📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ব্যবসা ও বাণিজ্য

📄 ব্যবসা ও বাণিজ্য


পূর্বে ভারত ও পশ্চিমে স্পেইন পর্যন্ত ইসলামি রাষ্ট্র বিস্তৃত হয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক বাধা দূর হয়ে যায়। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা, নগরায়ণ, কৃষি ও উৎপাদিত পণ্যের বৈচিত্র্যের সাথে মিলে এটি ইসলামি বিশ্বে ব্যবসার বহুল প্রসার ঘটায়। কয়েক ধরনের পণ্যের ব্যবসা হতো: খাদ্যদ্রব্য, প্রাণীসম্পদ, কাঠ ও বনজ উৎপাদ, ধাতু, এবং তৈরি পোশাক, পাথর ও মাটির উৎপাদ, মাছ ও সামুদ্রিক খাবার, লেখার সরঞ্জাম, ঔষধজাতীয় পণ্য, এবং দাস (Goitein, 1963)।

বাণিজ্যপথ ইউরোপকে ইসলামি বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করেছে মূলত সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া ও সিসিলির মাধ্যমে। ইউরোপ থেকে আমদানি ও সেখানে রপ্তানি করা প্রধান প্রধান পণ্য ছিল যথাক্রমে কাঠ ও খাদ্যদ্রব্য। মিশরের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল ভারতীয় বাণিজ্যপথের ওপর, যার বিস্তৃতি পূর্বে ইন্দোনেশিয়া ও সামারতা থেকে লোহিত সাগরের বন্দরসমূহ ও মিশরের পুরাতন কায়রো হয়ে পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেইন পর্যন্ত। কায়রো জেনিযা নথিপত্রে দেখানো হয়েছে যে, ভূমধ্যসাগরীয় ও ভারতীয় উভয় বাণিজ্যের জন্য শেষপ্রান্ত হিসেবে কাজ করত পুরাতন কায়রো (Goitein, 1963)। ভারত এবং ভারত মহাসাগরের অন্যান্য দেশ থেকে বা সেগুলো হয়ে আসা পণ্য ছিল মূলত বিভিন্ন মশলা। অবশ্য অন্যান্য দ্রব্যও ছিল সাথে। ভারতের দিক থেকে আসা পণ্যসমূহের ব্যাপারে জেনিযা কাগজপত্র উল্লেখিত একটি অসম্পূর্ণ তালিকা থেকে দেখা যায় যে, পণ্যগুলো ছিল (Goitein, 1963):
➡ মশলা, সুগন্ধী, রঞ্জক ও ভ্যানিশিং উদ্ভিদ ও ঔষধ জাতীয় গাছড়া (৪৭%),
➡ পিতলের পাত্র (১৫%),
➡ ভারতীয় রেশম ও সূতিনির্মিত অন্যান্য তৈরি পোশাক (১০%),
➡ লোহা ও ইস্পাত (৮%),
➡ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফলমূল, যেমন নারকেল (৭%),
➡ মুক্তা, পুঁতি, কড়ি ও অম্বর (৫%),
➡ চীনামাটি, ইয়েমেনি পাথরের পাত্র ও আফ্রিকান হাতির দাঁত (৪%),
➡ জুতা ও অন্যান্য চামড়ার জিনিস (৩%), এবং
➡ কাঠ (১%)।

একই তালিকায় উল্লেখিত পূর্বদিকগামী পণ্যের মাঝে রয়েছে (প্রাগুক্ত):
➡ তৈরি পোশাক ও কাপড় (৩৫%),
➡ রুপা, পিতল, কাঁচ ও অন্যান্য উপাদানে তৈরি পাত্র ও গহনা (২২%),
➡ রাসায়নিক, ঔষধ, সাবান, কাগজ, বই (১৮%),
➡ খাদ্যদ্রব্য, যেমন পনির, চিনি, কিসমিস, জলপাই তেল ও কুপির জন্য তিসির তেল (১০%),
➡ গৃহস্থালি জিনিসপত্র, যেমন গালিচা, মাদুর, টেবিল, ফ্রাইং প্যান (৭%),
➡ ধাতু ও তামা শিল্পের জন্য দরকারি অন্যান্য উপাদান (৭%), এবং
➡ প্রবাল (১%)।

এটি কেবল একটি কাগজে পাওয়া তথ্য। ভারতীয় বাণিজ্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না-ও হতে পারে এটি। তা ছাড়া, স্বল্প ও দীর্ঘ দূরত্বের অনেক বাণিজ্যপথ ইসলামি প্রদেশগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে সংযুক্ত করেছে। যেমন, সিরিয়া-মিশর, মিশর-উত্তর আফ্রিকান উপকূল, মিশর-আরব, ইরাক-সিরিয়া, এবং ইরাক-আরব। আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো ব্যবসায়ীরা ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ঘরানার মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল বন্ধুভাবাপন্ন। জেনিযা চিঠিপত্রে দেখা যায় যে, বিভিন্ন ধর্মের ব্যবসায়ীরা একে অপরকে একই মর্যাদাপূর্ণ ও বন্ধুসুলভ সম্বোধনে নিজেদের ভাই বলে উল্লেখ করছেন (Goitein, 1963)।

সাধারণত ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রকারের: উৎপাদক ও সরবরাহকারী, খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা, ভ্রমণরত ও থিতু, এবং বেনিয়া ও নিলামকারী। কিন্তু প্রকারগুলোর মাঝে বা এমনকি একই প্রকারের দুটি ভাগের মাঝে পার্থক্যও সবসময় একেবারে স্পষ্ট ছিল না। যেমন, তৈরি পণ্যের উৎপাদকরা ছিল মূলত কারিগর। তারা শুধু নিজেদের না, অন্যদের পণ্যও বিক্রয় করত। আবার পোশাকখাতের পাইকারি বিক্রেতারা বিক্রি করত একটি করে পণ্য। তা ছাড়া ব্যবসায়িক পণ্যগুলোর মাঝে বৈচিত্র্য খুবই প্রশস্ত আকারে দেখা যায়। একজন বেপারী বিভিন্ন ধরনের পণ্যের ব্যবসা করত। যেমন শণ, রেশম ও অন্যান্য পোশাক, জলপাই তেল, প্রাচ্যীয় মশলা, রঞ্জক উপাদান, ধাতু, বই, সুগন্ধী, গহনা, কাঁচ, প্রবাল, খাদ্যদ্রব্য, পশুর চামড়া, আলকাতরা, এবং নানারকমের গৃহস্থালি তৈজসপত্র (Goitein, 1967)। এর মাধ্যমে হয়তো উদ্দেশ্য ছিল বৈচিত্র্য এনে ব্যবসায়িক ঝুঁকির পরিমাণ কমানো। বিশেষায়নের অস্তিত্ব অবশ্যই ছিল। কিছু ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট ধরনের পণ্যের বিশেষায়িত ব্যবসা করেছে। পনির ব্যবসায়ী "আল-জাব্বান, দুধ ব্যবসায়ী "আল-লাব্বান", সুগন্ধী ব্যবসায়ী "আল-আত্তার", নীল ব্যবসায়ী "আন-নীলি", এবং খেজুর ব্যবসায়ী "আত-তাম্মার" হলো এমনকিছু উদাহরণ, যেখানে ব্যবসায়ীদের ব্যবসাসম্বন্ধীয় নাম তাদের বংশীয় নামে পরিণত হয়েছে (প্রাগুক্ত)।

দূরবর্তী বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের মাঝে সহযোগিতা "ব্যবসার রীতি” হিসেবে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। দুটি ভিন্ন ব্যবসাকেন্দ্রের দুজন ব্যবসায়ী একে অন্যের পণ্য ক্রয় ও বিক্রয় করত একদমই অনানুষ্ঠানিকভাবে। কোনো উপরি আদায় ছাড়াই পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল কাম্য (Goitein, 1967)। ক্রয় ও বিক্রয়ের পাশাপাশি এই সেবার মাঝে আরও রয়েছে বিদেশে ব্যবসায়িক ঋণ সংগ্রহের তদারকি। দূরবর্তী ব্যবসা ও খরচ কমানোর প্রচেষ্টা এ ধরনের সহযোগিতাকে সার্থক করে তোলে। তা ছাড়া এ ধরনের সহযোগিতার জন্য দুই ব্যবসায়ীর মাঝে বিশাল পরিমাণে আস্থার সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। অবশ্য মনে হতে পারে যে, দূরবর্তী বাজারের ব্যাপারে ব্যবসায়ীর প্রাপ্ত তথ্যই ওই ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছানোর দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। আর এতেই হয়তো সহযোগিতা অব্যাহত থাকা ও নিশ্চিত হয়, বিশেষত যখন উভয় ব্যবসায়ী জানে যে এরকম তথ্য হাতে পাওয়া কতটা কঠিন। জেনিযা নথি থেকে দেখা যায় যে, কোনো ব্যবসায়ী যদি মনে করে তার অপর সহযোগী তার স্বার্থে কাজ করছে না, সেক্ষেত্রে বিবাদ দেখা দিত এবং সহযোগিতার ব্যাপারে ঝামেলা তৈরি হতো। তাই এই পদ্ধতিটিকে কর্মোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন আস্থা। লেনদেনের বারবার পুনরাবৃত্তি, ব্যবসায়ীর সুনাম এবং ভ্রমণরত অন্য ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যপ্রবাহ এই আস্থাকে ক্রমান্বয়ে বাড়াতে সাহায্য করে। অথবা, Goitein (১৯৬৭) যেমনটি বলেন, "কায়রো জেনিযা থেকে প্রাপ্ত এই বাস্তবতা অনস্বীকার্য যে, ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য নগদ মুনাফা বা আইনি নিশ্চয়তার ওপর নয়, বরং পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের মানবীয় গুণের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল ছিল।"

