📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন দপ্তর

📄 রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন দপ্তর


রাষ্ট্রীয় নিবন্ধনের সূচনাকারী বলা চলে খলিফা উমর-কে। ইরাক ও বৃহত্তর সিরিয়া বিজয়ের পর ভূমিকর খারাজ থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব মুসলিম জনগণের মাঝে সঠিকভাবে বণ্টনের উদ্দেশ্যে খলিফা উমর একটি নিবন্ধন দপ্তর প্রতিষ্ঠিত করেন (আত-তাবারি)। নিবন্ধন তালিকার একদম শুরুতে ছিলেন নবি -এর আত্মীয়গণ, তারপর আগে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমগণ, তারপর পরবর্তীকালে ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিবর্গ। অর্থের পরিমাণেও একইভাবে তারতম্য ঘটে। আগের অধ্যায়েই উদ্ধৃত করা হয়েছে উমরের বিখ্যাত উক্তি, “নবিজির বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ও নবিজির পাশে থেকে যুদ্ধকারীকে আমি সমান ভাতা দেবো না।” (কিতাবুল খারাজ)

উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগে রাষ্ট্রীয় সম্প্রসারণের ফলে প্রশাসন ব্যবস্থা যেরকম জটিল হয়ে ওঠে, তার ফলে নতুন এক প্রশাসনপদ্ধতি প্রবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। উপরোল্লিখিত ডাকদপ্তরের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন নতুন প্রশাসনিক দপ্তর: বার্তাবিভাগ দিওয়ানুর রাসাইল, এবং সিলমোহর বিভাগ দিওয়ানুল খাতাম (আত-তাবারি)।

বার্তাবিভাগের প্রধান কাজ ছিল:
➡ (ক) খলিফা এবং প্রাদেশিক প্রশাসকদের মাঝে বার্তা আদানপ্রদান তত্ত্বাবধান করা,
➡ (খ) খলিফার চিঠিপত্রের অনুলিপি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যত ব্যবহারের জন্য বিশেষ নথিতে সংরক্ষণ করা,
➡ (গ) রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণশালার তদারকি, এবং
➡ (ঘ) প্রজাদের প্রতি খলিফার জারি করা ঘোষণা ও আদেশ সুবিন্যস্ত করা (প্রাগুক্ত)।

এই বিভাগের প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন এবং খলিফার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ ছিলেন। প্রদেশ থেকে আসা তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। কারণ এতে রাষ্ট্রেই আইনশৃঙ্খলার অবস্থার প্রতিফলন এবং প্রজাদের মাঝে সম্ভাব্য অসন্তোষের আগাম সতর্কবার্তা থাকে। সে বিচারে ডাকসেবাকে দেখা চলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের সমার্থক হিসেবে। বার্তাবিভাগের মতোই মুআবিয়া প্রতিষ্ঠা করেন সিলমোহর বিভাগ, যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় নথির নিয়ন্ত্রণ। এর লক্ষ্য ছিল: (ক) খলিফার অনুমোদনমূলক সিলছাপ্পড়ের অপব্যবহার রোধ করা, (খ) খলিফার চিঠিপত্র যথাযথভাবে মুখবন্ধ এবং বিশেষ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত থাকা নিশ্চিতকরণ এবং ফলে, (গ) চিঠির বাহক যেন চিঠি খুলে কিছু পরিবর্তিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এই বিভাগের প্রধানও তার দায়িত্বের সংবেদনশীলতার কারণে খলিফার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ ছিল (আত-তাবারি)।

