📄 ফিকহি মাযহাব
নবম শতাব্দীর মধ্যে ফিকহের বেশ কয়েকটি মাযহাবের উদ্ভব ঘটে, যদিও টিকে থাকা মাযহাবের সংখ্যা চার: হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি এবং হাম্বলি। নিচে সংক্ষেপে এদের ওপর আলোকপাত করা হলো:
হানাফি মাযহাব: এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত (৬৯৯-৭৬৭)। তিনি ফতোয়া প্রদানের জন্য কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার পাশাপাশি ইস্তিহসান এবং কিয়াসের ওপর নির্ভর করতেন (Al-Qattan, 1986)। আবু হানিফা হয়তো এটাও ভাবতে পারেননি যে, তিনি একটি ফিকহি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা হতে চলেছেন। তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি ফিকহের সবচেয়ে বিস্তৃত মাযহাবটি। আবু হানিফার শিক্ষা ইরাক, কুফা ও বাগদাদে প্রসার লাভ করে। তার অসংখ্য অনুসারীর মধ্যে রয়েছেন ইমাম আবু ইউসুফ যিনি ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম বিশেষায়িত গ্রন্থ আল-খারাজ রচনা করেন। বর্তমানেও মুসলিম বিশ্বে এই মাযহাবের অনুসারী সবচেয়ে বেশি।
মালিকি মাযহাব: মালিক ইবনু আনাস (৭১৫-৭৯৫) মদীনায় এই মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন। সুন্নাহ, মদীনার আলিমগণের মতামত, মদীনার প্রচলিত রীতিনীতি এবং খুলাফায়ে রাশিদিনের ইজমাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন তিনি (প্রাগুক্ত)। তার রচিত আল-মুওয়াত্তা হাদীসের প্রাচীনতম একটি কিতাব। মাসলাহা মুরসালা ও জনস্বার্থের তত্ত্ব প্রয়োগে বিশেষ কৃতিত্ব ইমাম মালিককেই দেওয়া হয়। মালিকের অনুসারীরা প্রধানত উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আরবের অধিবাসী।
শাফিয়ি মাযহাব: মুহাম্মাদ ইবনু ইদরিস আশ-শাফিয়ি (৭৬৭-৮১৯) জন্মগ্রহণ করেন গাযায়। তার প্রতিষ্ঠিত মাযহাবে সুন্নাহ ও হাদীসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইমাম মুহাম্মাদের শিষ্য আশ-শাফিয়ি তার পূর্বসূরিদ্বয়ের মাঝামাঝি একটি অবস্থান গ্রহণ করেন: বর্ণনাকারীদের ধারা অবিচ্ছিন্ন হলেই কেবল সুন্নাহকে গ্রহণ করা যাবে, আর কিয়াসকে ব্যবহার করতে হবে শেষ উপায় হিসেবে এবং এই ব্যাপারে বাড়াবাড়ি গ্রহণ করা হবে না (প্রাগুক্ত)। ফিকহের মূলনীতির ওপর তার প্রধান রচনা কিতাবুর রিসালা ফি উসুলুল ফিকহ এই শাস্ত্রের এক মাইলফলক। শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীরা মূলত মিশর, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের অধিবাসী, যদিও পরে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
হাম্বলি মাযহাব: এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবনু হাম্বল (৭৮৪-৮৫৫), যিনি কঠোরভাবে সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। ইজমা ও কিয়াসের পরিসীমাকে তিনি সংকুচিত করে আনেন এবং মানবীয় যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন। মধ্যমপন্থি শাফিয়ির ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি ফিকহের ক্ষেত্রে এক আপসহীন পথ তিনি গ্রহণ করেন। তার এই অবস্থান মূলত মুতাযিলা আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ ছিল। আব্বাসি যুগে মুতাযিলারা ধর্মতত্ত্বের বিকাশের জন্য যুক্তিবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং খলিফা মামুনের (৮১৩-৮৩৩) সুনজর ছিল তাদের প্রতি। ইবনু হাম্বলকে মত পরিবর্তনে বাধ্য করার ব্যর্থ চেষ্টায় মামুন তাকে কারাবন্দি করেন। হাদীসশাস্ত্রের ওপর প্রধানতম একটি গ্রন্থ ইবনু হাম্বলের "আল-মুসনাদ”, যাতে রয়েছে চল্লিশ হাজার হাদীস। তার অনুসারীরা প্রধানত হিজাযের অধিবাসী (প্রাগুক্ত)।
ফিকহি চিন্তার বিকাশ মোটেও উমাইয়্যা ও আব্বাসি শাসনামলের ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একমাত্র দিক নয়। চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, আলকেমি, ভূগোল, চারু ও শিল্পকলা, স্থাপত্যবিদ্যা, দর্শন, আরবি ব্যাকরণ, ইতিহাস লেখা, কাব্য, সঙ্গীত, শৈল্পিক লেখনী এবং চারুলিপির বিকাশ সম্পর্কেও জানা যায় ইসলামি ইতিহাস থেকে (উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য, Hitti, 1963)। আইন, ধর্মতত্ত্ব, ভাষাবিদ্যা ও ভাষাতত্ত্বে আরব ও অনারব মুসলিমরা স্বকীয় চিন্তা ও গবেষণা পরিচালনা করে চলে (প্রাগুক্ত)। শিক্ষাকে পবিত্র হিসেবে জ্ঞান করা হয়। মুসলিমরা জ্ঞান অর্জনের জন্য কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে আদিষ্ট। কুরআনের শিক্ষা ও শিক্ষণের ব্যাপারে মুসলিমদের বলা হয়েছে, "তোমাদের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ, যে কুরআন শেখে ও অন্যকে শেখায়", (সহীহ বুখারি: ৫০২৭) জ্ঞানশাস্ত্র তাই দুটি ভাগে বিভক্ত: ধর্মীয় জ্ঞানশাস্ত্র বা উলুমুদ্দীন, এবং জাগতিক জ্ঞানশাস্ত্র বা উলুমুদ্দুনইয়া। উভয়টিই একইরকম গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি অর্থনীতিশাস্ত্র সমানতালে এই দুই ধরনের জ্ঞানশাস্ত্রেরই শ্রেষ্ঠ মিশ্রণ। উভয়েরই অবদান রয়েছে এতে।
এখন আমরা মনোনিবেশ করছি ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রাচীনতম লিখিতকর্ম কিতাবুল খারাজের ওপর।