📄 ফাই
দ্বিতীয় অধ্যায়ে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঐতিহাসিকভাবে ফাই বলতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে বোঝানো হয়, যেগুলো কোনো সত্যিকার সামরিক লড়াই ছাড়াই শত্রুর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাদের থেকে অর্জিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে যোদ্ধারা কোনো অংশ পাবেন না, পুরোটাই যাবে রাষ্ট্রের হাতে। লব্ধ সম্পদ ফাই হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য শত্রুর আত্মসমর্পণের আগে মুসলিম সেনাবাহিনী কোনো প্রাথমিক সামরিক পদক্ষেপ নিতেই পারবে না, এমনটা জরুরি নয়। ওপরে ফাইয়ের সংজ্ঞা থেকে এমনটিই বোঝা যায়। সত্যিকারের সামরিক সংঘর্ষ সংঘটিত হওয়ার আগে আত্মসমর্পণ হয়ে গেলেই হবে। এমনকি শত্রুরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকলেও সেটা ফাই-ই হবে। যেমন- অবরোধের ফলে আত্মসমর্পণ করলে সেটাকেও যুদ্ধবিহীন আত্মসমর্পণ বলে গণ্য করা হবে। ফলে সেখান থেকে লব্ধ সম্পদ গণ্য হবে ফাই হিসেবে। সংজ্ঞাটা এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, লব্ধ সম্পদে রাষ্ট্রের অংশের পরিমাণ এই সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। লড়াই ছাড়া আত্মসমর্পণ হলে রাষ্ট্র যোদ্ধাদের কোনো অংশ না দিয়েই পুরোটা নিয়ে নিতে পারবে। আর সংঘর্ষের ফলে শত্রু আত্মসমর্পণ বা পরাজয় স্বীকার করলে রাষ্ট্র পাবে শুধু এক-পঞ্চমাংশ। ফাইয়ের ওপর আরও বিস্তারিত আলোচনা, গনিমতের সাথে পার্থক্য এবং ফাই থেকে প্রাপ্ত আয় খরচ করার পদ্ধতি দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
📄 সাওয়াফি ভূমি, রাজ-ভূসম্পত্তি বা জায়গীর
এই পরিভাষাটি দিয়ে সেসব ভূমিকে বোঝায়, যেগুলোর মালিকানা বেশ কয়েকটি কারণে রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। কারণগুলো হলো প্রধানত: (ক) ইসলামি বিজয়ের পর আগের মালিকরা সেগুলো ফেলে পালিয়ে গেছে, (খ) কোনো উত্তরাধিকারী না রেখে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অমুসলিম ভূমি-মালিকদের মৃত্যু, এবং (গ) কোনো উত্তরাধিকারী না রেখে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে-কোনো ভূমি-মালিকের মৃত্যু (আবু ইউসুফ)। প্রথমবারের মতো বড় আকারে সাওয়াফি ভূমির উদ্ভব দেখা দেয় দ্বিতীয় খলিফা উমর রা.-এর শাসনামলে। ইরাক ও সিরিয়ার বিপুলসংখ্যক পারস্য ও বাইজেন্টাইন জমিদার সে-সময় তাদের জমি ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সে ভূমিগুলোর ব্যবস্থাপনা করে এবং এখান থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ ৪,০০০,০০০ থেকে ১,০০০,০০০ দিরহাম পর্যন্ত হতো বলে জানা যায় (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। সে-সময়কার হিসেবে এটা বেশ বড় অঙ্ক। ইসলামি কোষাগারে তাই সাওয়াফি ভূমির ব্যাপক গুরুত্ব ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়।
উমর এ-এর দৃষ্টিতে অবশ্য সকল মুসলিম সাধারণভাবে সেই ভূমির মালিক। কিন্তু তৃতীয় খলিফা উসমানের আমলে সে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। সাওয়াফি ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যক্তিবর্গের হাতে হস্তান্তরিত হয়।
যদিও তৃতীয় খলিফা উসমান ভূমি-মালিকানায় বিশাল এক পরিবর্তনের দুয়ার খুলে দেন, তবুও তার এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি হিসেবে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে (মুহাম্মাদ, ১৯৮৬):
➡ ১. জমিগুলো ব্যক্তিদের হাতে মালিকানার ভিত্তিতে নয়, ভাড়া হিসেবে দেওয়া হচ্ছে,
➡ ২. নতুন পদ্ধতিতে জমির তত্ত্বাবধায়ক এর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য ব্যক্তিগত তৎপরতা বাড়াবে,
➡ ৩. এতে সরকারি খরচ কমবে, কারণ সেসব জমির ব্যবস্থাপনায় এখন রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হচ্ছে না,
➡ ৪. উপর্যুক্ত দুটি নিয়ামকের ফলে এসব ভূমি থেকে প্রাপ্ত মোট রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।