প্রশাসন ব্যবস্থা আব্বাসিদের অধীনে আরও পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। প্রশাসনের কার্যগত শ্রেণিবিভাগ একই থাকে। তবে ডাকবিভাগ, বার্তাবিভাগ, সিলমোহর বিভাগ, সেনাবিভাগ, অর্থবিভাগ, ও খলিফার আবাসন ব্যয়বিভাগকে আবার প্রাদেশিক দপ্তর ও কেন্দ্রীয় দপ্তরে বিভক্ত করা হয়। প্রাদেশিক দপ্তরগুলোর উদ্দেশ্য ছিল প্রদেশের বিষয়াদিতে প্রশাসকদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করা। আর কেন্দ্রীয় দপ্তরের উদ্দেশ্য রাজধানীতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রত্যেক প্রদেশের বিষয়াদির ওপর নজরদারিতে সহায়তা করা (Hassan, 1959)। রাজধানী ও প্রদেশের দপ্তরগুলো আবার দুটি প্রধান উপদপ্তরে বিভক্ত ছিল: প্রশাসনিক দপ্তর বা দিওয়ানুল আল এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর বা দিওয়ানুল যিমাম। প্রথমটি প্রশাসনিক বিষয়াদির সাথে সংশ্লিষ্ট, যেমন কর আদায়ের ব্যবস্থাপনা। আর দ্বিতীয়টির কাজ আর্থিক এবং হিসাব নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে। খলিফার প্রতিনিধির কাছে দায়বদ্ধ একজন করে স্বাধীন কর্মকর্তা প্রতিটি উপদপ্তরের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিল। এখান থেকে বোঝা যায় যে, তৎকালীন সরকার একেক ধরনের দায়িত্বের জন্য দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব স্বীকার করত।

বর্তমান সময়ে যাকে আমরা কেন্দ্রীয় হিসাবনিরীক্ষণ দপ্তর বলি, সেরকম একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসি খলিফা আল-মাহদি (৭৭৫-৭৮৫)। এটি তার সময়কালের এক লক্ষণীয় অগ্রগতি। রাষ্ট্রের আর্থিক নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সুবিন্যস্ত হয় এর ফলে। নতুন এই বিভাগের প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আল-মাহদির সহকারী উন্ন ইবনু রাবীআকে, যিনি আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর তদারকির জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। ইবনু রাবীআ এমন একটি স্বাধীন দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলেন, যা সরাসরি তার কাছে জবাবদিহি করবে। এর ফলে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কাজকর্মের ওপর শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ চর্চা করতে পারবেন তিনি। তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দিওয়ানুল যিম্মাহ (যিমাম-এর বহুবচন), যা আধুনিক সময়ের কেন্দ্রীয় হিসাবনিরীক্ষণ দপ্তরের সমতুল্য। দিওয়ানুল যিম্মাহর প্রধান খলিফার প্রতিনিধির কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ। সরাসরি সংযুক্তির ফলে এই দপ্তর ও এর কর্মচারীদের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যেমন, তেমনি প্রাদেশিক পর্যায়েও। উভয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ থেকেও স্বাধীন থাকে তারা। মোটকথা, রাষ্ট্রে দুই ধরনের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ছিল: অভ্যন্তরীণ হিসাবনিরীক্ষণ, এবং বাহ্যিক হিসাবনিরীক্ষণ। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণটি ছিল প্রাদেশিক প্রশাসকদের উপকারের জন্য। প্রদেশের কর্মকর্তারাই এ দায়িত্ব পালন করতেন। আর বহিঃনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের উপকারের জন্য, যে দায়িত্ব পালন করতেন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাধীন কর্মকর্তাবৃন্দ। মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক যুগের আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও অনুরূপ একটি দ্বৈত-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে: অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। প্রথমটি করা হয় তথ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারকারীদের উপকারের জন্য, যারা প্রধানত সংগঠন ব্যবস্থাপক। আর দ্বিতীয়টি করা হয় তথ্যের বাহ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য, যারা মূলত মালিক ও অংশীদার।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আরবিকরণ

📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আরবিকরণ


রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আরবিকরণের কৃতিত্ব দেওয়া হয় উমাইয়্যা খলিফা আবদুল মালিক (৬৮৫-৭০৫) এবং তার ছেলে আল-ওয়ালিদকে (৭০৫-৭১৫) (আত-তাবারি)। প্রক্রিয়াটি ছিল দুটি জিনিসের সমন্বয়: বিভিন্ন নথির ভাষা গ্রিক ও পারসিক থেকে আরবিতে পরিবর্তন, এবং আরব রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের একটি কাঠামো সৃষ্টি করা। রাষ্ট্রীয় নথির ভাষা পরিবর্তনের ফলে:
(ক) রাষ্ট্র প্রশাসনের আরবীয় চরিত্র জোরদার হয়,
(খ) রাষ্ট্রীয় নথি ব্যবস্থাপনায় অমুসলিম বা অনারব মুসলিমদের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসে বা নির্মূল হয়,
(গ) অনারব মুসলিমদের মাঝে আরবি ভাষার প্রসার ঘটে,
(ঘ) আরবি লেখনী ও চারুলিপির বিকাশ ঘটে, এবং
(ঙ) প্রশাসনিক পদসমূহ আরব ও আরবিভাষী মুসলিমদের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

খলিফা আবদুল মালিক এবং তার পরে আল-ওয়ালিদ বইপুস্তক গ্রিক ও পারস্য থেকে আরবি ভাষায় রূপান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তন ইরাকে ৬৯৭ সালে, সিরিয়া ও মিশরে ৭০০ সালে এবং তার কিছুকাল পরেই খুরাসানে বাস্তবায়িত হয় (Lapidus, 2002)। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারাও ছিলেন এই আরবিকরণ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। আরব রাষ্ট্রের প্রথমদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো পালন করতেন গ্রিক ও পারস্য-ভাষী কর্মকর্তাগণ। বিগত সাম্রাজ্যের সময়কাল থেকে এই দায়িত্বে থাকায় নতুন সরকারের সময়েও তারাই বহাল ছিলেন। কিন্তু ৭০০ সালের মধ্যে আরবিভাষী কর্মকর্তাদের এক নতুন প্রজন্ম ক্ষমতায় আসে। তাদের ওয়ারিশরাই দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরব-মুসলিম সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেন (প্রাগুক্ত)।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুদ্রাব্যবস্থা সংস্কার

📄 মুদ্রাব্যবস্থা সংস্কার


মুদ্রাব্যবস্থা পরিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নিজেদের রাজনৈতিক স্বনির্ভরতার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রধানদের ক্রমাগত উপলব্ধি এবং নিজ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদর্শনের একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা বোধ করার ফলেই সবসময় এই পরিবর্তনগুলো আসে। অবশ্য এরকম উপলব্ধি অর্জনের পেছনে অনেকগুলো নিয়ামক কাজ করে থাকে। নবি ﷺ-এর জীবদ্দশায় তাঁর মনোযোগ ছিল একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক পতাকার অধীনে সমগ্র আরবের একত্রীকরণ এবং পার্শ্ববর্তী বাইজেন্টাইন ও রোমান সীমানায় এই রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ। প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্র তখনো নিজস্ব মুদ্রা প্রয়োজন হওয়ার মতো আকার বা জটিলতা লাভ করেনি। তা ছাড়া তখন তাদের মুদ্রা পারস্য ও বাইজেন্টাইন ভূমিতে কার্যকর হওয়ার মতো পরিস্থিতিও হয়নি। খলিফা উমরের সময়ে রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের পর তিনি মুদ্রা পরিবর্তনের পথে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন প্রচলিত মুদ্রার ওপর আরবি ও কুরআনীয় লিপি অঙ্কনের মাধ্যমে। আরব মুদ্রা আবির্ভূত হতে শুরু করে উমাইয়্যা শাসনামলে (আত-তাবারি)। উমাইয়্যা খলিফা আবদুল মালিক হলেন সেই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ৬৯৫ সালে আরবি স্বর্ণ দিনার ও রৌপ্য দিরহামের সূচনা করেন (প্রাগুক্ত)। এটি রাষ্ট্র প্রশাসনের বৃহত্তর আরবিকরণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

