📄 বইটির গঠনকাঠামো
ইমাম আবু ইউসুফ -এর বইয়ে ঠিক কোন ক্রমানুসারে বিষয়গুলো এসেছে, সেটার বদলে আলোচনার সুবিধার্থে সেগুলোকে এভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা যায়: ◯ ভূমিকা ◯ রাজস্বের ব্যয় ও বণ্টন ◯ করব্যবস্থা • ভূমি কর • খারাজ • উশর • ভূমি করব্যবস্থায় প্রশাসনিক সংস্কার ◯ অন্যান্য কর ও আহরিত দ্রব্যসমূহ • যাকাত • জিযিয়া • শুল্ক মাশুল ◯ জনপ্রশাসন, “আইনশৃঙ্খলা” ◯ অন্যান্য বিষয় • জমি ইজারা • সরকারি ও বহিরাগত পণ্যসমূহ • দর, সংকট ও মূল্য
জটিলতার পর্যায়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন আলোচনার গুরুত্বের মাত্রা সহকারে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিম্নে আলোচিত হলো।
📄 ভূমিকা
ভূমিকাতে রয়েছে খলিফার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উপদেশ। খুবই ধর্মীয় গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে এখানে খলিফার প্রশংসা এবং জনগণের প্রতি তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
📄 রাষ্ট্রের ব্যয়ভার এবং রাজস্বের বণ্টন
আবু ইউসুফ এ বিষয়ের শুরুটা করেন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের আলোচনা দিয়ে। তিনি এই আলোচনাকে প্রয়োজনীয় মনে করেছেন সম্ভবত দুটি কারণে: ➡ (ক) নবি ও তাঁর আত্মীয়রা যারা যাকাত গ্রহণ করতে পারবেন না, তাঁদের অংশটি নবিজির মৃত্যুর পর এখন কিভাবে বণ্টিত হবে, এবং ➡ (খ) খুলাফায়ে রাশিদুন, বিশেষত উমর-এর সিদ্ধান্তগুলো থেকে ব্যতিক্রম কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে কি না।
প্রথম বিষয়টিতে তার মত হলো, নবিজির অংশটি তাঁর আত্মীয়দের মাঝে বণ্টিত হবে। আর দ্বিতীয় বিষয়ে তিনি আগে কিছু সমস্যার কথা স্পষ্ট করেন, যেগুলো নবি ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের পরে উদ্ভূত হয়েছে। তারপর এমন এক বণ্টনব্যবস্থার প্রস্তাব করেন, যা খলিফা উমরের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা আলাদা।
যাকাত রাজস্ব বণ্টনের বিষয়টি তার বইয়ে যাকাত পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে। আবু ইউসুফ এখানে তিনটি জিনিসের ওপর জোরারোপ করেন: (ক) যাকাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বকে অন্যান্য উৎসের রাজস্বের সাথে মেশানো যাবে না। (খ) যাকাতের বণ্টন হতে হবে ঠিক ঠিক কুরআনে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী। (গ) যেই শহর, নগর বা অঞ্চল থেকে যাকাত সংগৃহীত হয়েছে, সেখানকার স্থানীয় প্রাপকদের মাঝে যাকাত বণ্টন করতে হবে। একটা ব্যতিক্রম রয়েছে: "ফী সাবিলিল্লাহ” খাতের অংশটি সাধারণভাবে বণ্টিত হতে পারে। এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত অংশ বণ্টিত হবে অন্যান্য অঞ্চলে। লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, এ ব্যাপারটি করবণ্টনের যাতায়াত খরচ কমাতে সাহায্য করবে এবং এর ফলে প্রশাসনের ওপর করের বোঝা হ্রাস পাবে।।।
তা ছাড়া যাকাতের অর্থ থেকে যাকাত কালেক্টরদের প্রাপ্য অংশ প্রদান করতে হবে, যা কুরআনের আদেশ। কিন্তু ওই অংশটুকু যদি তাদের বেতনের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে সামগ্রিক যাকাত বা এমনকি অন্যান্য আয় ব্যবহার করেও তাদের প্রয়োজন মেটানো যাবে। এসকল কর্মচারীদের বেতন মধ্যমপন্থা অনুযায়ী হবে, কিন্তু কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। পরিমাণ নির্ধারিত হবে স্বয়ং খলিফার সিদ্ধান্তে। মোটামুটি বোঝা যায় যে, দুটি বিষয় ইমাম আবু ইউসুফ মাথায় রেখেছিলেন। প্রথমত, কর্মচারীদের ঘাড়ে যেন বেতনের অনুপাতে বেশি শ্রমের বোঝা না চাপে। দ্বিতীয়ত, স্বল্প বেতনভোগী হয়ে থাকলে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে যে অসততা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা যেন দূর করা যায়।
