📄 পুঁজিবৃত্তিক বিকাশ
আলোচ্য যুগে ইসলামি অর্থনীতি সংক্রান্ত লেখালেখিকে ঘিরে যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে, তার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শনের প্রসার, গ্রিক দর্শনের সমালোচনা, ইসলামি ফিকহি দর্শনের বিকাশ, এবং আধ্যাত্মিকতাবাদের একটি সুসংগত ঘরানার প্রতিষ্ঠা। নিম্নে এগুলোর ওপর আলোকপাত করা হলো।
📄 ইসলামি ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শন
ইসলামি ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শন এত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে যে, অতি স্বল্প সময়ের মাঝে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈচিত্র্য ও বেশ জটিলতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কোনো দর্শন প্রবর্তিত হলেই সেটা থেকে আরেকটা মতের উদ্ভব ঘটে, সেটা আবার তৃতীয় আরেকটির জন্ম দেয়, সেখান থেকে চতুর্থটির জন্ম, ইত্যাদি। ইসলামি ধর্মীয় দর্শনের একাধিক ঘরানা আগে থেকেই ছিল, অনেকগুলোই ছিল রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। কোনো কোনোটার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহ, গোত্রপ্রীতি এবং অগ্রহণযোগ্য ধর্মীয় চর্চার অভিযোগ পর্যন্ত ওঠে। যেমন অভিযোগ উঠেছিল কিছু শিয়া ইসমাঈলি উপদলের বিরুদ্ধে।
মজার ব্যাপার হলো, ওই যুগের মুসলিমদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক চিন্তা আসন্ন বহু বছরের মুসলিম-চিন্তাকে আকৃতি দান করেছে। নবম শতাব্দীর শুরু থেকে একাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ইসলামি ধর্মীয় দর্শনে গড়ে ওঠে প্রধান প্রধান গোষ্ঠী ও ধারণাগুলো হলো মুতাযিলা, আশআরিয়া, সুফিবাদ, বৈরাগ্যবাদ, আধ্যাত্মিকতাবাদ, জন্মান্তরবাদ, সর্বেশ্বরবাদ, ভ্রাতৃসংঘ, তাসবিহধারী, পীরপন্থা, শিয়া, ইসমাঈলীয়্যা, বাতিনিয়্যা, কারামাতিয়্যা, হাশাশিন, নুসাইরি, শিয়া দারাযি, পশ্চিম আনাতোলিয়ার তাখতাজি (কাঠুরে), পারস্য ও তুর্কিস্থানের আল-ইল্লাহি, পূর্ব আনাতোলিয়ার কিযিল-বাশ (লালচুলো), তুরস্ক ও আলবেনিয়ার বাখতাশি এবং ইয়েমেনের যাইদি (মাহমুদ, ১৯৮৬)।
মুসলিম আলিমগণ ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর নিন্দা করেছেন। যেমন, প্রখ্যাত আলিম গাযালি (১০৫৮-১১১১) এদের সমালোচনা করেন ও ভ্রান্ত পথের অনুসারী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইসলামি শব্দমালা ও পরিভাষার অর্থ পরিবর্তনকারীদের ধ্যানধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে তিরস্কার করেন গাযালি। তার মতে, কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানের শাস্ত্র হওয়ার বদলে তাদের আলোচ্য বিষয় হলো উদ্ভট আইনি মামলা, আকিদার অতিসূক্ষ্ম খুঁটিনাটি ও সেগুলো নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত তর্ক করা। ইলম তথা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের ব্যাপারে জ্ঞান এখন হয়ে গেছে বিরোধী পক্ষের বাদীদের সাথে তর্ক করতে পারা মানুষদের শাস্ত্র। যারা এহেন তর্কাতর্কি করতে পারে না, তাদের বলা হয় দুর্বল। তাদেরকে আলিমদের কাতারে ঠাঁই দেওয়া হয় না। তাওহিদ মানে ছিল এই বিশ্বাস যে, সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে কোনো মধ্যবর্তী প্রতিনিধি ছাড়াই। এর বদলে তাওহিদ হয়ে গেছে বিতর্ক-পদ্ধতির জ্ঞান, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার। আল্লাহর স্মরণ বা যিকিরের মজলিসগুলো হয়ে গেছে বক্তৃতা আর কিচ্ছা-কাহিনি বলার আসর। কাব্যের ব্যবহার যেখানে মূলত ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার করা নিষেধ ছিল, সেটা এখন হয়ে গেছে একেবারে লাগামছাড়া। ব্যক্তির প্রশংসা ও কুৎসা থেকে শুরু করে মদপানের আসরের বর্ণনা পর্যন্ত নানা বিষয়বস্তু এতে ঢুকে পড়েছে। জ্ঞানী ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হাকিম শব্দটি দিয়ে এখন বোঝানো হয় ডাক্তার, জ্যোতিষী ও রাশিফল নির্ণয়কারীদের (গাযালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ২/১৩২)।
টিকাঃ
[১] এখানে সেসব ফিরকার নিন্দা করা হচ্ছে যারা ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করার কারণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ফিকহি মাযহাব বা আলিমদের বৈধ ইখতিলাফ এর আওতাভুক্ত নয়। অর্থাৎ যেসব ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য দলিলের ভিত্তিতে হয়, এবং যেসব ক্ষেত্রে ইখতিলাফ করার অবকাশ থাকে, সেগুলোর ব্যাপারে নিন্দা করার সুযোগ নেই। - সম্পাদক
📄 গ্রিক দর্শনের সমালোচনা
গ্রিক দর্শনের প্রতি মুসলিমদের আগ্রহের জন্মটা হয় আব্বাসি খলিফা মামুনের শাসনামলে (৮১৩-৮৩৩)। ইবনু খালদুন আমাদের বলেন যে, মামুনের নিজেরও জ্ঞানশাস্ত্রে আগ্রহ ছিল। তিনি বাইজেন্টাইন সম্রাটদের কাছে প্রতিনিধি পাঠান গ্রিক জ্ঞানশাস্ত্র সম্পর্কে জানার জন্য এবং সেগুলোর আরবি অনুলিপি প্রস্তুত করার জন্য। এ উদ্দেশ্যে অনুবাদক প্রেরণ করেন তিনি (ইবনু খালদুন)।
একই উৎস থেকে আমরা জানতে পারি, "এর ফলে বেশ ভালো পরিমাণে গ্রিক বইপুস্তক সংরক্ষিত ও সংগৃহীত হয়", (প্রাগুক্ত)। মামুনের প্রচেষ্টার আগে মুসলিম খলিফাগণ শুধু গণিতশাস্ত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন। মামুনের প্রপিতামহ খলিফা জাফর মানসুর বাইজেন্টাই সম্রাটের কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন তাকে গণিতশাস্ত্রের লেখালেখির অনুবাদ পাঠানোর জন্য (প্রাগুক্ত)। বাইজেন্টাইন সম্রাট সাড়া প্রদান করে তার কাছে ইউক্লিডের বই প্রেরণ করেন।
গ্রিক জ্ঞানশাস্ত্রে মুসলিম চিন্তাবিদগণের বিশেষ আগ্রহ গড়ে ওঠে এবং এতে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেন তারা। কেউ কেউ গ্রিক দার্শনিকদের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামি সংস্করণের কিছু দার্শনিক কাজ গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। যেমন প্লেটোর রিপাবলিকের সমান্তরালে রচিত হয়েছে আল-ফারাবির আরাউ আহলিল মাদিনা। অন্যেরা আবার গ্রিক চিন্তাধারার সমালোচনা করেন এবং অ্যারিস্টটলের সাথে অনেক বিষয়ে দ্বিমত করেন। কেউ কেউ তাদের পূর্বসূরিদের ছাড়িয়েও যান বুদ্ধিশাস্ত্রে (প্রাগুক্ত)। ফলাফল হিসেবে গ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক শাস্ত্র কিছু মাত্রায় ইসলামে ঢুকে পড়ে। এটি এমন অনেক লোককে প্ররোচিত করে ফেলে, যারা সেসকল শাস্ত্র অধ্যয়নে উদগ্রীব ছিল। সেসব শাস্ত্রের মতগুলো গ্রহণও করে নেয় তারা (প্রাগুক্ত)। তাই দর্শন ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে লেখালেখি যে যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো দখল করে রেখেছিল, সে-সময় ইসলামি অর্থনীতির ওপর লেখা খুব কমই ছিল।