আবদুল মালিকের সময়কালীন মুদ্রাগত পরিবর্তন বা সংস্কারটি ছিল উমাইয়্যা খলিফার হাতে একটি সুদৃঢ় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি প্রতিফলন। এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ধরনের ফলাফলই ছিল। এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো (Hitti, 1963):
➡ ক) নিজস্ব স্বাধীন মুদ্রার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন ঘটানো।
➡ খ) পারস্যে পারসিক মুদ্রা এবং সিরিয়া ও মিশরে রোমান মুদ্রার মাধ্যমে কর সংগ্রহ না করে একটি একক মুদ্রার মাধ্যমে সব কর আদায় করা।
➡ গ) অর্থ-বিনিময়কারীদের প্রয়োজনীয়তার ওপর আরও জোর দেওয়া। কারণ চলমান মুদ্রাব্যবস্থার সাথে নতুন মুদ্রার তুলনামূলক মূল্য তারাই সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। এবং
➡ ঘ) বিভিন্ন আর্থিক সরঞ্জামের প্রসার। যেমন "রুকআ”, অর্থ পরিশোধের একধরনের আদেশপত্র; "সাক্”, ব্যাংকারের কাছ থেকে গৃহীত মুদ্রার স্মারক, যার সাথে গ্রহীতার হিসাব রয়েছে, এবং এখান থেকেই ইউরোপীয় ভাষায় “চেক” শব্দটি আসে; এবং “হাওয়ালাহ”, এক ধরনের বিনিময়-বিল, যার মাধ্যমে ঋণী তার ঋণকে মূল ঋণকারীর কাছে অথবা মূল ঋণদাতাকে অর্থ পরিশোধ করতে পারে, এমন কারও কাছে হস্তান্তরিত করে, (Goitein, 1967)। নিয়ে তা আলোচিত হবে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইসলামি নগরায়ন

📄 ইসলামি নগরায়ন


নবি -এর হিজরতের পর মদীনায় মসজিদে নববির স্থাপনাকে ইসলামি নগরায়ণের প্রথম চিহ্ন বলা চলে। মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থানই ছিল না, সেইসাথে ছিল একটি শিক্ষাকেন্দ্র এবং যুদ্ধ ও শান্তি সর্বাবস্থায় আলোচনার উদ্দেশ্যে মুসলিমদের সমাবেশস্থল। তা ছাড়া ইসলামে মসজিদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তা হলো বণ্টনের আগ পর্যন্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সংগ্রহশালা হিসেবে। ইসলাম এবং ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্য যেরকম, মসজিদের সাথে মন্দির-চার্চের পার্থক্যটাও ঠিক সেরকমই-ইসলাম যেখানে একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক ব্যবস্থাও, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্ম সেখানে শুধুই ধর্মীয়। মসজিদ তাই মুসলিম নগরীর প্রাণকেন্দ্র, যাকে একটি ভিত্তি হিসেবে ধরে নগরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্য ভিত্তিগুলো হলো বাজার এবং পরবর্তী যুগে সরকারি দপ্তর তথা 'দারুল খিলাফাত'। ইসলামি বিজয়াভিযানের ফলে নতুন নগর স্থাপনের প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর প্রথমটি স্থাপিত হয় খলিফা উমর -এর শাসনামলে।