উৎসটি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটায় এর যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়। আগে যেখানে প্রাপ্ত আয় ছিল ৪,০০০,০০০ থেকে ৯,০০০,০০০ দিরহামের মধ্যে, এই সিদ্ধান্তের পর তৃতীয় খলিফার আমলে তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০,০০০,০০০ দিরহাম (আল-মাওয়ারদি)।
যা-ই হোক, খলিফা উসমানের এই নতুন নিয়মের প্রবর্তন ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাসে সামন্তবাদের সূচনা করে。
ফলে যে জিনিসটির সূত্রপাত হয়েছিল খলিফার কাছে জমি ভাড়া নেওয়ার অনুরোধ হিসেবে, সেটাই পরবর্তী খলিফাগণের জমির মালিকানা লাভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জমির মালিকানা অর্জনের পেছনে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন পরের খলিফাগণ (আত-তাবারি)। এতে জায়গীরের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো হারে বৃদ্ধি পায়। মৃত ভূমি পুনর্জীবিত করার মাধ্যমে সেটার মালিকানা পেয়ে যাওয়ার ফলে আরও বেড়ে যায় সেটার পরিমাণ। নীতিটি কৃষি উন্নয়নের জন্য উপকারী হলেও এর বিরূপ প্রয়োগও ঘটে। উমাইয়্যা ও আব্বাসি খলিফাগণ বিপুল পরিমাণ জমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সাথে যুক্ত না করে নিজেদের মালিকানা দাবি করেন সেগুলোর ওপর। ফলে রাজ জায়গীরের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
উমাইয়্যা ইতিহাসে এক অনন্য ব্যতিক্রম চরিত্র খলিফা উমর ইবনু আবদুল আযীয ওরফে দ্বিতীয় উমর (৭১৭-২০)। প্রবল ধর্মানুরাগের কারণে তাকে পঞ্চম খলিফায়ে রাশিদ হিসেবে উপাধি দেওয়া হয়। পূর্বসূরি খলিফাগণ তাদের অধিকৃত জমিগুলো উপহার হিসেবেও উমরকে দিতে পারতেন, আবার তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবেও সেগুলোর মালিক বনে যেতে পারতেন। কিন্তু উমর স্বয়ং সেই হস্তান্তরের অধিকার নাকচ করে দেন। শুধু নিজের ক্ষেত্রে না, পরিবারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রেও। তার বদলে সেসব জমিকে যুক্ত করে দেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সাথে (আত-তাবারি)।
তবে উমর একজন ব্যতিক্রম মাত্র। তার পরের খলিফাগণ আবার এই নিয়মকে উলটে দেন, নিজের বা নিজের বলে মনে করা জমিগুলো ফিরিয়ে নেন এবং মাঝখানের সাময়িক বিরতির পর আগের সেই নিয়মে ফিরে যান। উমাইয়্যাদের অস্তগমন ও আব্বাসিদের উদয়ের পরও চলতে থাকে সাওয়াফি ভূমি অধিগ্রহণের নীতি। শুধু পালটে যায় মালিক—আব্বাসিদেরও ভূমির প্রতি আগ্রহ ছিল একইরকম। উমাইয়্যাদের রেখে যাওয়া সবকিছুর উত্তরাধিকারী হয়ে বিরাজমান জায়গীরের মালিকানা লাভের পাশাপাশি সেগুলোর আকার আরও বাড়িয়ে তোলেন তারা (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)।
📄 ব্যবসা ও সরকারি খাতের রাজস্ব
সাওয়াফি ভূমির তুলনায় ছোট হলেও ব্যবসা খাতের কিছু মালিকানা ও পরিচালনাও ছিল রাষ্ট্রের হাতে। এগুলো ছিল মূলত সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত গোসলখানা, ছোট দোকান, চূর্ণ করার কারখানা, এবং সেসব জমি যেগুলোর ওপর দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এর অনেকগুলোই সরাসরি ব্যবস্থাপনা বা ভাড়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্য রাজস্ব আনয়ন করতে থাকে। এসব উদ্যোগ ও তা থেকে প্রাপ্ত আয় আল-ওয়ালিদ ইবনু আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭০৫-১৫) বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। আল-ওয়ালিদের আমলে দিওয়ানুল মুস্তাগাল্লাত নামক বিশেষ একটি দপ্তর স্থাপিত হয় সরকারি ব্যবসা খাতের কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের জন্য (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। এই খাতের কার্যক্রমে নজরদারির জন্য আলাদা দপ্তর স্থাপন করা থেকে বোঝা যায় যে, অন্যান্য খাতের তুলনায় এটির আকার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল।