📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উৎপাদিত দ্রব্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য

📄 উৎপাদিত দ্রব্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য


রাষ্ট্রীয় রাজস্ব নিয়ে আল-জাহশিয়ারির দেওয়া তালিকা (যার প্রামাণ্যতার পক্ষে তিনি নিজে কিতাবুল উযারা ওয়াল কুত্তাব-এ জোরেসোরে দাবি করেছেন) এবং ইবনু খালদুন ও ইবনু কুদামা-সহ অন্যান্য ইতিহাসবিদের সংকলিত তালিকাসমূহ চারটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী:
➡ (ক) অঞ্চলভেদে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের পরিমাণ এতে বিশদভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে,
➡ (খ) অঞ্চলের আকার ছিল বিবেচনায় নেওয়ার মতো। স্বভাবতই একেকটি অঞ্চল হলো বর্তমানে আমরা দেশ বলতে যা বুঝি, সেগুলোর সমান। যেমন মিশর, ইরাক, সাইপ্রাস ইত্যাদি প্রত্যেকটিকে একটি করে অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে,
➡ (গ) অঞ্চলের সংখ্যা বিপুল। তালিকাটিতে ৩৬টি অঞ্চল বা দেশ রয়েছে,
➡ (ঘ) পরিশোধিত কর হয় মুদ্রার অংকে বা পণ্যের পরিমাণে উল্লেখ করা (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)।
এই তালিকা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা যায়: ➡ (ক) রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থাপকদের যে পরিমাণ ভৌগোলিক এলাকার বিস্তারিত রাজস্বের হিসাব রাখতে হতো, তা খুবই বিশাল। ভারত থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত, এবং
➡ (খ) প্রত্যেকটি অঞ্চলের করারোপযোগ্য কর্মকাণ্ডও ছিল ব্যাপক বৈচিত্র্যময়। তার ওপর যদিও কর রাজস্বের বিশাল অংশই টাকার অংকে দেওয়া হতো, কিন্তু পণ্য দিয়ে পরিশোধ করার পরিমাণও কম ছিল না। তা ছাড়া অঞ্চলভেদে উৎপাদের বৈচিত্র্যের কারণে কর হিসেবে পরিশোধিত পণ্যের প্রকারভেদও ছিল অনেক। এ থেকে বোঝা যায় যে, কৃষি উৎপাদের পাশাপাশি প্রতিটি এলাকার নিজস্ব প্রধান পরিচিতিমূলক পণ্যও ছিল। তালিকাটিতে প্রায় পঞ্চাশটি পরিচিতিমূলক পণ্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিসমিস থেকে শুরু করে মশলা, লবণ, রুপা, গালিচা, পোশাক, হাতি, দাস সবকিছুই রয়েছে এতে। তার মানে উৎপাদন কর্মকাণ্ডের আকার ও প্রকার ছিল ব্যাপক।
এই বৈচিত্র্যের কারণ হিসেবে দুটি প্রধান বিষয়কে উল্লেখ করা যায়: প্রশস্ত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সক্রিয় বাণিজ্য। রাষ্ট্রগুলোর সুপ্রশস্ত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বৈচিত্র্যময় ঋতু ও আবহাওয়ার সন্নিবেশ ঘটেছে, যার ফলে এর আওতায় এসেছে নানারকমের কৃষিজ উৎপাদ। অল্প কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। আল-জাহিয (মৃ. ৮৬৯) বলেছেন যে, বসরার বাজারে ৩৬০ প্রকারের আলাদা আলাদা খেজুর পাওয়া যেত। আল-আনসারির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকান উপকূলের এক ছোট্ট গ্রামের খুব কাছাকাছি এক জায়গায় ৬৫ জাতের আঙুর, ৩৬ প্রকারের নাশপাতি, ২৮ ধরনের ডুমুর, ১৬ শ্রেণির খুবানি ইত্যাদি পাওয়া যেত (Watson, 1981)। ওয়াটসনের মতে একটা বিষয় এখানে খুবই স্পষ্ট। নতুন ধরনের উদ্ভিদের ব্যাপ্তি ও নতুন জাতের বিকাশের ফলে ইসলামের প্রথম দিকের শতাব্দীগুলোতে চাষযোগ্য উপকারী উদ্ভিদের পরিমাণ বিপুলভাবে বেড়ে যায় (প্রাগুক্ত)। দ্বিতীয় কারণ ছিল বাণিজ্য। একেক এলাকার মধ্যে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সম্প্রসারণের ফলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে বৈচিত্র্যময় পণ্য ও কর্মকাণ্ডের উদ্ভব ঘটে।
এর ফলে কর আরোপ ও আদায় করা— তাও আবার মুদ্রা ও পণ্য উভয় মাধ্যমে— বেশ জটিল হয়ে ওঠার কথা। এর ফলে নিশ্চয়ই একটি জটিল করব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দিয়ে থাকবে, যার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে হওয়া আবশ্যক। যেমন: করের হার, করের ভিত্তির পরিমাণ নির্ধারণ, সীমা নির্ণয়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর, মূল্যানুযায়ী কর, এবং করারোপের পূর্বে উৎপাদ ভোগের বিষয়গুলোতে ভালোরকম জটিলতা রয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, এগুলোর জন্য সরকারপক্ষ থেকে ভালো মানের সমাধান আসা জরুরি ছিল। সেসব সমাধান আবার শুধু কার্যকর হলেই চলবে না, শরীয়তের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ফলে স্বভাবতই দক্ষ আইনবিদ বা ফকিহ এবং করব্যবস্থা-সংক্রান্ত লেখালেখির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়—আসলে, প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভূমি মালিকানার কাঠামো পরিবর্তন