উমর ভাবলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য আলাদা নগর নির্মাণ করলে তা সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণ উভয়ের মাঝে শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হবে। তাই সেনাদল ও তাদের পরিবারবর্গের আবাসনের জন্য খলিফা উমর বিশেষ নগর নির্মাণের আদেশ দেন (আত-তাবারি)। এসব শহরের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কুফা, যা নির্মিত হয় ফুরাত নদীর ধারে আল-হিরার কাছে। আরেকটি নগর বসরা, যা কৌশলগতভাবে পারস্য উপসাগরের একদম মাথায় নির্মাণ করা হয়েছে মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সহজ যোগাযোগের জন্য। তৃতীয় আরেকটি নগর ফুস্তাত, এটি মিশরে নীল বদ্বীপের নিচে প্রতিষ্ঠিত। উমরের এই উদ্যোগকে তার পরবর্তী খলিফাগণও অনুসরণ করেন। উমাইয়্যা শাসনামলে ইরাকে প্রতিষ্ঠিত হল মাউসিল ও ওয়াসিত। উত্তর আফ্রিকায় কাইরাওয়ান (তিউনিসিয়া) স্থাপিত হয়, যাতে উত্তর আফ্রিকান উপকূলে ইসলামি সম্প্রসারণের জন্য সামরিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে এটি। তবে ইরানের মতো অন্যান্য এলাকায় মুসলিমরা শহর ও নগরগুলোর প্রান্তেই বসতি স্থাপন করে (প্রাগুক্ত)।

আব্বাসি শাসনামলে ৭৬২ সালে এমন এক শহর প্রতিষ্ঠার জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইতিহাসের এক অনন্য স্থান দখল করে রাখবে, তা হলো বাগদাদ। আব্বাসিদের রাজধানী হিসেবে বাছাইকৃত এই শহরটি তিনটি নদীপথ ও দুটি স্থলপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই আব্বাসি খলিফা আল-মানসুরের ভাষ্যমতে এই শহরটি ছিল "এক অসাধারণ সামরিক ঘাঁটি।” তা ছাড়া "এখানে আছে দজলা নদী, যা আমাদের চীন পর্যন্ত ভূমির সাথে সংযুক্ত করে। সাগর যা কিছুর জন্ম দেয়, সেই সবকিছুকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। সাথে আসে মেসোপটেমিয়া, আরমেনিয়া ও তার আশপাশের খাদ্যসামগ্রী। সিরিয়া, আর-রাক্কা এবং এর সংলগ্ন ভূমিগুলোর যা কিছু দেবার আছে, সেগুলো নিয়ে আসার জন্য আরও রয়েছে ফুরাত নদী” (আত-তাবারি, Hitti, 1963)। নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে "শান্তির নগর” বাগদাদের আকৃতি হয়ে যায় তৎকালীন রোম ও কন্সটান্টিনোপলের মিলিত আকারের সমান। আর উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকের প্যারিসের সমান (Hitti, 1963)।

নতুন নতুন শহরের প্রতিষ্ঠার ফলে সেগুলোর ভেতরে ও আশপাশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। সৈনিকদের খাওয়া-পরা আছে, আরও আছে অস্ত্র উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা। কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়। কুফার চারপাশের কুয়া থেকে পানি নিয়ে চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়। পুনরুদ্ধার করা হয় বসরার পূর্বদিকের লোনাপানি-প্লাবিত উপকূলীয় তৃণভূমি। ইরানে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। এর ফলে কৃষিব্যবস্থা উন্নত হয়, বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসে (Lapidus, 1988)। তা ছাড়া, এই প্রবৃদ্ধির ফলে নানারকম শিল্পদক্ষতা ও গুণসম্পন্ন অনারবরা আকৃষ্ট হয় এখানে এসে বসতি স্থাপনের জন্য। এর ফলে আরব ও অনারব অধিবাসীদের সমন্বয় ঘটে এবং নগরের জনসমাজ আরও বহুজাতিক ধাঁচের একটি কাঠামো লাভ করে। তা ছাড়া বসতি স্থাপনের ফলে বেদুইন হয়ে ওঠে তুলনামূলক থিতু একজন মানুষ। যেমন, বসরা হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক রাজধানী, পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্র এবং ইরান, ভারত, চীন ও আরবের সাথে সংযুক্ত একটি বাণিজ্যিক নগরী। আরব অভিবাসীরা হয়ে যায় বণিক, ব্যবসায়ী ও কারিগর (Lapidus, 1988)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00