে যে, নবিজির দান করা জমিগুলো আকারে ছিল মাঝারি। সে তুলনায় তাঁর পরবর্তীকালে প্রদান করা জমিগুলো বিশাল। ইমাম আবু ইউসুফ অবশ্য এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেননি এবং নবি-এর সুন্নাহর ভিত্তিতে সংক্ষেপে নিজের মত দিয়ে আলোচনা শেষ করেন।
আবু ইউসুফ কি তার খলিফাকে মুক্তহস্তে দান করার স্বাধীনতা দিয়ে তাকে খুশি করতে চাইছিলেন? নাকি ব্যক্তির অধীনে জমি অর্পণ করে সেটির উন্নয়ন ঘটানোর জন্য বণ্টনের অধিকারের শিথিলতায় বিশ্বাস করতেন? উত্তর সম্ভবত উভয়টিই। অবশ্য আবু ইউসুফ তার বইয়ের ভূমিকায় যেরকম স্পষ্ট ভাষায়, বা বলা চলে দুঃসাহসী ভঙ্গিতে খলিফাকে সম্বোধন করেছেন, তাতে বলা যায় ভূমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাটাই আবু ইউসুফের উদ্দেশ্য হয়ে থাকবে।।
ভূমির মালিকানা এবং এ সংক্রান্ত ব্যবসায়িক লেনদেনে স্থিতিশীলতা আনতে ইমাম আবু ইউসুফ ছিলেন খুবই আগ্রহী। সেইসাথে চেয়েছেন এই সম্পর্ক পরিবর্তনের ব্যাপারে শাসকের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে। তাই ইমাম আবু ইউসুফ জোর দিয়ে বলেন যে, এক শাসকের জমি দান করার সিদ্ধান্তকে পরবর্তী কোনো শাসক অকারণে পালটে দিতে পারবেন না। মালিক যদি প্রাপ্ত জমির দেখাশোনা করতে অপারগ না হন, তাহলে সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। তা ছাড়া মালিক সেই জমি বিক্রয় বা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে হস্তান্তর করার অধিকার সংরক্ষণ করেন। সেটা নিশ্চিত করার জন্য ইমাম আবু ইউসুফ এও বলে দেন যে, সেই জমি ফিরিয়ে নিয়ে আরেকজনকে দেওয়া মানে একজনের সম্পত্তি চুরি করে আরেকজনের হাতে চোরাই মাল তুলে দেওয়া।
আবু ইউসুফের মতে এসকল কাতাই ভূমির করের হার হবে ১০% তথা উশর। কারণ এটি মুসলিমদের হাতে থাকা উশর ভূমির মতোই। তবে সামনে আরও বলে দেন, শাসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরও বড় পরিমাণ করও অর্পিত হতে পারে: উশরের দ্বিগুণ—এক-পঞ্চমাংশ (২০%) বা খারাজ কর। উচ্চতর কর আরোপের মাধ্যমে সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিল—কোনো আর্থিক ক্ষতি ছাড়াই জমিপ্রদান নিশ্চিত করা। সেটা অর্জন করার জন্য কোনো পুঁজি পরিশোধ করতে হবে না। পক্ষান্তরে এবার করদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। এসব জমির কর্মক্ষমতা কম এবং এগুলোর উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত যত্নের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তাই প্রদত্ত জমিতে খাল খনন, খামার নির্মাণ, ও মাটিকাটার জন্য অতিরিক্ত খরচ করার প্রয়োজন পড়লে কর এক-দশমাংশ (১০%) উশরের বেশি হতো না। তবে তারপরও আবু ইউসুফ খলিফাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, “আমি আপনার নিকট বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দিয়েছি। পালন করা আপনার হাতে।”
টিকাঃ
