📄 ব্যবসার বৈধ ধরনসমূহ
ব্যবসার আইনি ধরনের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাই যে, ব্যবসা মূলত তিন প্রকারের ছিল: একক মালিকানা, অংশীদারি, মুদারাবা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ (চিত্র ৪.১, পৃষ্ঠা নং ১৮৮)। একক মালিকের শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অংশীদারি হতো প্রাচীন মুসলিম ফকিহগণের দেওয়া শর্তাবলি অনুযায়ী। ফকিহগণ বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে দুটো প্রধান প্রকারে বিভক্ত করতেন: “মুফাওয়াদা” অংশীদারত্বের অনুবাদ করা যায় নিঃশর্ত-কর্তৃত্ব অংশীদারত্ব হিসেবে, এবং "ইনান” অংশীদারত্ব মানে সীমিত-কর্তৃত্ব অংশীদারত্ব। "মুফাওয়াদা” অংশীদারত্বে অংশীদারদের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক জামিন ও পারস্পরিক প্রতিনিধিত্ব। আর "ইনান" অংশীদারত্বে শুধুই পারস্পরিক প্রতিনিধিত্ব-ভিত্তিক। এই পার্থক্যটি অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করে: ধর্মের অভিন্নতা, কর্তৃত্বের মাত্রা, মুনাফা ভাগাভাগি ও আর্থিক জামানতের ভিত্তি।
"মুফাওয়াদা”তে ধর্মের অভিন্নতা জরুরি হলেও "ইনানে” তা অতটা প্রয়োজনীয় নয়। অমুসলিম অংশীদার ব্যবসায়িক লেনদেনে যতক্ষণ শরীয়ত মেনে চলছে, ততক্ষণ অংশীদারত্ব কার্যকর। অন্যথায় তা নাকচ হয়ে যাবে। তা ছাড়া, "মুফাওয়াদা” তে যেখানে কর্তৃত্বাধিকার নিঃশর্ত, "ইনানে” তা শর্তভিত্তিক। মুনাফা বণ্টন করা হয় ব্যবসায় অংশীদারদের পুঁজি বিনিয়োগের অনুপাতের ভিত্তিতে। অবশ্য যেই অংশীদার ব্যবসার ব্যবস্থাপনা করে, তার কাজ ও প্রচেষ্টার কারণে তাকে মুনাফার বৃহদাংশ দেওয়া হতে পারে। তবে ক্ষতির বণ্টন হতে হবে বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে, এমনকি তারা মুনাফা বণ্টনের ভিন্নতর ভিত্তির ব্যাপারে একমত হলেও। তার মানে মুনাফার বণ্টনের ব্যাপারে শিথিলতা থাকলেও ক্ষতির বণ্টন তুলনামূলক কঠোর। এর পেছনে কারণটা হলো ক্ষতির ফলে পুরো মূলধন হারালে (ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়) অংশীদারদের সেটা বিনিয়োগকৃত পুঁজির অনুপাতেই করতে হবে। তাই পুরো মূলধন না হারালেও ক্ষতির বণ্টন নিশ্চয়ই একই অনুপাতেই করা উচিত। আর্থিক দায়ভারের ব্যাপারটা "মুওয়াফাদা"য় নিঃশর্ত আর “ইনানে" সাধারণত শর্তাধীন।
মুদারাবা বা কমেন্ডা আরেক ধরনের ব্যবসায়িক কারবার। এই ব্যবস্থায় কোনো বিনিয়োগকারী বা বিনিয়োগকারীদের দল পুঁজি বা ব্যবসাপণ্যের দায়িত্ব অর্পণ করে একজন প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপকের কাছে। সে এটি নিয়ে ব্যবসায় করবে এবং মূলধন ও পূর্বনির্ধারিত লভ্যাংশ বিনিয়োগকারী (দে)র কাছে ফিরিয়ে দেবে (Udovitch, ১৯৭০)। শ্রমের প্রতিদানস্বরূপ প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপক পাবে মুনাফার বাকি অংশটি। ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা কিংবা অসফল ব্যবসায়িক কারবারের কারণে যা কিছু ক্ষতি হয়, তার পুরোটাই বহন করবে বিনিয়োগকারী (গণ)। এ ধরনের কোনো ক্ষতির দায়ভার প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপকের না। ব্যয়কৃত সময় ও প্রচেষ্টাটুকুই তার ক্ষতি (Udovitch, 1970)। ইসলামের আগে থেকেই আরবে প্রচলিত কমেন্ডা ব্যবস্থা আরবিতে তিনটি আলাদা পরিভাষায় পরিচিত: মুদারাবা, কিরাদ, ও মুকারাদা। কিন্তু তিনটি পরিভাষার অর্থ একই। পার্থক্যটি অর্থতত্ত্ব-ভিত্তিক এবং ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে প্রভাবিত ভাষাগত বৈচিত্র্যের ফল। প্রাক-ইসলামি মুদারাবাকে নবি * অনুমোদন দেন এবং তা ইসলামিভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক প্রকারে পরিণত হয়। তা ছাড়া মুদারাবাতে ধর্মীয় পার্থক্য কোনো বাধা নয়। শরীয়ত মান্য করার শর্তে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে-কেউ কমেন্ডা চুক্তিতে জড়িত হতে পারে।
