📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সামগ্রিক রচনাপদ্ধতি

📄 সামগ্রিক রচনাপদ্ধতি


বইটি একটি সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত কাজ, যার উদ্দিষ্ট পাঠক শুরুতে ছিলেন একজনই। প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে তা বোঝা যায়, “আমিরুল মুমিনীন (আল্লাহ তাকে শক্তিশালী করুন) আমাকে তার জন্য লেখার অনুরোধ করেছেন”।
তার মানে আবু ইউসুফকে খলিফা হারুনুর রশিদ (৭৮৬-৮০৯) এ গ্রন্থ রচনা করতে বলেছিলেন বিশদ একটি প্রতিবেদন হিসেবে। আর এভাবেই জন্ম হয় ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম বইটির। হাল আমলের মতোই সেই বইটির বিষয়বস্তুও নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। কারণ খলিফা নিজে এই ব্যাপারটির নিরীক্ষণ করাতে চেয়েছেন। আর দায়িত্বপ্রাপ্ত লেখকও নিশ্চয়ই যথাযথ যোগ্য ব্যক্তি হয়ে থাকবেন এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য।
বইটির বিষয়বস্তু ছিল খারাজ, উশর, সদাকা, জিযিয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিশদ গবেষণা করা, ‘যে ব্যাপারে তিনি (খলিফা) পর্যবেক্ষণ ও কাজ করতে ইচ্ছুক’। আর এর উদ্দেশ্য ছিল ‘তার প্রজাদের ওপর থেকে অবিচার দূর করা এবং তাদের স্বার্থকে সংরক্ষণ করা’। তবে বইটি শুধুমাত্র করব্যবস্থা নিয়ে রচিত হয়নি। কিছু লেখক এই গ্রন্থটির নামের কারণে তাকে ওইরকম সীমিতভাবে বোঝেন, বা সেভাবেই তুলে ধরেন। অথচ এর পরিসর তার চেয়েও অনেক প্রশস্ত। হ্যাঁ, ভূমিকর হয়তো সেটার প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে একটি। কিতাবুল খারাজের গঠনকাঠামো দেখলেই এ ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বইটি লেখা হয়েছে খলিফার উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিতে। খলিফা বাস্তবেই সেগুলো জিজ্ঞেস করেছেন, নাকি ইমাম আবু ইউসুফ লেখার শৈলী হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন—তা স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু ধরে নেওয়া যায় যে, খলিফা যখন করব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় রাজস্বের ওপর তাকে গ্রন্থ রচনা করতে বলেন, তখন আবু ইউসুফ খলিফাদের প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো বুঝে নিয়েছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে, স্বয়ং খলিফার উদ্দেশ্যে লিখিত এই গ্রন্থে ইমাম আবু ইউসুফ শরীয়তের বিধান উল্লেখ, উপদেশ ও মতামত প্রদান করেছেন; সিদ্ধান্ত নয়। সিদ্ধান্তগ্রহণ খলিফার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আবু ইউসুফের প্রতিটি ফতোয়া সমাপ্ত হয়েছে এভাবে, “আমিরুল মুমিনীন, কোন মতটি অনুসরণ করবেন, তা আপনার ব্যাপার।”
খারাজের ব্যাপারে আবু ইউসুফের লেখার ধাঁচটি একটি বাস্তবমুখী পদ্ধতি। তিনি প্রচলিত চর্চার দিকে লক্ষ করেন, অতীত পদ্ধতিগুলো নিরীক্ষণ করেন, বর্তমান ও অতীতে অনুসৃত নীতিমালা থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, কুরআন- সুন্নাহ ও ফিকহের বিধান ব্যাখ্যা করে শরীয়তের সাথে সেগুলোর সামঞ্জস্যতা নিরূপণ করেন এবং তারপর সন্তোষজনক জবাবের উদ্দেশ্যে একটি ফতোয়া প্রদান করেন। তার অনুসৃত বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতিটি ব্যবহৃত হয়েছে কোনো বিষয়কে প্রমাণিত করা, কোনো ধারণার সমর্থন করা, বা কোনো সিদ্ধান্তের অপনোদন করার জন্য। ইউসরি (১৯৯২)-র সাথে একমত হয়ে বলা যায় যে, ইমাম আবু ইউসুফ-ই ইসলামি অর্থশাস্ত্রকে যথাযথ গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে "বৈজ্ঞানিক” রূপদানকারী প্রথম লেখক।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বইটির গঠনকাঠামো

📄 বইটির গঠনকাঠামো


ইমাম আবু ইউসুফ -এর বইয়ে ঠিক কোন ক্রমানুসারে বিষয়গুলো এসেছে, সেটার বদলে আলোচনার সুবিধার্থে সেগুলোকে এভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা যায়: ◯ ভূমিকা ◯ রাজস্বের ব্যয় ও বণ্টন ◯ করব্যবস্থা • ভূমি কর • খারাজ • উশর • ভূমি করব্যবস্থায় প্রশাসনিক সংস্কার ◯ অন্যান্য কর ও আহরিত দ্রব্যসমূহ • যাকাত • জিযিয়া • শুল্ক মাশুল ◯ জনপ্রশাসন, “আইনশৃঙ্খলা” ◯ অন্যান্য বিষয় • জমি ইজারা • সরকারি ও বহিরাগত পণ্যসমূহ • দর, সংকট ও মূল্য
জটিলতার পর্যায়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন আলোচনার গুরুত্বের মাত্রা সহকারে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিম্নে আলোচিত হলো।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


ভূমিকাতে রয়েছে খলিফার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উপদেশ। খুবই ধর্মীয় গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে এখানে খলিফার প্রশংসা এবং জনগণের প্রতি তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাষ্ট্রের ব্যয়ভার এবং রাজস্বের বণ্টন

