📄 ডাকসেবার প্রচলন
ডাকব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল খলিফাকে তার প্রাদেশিক প্রশাসকদের সাথে দ্রুত ও সুসংগঠিত উপায়ে সংযুক্ত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সেবা করা। কিন্তু ভালোরকম খরচের বিনিময়ে সাধারণ জনগণের কাছেও এই সেবা বর্ধিত করা হয়। বিভিন্ন সড়কে বারো মাইল দূরত্ব পরপর ডাককেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখানে তাগড়া প্রাণী প্রস্তুত থাকত ডাক বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পারস্যের জন্য খচ্চর আর ঘোড়া, সিরিয়া ও আরবের জন্য উট। আকাশ ডাকব্যবস্থার মাধ্যম হিসেবে কবুতরও ব্যবহৃত হয়েছে। ডাকব্যবস্থা রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়। এমনকি উমাইয়্যা খলিফা আবদুল মালিক (৬৮৫-৭০৫) তার এক উজিরকে বলেছেন, "প্রশাসনিক বিষয়াদির সবকিছুই আমি আপনার হাতে অর্পণ করে দিচ্ছি। শুধু চারটি জিনিস বাদে: মুআযযিন, কারণ সে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী; রাতের ঘোষক, কারণ তার ঘোষণা এতটা জরুরি না হলে সে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়েই কাটাতে পারত; ডাকব্যবস্থা, কারণ ডাক পৌঁছাতে দেরি হলে মানুষের পরিকল্পিত যাত্রা ভণ্ডুল হয়ে যায়; এবং খাদ্যসামগ্রী" (Hassan, 1959)।
আব্বাসি যুগে ডাকসেবাকে আরও সুসংগঠিত করা হয়। রাস্তার নকশা রাখা হতো রাজধানী বাগদাদে প্রধান ডাকদপ্তরে। এর ফলে মুসাফির, বণিক, হজযাত্রী এবং পরবর্তীকালে ভৌগোলিক গবেষকগণ উপকৃত হন। ডাকসেবার ফলে শুধু যে চিঠিপত্রই আদান-প্রদান করা যেত, তা-ই নয়। কোনো সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বা প্রশাসকের দায়িত্বে অবহেলার খবরও পৌঁছে যেত খলিফার কাছে। ডাকব্যবস্থার গুরুত্বের কারণে এই সেবাকে সুবিন্যস্ত করার জন্য আব্বাসি সরকারের আমলে একটি বিশেষ সরকারি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ডাকবিভাগের প্রধান কর্মকর্তা সাহিবুল বারীদের ভূমিকা শুধু ডাকবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভূমিকা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান, সাহিবুল বারীদ ওয়াল আখবার। তিনি খলিফার কাছে জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ। আর তার কাছে জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ স্থানীয় ডাকপ্রধানগণ। নিজ নিজ প্রদেশে এই সেবার অবস্থা সম্পর্কে তার কাছে হিসাব পেশ করবেন তারা। পাশাপাশি জানাবেন প্রাদেশিক প্রশাসকদের কাজকর্ম সম্পর্কেও। সেবাটির ব্যয়ভার বহনের জন্য সরকারি খরচও ওই অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাক দপ্তর তথা দিওয়ানুল বারীদ শিরোনামে রাষ্ট্রীয় বাজেটে বিশেষ ভাতাও সংযোজিত হয়।
📄 রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন দপ্তর
রাষ্ট্রীয় নিবন্ধনের সূচনাকারী বলা চলে খলিফা উমর-কে। ইরাক ও বৃহত্তর সিরিয়া বিজয়ের পর ভূমিকর খারাজ থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব মুসলিম জনগণের মাঝে সঠিকভাবে বণ্টনের উদ্দেশ্যে খলিফা উমর একটি নিবন্ধন দপ্তর প্রতিষ্ঠিত করেন (আত-তাবারি)। নিবন্ধন তালিকার একদম শুরুতে ছিলেন নবি -এর আত্মীয়গণ, তারপর আগে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমগণ, তারপর পরবর্তীকালে ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিবর্গ। অর্থের পরিমাণেও একইভাবে তারতম্য ঘটে। আগের অধ্যায়েই উদ্ধৃত করা হয়েছে উমরের বিখ্যাত উক্তি, “নবিজির বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ও নবিজির পাশে থেকে যুদ্ধকারীকে আমি সমান ভাতা দেবো না।” (কিতাবুল খারাজ)
উমাইয়্যা ও আব্বাসি যুগে রাষ্ট্রীয় সম্প্রসারণের ফলে প্রশাসন ব্যবস্থা যেরকম জটিল হয়ে ওঠে, তার ফলে নতুন এক প্রশাসনপদ্ধতি প্রবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। উপরোল্লিখিত ডাকদপ্তরের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন নতুন প্রশাসনিক দপ্তর: বার্তাবিভাগ দিওয়ানুর রাসাইল, এবং সিলমোহর বিভাগ দিওয়ানুল খাতাম (আত-তাবারি)।
বার্তাবিভাগের প্রধান কাজ ছিল:
➡ (ক) খলিফা এবং প্রাদেশিক প্রশাসকদের মাঝে বার্তা আদানপ্রদান তত্ত্বাবধান করা,
➡ (খ) খলিফার চিঠিপত্রের অনুলিপি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যত ব্যবহারের জন্য বিশেষ নথিতে সংরক্ষণ করা,
➡ (গ) রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণশালার তদারকি, এবং
➡ (ঘ) প্রজাদের প্রতি খলিফার জারি করা ঘোষণা ও আদেশ সুবিন্যস্ত করা (প্রাগুক্ত)।
এই বিভাগের প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন এবং খলিফার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ ছিলেন। প্রদেশ থেকে আসা তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। কারণ এতে রাষ্ট্রেই আইনশৃঙ্খলার অবস্থার প্রতিফলন এবং প্রজাদের মাঝে সম্ভাব্য অসন্তোষের আগাম সতর্কবার্তা থাকে। সে বিচারে ডাকসেবাকে দেখা চলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের সমার্থক হিসেবে। বার্তাবিভাগের মতোই মুআবিয়া প্রতিষ্ঠা করেন সিলমোহর বিভাগ, যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় নথির নিয়ন্ত্রণ। এর লক্ষ্য ছিল: (ক) খলিফার অনুমোদনমূলক সিলছাপ্পড়ের অপব্যবহার রোধ করা, (খ) খলিফার চিঠিপত্র যথাযথভাবে মুখবন্ধ এবং বিশেষ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত থাকা নিশ্চিতকরণ এবং ফলে, (গ) চিঠির বাহক যেন চিঠি খুলে কিছু পরিবর্তিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এই বিভাগের প্রধানও তার দায়িত্বের সংবেদনশীলতার কারণে খলিফার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ ছিল (আত-তাবারি)।
প্রশাসন ব্যবস্থা আব্বাসিদের অধীনে আরও পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। প্রশাসনের কার্যগত শ্রেণিবিভাগ একই থাকে। তবে ডাকবিভাগ, বার্তাবিভাগ, সিলমোহর বিভাগ, সেনাবিভাগ, অর্থবিভাগ, ও খলিফার আবাসন ব্যয়বিভাগকে আবার প্রাদেশিক দপ্তর ও কেন্দ্রীয় দপ্তরে বিভক্ত করা হয়। প্রাদেশিক দপ্তরগুলোর উদ্দেশ্য ছিল প্রদেশের বিষয়াদিতে প্রশাসকদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করা। আর কেন্দ্রীয় দপ্তরের উদ্দেশ্য রাজধানীতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রত্যেক প্রদেশের বিষয়াদির ওপর নজরদারিতে সহায়তা করা (Hassan, 1959)। রাজধানী ও প্রদেশের দপ্তরগুলো আবার দুটি প্রধান উপদপ্তরে বিভক্ত ছিল: প্রশাসনিক দপ্তর বা দিওয়ানুল আল এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর বা দিওয়ানুল যিমাম। প্রথমটি প্রশাসনিক বিষয়াদির সাথে সংশ্লিষ্ট, যেমন কর আদায়ের ব্যবস্থাপনা। আর দ্বিতীয়টির কাজ আর্থিক এবং হিসাব নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে। খলিফার প্রতিনিধির কাছে দায়বদ্ধ একজন করে স্বাধীন কর্মকর্তা প্রতিটি উপদপ্তরের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিল। এখান থেকে বোঝা যায় যে, তৎকালীন সরকার একেক ধরনের দায়িত্বের জন্য দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব স্বীকার করত।