প্রতিনিধি নিয়োগও ব্যবসা পরিচালনার একটি সুলভ মাধ্যম ছিল। দূরবর্তী বাজারে ব্যবসায়ী তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করত, যাতে মজুরি বা লভ্যাংশের বিনিময়ে তার কাছ থেকে সেবা পাওয়া যায়। এই মজুরি সেবার পরিমাণের ভিত্তিতে বিভিন্নরকম হতো। প্রতিনিধি বা "ওয়াকিলে"র তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত কাজ ছিল: (ক) আইনি বিবাদে ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিত্ব করা। এখান থেকেই বোঝা যায় যে, প্রতিনিধি হওয়ার জন্য ব্যবসার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পেশাদারি অভিজ্ঞতা কেন প্রয়োজনীয় ছিল, (খ) পণ্য মজুদ করার সুবিধাদি প্রদান করা, যা দেওয়া হতো প্রতিনিধির নিজস্ব মালিকানাধীন স্থানে, (গ) ব্যবসায়ীদের জন্য পুঁজিরক্ষক হিসেবে এবং তাদের মাঝে নিরপেক্ষ নিষ্পত্তিকারী হিসেবে কাজ করা (Goitein, 1967)। প্রতিনিধির গুদামঘর পণ্য নিলামের স্থান এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ডাকঠিকানা হিসেবেও কাজ করত।

টিকাঃ
[১] কায়রোর জেনিযা নথিপত্র: ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় কাগজপত্র বিকৃতি বা এজাতীয় বিশেষ কোনো কারণে ধ্বংস করতে হলে গির্জাসংলগ্ন কুঠুরি বা মাটির নিচে দাফন করে দিত। যেহেতু এগুলোতে আল্লাহর নাম আছে তাই তারা এগুলো বাইরে ফেলত না। এই ধরণের দুই লক্ষ নথিপত্র কায়রোর একটি গির্জা থেকে আবিষ্কৃত হয়। সেগুলোকে ইহুদি ধর্মের প্রাচীন নথি মনে করা হয়। ধারণা করা হয় এগুলো খৃষ্টীয় নবম শতক থেকে নিয়ে একাদশ শতকের। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ব্যবসার বৈধ ধরনসমূহ

📄 ব্যবসার বৈধ ধরনসমূহ


ব্যবসার আইনি ধরনের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাই যে, ব্যবসা মূলত তিন প্রকারের ছিল: একক মালিকানা, অংশীদারি, মুদারাবা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ (চিত্র ৪.১, পৃষ্ঠা নং ১৮৮)। একক মালিকের শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অংশীদারি হতো প্রাচীন মুসলিম ফকিহগণের দেওয়া শর্তাবলি অনুযায়ী। ফকিহগণ বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে দুটো প্রধান প্রকারে বিভক্ত করতেন: “মুফাওয়াদা” অংশীদারত্বের অনুবাদ করা যায় নিঃশর্ত-কর্তৃত্ব অংশীদারত্ব হিসেবে, এবং "ইনান” অংশীদারত্ব মানে সীমিত-কর্তৃত্ব অংশীদারত্ব। "মুফাওয়াদা” অংশীদারত্বে অংশীদারদের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক জামিন ও পারস্পরিক প্রতিনিধিত্ব। আর "ইনান" অংশীদারত্বে শুধুই পারস্পরিক প্রতিনিধিত্ব-ভিত্তিক। এই পার্থক্যটি অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করে: ধর্মের অভিন্নতা, কর্তৃত্বের মাত্রা, মুনাফা ভাগাভাগি ও আর্থিক জামানতের ভিত্তি।