কায়রো জেনিযা নথি থেকে দেখা যায়, শারিকাহ-অংশীদারত্ব বা মুদারাবা-কমেন্ডা চুক্তি চূড়ান্ত করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে (Goitein, 1967):
➡ ১. চুক্তিকারীদের সংখ্যা ও অবস্থা;
➡ ২. চুক্তির বিষয়বস্তু ও এর লক্ষ্যসমূহ;
➡ ৩. অংশীদারদের অবদানের ধরন ও পরিমাণ (পুঁজি, পণ্য, শর্ত ও কাজ) এবং প্রত্যেক অংশীদারের সুনির্দিষ্ট অধিকার ও সুবিধাদি;
➡ ৪. লাভ ও ক্ষতিতে অংশীদারদের অংশ এবং বিনিয়োগকৃত পুঁজির ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব;
➡ ৫. অংশীদারত্বের ব্যয়সমূহ ও অংশীদারদের খরচ সংক্রান্ত শর্তাবলি;
➡ ৬. স্বার্থের সংঘাত; একইরকম অন্য শারিকাহ ও মুদারাবায় অংশীদাররা অংশ নিতে পারবে কি না;
➡ ৭. অংশীদারত্বের মেয়াদকাল, যদি না সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্যোগ হয়ে থাকে;
➡ ৮. মধ্যবর্তী হিসেবের প্রয়োজন থাকলে চূড়ান্ত হিসেবের তারিখ;
➡ ৯. কোনো ধরনের বিশেষ শর্তাবলি;
➡ ১০. ঘটনাক্রমে, কোনো নির্দিষ্ট শর্তের অনুপস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য- সংক্রান্ত স্থানীয়ভাবে প্রচলিত শরীয়াহ-সম্মত নিয়মকানুন প্রযুক্ত হবে।
বাণিজ্যের ভৌগোলিক এলাকা বেড়ে যাওয়ার ফলে বেশ কিছু আর্থিক বিষয় নতুন করে প্রবর্তিত হয় কিংবা অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে খানিকটা পরিবর্তন করে গৃহীত হয়। আরবি "রুক'আ” শব্দটির অর্থ কাগজের টুকরা বা লেখার সরঞ্জাম। এটি দিয়ে পে-অর্ডার বোঝানো হয়। "সাক্” অর্থ জারিকৃত দলীল বা নথি। এটি দিয়ে বোঝানো হয় ব্যাংকারের ওপর আরোপিত পে-অর্ডার, যার সাথে টাকা আদায়কারীর অ্যাকাউন্ট রয়েছে। "সাফতাজা” এরকম আরেকটি বিষয়, যার অর্থ হুণ্ডি। মুসলিম ফকিহগণ বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে এটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন। ফকিহদের মতে সাফতাজার সংজ্ঞা হলো, পরিবহনের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য অন্য কোনো স্থানে বা অন্য কোনো দেশে ঋণের টাকা পরিশোধ করার প্রক্রিয়া। টাকা পরিবহনের বিবিধ ঝুঁকি রয়েছে। মজুরি জাতীয় কোনো আর্থিক প্রতিদান ছাড়াই ঋণগ্রহীতাকে এসব ঝুঁকির পুরোটা বহন করতে হয়। তাই মুসলিম ফকিহগণ সাফতাজাকে ঋণগ্রহীতার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করেন। পক্ষান্তরে, অন্য কোনো স্থানে বা দেশে ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেওয়াটা ঋণদাতার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তাই ফকিহগণ সাফতাজার ব্যবহারের ওপর কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেন। প্রথমত, যদি তা ঋণদাতার উপকারের কারণ হয়ে ঋণগ্রহীতার ক্ষতি করে, তাহলে তা হারাম; দ্বিতীয়ত, যদি ঋণদাতার কোনো উপকার না হয়েও ঋণগ্রহীতার উপকারের কারণ হয় এবং অন্যদেশে ঋণ পরিশোধের শর্ত ঋণদাতা কর্তৃক অনুমোদিত হয়, তাহলে তা হালাল; তৃতীয়ত, যদি তা ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের উপকার করে, তাহলে তা হালাল (আল-মিসরি, ১৯৮৪)।
"আল-হাওয়ালা” হলো সাফতাজার কাছাকাছি একটি বিষয়। এখানে ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধের দায়ভার হস্তান্তর করে দেয় নিজের ঋণগ্রহীতার কাছে অথবা মূল ঋণদাতাকে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে, এমন তৃতীয় কারও কাছে। এখানে দুইজনের বদলে তিন বা ততোধিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট। এটি আধুনিক বিনিময়-রশিদের অনুরূপ এবং এখান থেকেই বিল অব এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে প্রণোদনা বোঝাতে ফ্রেঞ্চ "অ্যাভাল" শব্দটির উদ্ভব।
সাফতাজা "বাহককে পরিশোধযোগ্য" হিসেবে জারি করা হতো। সাফতাজার ব্যবহার বেশ ভালোমতোই বিকশিত হয়, বিশেষত স্বয়ং মিশরের ভেতর, মিশর ও তার পার্শ্ববর্তী প্রাচ্যীয় প্রতিবেশীদের মাঝে, এবং কায়রো ও বাগদাদের মতো আন্তর্জাতিক কেন্দ্রসমূহের মাঝে (Goitein, 1967)1