📄 ভূমিকর
উপস্থাপনের সুবিধার্থে ভূমির করব্যবস্থাকে নিয়ে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। খারাজ কর ও উশর কর, এবং তারপর ভূমিকরের প্রশাসনিক সংস্কার। কিন্তু পরিভাষা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার জন্য উশর, আধা উশর, এবং উশর শব্দগুলো একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ভাষাগতভাবে উশর অর্থ এক-দশমাংশ তথা ১০%। তাই অর্ধ-উশর মানে পাঁচ শতাংশ (৫%)। ভূমিকরের ওপর এটি প্রয়োগ করার ফলে জমির শ্রেণিবিভাগ করা হবে তার ওপর আরোপিত করের মাত্রা অনুযায়ী। কোনোটি উশর ভূমি, কোনোটি খারাজ ভূমি। উশর জমি প্রধানত মুসলিম মালিকদের হাতে থাকা জমি। আর খারাজ জমি হলো মূলগতভাবে অমুসলিমদের দখলে থাকা জমি, যা ইসলামি বিজয়ের পর আওতাধীন হয়। উশর ভূমিকে মুসলিম মালিকানাধীন আর খারাজ ভূমিকে অমুসলিম মালিকানাধীন ভূমি বললে একটি ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। সবক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। অমুসলিমদের হাতে থাকা ভূমির ওপরও ১০% উশর হারে খারাজ আরোপ করা হতে পারে এবং হয়েছেও। আরবের আহলে কিতাব তথা খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মালিকানাধীন ভূমি এবং আরবের বাইরে যারা মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তি করেছে, তাদের ভূমি। এদেরকে ১০% হারে কর আরোপ করা হতো। আবার মুসলিম ভূমির ওপরও খারাজ হারে কর আরোপিত হতে পারে। খারাজ হারে কর পরিশোধ করত, এমন মালিকদের কাছ থেকে মুসলিমরা সেই জমি কিনে নিলে এমনটি হবে।
ব্যাখ্যাটিকে আরেকটু স্পষ্ট করলে বলা যায়, উশর মানে সবক্ষেত্রে ১০% ছিল না। হারটি অর্ধেক করে ৫% করা হতো। সুন্নাহতে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী এটি নির্ভর করত সেচের পদ্ধতির ওপর। কিন্তু এরপরও সেই কর ও ভূমিকে উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে উশর কর ও উশর ভূমি হিসেবে। শেষ কথা হলো, উশরের বহুবচন উশূর। আর বাণিজ্যিক উশূরকে প্রায়ই উশর ভূমিকরের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এখানে উশূর মানে শুল্ক মাশুল (Custom dues)। গুলিয়ে ফেলার কারণ হলো শুল্ক মাশুলের হারও দশ শতাংশই। কিন্তু এই দুই ধরনের করের মাঝে এই একটি বিষয় ছাড়া আর কোনো মিল নেই। অবশ্য শুল্ক মাশুলের এই দশ শতাংশকেও অর্ধেক করে ৫% করা হয়ে থাকত।
📄 খারাজ
আবু ইউসুফ তার বইয়ে খারাজের বিশেষ একটি পদ্ধতির ওপর আলোকপাত করেন। সেটিকে বলা হয় মুকাসামা। এর আগ পর্যন্ত বিজিত ভূমির করব্যবস্থা ছিল দ্বিতীয় খলিফা উমরের অনুসৃত নীতি অনুসারে। ইরাকের আস-সাওয়াদ বিজয় করার পর তিনি এই নিয়ম করেছিলেন: নিম্নসীমা সহকারে একটি সুনির্ধারিত হার। উমর এ-এর এই নিয়মের সাথে কিছুটা ভিন্নতা রেখে ইমাম আবু ইউসুফ যে পদ্ধতির আলোচনা করেন, তার ভিত্তি হলো ফসল ভাগাভাগি বা মুকাসামা।
