📄 খারাজের অর্থ
খারাজ শব্দের ব্যুৎপত্তি আরবি থেকে। শব্দটি কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে নিয়মিত প্রদেয় অর্থ হিসেবে। "তারা বলল, 'হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে খরচ (খাজ) দেব যে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে এক প্রাচীর গড়ে দিবেন?” (সূরা কাহফ, ১৮: ৯৪)। কুরআনের এই আয়াতটি এক ন্যায়পরায়ণ শাসকের সাথে একটি জাতির কথোপকথন। জাতিটি ইয়াজুজ ও মাজুজ নামক আরেক জাতির হাতে আক্রান্ত হচ্ছিল। আরেক জায়গায় আল্লাহ তাঁর নবি -কে কাফিরদের আচরণের ব্যাপারে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “আপনি কি তাদের কাছে কোনো প্রতিদান (খারাজ) চেয়েছেন? আপনার প্রতিপালকের প্রতিদানই শ্রেষ্ঠ।” (সূরা মুমিনূন ২৩: ৭২)। এখানে খরচ ও প্রতিদান শব্দ দুটি আরবি খারাজ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষাগতভাবে এর অর্থ আর্থিক প্রদেয়, নিয়মিত প্রদেয়, অথবা প্রতিদান।
তবে করব্যবস্থার পরিভাষা হিসেবে বিভিন্ন লেখক নিশ্চিত করেছেন যে, ইসলামের আগে থেকেই পারস্যে ভূমিকরের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রচলিত ছিল। প্রাথমিক যুগের ইসলামি লেখকগণ তাদের গ্রন্থাদিতে খারাজকে ভূমিকর অর্থে ব্যবহার করেছেন। পারিভাষিকভাবে, শব্দটির একাধিক অর্থ থাকতে পারে। সাধারণভাবে একে সামগ্রিক সরকারি অর্থায়ন অর্থে ব্যবহার করা যায়, যার মধ্যে সকল কর এবং রাজস্ব বণ্টনের পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিক যুগের লেখকগণ এমনটি করেছেন। কিন্তু সংকুচিত অর্থে বিশেষভাবে বোঝালে তা দিয়ে কাফিরদের ভূমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বকে বোঝায়। তাই বলা চলে রাষ্ট্রীয় খারাজ বলতে রাষ্ট্রের সামষ্টিক রাজস্ব (Revenue) বোঝায়। অতীতের ঐতিহাসিকগণ এভাবে ব্যবহার করেছেন। আর ভূমি খারাজ বলতে বোঝানো হয় ভূমিকর থেকে প্রাপ্ত আয়কে (আর-রাহায়্যস, ১৯৭৭)।
টিকাঃ
[১] ইসলামের দৃষ্টিতে দুটি জ্ঞানই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দুটোর গুরুত্বের মাত্রা ও মর্যাদা সমান নয়।
📄 খারাজ সংক্রান্ত গ্রন্থাদি
ইসলামি করব্যবস্থা নিয়ে নিজের গবেষণাকর্মে বেন শেমেশ (Ben Shemesh) খারাজ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বইয়ের সূত্র দিয়েছেন, যেগুলো মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীতে রচিত। তবে এর মাঝে টিকে আছে শুধু নিচে উল্লেখিত বই তিনটি।
➡ এক. ইমাম আবু ইউসুফের “কিতাবুল খারাজ”। আব্বাসিদের শক্তিশালী খলিফা হারুনুর রশীদের (৭৮৬-৮০৯) জামানায় এবং সাংস্কৃতিক রেনেসাঁসের সময়ে ফকিহ আবু ইউসুফকে (৭৩১-৭৯৮) কর সংগ্রহ বিষয়ে একটি বিস্তারিত গ্রন্থ রচনার অনুরোধ করেন খলিফা। হানাফি ইমাম আবু ইউসুফ সেই অনুরোধের জবাবে “আল-খারাজ” গ্রন্থটি রচনা করেন, যা এই বিষয়ের ওপর প্রথম বিস্তারিত কর্ম।