📄 ভূমি মালিকানার কাঠামো পরিবর্তন


মুসলিম ও অমুসলিমদের ভূমির মালিকানা-কাঠামোর মূলে রয়েছে তিনটি বিষয়। প্রথমত, অমুসলিমদের কাছ থেকে মুসলিমদের জমি কেনার অধিকার। এই অধিকারটির চর্চা উমাইয়্যা ও আব্বাসি আমলে বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। দ্বিতীয়ত, কোনো অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কোনো মুসলিমকে জমি দান করার ব্যাপারে খলিফার অধিকার। এই অধিকারটিও খুলাফায়ে রাশিদীন যুগের তুলনায় দুই রাজতান্ত্রিক খিলাফতের যুগে অনেক বেশি মাত্রায় চর্চিত হতে দেখা গেছে। তৃতীয়ত, ইতিপূর্বে অবহেলিত মালিকবিহীন জমিকে আবাদকারীর সেই জমির মালিকানা লাভ করা। এই তিনটি প্রধান নিয়ামক ইসলামি রাষ্ট্রে ভূমি মালিকানার কাঠামো পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। উমাইয়্যা ও বিশেষত আব্বাসি খিলাফত আমলে কারও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা জমির পরিমাণ এত বেড়ে যায় যে, এটি অর্থনৈতিক গুরুত্বের অধিকারী হয়ে ওঠে। এরকম ভূমিকে বলে জায়গীর। এটি কৃষি কর্মকাণ্ডের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। তাই লক্ষণীয় যে, ভূমি-মালিকানার পেন্ডুলাম উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগে মুসলিমদের দিকে ঝুঁকে আসে। কৃষিজ ভূমির মালিকানা লাভ করার প্রবল আগ্রহ গড়ে ওঠে মুসলিমদের মাঝে (Cahen, 1970, Lapidus, 1981)।
সাধারণভাবে রাষ্ট্রের অর্থায়ন নিয়ে এবং বিশেষভাবে ভূমিকর নিয়ে লেখালেখি শুরু হওয়ার সাথে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিটি বেশ প্রাসঙ্গিক। কারণ ভূমির মালিকের ধর্ম পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় কিছু ফকিহের মতে করদাতার প্রদেয় কর খারাজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে যাকাত, উশর হয়ে যাওয়া উচিত। তবে তা সর্বসম্মত মত নয়। অন্যান্য ফকিহের মতে মালিকের ধর্ম পরিবর্তিত হওয়ায় করের ধরন পালটাবে না। উমাইয়্যা যুগে সরকারি নীতি একেকবার একেকরকম ছিল। কখনো করের ধরন পালটে উশর হয়ে যেত, কখনো মালিকের ধর্মপরিবর্তন সত্ত্বেও খারাজই থাকত (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। এর স্বপক্ষে দাবি হলো, যাকাতের চেয়ে খারাজ বেশি হলে এর মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। তাই বিষয়টিতে মতপার্থক্যের অবকাশ আছে, যেহেতু এতে ব্যবহারিক এবং ফিকহি বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে খারাজের ওপর একাধিক গ্রন্থ রচিত হয়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 কর সংগ্রহে মধ্যবর্তী প্রতিনিধি সংযোজন

📄 কর সংগ্রহে মধ্যবর্তী প্রতিনিধি সংযোজন


তা ছাড়া কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও একটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ওপর আরোপিত মোট করের অংক পরিশোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে একজন মধ্যবর্তী প্রতিনিধি নিজেকে কোষাগারের কাছে উপস্থাপন করতেন। বাকি কিংবা অগ্রিম হিসেবে কর পরিশোধ করে দিতেন তিনি। তারপর আলাদা আলাদা করপরিশোধকারীর কাছ থেকে সেই অংকের কর আদায় করে নিতেন। কোষাগারের জন্য এই ব্যবস্থাটি সুবিধাজনক হলেও এতে সমস্যাও ছিল। মূল করদাতাদের কাছ থেকে প্রতিনিধি আসল অংকের চেয়ে বেশি পরিমাণে কর আদায় করছেন কি না, এরকম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যেত না। এর ফলে চূড়ান্ত করদাতাদের ওপর অন্যায় হয়। সামনে আমরা দেখব যে, ইমাম আবু ইউসুফ প্রবলভাবে এই ব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00