বর্তমান সময়ে যাকে আমরা কেন্দ্রীয় হিসাবনিরীক্ষণ দপ্তর বলি, সেরকম একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসি খলিফা আল-মাহদি (৭৭৫-৭৮৫)। এটি তার সময়কালের এক লক্ষণীয় অগ্রগতি। রাষ্ট্রের আর্থিক নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সুবিন্যস্ত হয় এর ফলে। নতুন এই বিভাগের প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আল-মাহদির সহকারী উন্ন ইবনু রাবীআকে, যিনি আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর তদারকির জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন (আর-রাইয়্যিস, ১৯৭৭)। ইবনু রাবীআ এমন একটি স্বাধীন দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলেন, যা সরাসরি তার কাছে জবাবদিহি করবে। এর ফলে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কাজকর্মের ওপর শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ চর্চা করতে পারবেন তিনি। তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দিওয়ানুল যিম্মাহ (যিমাম-এর বহুবচন), যা আধুনিক সময়ের কেন্দ্রীয় হিসাবনিরীক্ষণ দপ্তরের সমতুল্য। দিওয়ানুল যিম্মাহর প্রধান খলিফার প্রতিনিধির কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ। সরাসরি সংযুক্তির ফলে এই দপ্তর ও এর কর্মচারীদের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যেমন, তেমনি প্রাদেশিক পর্যায়েও। উভয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ থেকেও স্বাধীন থাকে তারা। মোটকথা, রাষ্ট্রে দুই ধরনের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ছিল: অভ্যন্তরীণ হিসাবনিরীক্ষণ, এবং বাহ্যিক হিসাবনিরীক্ষণ। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণটি ছিল প্রাদেশিক প্রশাসকদের উপকারের জন্য। প্রদেশের কর্মকর্তারাই এ দায়িত্ব পালন করতেন। আর বহিঃনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের উপকারের জন্য, যে দায়িত্ব পালন করতেন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাধীন কর্মকর্তাবৃন্দ। মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক যুগের আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও অনুরূপ একটি দ্বৈত-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে: অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। প্রথমটি করা হয় তথ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারকারীদের উপকারের জন্য, যারা প্রধানত সংগঠন ব্যবস্থাপক। আর দ্বিতীয়টি করা হয় তথ্যের বাহ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য, যারা মূলত মালিক ও অংশীদার।
📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আরবিকরণ
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আরবিকরণের কৃতিত্ব দেওয়া হয় উমাইয়্যা খলিফা আবদুল মালিক (৬৮৫-৭০৫) এবং তার ছেলে আল-ওয়ালিদকে (৭০৫-৭১৫) (আত-তাবারি)। প্রক্রিয়াটি ছিল দুটি জিনিসের সমন্বয়: বিভিন্ন নথির ভাষা গ্রিক ও পারসিক থেকে আরবিতে পরিবর্তন, এবং আরব রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের একটি কাঠামো সৃষ্টি করা। রাষ্ট্রীয় নথির ভাষা পরিবর্তনের ফলে:
(ক) রাষ্ট্র প্রশাসনের আরবীয় চরিত্র জোরদার হয়,
(খ) রাষ্ট্রীয় নথি ব্যবস্থাপনায় অমুসলিম বা অনারব মুসলিমদের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসে বা নির্মূল হয়,
(গ) অনারব মুসলিমদের মাঝে আরবি ভাষার প্রসার ঘটে,
(ঘ) আরবি লেখনী ও চারুলিপির বিকাশ ঘটে, এবং
(ঙ) প্রশাসনিক পদসমূহ আরব ও আরবিভাষী মুসলিমদের কাছে হস্তান্তরিত হয়।
খলিফা আবদুল মালিক এবং তার পরে আল-ওয়ালিদ বইপুস্তক গ্রিক ও পারস্য থেকে আরবি ভাষায় রূপান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তন ইরাকে ৬৯৭ সালে, সিরিয়া ও মিশরে ৭০০ সালে এবং তার কিছুকাল পরেই খুরাসানে বাস্তবায়িত হয় (Lapidus, 2002)। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারাও ছিলেন এই আরবিকরণ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। আরব রাষ্ট্রের প্রথমদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো পালন করতেন গ্রিক ও পারস্য-ভাষী কর্মকর্তাগণ। বিগত সাম্রাজ্যের সময়কাল থেকে এই দায়িত্বে থাকায় নতুন সরকারের সময়েও তারাই বহাল ছিলেন। কিন্তু ৭০০ সালের মধ্যে আরবিভাষী কর্মকর্তাদের এক নতুন প্রজন্ম ক্ষমতায় আসে। তাদের ওয়ারিশরাই দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরব-মুসলিম সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেন (প্রাগুক্ত)।
📄 মুদ্রাব্যবস্থা সংস্কার
মুদ্রাব্যবস্থা পরিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নিজেদের রাজনৈতিক স্বনির্ভরতার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রধানদের ক্রমাগত উপলব্ধি এবং নিজ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদর্শনের একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা বোধ করার ফলেই সবসময় এই পরিবর্তনগুলো আসে। অবশ্য এরকম উপলব্ধি অর্জনের পেছনে অনেকগুলো নিয়ামক কাজ করে থাকে। নবি ﷺ-এর জীবদ্দশায় তাঁর মনোযোগ ছিল একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক পতাকার অধীনে সমগ্র আরবের একত্রীকরণ এবং পার্শ্ববর্তী বাইজেন্টাইন ও রোমান সীমানায় এই রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ। প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্র তখনো নিজস্ব মুদ্রা প্রয়োজন হওয়ার মতো আকার বা জটিলতা লাভ করেনি। তা ছাড়া তখন তাদের মুদ্রা পারস্য ও বাইজেন্টাইন ভূমিতে কার্যকর হওয়ার মতো পরিস্থিতিও হয়নি। খলিফা উমরের সময়ে রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের পর তিনি মুদ্রা পরিবর্তনের পথে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন প্রচলিত মুদ্রার ওপর আরবি ও কুরআনীয় লিপি অঙ্কনের মাধ্যমে। আরব মুদ্রা আবির্ভূত হতে শুরু করে উমাইয়্যা শাসনামলে (আত-তাবারি)। উমাইয়্যা খলিফা আবদুল মালিক হলেন সেই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ৬৯৫ সালে আরবি স্বর্ণ দিনার ও রৌপ্য দিরহামের সূচনা করেন (প্রাগুক্ত)। এটি রাষ্ট্র প্রশাসনের বৃহত্তর আরবিকরণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।
আবদুল মালিকের সময়কালীন মুদ্রাগত পরিবর্তন বা সংস্কারটি ছিল উমাইয়্যা খলিফার হাতে একটি সুদৃঢ় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি প্রতিফলন। এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ধরনের ফলাফলই ছিল। এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো (Hitti, 1963):
➡ ক) নিজস্ব স্বাধীন মুদ্রার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন ঘটানো।
➡ খ) পারস্যে পারসিক মুদ্রা এবং সিরিয়া ও মিশরে রোমান মুদ্রার মাধ্যমে কর সংগ্রহ না করে একটি একক মুদ্রার মাধ্যমে সব কর আদায় করা।
➡ গ) অর্থ-বিনিময়কারীদের প্রয়োজনীয়তার ওপর আরও জোর দেওয়া। কারণ চলমান মুদ্রাব্যবস্থার সাথে নতুন মুদ্রার তুলনামূলক মূল্য তারাই সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। এবং
➡ ঘ) বিভিন্ন আর্থিক সরঞ্জামের প্রসার। যেমন "রুকআ”, অর্থ পরিশোধের একধরনের আদেশপত্র; "সাক্”, ব্যাংকারের কাছ থেকে গৃহীত মুদ্রার স্মারক, যার সাথে গ্রহীতার হিসাব রয়েছে, এবং এখান থেকেই ইউরোপীয় ভাষায় “চেক” শব্দটি আসে; এবং “হাওয়ালাহ”, এক ধরনের বিনিময়-বিল, যার মাধ্যমে ঋণী তার ঋণকে মূল ঋণকারীর কাছে অথবা মূল ঋণদাতাকে অর্থ পরিশোধ করতে পারে, এমন কারও কাছে হস্তান্তরিত করে, (Goitein, 1967)। নিয়ে তা আলোচিত হবে।