[১] এজাতীয় মন্তব্য তারাই করতে পারে যারা ফিকহ ও ইজতিহাদ কাকে বলে, মুজতাহিদ ফকিহগণের কর্মপদ্ধতি ও ফুকাহায়ে কেরামের আল্লাহভীতি কেমন ছিল-এ সম্পর্কে নিতান্তই অজ্ঞ। লেখকের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা ও জ্ঞানগত ভিত্তি সম্পর্কে পাঠকের জানা থাকা দরকার বলেই মূল বইয়ের এই অংশটুকু পরিমার্জন করা হয়নি। - সম্পাদক
📄 পুনজ্জীবিত অনাবাদি জমি
জমির ক্ষেত্রে কর ও অর্থনৈতিক দক্ষতার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে আবু ইউসুফ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে উদ্যত হন: অনাবাদি ও অব্যবহৃত জমির ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত করনীতি কী হতে পারে? নিষ্ফলা ভূমির আলোচনায় তিনি একটি সংজ্ঞা, বা শর্ত দিয়ে আলাপ শুরু করেন: এগুলো এমন জমি, যেগুলোতে কোনো স্থাপনা বা চাষাবাদের কোনো নামনিশানা নেই। অথবা জমিগুলো শহরের মানুষদের গণব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। যেমন নগরউদ্যান, কবরস্থান, বন, গবাদি পশু বা ভেড়ার চারণভূমি। তা ছাড়া এটি কারও মালিকানাধীনও হবে না। এরপর তিনি নিচের এই মত দেন: ➡ (ক) সাধারণ মূলনীতি হলো, যে এই জমি বা এর কোনো অংশকে পুনর্জীবিত করবে, সে এর বৈধ মালিক হয়ে যাবে, এবং
➡ (খ) খলিফা এই জমি থেকে যাকে ইচ্ছা দান করতে পারেন, ইজারা দিতে পারেন, অথবা এ দিয়ে উপকারী যে-কোনো কাজ করতে পারেন, কিন্তু
➡ (গ) মালিকানা দাবি করার উদ্দেশ্যে নিষ্ফলা ভূমিকে পুনর্জীবিত করতে হলে খলিফার থেকে অনুমতি নিতে হবে। অনুমোদন না নিয়ে থাকলে পুনর্জীবিতকারীর কাছ থেকে জমি কেড়ে নেওয়া হতে পারে। এখানে তিনি আবু হানিফার সাথে একমত। কিন্তু সুন্নাহয় উল্লেখিত ব্যাপকতার অন্যথা করেছেন। সুন্নাহয় সাধারণভাবে যে আবাদ করবে, সে জমির মালিক হয়ে যাবে বলা হয়েছে, যা পূর্বে গত হয়েছে। তাই নিজের মতটির কারণ ব্যাখ্যা করে দেন তিনি। বলেন যে, জমিটি নিয়ে স্বার্থের সংঘাত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকতে পারে। তাই খলিফার অনুমতি নেওয়া জরুরি।
তবে তার মতে কারও ক্ষতি বা লোকসান না হয়ে থাকলে, অথবা জমিটি নিয়ে কোনো বিবাদ না থাকলে, খলিফার অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই। নবি-এর সাধারণ কর্মপদ্ধতিটিই এখানে কার্যকর হবে। চাষাবাদের পর পুনর্জীবিত জমি উশর ভূমির শ্রেণিতে পড়লে কর আরোপিত হবে ১০% উশর হারে। আর খারাজ ভূমি হয়ে থাকলে আরোপিত হবে খারাজ কর। তা ছাড়া পুনর্জীবিত নিষ্ফলা ভূমিটি যদি বিজিত ভূমির অংশ হয়ে থাকে যা খলিফা বিজয়ীদের (মুসলিমদের) মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে রাষ্ট্রের পাওনা এক-পঞ্চমাংশ খুমুস বিয়োগ করার পর পুনর্জীবিতকারী ব্যক্তিটি সেচের অবস্থার ভিত্তিতে হয় উশর অথবা উশরের অর্ধেক কর পরিশোধ করবেন। পক্ষান্তরে জমিটি যদি বিজিত ভূমির অংশ হয়ে থাকে যা খলিফা সেটার আগের মালিকের (অমুসলিমদের) অধিকারে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে পুনর্জীবিত ভূমির ওপর পুনর্জীবিতকারী ব্যক্তি খারাজ কর দেবেন。