বিচারক ও কর্মকর্তাদের মজুরির ব্যাপারে আবু ইউসুফ জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের বেতন কেন্দ্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে পরিশোধ করতে হবে। তার মতে এর ফলে একটি ব্যাপার নিশ্চিত করা যাবে। যে অঞ্চল থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে, সেবাগুলো শুধু ওইখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই সেই সেবার অধিকারী হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন যেন যাকাতের রাজস্ব থেকে না দেওয়া হয়। শুধুই যাকাত সংগ্রহের জন্য কাজ করা কর্মচারীদের মজুরি সেখান থেকে হবে, আর কারোরটা নয়। কুরআন কারীমে কেবল তাদের জন্যই অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারকদের প্রদত্ত বেসরকারি সেবাগুলোর মজুরি সেসব সেবার উপকারভোগীরা পরিশোধ করতে পারে। যেমন উত্তরাধিকারের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু বিচারক এত বেশি মজুরি দাবি করতে পারবেন না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে উত্তরাধিকারের সম্পদ ক্ষয় হয়ে যায়। দারুণ একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ইমাম আবু ইউসুফের মতটি করব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে মিলে যায়। করসংক্রান্ত লেখালেখিতে ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত। একে লাভভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে না। করব্যবস্থায় লাভভিত্তিক দৃষ্টিকোণ অর্থ করদাতাদের কাছ থেকে শুধু সে অনুযায়ী কর আদায় করা যাবে, যতটুকু সুবিধা তারা সরকারি সেবাসমূহ থেকে লাভ করে। আবু ইউসুফের মতে, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গরিবদের পাওনা তো আরও বেশি। কে কতটুকু কর দিল, তার ভিত্তিতে সেবার পরিমাণে বেশকম করা যাবে না。
টিকাঃ
[১] আরেকটি কারণ হলো, ধনীদের সম্পদে স্থানীয় দরিদ্রদের অগ্রাধিকার রয়েছে। একটি হাদীস থেকে ফকিহগণ এই অর্থ গ্রহণ করেন। (সহীহ বুখারি: ১৩৯৫) - সম্পাদক
📄 ভূমিকর
উপস্থাপনের সুবিধার্থে ভূমির করব্যবস্থাকে নিয়ে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। খারাজ কর ও উশর কর, এবং তারপর ভূমিকরের প্রশাসনিক সংস্কার। কিন্তু পরিভাষা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার জন্য উশর, আধা উশর, এবং উশর শব্দগুলো একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ভাষাগতভাবে উশর অর্থ এক-দশমাংশ তথা ১০%। তাই অর্ধ-উশর মানে পাঁচ শতাংশ (৫%)। ভূমিকরের ওপর এটি প্রয়োগ করার ফলে জমির শ্রেণিবিভাগ করা হবে তার ওপর আরোপিত করের মাত্রা অনুযায়ী। কোনোটি উশর ভূমি, কোনোটি খারাজ ভূমি। উশর জমি প্রধানত মুসলিম মালিকদের হাতে থাকা জমি। আর খারাজ জমি হলো মূলগতভাবে অমুসলিমদের দখলে থাকা জমি, যা ইসলামি বিজয়ের পর আওতাধীন হয়। উশর ভূমিকে মুসলিম মালিকানাধীন আর খারাজ ভূমিকে অমুসলিম মালিকানাধীন ভূমি বললে একটি ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। সবক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। অমুসলিমদের হাতে থাকা ভূমির ওপরও ১০% উশর হারে খারাজ আরোপ করা হতে পারে এবং হয়েছেও। আরবের আহলে কিতাব তথা খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মালিকানাধীন ভূমি এবং আরবের বাইরে যারা মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তি করেছে, তাদের ভূমি। এদেরকে ১০% হারে কর আরোপ করা হতো। আবার মুসলিম ভূমির ওপরও খারাজ হারে কর আরোপিত হতে পারে। খারাজ হারে কর পরিশোধ করত, এমন মালিকদের কাছ থেকে মুসলিমরা সেই জমি কিনে নিলে এমনটি হবে।
ব্যাখ্যাটিকে আরেকটু স্পষ্ট করলে বলা যায়, উশর মানে সবক্ষেত্রে ১০% ছিল না। হারটি অর্ধেক করে ৫% করা হতো। সুন্নাহতে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী এটি নির্ভর করত সেচের পদ্ধতির ওপর। কিন্তু এরপরও সেই কর ও ভূমিকে উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে উশর কর ও উশর ভূমি হিসেবে। শেষ কথা হলো, উশরের বহুবচন উশূর। আর বাণিজ্যিক উশূরকে প্রায়ই উশর ভূমিকরের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এখানে উশূর মানে শুল্ক মাশুল (Custom dues)। গুলিয়ে ফেলার কারণ হলো শুল্ক মাশুলের হারও দশ শতাংশই। কিন্তু এই দুই ধরনের করের মাঝে এই একটি বিষয় ছাড়া আর কোনো মিল নেই। অবশ্য শুল্ক মাশুলের এই দশ শতাংশকেও অর্ধেক করে ৫% করা হয়ে থাকত।