এই পদ্ধতিটির বর্ণনা ইমাম আবু ইউসুফ বেশ দীর্ঘভাবে দিয়েছেন। পদ্ধতিটি প্রস্তাব করার আগে তিনি খলিফা উমরের কাজ এবং তার মতামতের একটি সংশ্লেষণ পেশ করেন। তিনি বলেন, "আমি ইরাকের আস-সাওয়াদ এলাকার করব্যবস্থা এবং তা সংগ্রহ করার পদ্ধতিসমূহ নিরীক্ষণ করে দেখেছি। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ও অন্যদের মতামত গ্রহণ করেছি এবং বিষয়টি আলোচনা করেছি তাদের সঙ্গে। তারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, উমরের শাসনামলে স্থাপিত হওয়া এই পদ্ধতিটির অনুসরণ করে যাওয়া এখন অসম্ভব." এভাবে তিনি সমস্যাটির সমাধানে তার নিজের বাস্তবমুখী পদক্ষেপটির ভূমিকা প্রস্তুত করেন। তাই পরিবর্তিত একটি করব্যবস্থার ব্যাপারে ইমাম আবু ইউসুফের পরামর্শটি এসেছে তার যথাযথ গবেষণা এবং এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ-আলোচনার ফলাফল হিসেবে।
তবে খলিফা উমরের কর্মপদ্ধতি থেকে এভাবে সরে আসাটা নিশ্চয়ই কোনো সহজ কাজ ছিল না। খলিফা উমরের মতটি ফিকহের দৃষ্টিতে ইজমার একটি কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে ফকিহগণ এখান থেকে বিচ্যুত হতে পারবেন না। অতএব, নিজ প্রস্তাবিত নতুন পদ্ধতির সপক্ষে আবু ইউসুফ কী যুক্তি তুলে ধরেন, তা এখানে উল্লেখিত হওয়ার দাবি রাখে।
প্রথমত, নিজের মতকে সম্ভাব্য আপত্তিসমূহ থেকে নিরাপদ রাখার জন্য তিনি বলেন, এটি সমস্যার কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং অন্যদের সাথে পর্যালোচনা করার ফলাফল।
দ্বিতীয়ত, ইমাম আবু ইউসুফ তার প্রস্তাবটির অবতারণা করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্নের মাধ্যমে। নিম্নে এর সারাংশ উল্লেখ করা হলো: ➡ ১. খলিফা উমর সে-সময় নিশ্চিত ছিলেন যে, ভূমিটি তার ওপর আরোপিত খারাজ করের ভার বহন করতে পারবে। পরের বিষয়টি থেকে এটি অনুমান করা যায়। ➡ ২. খলিফা উমর জমি জরিপ ও কর আরোপ করার জন্য তার কর্মকর্তা হিসেবে পাঠিয়েছিলেন হুযাইফা ও উসমানকে। তারা ফিরে এলে উমর তাদের জিজ্ঞেস করেন, "জমির ওপর কী রকম কর আরোপ করেছেন? অধিবাসীদের ওপর তাদের সাধ্যের বাইরে আরোপ করেননি তো?" হুযাইফা জবাব দেন, "আমি উদ্বৃত্ত রেখে এসেছি।” আর উসমান বলেন, "চাইলে যতটুকু নিতে পারতাম, তার দ্বিগুণ পরিমাণ ছেড়ে দিয়ে এসেছি."।" উমর নিশ্চিত হতে চাইছিলেন যে, তার নির্ধারিত করে দেওয়া করের হার আকাঙ্ক্ষিত ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে পারছে কি না। এজন্য কর্মকর্তাদের তিনি এই প্রশ্ন করেন। কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, তারা ভূমির ওপর সাধ্যাতীত কর চাপাননি। তা থেকে বোঝা যায়, সেই জমি কর প্রদানে সমর্থ ছিল। ইমাম আবু ইউসুফ সম্ভবত এই ঘটনাটি উল্লেখের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন ভূমির ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। উমরের যুগে সে লক্ষ্য অর্জিত হলেও পরবর্তীকালে তার বাস্তবায়ন না হয়ে থাকতে পারে। পরের পয়েন্ট থেকে সেটি আরও স্পষ্ট হয়।