📄 রাষ্ট্রের ব্যয়ভার এবং রাজস্বের বণ্টন


আবু ইউসুফ এ বিষয়ের শুরুটা করেন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের আলোচনা দিয়ে। তিনি এই আলোচনাকে প্রয়োজনীয় মনে করেছেন সম্ভবত দুটি কারণে: ➡ (ক) নবি ও তাঁর আত্মীয়রা যারা যাকাত গ্রহণ করতে পারবেন না, তাঁদের অংশটি নবিজির মৃত্যুর পর এখন কিভাবে বণ্টিত হবে, এবং ➡ (খ) খুলাফায়ে রাশিদুন, বিশেষত উমর-এর সিদ্ধান্তগুলো থেকে ব্যতিক্রম কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে কি না।
প্রথম বিষয়টিতে তার মত হলো, নবিজির অংশটি তাঁর আত্মীয়দের মাঝে বণ্টিত হবে। আর দ্বিতীয় বিষয়ে তিনি আগে কিছু সমস্যার কথা স্পষ্ট করেন, যেগুলো নবি ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের পরে উদ্ভূত হয়েছে। তারপর এমন এক বণ্টনব্যবস্থার প্রস্তাব করেন, যা খলিফা উমরের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা আলাদা।
যাকাত রাজস্ব বণ্টনের বিষয়টি তার বইয়ে যাকাত পরিচ্ছেদের অধীনে এসেছে। আবু ইউসুফ এখানে তিনটি জিনিসের ওপর জোরারোপ করেন: (ক) যাকাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বকে অন্যান্য উৎসের রাজস্বের সাথে মেশানো যাবে না। (খ) যাকাতের বণ্টন হতে হবে ঠিক ঠিক কুরআনে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী। (গ) যেই শহর, নগর বা অঞ্চল থেকে যাকাত সংগৃহীত হয়েছে, সেখানকার স্থানীয় প্রাপকদের মাঝে যাকাত বণ্টন করতে হবে। একটা ব্যতিক্রম রয়েছে: "ফী সাবিলিল্লাহ” খাতের অংশটি সাধারণভাবে বণ্টিত হতে পারে। এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত অংশ বণ্টিত হবে অন্যান্য অঞ্চলে। লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, এ ব্যাপারটি করবণ্টনের যাতায়াত খরচ কমাতে সাহায্য করবে এবং এর ফলে প্রশাসনের ওপর করের বোঝা হ্রাস পাবে।।।
তা ছাড়া যাকাতের অর্থ থেকে যাকাত কালেক্টরদের প্রাপ্য অংশ প্রদান করতে হবে, যা কুরআনের আদেশ। কিন্তু ওই অংশটুকু যদি তাদের বেতনের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে সামগ্রিক যাকাত বা এমনকি অন্যান্য আয় ব্যবহার করেও তাদের প্রয়োজন মেটানো যাবে। এসকল কর্মচারীদের বেতন মধ্যমপন্থা অনুযায়ী হবে, কিন্তু কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। পরিমাণ নির্ধারিত হবে স্বয়ং খলিফার সিদ্ধান্তে। মোটামুটি বোঝা যায় যে, দুটি বিষয় ইমাম আবু ইউসুফ মাথায় রেখেছিলেন। প্রথমত, কর্মচারীদের ঘাড়ে যেন বেতনের অনুপাতে বেশি শ্রমের বোঝা না চাপে। দ্বিতীয়ত, স্বল্প বেতনভোগী হয়ে থাকলে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে যে অসততা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা যেন দূর করা যায়।
বিচারক ও কর্মকর্তাদের মজুরির ব্যাপারে আবু ইউসুফ জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের বেতন কেন্দ্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে পরিশোধ করতে হবে। তার মতে এর ফলে একটি ব্যাপার নিশ্চিত করা যাবে। যে অঞ্চল থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে, সেবাগুলো শুধু ওইখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই সেই সেবার অধিকারী হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন যেন যাকাতের রাজস্ব থেকে না দেওয়া হয়। শুধুই যাকাত সংগ্রহের জন্য কাজ করা কর্মচারীদের মজুরি সেখান থেকে হবে, আর কারোরটা নয়। কুরআন কারীমে কেবল তাদের জন্যই অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারকদের প্রদত্ত বেসরকারি সেবাগুলোর মজুরি সেসব সেবার উপকারভোগীরা পরিশোধ করতে পারে। যেমন উত্তরাধিকারের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু বিচারক এত বেশি মজুরি দাবি করতে পারবেন না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে উত্তরাধিকারের সম্পদ ক্ষয় হয়ে যায়। দারুণ একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ইমাম আবু ইউসুফের মতটি করব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে মিলে যায়। করসংক্রান্ত লেখালেখিতে ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত। একে লাভভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে না। করব্যবস্থায় লাভভিত্তিক দৃষ্টিকোণ অর্থ করদাতাদের কাছ থেকে শুধু সে অনুযায়ী কর আদায় করা যাবে, যতটুকু সুবিধা তারা সরকারি সেবাসমূহ থেকে লাভ করে। আবু ইউসুফের মতে, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গরিবদের পাওনা তো আরও বেশি। কে কতটুকু কর দিল, তার ভিত্তিতে সেবার পরিমাণে বেশকম করা যাবে না。

টিকাঃ
[১] আরেকটি কারণ হলো, ধনীদের সম্পদে স্থানীয় দরিদ্রদের অগ্রাধিকার রয়েছে। একটি হাদীস থেকে ফকিহগণ এই অর্থ গ্রহণ করেন। (সহীহ বুখারি: ১৩৯৫) - সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00