📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুকাসামার অর্থনৈতিক প্রভাব

📄 মুকাসামার অর্থনৈতিক প্রভাব


করের নির্ধারিত হারের পরিবর্তে মুকাসামার ফলে কর আরোপের অতিরিক্ত বোঝা কমে আসতে পারে বা একেবারে দূর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে করের লাভহীনতা হ্রাস পায়। নিচের চিত্র থেকে এই প্রভাবটি বোঝা যায়। ধরা যাক, চাহিদা ও জোগানের অবস্থা চিত্রে প্রদর্শিত অবস্থার মতো। তাহলে নির্ধারিত হারের কর আরোপের ফলে করের পরিমাণ অনুযায়ী কোনো পণ্যের মূল্য প্রতি এককে বেড়ে যাবে। P1 থেকে P2 পর্যন্ত পার্থক্যটি প্রতি এককে করের সমতুল্য। যদি বাহ্যিক কোনো প্রভাব না থাকে এবং বাজার যথাযথ অবস্থায় ক্রিয়াশীল থাকে, তাহলে যোগানরেখা S ওপরে উঠে SS-এ চলে যাবে, যা পণ্যটির উচ্চতর সামাজিক সুযোগ ব্যয়ের প্রতিফলন। কিন্তু জোগানের এই নতুন উচ্চতার ফলে চাহিদাপূর্ণ ও যোগানকৃতের পরিমাণ Q1 থেকে কমে Q2-তে চলে যাবে। এর ফলে যে রাষ্ট্রীয় কর রাজস্ব পাওয়া যাবে, তা P1 P2 A E ক্ষেত্রটির সমতুল্য হবে, যেমন Q2*(P2-P1)। কিন্তু ভোক্তারা P1 P2 A C ক্ষেত্রের সমপরিমাণ ভোগের উপকারিতা হারাবে। তাই কর থেকে রাষ্ট্র যতটুকু লাভ পাচ্ছে, ভোক্তার ক্ষতি সে তুলনায় বেশি। AEC ক্ষেত্রটি একটি অতিরিক্ত করের বোঝা বা লাভহীন অংশ (James, 1983)। একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে উৎপাদকের দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রতিবিম্ব তৈরি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে লাভহীন অংশটি হবে BEC ক্ষেত্রটি। কর আরোপের ফলে প্রাপ্ত মোট লাভহীন অংশটি ABC ক্ষেত্র দিয়ে বোঝানো হয়েছে।
ইমাম আবু ইউসুফের মুকাসামা করব্যবস্থায় এই অসুবিধাটি থাকবে না। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত থাকবে। উপরন্ত আবু ইউসুফের এই প্রস্তাবনার আরেকটি দিক হলো উৎপাদে রাষ্ট্রের প্রাপ্য অংশটি করদাতার অংশের পাশাপাশিই বিক্রি হবে। এর ফলে বাজারশক্তির মাধ্যমে পণ্যের দাম নির্ধারিত হওয়াটা নিশ্চিততর হবে। যত যা-ই হোক, অর্থনীতির ইসলামি পদ্ধতিতে পণ্যের দাম নির্ধারিত করে দেওয়া অবাঞ্ছিত। দাম ঠিক হবে মুক্ত বাজারশক্তির মাধ্যমে। নবি -এর উক্তির পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করেন আবু ইউসুফ |

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উশর

📄 উশর


ভূমি করব্যবস্থার ভেতরেই উশর হলো সেই ভূমিকর, যার হার ভূমির অবস্থা ও সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এক-দশমাংশ বা তার অর্ধেক হয়ে থাকে। করের ভিত্তি হিসেবে রয়েছে চার ধরনের ভূমি: (ক) মুসলিমদের হাতে থাকা ভূমি, (খ) আরবের আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের হাতে থাকা ভূমি, (গ) কাতাই বা জায়গীর ভূমি, এবং (ঘ) আবাদকৃত পতিত ভূমি। পূর্বেকার হার থেকে করের হার পরিবর্তন করার সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আবু ইউসুফ যা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ এরকম:

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুসলিমদের হাতে থাকা জমি

📄 মুসলিমদের হাতে থাকা জমি


উশরের ভিত্তি হলো ইসলামি বিজয়ের আগে মুসলিমদের মালিকানাধীন ভূমি। অর্থাৎ, আরবের ভূমিসমূহ এবং বিজয়যাত্রা শুরুর আগে কেনা অনারব জমিসমূহ। দ্বিতীয় এই প্রকারটি উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগে দেখা গেছে। কিন্তু খলিফা উমর -এর যুগে এর অনুমোদন ছিল না। খেয়াল করুন, বিশেষ প্রেক্ষিতে খলিফা উমরের শাসনামলে মুসলিমদের আরবের বাইরে ভূমি কেনা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ বিজিত ভূমিগুলোতে সামগ্রিকভাবে সকল মুসলিমের হক রয়েছে বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু উমরের আমলের পর এই নিয়মটি শিথিল করে দেওয়া হয় বলেই প্রতীয়মান হয়।
জমি যদি বৃষ্টি বা খালের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে সেচপ্রাপ্ত হয়, তাহলে করের হার এক-দশমাংশ তথা ১০%। এর অর্ধেক বা ৫% হবে, যদি সেচকাজ কৃত্রিমভাবে করতে হয়। যেমন শ্রম বা যন্ত্রের ব্যবহার করা হলে, অথবা জমিতে যদি খরচ বেড়ে যাওয়ার মতো কোনো অতিরিক্ত কষ্ট করতে হয়। যেমন- খনন বা হালচাষ। হার যেহেতু নবি -এর জীবদ্দশায় নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে, তাই এটি আর পরিবর্তন করা হয়নি। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফের মতে আরবের বাইরের ভূমির মুসলিমদের জন্য হার পরিবর্তন করা বৈধ।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আরবের আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমি

📄 আরবের আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমি


করব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরবকে একেবারেই আলাদা করে দেখা হয়, কারণ এর হার স্বয়ং নবি কর্তৃক নির্ধারিত। এই মতের পক্ষে ইমাম আবু ইউসুফ উল্লেখ করেন যে, হিজায, মক্কা, ও মদীনা, ইয়েমেন এবং নবিজির জয় করা আরবের ভূমিগুলোর কর বাড়ানো বা কমানো যাবে না। এ ব্যাপারে নবি নিজে আদেশ জারি করেছেন, তাই কেউ সেটা পরিবর্তনের অধিকার রাখে না। সেচের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সেই হার হয় এক-দশমাংশ উশর বা তার অর্ধেক। করসংক্রান্ত পরিভাষায় তাই এসব ভূমিকে বলা হতো উশর ভূমি। তবে অন্যান্য জাতির বিপরীতে আরব পৌত্তলিকদের সাথে ভিন্নভাবে আচরণ করা হতো। তারা কোনো একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারী নয়। তাই তাদের থেকে কোনো জিযিয়া গ্রহণ করা হবে না। তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে, নয়তো তরবারির নিচে পড়তে হবে। তাই তাদের ওপর খারাজ করও প্রযোজ্য নয়। আরবভূমের অন্তর্ভুক্ত ইয়েমেনের অধিবাসীরা আহলে কিতাব জাতি। তাই ব্যক্তি হিসেবে জিযিয়া এবং জমির ওপর উশর বা তার অর্ধেক পরিশোধ করার বিনিময়ে তাদের ধর্ম অক্ষুণ্ণ রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
মোটকথা, আরব উপদ্বীপে মানুষ হয় মুসলিম আর নয়তো ইহুদি বা খ্রিষ্টান। এই ভূমি থেকে স্বয়ং নবি যে হারে কর নিয়েছেন, সেই উশর অপরিবর্তিত থাকে। উল্টোদিক থেকে তাই প্রশ্ন করা যায়: আবু ইউসুফ অনারব ভূমির করব্যবস্থার ব্যাপারে যে মত প্রচার করেছেন, নবিজি কি আরবের ভূমির ব্যাপারে অনুরূপ কোনো পন্থা অনুসরণ করতে পারতেন? আমরা জানি না। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে দক্ষিণ আরবের ভূমিগুলোর উর্বরতা আরব উপদ্বীপের বাইরের অন্যান্য বিজিত ভূমির চেয়ে কম হওয়ার কথা না। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখেছি কিভাবে এই অঞ্চলগুলো কৃষির ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলে এবং কিভাবে দক্ষিণ ও উত্তরের মধ্যকার বাণিজ্যপথগুলো ইসলামের আগমনের আগে ও পরে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। নবি -এর লক্ষ্য কি ছিল সাধারণভাবে সকল ভূমির কর নির্ধারণের ব্যাপারে সমান আচরণ করা? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে সেই সমতা কি ইসলামি রাষ্ট্রের পুরো ইতিহাস জুড়ে অপরিবর্তিত রাখা উচিত? নাকি তিনি আরব ভূমির কর নির্ধারণের ব্যাপারে এই নীতি ঠিক রেখে অনারবগুলোর ব্যাপারে ভিন্ন নীতির অনুমোদন দিতেন? ফকিহগণ এর উত্তর ভালো দিতে পারবেন। দুটির একটি প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা নেই এবং বিভিন্নরকমের উত্তর সম্ভব। তবে সামগ্রিকভাবে হানাফি প্রধান বিচারপতির যুক্তিতে "আইনি” নিশ্চয়তা রয়েছে বলেই মনে হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00