➡ ৩. খলিফা উমরের সময় নতুন দখল হওয়া চাষকৃত জমির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। সে তুলনায় অনাবাদী ভূমি একেবারেই কম। কিন্তু খলিফা উমরের যুগের পরে প্রায় একশ বছর ধরে জমি অনাবাদী অবস্থায় পড়ে থাকে।। নতুন করে এসব জমির উন্নয়ন ঘটিয়ে চাষযোগ্য করতে যে বিশাল খরচ ও বিনিয়োগ করা দরকার, তা খেটে খাওয়া মানুষদের সামর্থ্যের বাইরে। তাই অদূর ভবিষ্যতে এসব অবহেলিত জমির চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব। অতএব, পদ্ধতিতে পরিবর্তন ছাড়া পূর্ণ ন্যায়বিচারের নীতি রক্ষা করা অসম্ভব।
➡ ৪. উপর্যুক্ত কারণের ফলাফল হিসেবে নির্ধারিত করের হার শাসক, কোষাগার, ও করদাতা সকলের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। শাসকের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে, কোনো এক বছরে হয়তো ভুট্টা খুবই সস্তা। শস্যের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলে সংগৃহীত কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্বকে যথেষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে না। ফলে রাষ্ট্রের ব্যয়ভারও পূরণ করা যাবে না। পক্ষান্তরে, ফসলের দাম বেড়ে গেলে সংগৃহীত ফসলের যে অংশটুকুকে করদাতারা অতিরিক্ত (নগদ অর্থের হিসেবে) বলে বিবেচনা করবেন, খলিফার পক্ষে সেটা আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। তার ওপর সেই নির্ধারিত করের হার চাই নগদ অর্থে হোক বা পণ্যে হোক, এটি করদাতার জন্যও ক্ষতিকর। কারণ এর ফলে করের অন্যায় বণ্টন এবং দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের সুযোগ থেকে যায়।
ভূমির ওপর যা আরোপ করে দিয়ে গেছেন, সেটাই ➡ ৫. খলিফা উমর চূড়ান্ত হয়ে থাকলে কর বাড়ানো বা কমানো হালাল হতো না। কিন্তু উমর তার আরোপিত খারাজকে চূড়ান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেননি। কিংবা তার পরের খলিফাগণ সেটা কমাতে বা বাড়াতে পারবেন না, এমন নিয়মও করে দেননি।
➡ ৬. হুযাইফা ও উসমানের প্রতি খলিফা উমরের প্রশ্ন, "অধিবাসীদের ওপর তাদের সাধ্যের বাইরে আরোপ করেননি তো?" থেকে একটি যুক্তি উত্থাপিত হয়। তারা যদি জানাতেন ভূমি তার ওপর আরোপিত করের ভার নিতে পারছে না, তাহলে উমর খারাজ কর কমিয়ে দিতেন। তার প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়, আরোপিত করের পরিমাণ পরিবর্তনযোগ্য।
➡ ৭. খলিফা উমরের প্রশ্নের জবাবে হুযাইফা ও উসমান বলেছেন তারা উদ্বৃত্ত রেখে দিয়ে এসেছেন। তারা চাইলে সেটার ওপরও কর আরোপ করতে পারতেন। এই উত্তরের প্রতি উমরের সমর্থন থেকে আবারও বোঝা যায় যে, ভূমির সহ্যসীমা অনুযায়ী করের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যায়।
➡ ৮. নির্ধারিত হারের করব্যবস্থা পরিবর্তন করে আনুপাতিক ফসল-ভাগাভাগি মুকাসামা পদ্ধতি প্রবর্তন করা মানে খলিফা উমরের পদ্ধতিই অব্যাহত রাখা। কারণ তার নীতি ছিল ভূমি যতটুকু বহন করতে পারে, তার চেয়ে বেশি কর আরোপ না করা।
➡ ৯. খারাজ কর বৃদ্ধি বা হ্রাস করার অধিকার শাসকের রয়েছে। কিন্তু তিনি কিছুতেই করদাতাদের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপাতে পারবেন না।
➡ ১০. আস-সাওয়াদের জনগণের ওপর খলিফা উমর যে কর আরোপ করেছিলেন, সেটার মাধ্যমে পূর্বের পয়েন্টের বক্তব্য আরও জোরদার হয়। প্রতি জারিব খেজুর গাছের ক্ষেত্রে আট দিরহাম। কিন্তু করদাতাদের জন্য সহজ করতে গিয়ে পরে তিনি সেসব খেজুর গাছের কর বাতিল করে দেন, যেগুলো অন্যান্য চাষাবাদকৃত ভূমিতে জন্মায়। তা ছাড়া খলিফা উমর তার কর্মকর্তা ইয়ালা ইবনু উমাইয়্যাকে নাজরানে প্রেরণ করেছিলেন। সে-সময় তিনি তাকে নির্দেশনা দেন আনুপাতিক ফসল-ভাগাভাগি করপদ্ধতির ভিত্তিতে তাদের ভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য: প্রাকৃতিকভাবে সেচ দেওয়া ভূমির ক্ষেত্রে ভুট্টা ও খেজুরের দুই-তৃতীয়াংশ এবং কৃত্রিম সেচের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ। আস-সাওয়াদ ও নাজরানের এ দুটি উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, করদাতাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের ওপর আরোপিত কর বাড়ানো-কমানোর ক্ষেত্রে শাসকের স্বাধীনতা রয়েছে।
➡ ১১. নবি বলপ্রয়োগে খাইবার বিজয় করার পর নির্ধারিত নগদ করের রূপে ভূমির ওপর কোনো কর আরোপ করেননি। এর বদলে তিনি জমিগুলো তাদের আগের মালিক ইহুদিদের কাছে দিয়ে দেন মুসাকা চুক্তির ভিত্তিতে। এই চুক্তি অনুযায়ী ফসলের অর্ধেক কর হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
➡ ১২. নীতিবান উমাইয়্যা খলিফা উমর ইবনু আবদিল আযীয তার এক প্রশাসক আবদুল হামিদ ইবনু আবদুর রহমানকে ভূমিজরিপের আদেশ দেন। সাথে নির্দেশনা দিয়ে দেন, যেন নিষ্ফলা ভূমিকে চাষকৃত বা চাষকৃত ভূমিকে নিষ্ফলা ভূমির মতো ব্যবহার না করা হয়। নিষ্ফলা ভূমিরও জরিপ করা হবে বটে। সেটির উন্নয়ন ঘটালে বা চাষযোগ্য করলে যেরকম উৎপাদনের সামর্থ্য রাখত, কর আরোপ করা হবে সে অনুযায়ী। যে ভূমির খারাজ মওকুফ করে দেওয়া হবে, সেটার মামলা শিথিলভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে, যেন ওই ভূমির মানুষরা সন্তুষ্ট থাকে। ঘরবাড়ি, নারী শ্রমিকদের উপার্জন এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের উপার্জনের ওপর কোনো খারাজ আরোপ করা যাবে না।
ওপরের যুক্তিসমূহের আলোকে আবু ইউসুফ প্রস্তাব করেন যে, কোষাগারের জন্য সর্বোত্তম এবং করদাতাদের ওপর জুলুম প্রতিহত করার উপযুক্ত ব্যবস্থা হলো ন্যায়ানুগ ফসল ভাগাভাগি পদ্ধতি বা মুকাসামা।
মুকাসামা বা ভাগাভাগির অনুপাতের ব্যাপারে আবু ইউসুফ একটি পরিবর্তনশীল হার প্রস্তাব করেন। এটি নির্ভর করবে ভূমির সে কর পরিশোধ করার সামর্থ্য এবং চাষাবাদের জটিলতার ওপর। তিনি নিম্নলিখিত উপায়ে করের হার নির্ধারণের পরামর্শ দেন:
➡ ১. প্রাকৃতিকভাবে সেচপ্রাপ্ত (বৃষ্টির পানি বা প্রাকৃতিক ঝরনা থেকে) জমির গম ও যবের ওপর দুই-পঞ্চমাংশ বা ৪০%।
➡ ২. কৃত্রিমভাবে সেচপ্রদত্ত জমির ওপর পরিশ্রমের পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় সেচপদ্ধতির ভিত্তিতে দেড়-দশমাংশ বা ১৫% অথবা তিন-দশমাংশ বা ৩০%। আগেরটির তুলনায় এখানে হার কম হওয়ার কারণ হলো সেচের খরচ জোগানো।
➡ ৩. খেজুরগাছ, আঙুরবাগান, সবজি ও উদ্যানের ওপর এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু গ্রীষ্মকালীন ফসল থেকে নেওয়া হবে শুধু এক-চতুর্থাংশ।
