📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 খারাজ

📄 খারাজ


খারাজ ছিল রাষ্ট্রের অর্থায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এটি হলো ইসলামি বিজয়ের পর অমুসলিম মালিকদের কৃষি ভূমিগুলোর ওপর আরোপিত কর। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখে এসেছি যে, নতুন বিজিত ভূমিগুলোর বণ্টনের ব্যাপারে মুজাহিদগণের সাথে দ্বিতীয় খলিফা উমরের মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। যোদ্ধাদের দাবি ছিল রাষ্ট্রের প্রাপ্য এক-পঞ্চমাংশ খুমুস বিয়োগ করার পর বাকিটুকু গনিমত হিসেবে তাদের মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে। আর দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন সেসব ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে রাখার পক্ষপাতী। আগের মালিকেরা সেগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকলেও মূল মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের কাছে। জমির চাষযোগ্যতা অনুযায়ী তারা পরিশোধ করবে খারাজ কর, “আমি তাদের জমির ওপর খারাজ ও ব্যক্তির ওপর জিযিয়া আরোপ করেছি” (আবু ইউসুফ)।

খারাজ ভূমিকে সাওয়াফি ভূমি বা উশরি ভূমির সাথে মিলিয়ে ফেললে হবে না। ইসলামি বিজয়ের আগে যে অমুসলিমরা জমিগুলোর মালিক ছিল, খারাজ কর পরিশোধের বিনিময়ে তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভূমিগুলো খারাজ ভূমি। সাওয়াফি ভূমি হলো যেগুলোর অমুসলিম মালিকরা ইসলামি বিজয়ের পর পালিয়ে গেছে কিংবা কোনো উত্তরাধিকারী না রেখে মারা গেছে। সেগুলো রাষ্ট্রের সরাসরি ব্যবস্থাপনার অধীনে চলে আসে। যাকাত তথা উশর ভূমি মুসলিমদের মালিকানাধীন, যেগুলো ইসলামি বিজয়ের আগে মূলত আরব উপদ্বীপের মধ্যেই ছিল। খারাজ ভূমি থেকে খারাজ কর আর যাকাত ভূমি থেকে যাকাত অর্থাৎ উশর নেওয়া হতো। আর সাওয়াফি ভূমি থেকে পাওয়া যেত লভ্যাংশ। প্রত্যেক ধরনের জমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব রাষ্ট্রের কাছে ওই নামেই পরিচিত লাভ করে: খারাজ, উশর ও সাওয়াফি রাজস্ব (আবু ইউসুফ)।

খারাজ ভূমিগুলোর করসীমা নির্ধারণের জন্য বিশেষভাবে জরিপ করা হতো। আরোপিত করের অনুপাত প্রথমদিকে নির্ভর করত উৎপাদের ধরন, সেচের জটিলতা, এবং ভূমির উর্বরতার ওপর। পরে আল-মাহদির শাসনামলে (৭৭৫-৭৮৫) এই আনুপাতিক হারের পদ্ধতি পরিবর্তন করে ফসল ভাগাভাগি পদ্ধতি প্রবর্তিত করা হয় (আবু ইউসুফ)। পক্ষান্তরে উশরি ভূমির ওপর করারোপ হতো দুটি হারে। সেচের প্রকরণের ওপর ভিত্তি করে একটি হার অপরটির চেয়ে বেশি। এই নিয়ম সুন্নাহর মাধ্যমে বিধিবদ্ধ। তা ছাড়া উশরি ভূমি থেকে প্রাপ্ত আয়কে অন্যান্য ভূমি কর বা রাজস্বের সাথে মেশানো যাবে না। কারণ উশর ও যাকাতের টাকা ব্যয় করতে হবে কুরআনে নির্ধারিত খাত অনুযায়ী। আর অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়ের ব্যয়পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট নয়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অন্যান্য কর

📄 অন্যান্য কর


উশ্বর বা শুল্ক মাশুল প্রথমবারের মতো আরোপিত হয় দ্বিতীয় খলিফা উমর এ-এর আমলে। প্রথম প্রথম তা প্রবর্তিত হয়েছিল ইসলামি রাষ্ট্রের প্রজাদের প্রতি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর আচরণের পাল্টা জবাব হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীকালে তা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কারও হাতে সীমান্ত পার হওয়া পণ্যের জন্য এই কর প্রযুক্ত হয়। উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগেও বহাল থাকে এই কর।

আব্বাসি শাসনামলে নতুন কিছু কর প্রবর্তিত হয়। এগুলো প্রধানত (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭):
১. বাজার কর, যা প্রথম প্রবর্তিত হয় ৭৮৪ সালে খলিফা আল-মাহদির শাসনামলে (৭৭৫-৮৫)। বাজারের সকল দোকানের ওপর আরোপ করা হয় এটি। করের হার ৩৩ শতাংশ পর্যন্তও উঠে গিয়েছিল, যার ফলে মিশরে দুই বছরব্যাপী স্থায়ী একটি বিদ্রোহও সংঘটিত হয়।
২. ভূসম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার ওপর মাশুল প্রযুক্ত হয় ২ শতাংশ পর্যন্ত।
৩. উত্তরাধিকার করের হার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হয়। এর কর সম্ভবত একদম ১২৫২ সালের দিকে এসে সর্বশেষ আব্বাসি খলিফা আল-মুতাসিমের আমলে প্রবর্তিত হয়েছে।
৪. মৎস্য কর আরোপিত হয় মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক পণ্যের ওপর। যেসব জেলে কোনোভাবে অন্যান্য করের আওতা থেকে বেঁচে যেত, তাদের ওপরই এটি আরোপ করা হতো বলে বোঝা যায়। এখান থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ব্যয় করা হয় বন্দর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে।

ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকে শুরু করে অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ইসলামি সমাজের বিকাশ পর্যবেক্ষণ, কুরআন ও সুন্নাহতে ইসলামি অর্থনীতির শিক্ষা নিরীক্ষণ, খুলাফায়ে রাশিদীনের ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার পর্যালোচনা এবং উমাইয়্যা খিলাফতের আর্থ-সামাজিক অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাতের পর এখন আমরা ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম বিশেষায়িত গবেষণাকর্ম নিয়ে আলোচনা করার মতো অবস্থায় উপনীত হয়েছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00