"মুফাওয়াদা”তে ধর্মের অভিন্নতা জরুরি হলেও "ইনানে” তা অতটা প্রয়োজনীয় নয়। অমুসলিম অংশীদার ব্যবসায়িক লেনদেনে যতক্ষণ শরীয়ত মেনে চলছে, ততক্ষণ অংশীদারত্ব কার্যকর। অন্যথায় তা নাকচ হয়ে যাবে। তা ছাড়া, "মুফাওয়াদা” তে যেখানে কর্তৃত্বাধিকার নিঃশর্ত, "ইনানে” তা শর্তভিত্তিক। মুনাফা বণ্টন করা হয় ব্যবসায় অংশীদারদের পুঁজি বিনিয়োগের অনুপাতের ভিত্তিতে। অবশ্য যেই অংশীদার ব্যবসার ব্যবস্থাপনা করে, তার কাজ ও প্রচেষ্টার কারণে তাকে মুনাফার বৃহদাংশ দেওয়া হতে পারে। তবে ক্ষতির বণ্টন হতে হবে বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে, এমনকি তারা মুনাফা বণ্টনের ভিন্নতর ভিত্তির ব্যাপারে একমত হলেও। তার মানে মুনাফার বণ্টনের ব্যাপারে শিথিলতা থাকলেও ক্ষতির বণ্টন তুলনামূলক কঠোর। এর পেছনে কারণটা হলো ক্ষতির ফলে পুরো মূলধন হারালে (ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়) অংশীদারদের সেটা বিনিয়োগকৃত পুঁজির অনুপাতেই করতে হবে। তাই পুরো মূলধন না হারালেও ক্ষতির বণ্টন নিশ্চয়ই একই অনুপাতেই করা উচিত। আর্থিক দায়ভারের ব্যাপারটা "মুওয়াফাদা"য় নিঃশর্ত আর “ইনানে" সাধারণত শর্তাধীন।

মুদারাবা বা কমেন্ডা আরেক ধরনের ব্যবসায়িক কারবার। এই ব্যবস্থায় কোনো বিনিয়োগকারী বা বিনিয়োগকারীদের দল পুঁজি বা ব্যবসাপণ্যের দায়িত্ব অর্পণ করে একজন প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপকের কাছে। সে এটি নিয়ে ব্যবসায় করবে এবং মূলধন ও পূর্বনির্ধারিত লভ্যাংশ বিনিয়োগকারী (দে)র কাছে ফিরিয়ে দেবে (Udovitch, ১৯৭০)। শ্রমের প্রতিদানস্বরূপ প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপক পাবে মুনাফার বাকি অংশটি। ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা কিংবা অসফল ব্যবসায়িক কারবারের কারণে যা কিছু ক্ষতি হয়, তার পুরোটাই বহন করবে বিনিয়োগকারী (গণ)। এ ধরনের কোনো ক্ষতির দায়ভার প্রতিনিধি-ব্যবস্থাপকের না। ব্যয়কৃত সময় ও প্রচেষ্টাটুকুই তার ক্ষতি (Udovitch, 1970)। ইসলামের আগে থেকেই আরবে প্রচলিত কমেন্ডা ব্যবস্থা আরবিতে তিনটি আলাদা পরিভাষায় পরিচিত: মুদারাবা, কিরাদ, ও মুকারাদা। কিন্তু তিনটি পরিভাষার অর্থ একই। পার্থক্যটি অর্থতত্ত্ব-ভিত্তিক এবং ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে প্রভাবিত ভাষাগত বৈচিত্র্যের ফল। প্রাক-ইসলামি মুদারাবাকে নবি * অনুমোদন দেন এবং তা ইসলামিভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক প্রকারে পরিণত হয়। তা ছাড়া মুদারাবাতে ধর্মীয় পার্থক্য কোনো বাধা নয়। শরীয়ত মান্য করার শর্তে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে-কেউ কমেন্ডা চুক্তিতে জড়িত হতে পারে।

কায়রো জেনিযা নথি থেকে দেখা যায়, শারিকাহ-অংশীদারত্ব বা মুদারাবা-কমেন্ডা চুক্তি চূড়ান্ত করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে (Goitein, 1967):
➡ ১. চুক্তিকারীদের সংখ্যা ও অবস্থা;
➡ ২. চুক্তির বিষয়বস্তু ও এর লক্ষ্যসমূহ;
➡ ৩. অংশীদারদের অবদানের ধরন ও পরিমাণ (পুঁজি, পণ্য, শর্ত ও কাজ) এবং প্রত্যেক অংশীদারের সুনির্দিষ্ট অধিকার ও সুবিধাদি;
➡ ৪. লাভ ও ক্ষতিতে অংশীদারদের অংশ এবং বিনিয়োগকৃত পুঁজির ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব;
➡ ৫. অংশীদারত্বের ব্যয়সমূহ ও অংশীদারদের খরচ সংক্রান্ত শর্তাবলি;
➡ ৬. স্বার্থের সংঘাত; একইরকম অন্য শারিকাহ ও মুদারাবায় অংশীদাররা অংশ নিতে পারবে কি না;
➡ ৭. অংশীদারত্বের মেয়াদকাল, যদি না সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্যোগ হয়ে থাকে;
➡ ৮. মধ্যবর্তী হিসেবের প্রয়োজন থাকলে চূড়ান্ত হিসেবের তারিখ;
➡ ৯. কোনো ধরনের বিশেষ শর্তাবলি;
➡ ১০. ঘটনাক্রমে, কোনো নির্দিষ্ট শর্তের অনুপস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য- সংক্রান্ত স্থানীয়ভাবে প্রচলিত শরীয়াহ-সম্মত নিয়মকানুন প্রযুক্ত হবে।

বাণিজ্যের ভৌগোলিক এলাকা বেড়ে যাওয়ার ফলে বেশ কিছু আর্থিক বিষয় নতুন করে প্রবর্তিত হয় কিংবা অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে খানিকটা পরিবর্তন করে গৃহীত হয়। আরবি "রুক'আ” শব্দটির অর্থ কাগজের টুকরা বা লেখার সরঞ্জাম। এটি দিয়ে পে-অর্ডার বোঝানো হয়। "সাক্” অর্থ জারিকৃত দলীল বা নথি। এটি দিয়ে বোঝানো হয় ব্যাংকারের ওপর আরোপিত পে-অর্ডার, যার সাথে টাকা আদায়কারীর অ্যাকাউন্ট রয়েছে। "সাফতাজা” এরকম আরেকটি বিষয়, যার অর্থ হুণ্ডি। মুসলিম ফকিহগণ বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে এটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন। ফকিহদের মতে সাফতাজার সংজ্ঞা হলো, পরিবহনের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য অন্য কোনো স্থানে বা অন্য কোনো দেশে ঋণের টাকা পরিশোধ করার প্রক্রিয়া। টাকা পরিবহনের বিবিধ ঝুঁকি রয়েছে। মজুরি জাতীয় কোনো আর্থিক প্রতিদান ছাড়াই ঋণগ্রহীতাকে এসব ঝুঁকির পুরোটা বহন করতে হয়। তাই মুসলিম ফকিহগণ সাফতাজাকে ঋণগ্রহীতার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করেন। পক্ষান্তরে, অন্য কোনো স্থানে বা দেশে ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেওয়াটা ঋণদাতার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তাই ফকিহগণ সাফতাজার ব্যবহারের ওপর কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেন। প্রথমত, যদি তা ঋণদাতার উপকারের কারণ হয়ে ঋণগ্রহীতার ক্ষতি করে, তাহলে তা হারাম; দ্বিতীয়ত, যদি ঋণদাতার কোনো উপকার না হয়েও ঋণগ্রহীতার উপকারের কারণ হয় এবং অন্যদেশে ঋণ পরিশোধের শর্ত ঋণদাতা কর্তৃক অনুমোদিত হয়, তাহলে তা হালাল; তৃতীয়ত, যদি তা ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের উপকার করে, তাহলে তা হালাল (আল-মিসরি, ১৯৮৪)।

"আল-হাওয়ালা” হলো সাফতাজার কাছাকাছি একটি বিষয়। এখানে ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধের দায়ভার হস্তান্তর করে দেয় নিজের ঋণগ্রহীতার কাছে অথবা মূল ঋণদাতাকে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে, এমন তৃতীয় কারও কাছে। এখানে দুইজনের বদলে তিন বা ততোধিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট। এটি আধুনিক বিনিময়-রশিদের অনুরূপ এবং এখান থেকেই বিল অব এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে প্রণোদনা বোঝাতে ফ্রেঞ্চ "অ্যাভাল" শব্দটির উদ্ভব।

সাফতাজা "বাহককে পরিশোধযোগ্য" হিসেবে জারি করা হতো। সাফতাজার ব্যবহার বেশ ভালোমতোই বিকশিত হয়, বিশেষত স্বয়ং মিশরের ভেতর, মিশর ও তার পার্শ্ববর্তী প্রাচ্যীয় প্রতিবেশীদের মাঝে, এবং কায়রো ও বাগদাদের মতো আন্তর্জাতিক কেন্দ্রসমূহের মাঝে (Goitein, 1967)1

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00