➡ ৪. প্রাকৃতিকভাবে সেচপ্রাপ্ত কাতাই বা জায়গীরের জমির ওপর এক-দশমাংশ এবং কৃত্রিম সেচপ্রদত্ত জমির ওপর বিশ ভাগের এক ভাগ। আগেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, কাতাই ভূমি হলো রাষ্ট্র ও ইসলামের জন্য বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিবর্গকে খলিফার পক্ষ থেকে প্রদত্ত জমি। এসব জমি সবক্ষেত্রে উচ্চমানের হতো না। কোনো কোনোটিতে খাল নির্মাণের প্রয়োজন থাকত।
* ৫. মুসলিমদের মালিকানাধীন উশর ভূমি প্রাকৃতিকভাবে সেচপ্রাপ্ত হলে এক-দশমাংশ বা ১০%। আর যদি কৃত্রিমভাবে সেচপ্রদত্ত হয়ে থাকে, তাহলে অর্ধ-দশমাংশ বা ৫%।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবু ইউসুফ নিশ্চিত করেন, যেন মূল্যায়নের একটি যথাযথ মাধ্যম অনুসরণ করা হয় এবং স্রেফ ধারণার ভিত্তিতে কিছু গ্রহণ না করা হয়। বাজারশক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত একটি মূল্যে স্থির হতে হবে। পুরো উৎপাদ বাজারে বিক্রি হবে এবং তারপর বিক্রিত সম্পূর্ণ অংশকে নির্দিষ্ট খাতের জন্য আলাদা করতে হবে। নির্দিষ্ট বাজারদরের অনুপস্থিতিতে মূল্যায়ন হবে ন্যায়ানুগ বিবেচনার মাধ্যমে। সেখানে যেমন কোনো করদাতার থেকে অতিরিক্ত কিছু আদায় করা হবে না, তেমনি কর্তৃপক্ষের স্বার্থেরও কোনো ক্ষতি করা যাবে না। উভয়ক্ষেত্রেই যেটা সহজতর, সেটাই ব্যবহৃত হবে।
তা ছাড়া পচনশীল সকল পণ্যের কর মওকুফ। যেমন সবজি, তরমুজ, শসা, কুমড়া, বেগুন, গাজর, গুল্ম, সুগন্ধি উদ্ভিদ, এবং অনুরূপভাবে, জ্বালানির জন্য কাঠ। অপচনশীল পণ্যকে আলাদা করার প্রশাসনিক মানদণ্ড ছিল সেগুলোকে পরিমাপ ও ওজন করার একক। অপচনশীল পণ্যের পরিমাপের একক বুশেল বা কাফিয, আর ওজনের একক রাতল। যেমন- গম, যব, ভুট্টা, ধান, তিল, শণ, বাদাম, আখরোট, চিনাবাদাম, জাফরান, জলপাই, কুসুম ফুল, ধনিয়া, কেওড়া, জিরা, পেঁয়াজ, রসুন, এবং অনুরূপ ফসলাদি (উৎপাদের এসব উদাহরণ আবু ইউসুফ তার কিতাবুল খারাজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন)।
একটি নিম্নসীমাও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। কর আরোপ করতে হবে কমপক্ষে পাঁচ ওয়াসাক পরিমাণের ওপর। জমিতে যদি পাঁচ ওয়াসাকের চেয়ে কম উৎপাদন হয়, তাহলে কোনো কর আরোপ করা হবে না। এই নিম্নসীমা পরিমাপ করার জন্য ওই জমির সকল উৎপাদের সমষ্টি হিসেব করা হতো। কোনো জমিতে যদি আড়াই ওয়াসাক গম ও আড়াই ওয়াসাক যব কিংবা এক ওয়াসাক করে গম, যব, ধান, খেজুর ও কিসমিস উৎপাদিত হয়, তাহলে মোট পাঁচ ওয়াসাক হওয়ার কারণে কর আরোপিত হবে ওই জমির ওপর। সামষ্টিক পরিমাণ পাঁচ ওয়াসাকের কম হলেই কর মাফ। কিন্তু জাফরানের মতো দামি জিনিসগুলোর ক্ষেত্রে আবার ব্যতিক্রম। জাফরান যতটুকুই উৎপাদিত হোক, তার বাজারমূল্য পাঁচ ওয়াসাক গমের সমান হয়ে গেলে কর দিতে হবে। এর চেয়ে কম হলে দিতে হবে না। এ এক বিশেষ পার্থক্য, যাতে কর পরিশোধ করার সামর্থ্যই ছিল মূল বিবেচ্য।
