📄 ইসলামি নগরায়ন
নবি -এর হিজরতের পর মদীনায় মসজিদে নববির স্থাপনাকে ইসলামি নগরায়ণের প্রথম চিহ্ন বলা চলে। মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থানই ছিল না, সেইসাথে ছিল একটি শিক্ষাকেন্দ্র এবং যুদ্ধ ও শান্তি সর্বাবস্থায় আলোচনার উদ্দেশ্যে মুসলিমদের সমাবেশস্থল। তা ছাড়া ইসলামে মসজিদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তা হলো বণ্টনের আগ পর্যন্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সংগ্রহশালা হিসেবে। ইসলাম এবং ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্য যেরকম, মসজিদের সাথে মন্দির-চার্চের পার্থক্যটাও ঠিক সেরকমই-ইসলাম যেখানে একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক ব্যবস্থাও, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্ম সেখানে শুধুই ধর্মীয়। মসজিদ তাই মুসলিম নগরীর প্রাণকেন্দ্র, যাকে একটি ভিত্তি হিসেবে ধরে নগরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্য ভিত্তিগুলো হলো বাজার এবং পরবর্তী যুগে সরকারি দপ্তর তথা 'দারুল খিলাফাত'। ইসলামি বিজয়াভিযানের ফলে নতুন নগর স্থাপনের প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর প্রথমটি স্থাপিত হয় খলিফা উমর -এর শাসনামলে।
উমর ভাবলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য আলাদা নগর নির্মাণ করলে তা সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণ উভয়ের মাঝে শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হবে। তাই সেনাদল ও তাদের পরিবারবর্গের আবাসনের জন্য খলিফা উমর বিশেষ নগর নির্মাণের আদেশ দেন (আত-তাবারি)। এসব শহরের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কুফা, যা নির্মিত হয় ফুরাত নদীর ধারে আল-হিরার কাছে। আরেকটি নগর বসরা, যা কৌশলগতভাবে পারস্য উপসাগরের একদম মাথায় নির্মাণ করা হয়েছে মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সহজ যোগাযোগের জন্য। তৃতীয় আরেকটি নগর ফুস্তাত, এটি মিশরে নীল বদ্বীপের নিচে প্রতিষ্ঠিত। উমরের এই উদ্যোগকে তার পরবর্তী খলিফাগণও অনুসরণ করেন। উমাইয়্যা শাসনামলে ইরাকে প্রতিষ্ঠিত হল মাউসিল ও ওয়াসিত। উত্তর আফ্রিকায় কাইরাওয়ান (তিউনিসিয়া) স্থাপিত হয়, যাতে উত্তর আফ্রিকান উপকূলে ইসলামি সম্প্রসারণের জন্য সামরিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে এটি। তবে ইরানের মতো অন্যান্য এলাকায় মুসলিমরা শহর ও নগরগুলোর প্রান্তেই বসতি স্থাপন করে (প্রাগুক্ত)।
আব্বাসি শাসনামলে ৭৬২ সালে এমন এক শহর প্রতিষ্ঠার জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইতিহাসের এক অনন্য স্থান দখল করে রাখবে, তা হলো বাগদাদ। আব্বাসিদের রাজধানী হিসেবে বাছাইকৃত এই শহরটি তিনটি নদীপথ ও দুটি স্থলপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই আব্বাসি খলিফা আল-মানসুরের ভাষ্যমতে এই শহরটি ছিল "এক অসাধারণ সামরিক ঘাঁটি।” তা ছাড়া "এখানে আছে দজলা নদী, যা আমাদের চীন পর্যন্ত ভূমির সাথে সংযুক্ত করে। সাগর যা কিছুর জন্ম দেয়, সেই সবকিছুকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। সাথে আসে মেসোপটেমিয়া, আরমেনিয়া ও তার আশপাশের খাদ্যসামগ্রী। সিরিয়া, আর-রাক্কা এবং এর সংলগ্ন ভূমিগুলোর যা কিছু দেবার আছে, সেগুলো নিয়ে আসার জন্য আরও রয়েছে ফুরাত নদী” (আত-তাবারি, Hitti, 1963)। নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে "শান্তির নগর” বাগদাদের আকৃতি হয়ে যায় তৎকালীন রোম ও কন্সটান্টিনোপলের মিলিত আকারের সমান। আর উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকের প্যারিসের সমান (Hitti, 1963)।
নতুন নতুন শহরের প্রতিষ্ঠার ফলে সেগুলোর ভেতরে ও আশপাশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। সৈনিকদের খাওয়া-পরা আছে, আরও আছে অস্ত্র উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা। কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়। কুফার চারপাশের কুয়া থেকে পানি নিয়ে চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়। পুনরুদ্ধার করা হয় বসরার পূর্বদিকের লোনাপানি-প্লাবিত উপকূলীয় তৃণভূমি। ইরানে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। এর ফলে কৃষিব্যবস্থা উন্নত হয়, বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসে (Lapidus, 1988)। তা ছাড়া, এই প্রবৃদ্ধির ফলে নানারকম শিল্পদক্ষতা ও গুণসম্পন্ন অনারবরা আকৃষ্ট হয় এখানে এসে বসতি স্থাপনের জন্য। এর ফলে আরব ও অনারব অধিবাসীদের সমন্বয় ঘটে এবং নগরের জনসমাজ আরও বহুজাতিক ধাঁচের একটি কাঠামো লাভ করে। তা ছাড়া বসতি স্থাপনের ফলে বেদুইন হয়ে ওঠে তুলনামূলক থিতু একজন মানুষ। যেমন, বসরা হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক রাজধানী, পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্র এবং ইরান, ভারত, চীন ও আরবের সাথে সংযুক্ত একটি বাণিজ্যিক নগরী। আরব অভিবাসীরা হয়ে যায় বণিক, ব্যবসায়ী ও কারিগর (Lapidus, 1988)।