➡ দুই, ইয়াহইয়া ইবনু আদামের “কিতাবুল খারাজ”। ইয়াহইয়া ইবনু আদম আল-কুরাশি (৭৫৭-৮১৮) খারাজের ওপর নবি -এর বাণী ও কর্ম তুলে ধরার উদ্দেশ্যে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। বইটিতে বিভিন্ন আলিমের উদ্ধৃতিও রয়েছে। ইয়াহইয়া নিজের মতামতও উল্লেখ করেছেন অল্প পরিমাণে। কিন্তু আবু ইউসুফের তুলনায় তা খুবই সীমিত। কলেবরের দিক থেকে এটি আবু ইউসুফের কিতাবের অর্ধেক বা তারও কম। অতটা বিস্তারিত বা বৈচিত্র্যময়ও নয়। কিন্তু স্থাবর সম্পত্তি সম্পর্কিত কিছু মৌলিক আইন এই গ্রন্থে রয়েছে, যা আধুনিক যুগেও অনেক মুসলিম দেশে কার্যকর (Ben Shemesh, 1967)।
লক্ষণীয় হলো, কর-সংক্রান্ত সংকলনের মাঝেও তিনি পুরো একটি সেকশন রেখেছেন ব্যবসা, কৃষি ও খেজুর চাষের ফযিলতের ব্যাপারে। এইসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়াকে উৎসাহ দিতে গিয়ে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর উদ্ধৃতি টেনেছেন। অবশ্য এই তিনটির মাঝে কোনোটিকেই বিশেষ প্রাধান্য দেননি। এই ব্যাপারটির একটি প্রাসঙ্গিকতা আছে। কিছু হাদীসের ভিত্তিতে কতিপয় মুসলিম ধারণা করে যে, অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে ব্যবসার মর্যাদা অনেক বেশি, আর কৃষিকাজ সবচেয়ে নিন্দনীয়। কিন্তু ইয়াহইয়ার উদ্ধৃত করা আয়াত ও হাদীস থেকে এই সকল কর্মের পছন্দনীয়তা সম্পর্কে জানা যায়। আলোচ্য বিষয়ে এই গ্রন্থটি দ্বিতীয় বৃহত্তম।
➡ তিন. কুদামা ইবনু জাফর-এর "কিতাবুল খারাজ"। আবুল ফারাজ কুদামা ইবনু জাফর আল-কাতিব (৮৬৪-৯৩২) প্রণীত গ্রন্থটি আলোচ্য যুগের বইগুলোর মধ্যে টিকে থাকা তৃতীয়টি। যদিও তিনি পূর্বসূরিদের আলোচিত বিষয়গুলোর বাইরে নতুন কিছু আলোচনা করেননি, কিন্তু কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে কুদামার গ্রন্থকে বিবেচনা করা চাই: (ক) বইটি লিখার সময় সকল ফিকহি মাযহাব ভালোমতো প্রতিষ্ঠিত ও পরিপক্ক হয়ে ওঠে, যেটা তার আগে কখনো ঘটেনি, (খ) ততদিনে হাদীস সংকলনের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে, (গ) ইমাম আবু ইউসুফ -এর সুপরিচিত রচনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় দেড়শ বছর পেরিয়ে গেছে। তাই নতুন এই গ্রন্থ নিশ্চয়ই নতুন কোনো সংযোজন হিসেবে কাজ করে থাকবে, এবং (ঘ) কুদামা -এর জীবদ্দশায় ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থানের গতি বিপরীতমুখী হতে শুরু করেছে। আল-মুকতাফির (৯০২-৯০৮) খিলাফতের অবনতির মাধ্যমে এর সূচনাটা হয়। নতুন একটি গ্রন্থ রচিত হওয়াটা ছিল সময়ের দাবি।
কলেবর, গভীরতা, বৈচিত্র্য, ও বিস্তার বিবেচনায় শুধু ইমাম আবু ইউসুফ -এর রচনাকর্মটি নিয়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ করা চলে। অনুরূপ ও তুলনামূলক বিশেষায়িত বাকি দুটি কর্ম এখানে আলোচিত হচ্ছে না।