তা ছাড়া করদাতাদের জন্য আরও একটি ছাড়ের ব্যবস্থা ছিল। পরিবার, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের খাওয়ানো কিংবা চুরি হওয়ার কারণে যদি উৎপাদ পাঁচ ওয়াসাকের থেকে কমে গিয়ে থাকে, তাহলে ওই অংশটুকু বিয়োগ করেই কর হিসেব করা হতো। নিম্নসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইমাম আবু ইউসুফ তার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আবু হানিফা-এর মতে পরিমাণ একেবারে কম হলেও সেখান থেকে কর বাদ যাবে না। পরিবার ও বন্ধুদের খাওয়াতে ব্যবহৃত উৎপাদ করের ভিত্তি থেকে বিয়োগ করার অনুমোদন দেওয়ায় আবু হানিফার দেওয়া নিম্নসীমার তুলনায় আবু ইউসুফের নিম্নসীমা কার্যকরীভাবে বেড়ে যায়। কার্যত সেটা হয় ব্যক্তিগত ব্যবহারের পর বাকি থাকা উদ্বৃত্ত। বন্ধু ও প্রতিবেশীকে খাওয়ানোর জন্য অনুরূপ বিয়োগ করা হলে আরও বেড়ে যায় নিম্নসীমা। শেষোক্ত এই অনুমোদনটিকে হয়তো তৎকালীন দানশীলতার সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হতো। পাশাপাশি এটি সমাজের সদস্যদের মাঝে সম্পর্ক ও সম্প্রীতি দৃঢ়করণে অবদান রাখে।
উপরোল্লিখিত পরিমাপের এককটি আরেকটু স্পষ্ট করা যাক। এক ওয়াসাক অর্থ ষাট সা'। এই সা' এককটির পরিমাণ নবি নির্ধারিত করে দিয়ে গেছেন। অতএব, পাঁচ ওয়াসাকে রয়েছে ৩০০ সা'। এক সা' সমান পাঁচ সমস্ত তিন ভাগের এক রাতল। এক রাতল হলো গমের দানার হিসেবে এক পাউন্ড (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। আরেকভাবে বললে, ওজনের হিসেবে নিম্নসীমা হলো ১৬০০ পাউন্ড গম। এক কিলোগ্রামে যদি ২.২ পাউন্ড ধরা হয়, তাহলে বর্তমানের হিসেবে নিম্নসীমাটি ছিল প্রায় ৭২৭ কিলোগ্রাম গমের সমান।
খলিফা উমরের শাসনামলে বিজিত ভূমিসমূহ যুক্ত হওয়ার ফলে খারাজ করের ভিত্তি প্রশস্ত হয়। উমর-এর শাসনকালীন ইরাক ভূমিকে পর্যালোচনার পর আবু ইউসুফ সেসব ভূমিকে বিবেচনায় নেন, যেগুলো উমরের তখনো উমর প্রশাসনের অধীনে আসেনি। আরও একবার কাজে দেয় বিচারকের ভূমিকা। জনস্বার্থের মূলনীতির ব্যাপারে হানাফি বিচারপতির বাস্তবমুখী নির্ভরতার ফলে একটি ব্যবহারিক উত্তর চলে আসে। আবু ইউসুফ বলেন, "আমার মতে” বসরা এবং খুরাসান ভূমিদ্বয় আস-সাওয়াদের মতোই। অধিকৃত ভূমিগুলো খারাজ ভূমি। আর এগুলোর ওপর আরোপিত খারাজ করের পরিমাণ খলিফা উমর-এর নির্ধারিত পরিমাণের থেকে বাড়তে বা কমতে পারবে।
খারাজ বাড়ানো ও কমানোর ব্যাপারে আবু ইউসুফের প্রস্তাবনায় একটি ব্যতিক্রম ছিল এবং তা শান্তিচুক্তির অধীনে থাকা ভূমিগুলোর সাথে সম্পর্কিত। এসব ভূমির কর হবে চুক্তিতে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী, যা পরিবর্তন করা অনুচিত। পরিবর্তন হবে শুধু একটি ক্ষেত্রে, যদি সেই ভূমির অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। সেক্ষেত্রে সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে হয় ১০% বা তার অর্ধেক উশর আরোপিত হবে ভূমির ওপর। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, "আমার মত হলো আপনি তাদেরকে (চুক্তির শর্তানুযায়ী) বর্তমান অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন। আর এই ফতোয়ার ভিত্তিতেই আপনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।”
টিকাঃ
[১] কিতাবুল খারাজ: ৪৮। - সম্পাদক
[১] প্রাগুক্ত।
📄 মুকাসামার অর্থনৈতিক প্রভাব
করের নির্ধারিত হারের পরিবর্তে মুকাসামার ফলে কর আরোপের অতিরিক্ত বোঝা কমে আসতে পারে বা একেবারে দূর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে করের লাভহীনতা হ্রাস পায়। নিচের চিত্র থেকে এই প্রভাবটি বোঝা যায়। ধরা যাক, চাহিদা ও জোগানের অবস্থা চিত্রে প্রদর্শিত অবস্থার মতো। তাহলে নির্ধারিত হারের কর আরোপের ফলে করের পরিমাণ অনুযায়ী কোনো পণ্যের মূল্য প্রতি এককে বেড়ে যাবে। P1 থেকে P2 পর্যন্ত পার্থক্যটি প্রতি এককে করের সমতুল্য। যদি বাহ্যিক কোনো প্রভাব না থাকে এবং বাজার যথাযথ অবস্থায় ক্রিয়াশীল থাকে, তাহলে যোগানরেখা S ওপরে উঠে SS-এ চলে যাবে, যা পণ্যটির উচ্চতর সামাজিক সুযোগ ব্যয়ের প্রতিফলন। কিন্তু জোগানের এই নতুন উচ্চতার ফলে চাহিদাপূর্ণ ও যোগানকৃতের পরিমাণ Q1 থেকে কমে Q2-তে চলে যাবে। এর ফলে যে রাষ্ট্রীয় কর রাজস্ব পাওয়া যাবে, তা P1 P2 A E ক্ষেত্রটির সমতুল্য হবে, যেমন Q2*(P2-P1)। কিন্তু ভোক্তারা P1 P2 A C ক্ষেত্রের সমপরিমাণ ভোগের উপকারিতা হারাবে। তাই কর থেকে রাষ্ট্র যতটুকু লাভ পাচ্ছে, ভোক্তার ক্ষতি সে তুলনায় বেশি। AEC ক্ষেত্রটি একটি অতিরিক্ত করের বোঝা বা লাভহীন অংশ (James, 1983)। একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে উৎপাদকের দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রতিবিম্ব তৈরি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে লাভহীন অংশটি হবে BEC ক্ষেত্রটি। কর আরোপের ফলে প্রাপ্ত মোট লাভহীন অংশটি ABC ক্ষেত্র দিয়ে বোঝানো হয়েছে।
ইমাম আবু ইউসুফের মুকাসামা করব্যবস্থায় এই অসুবিধাটি থাকবে না। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত থাকবে। উপরন্ত আবু ইউসুফের এই প্রস্তাবনার আরেকটি দিক হলো উৎপাদে রাষ্ট্রের প্রাপ্য অংশটি করদাতার অংশের পাশাপাশিই বিক্রি হবে। এর ফলে বাজারশক্তির মাধ্যমে পণ্যের দাম নির্ধারিত হওয়াটা নিশ্চিততর হবে। যত যা-ই হোক, অর্থনীতির ইসলামি পদ্ধতিতে পণ্যের দাম নির্ধারিত করে দেওয়া অবাঞ্ছিত। দাম ঠিক হবে মুক্ত বাজারশক্তির মাধ্যমে। নবি -এর উক্তির পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করেন আবু ইউসুফ |
📄 উশর
ভূমি করব্যবস্থার ভেতরেই উশর হলো সেই ভূমিকর, যার হার ভূমির অবস্থা ও সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এক-দশমাংশ বা তার অর্ধেক হয়ে থাকে। করের ভিত্তি হিসেবে রয়েছে চার ধরনের ভূমি: (ক) মুসলিমদের হাতে থাকা ভূমি, (খ) আরবের আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের হাতে থাকা ভূমি, (গ) কাতাই বা জায়গীর ভূমি, এবং (ঘ) আবাদকৃত পতিত ভূমি। পূর্বেকার হার থেকে করের হার পরিবর্তন করার সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আবু ইউসুফ যা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ এরকম: