📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 খলিফা উসমান এবং আর্থিক প্রশাসন

📄 খলিফা উসমান এবং আর্থিক প্রশাসন


তৃতীয় খলিফা নিজের ভাষ্যমতেই ছিলেন পূর্বসূরিদের অনুসারী। তাঁর অর্থনৈতিক নীতিমালা তাই ছিল তাঁর অব্যবহিত পূর্বসূরির নীতিমালারই ধারাবাহিকতা। সত্যি বলতে, খলিফা উমর অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালার এমন এক সুগঠিত কাঠামো রেখে গিয়েছিলেন, যেটাকে পরিবর্তিত করার কোনো যথার্থ কারণ ছিল না। তাই খলিফা উসমানের নীতিমালা যে খলিফা উমরের সাথে মিলে যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উসমানের কৃতিত্ব এখানেও যে, খলিফা উমরের শূরা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনিও নিশ্চয়ই সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে থাকবেন। বিজিত ভূমির মালিকানার ব্যাপারে বিতর্কে খলিফা উমরের সমর্থক ছিলেন উসমান (আবু ইউসুফ)।

খলিফা উসমানের শাসনকালীন সরকারি অর্থায়নের প্রধান উৎসগুলো উমরেরই ঠিক করে দিয়ে যাওয়া। সেগুলো হলো যাকাত, খুমুস (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), জিযিয়া, খারাজ, উশর (শুল্ক) এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, ব্যক্তিগত মালিক না থাকায় যা কিছু রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। সরকারি ব্যয়ও ছিল তিনটি প্রধান প্রকারের: সামাজিক কল্যাণ ও ভাতা, চলমান ব্যয় এবং বিনিয়োগ ব্যয় (মুহাম্মাদ, ১৯৮৬)।

তবে কৃষিজমির মালিকানার ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটে তৃতীয় খলিফার আমলে। পরবর্তী বহু বছর যাবত ভূমি মালিকানার কাঠামোয় এর নাটকীয় প্রভাব পড়ে চলেছে। ইসলামি বিজয়ের পর ইরাক ও সিরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া পূর্ববর্তী মালিকদের থেকে যেসব কৃষিজমি পাওয়া যায়, উসমানের শাসনামলের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র ছিল সেগুলোর মালিক। এটা ঠিক যে এসকল সাওয়াফি ভূমি সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের, এবং খলিফা উমর খুব ভালোভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক রেখেছেন। কিন্তু খলিফা উসমানের দৃষ্টিতে, এসব ভূমিকে ভাড়ার বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যক্তিদের হাতে হস্তান্তরিত করা যায়।

তৃতীয় খলিফা উসমান ভূমির মালিকানার ব্যাপারে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দরজা উন্মুক্ত করে দেন, যার ফলে পরবর্তীকালে ইসলামি সামন্ততন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সম্ভবত বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক কারণের ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকবে। তাঁর মতে:
➡ (ক) ভূমিগুলো ব্যক্তিদের দেওয়া হচ্ছে ভাড়ার ভিত্তিতে, মালিকানার ভিত্তিতে না। এই ভাড়া আরোপিত হয়েছে ভাগাভাগির মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, যেখানে পূর্ণ মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকছে।
➡ (খ) নতুন এই পদ্ধতির ফলে তত্ত্বাবধায়কের ব্যক্তিগত প্রণোদনাকে কাজে লাগানো যাবে। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং এ থেকে রাষ্ট্রের প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
➡ (গ) ব্যক্তিদের হাতে ভূমি অর্পণ করলে রাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় কমবে। কারণ সেই ভূমির ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রকে এখন আর খরচ করতে হচ্ছে না।
➡ (ঘ) ব্যক্তিগত প্রণোদনার প্রবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস করার ফলে যে অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, এর ফলে এই ভূমি থেকে প্রাপ্ত মোট আয়ের পরিমাণ বাড়বে (মুহাম্মাদ, ১৯৮৬)। এই উৎস থেকে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের যে বিপুল বৃদ্ধি ঘটে, তা থেকে উক্ত যুক্তির স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। আগে এই রাজস্বের পরিমাণ যেখানে ছিল ৪,০০০,০০০ থেকে ৯,০০০,০০০ দিরহাম এর মধ্যে, তৃতীয় খলিফার আমলে তা ৫০,০০০,০০০ দিরহাম পর্যন্ত উঠে যায় (আল-মাওয়ারদি)।

আরেকদিকে এই নতুন নীতির ফলে নানাবিধ প্রতিকূল ফলাফল দেখা দেয়:
➡ (ক) এর ফলে যে পরিস্থিতির দুয়ার খুলে যায়, সেটাকে অনেকে স্বজনপ্রীতি বলে অভিযোগ করেন,
➡ (খ) ব্যবহার করার অধিকার হস্তান্তরিত করতে গিয়ে গৃহীত প্রকল্পে জমিগুলো অনেকটাই উমাইয়্যাদের মালিকানায় চলে যায়,
➡ (গ) রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও মালিকানার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ক্রমেই ব্যক্তিদের হাতে হস্তান্তরিত করতে থাকে, সেহেতু এর ফলে সরকারি খাত সংকুচিত হয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত খাতের ভিত্তি প্রসারিত হতে থাকে, এবং
➡ (ঘ) উমাইয়্যা শাসনামলে ৮২ হিজরি সনে যে অভ্যন্তরীণ গণ্ডগোল দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্রীয় তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস নিবন্ধন নথিগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলাফল হয় মালিকানার মিথ্যে দাবি এবং ব্যক্তিদের এমনসব ভূমিতে মালিকানা দাবির ক্ষমতা, আদতে যেগুলোর মালিক তারা নয় (আল-মাওয়ারদি)।

আধুনিক অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করলে বলা যায় যে, খলিফা উসমান ছিলেন রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভূমিকার বিপরীতে বরং ব্যক্তিগতকরণের পক্ষপাতি। অপরদিকে, দ্বিতীয় খলিফা উমর ছিলেন ব্যক্তিগতকরণের বিপরীতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকার পক্ষে।

ওপরে যেমনটি বলা হলো, খলিফা উসমানের শাসনকাল শেষ হয় একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। পথভ্রষ্ট বিদ্রোহীরা তাঁর বাসভবন অবরোধ করে এবং ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে শহীদ করে।

তৃতীয় খলিফা নিজের ভাষ্যমতেই ছিলেন পূর্বসূরিদের অনুসারী। তাঁর অর্থনৈতিক নীতিমালা তাই ছিল তাঁর অব্যবহিত পূর্বসূরির নীতিমালারই ধারাবাহিকতা। সত্যি বলতে, খলিফা উমর অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালার এমন এক সুগঠিত কাঠামো রেখে গিয়েছিলেন, যেটাকে পরিবর্তিত করার কোনো যথার্থ কারণ ছিল না। তাই খলিফা উসমানের নীতিমালা যে খলিফা উমরের সাথে মিলে যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উসমানের কৃতিত্ব এখানেও যে, খলিফা উমরের শূরা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনিও নিশ্চয়ই সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে থাকবেন। বিজিত ভূমির মালিকানার ব্যাপারে বিতর্কে খলিফা উমরের সমর্থক ছিলেন উসমান (আবু ইউসুফ)।

খলিফা উসমানের শাসনকালীন সরকারি অর্থায়নের প্রধান উৎসগুলো উমরেরই ঠিক করে দিয়ে যাওয়া। সেগুলো হলো যাকাত, খুমুস (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), জিযিয়া, খারাজ, উশর (শুল্ক) এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, ব্যক্তিগত মালিক না থাকায় যা কিছু রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। সরকারি ব্যয়ও ছিল তিনটি প্রধান প্রকারের: সামাজিক কল্যাণ ও ভাতা, চলমান ব্যয় এবং বিনিয়োগ ব্যয় (মুহাম্মাদ, ১৯৮৬)।

তবে কৃষিজমির মালিকানার ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটে তৃতীয় খলিফার আমলে। পরবর্তী বহু বছর যাবত ভূমি মালিকানার কাঠামোয় এর নাটকীয় প্রভাব পড়ে চলেছে। ইসলামি বিজয়ের পর ইরাক ও সিরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া পূর্ববর্তী মালিকদের থেকে যেসব কৃষিজমি পাওয়া যায়, উসমানের শাসনামলের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র ছিল সেগুলোর মালিক। এটা ঠিক যে এসকল সাওয়াফি ভূমি সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের, এবং খলিফা উমর খুব ভালোভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক রেখেছেন। কিন্তু খলিফা উসমানের দৃষ্টিতে, এসব ভূমিকে ভাড়ার বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যক্তিদের হাতে হস্তান্তরিত করা যায়।

তৃতীয় খলিফা উসমান ভূমির মালিকানার ব্যাপারে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দরজা উন্মুক্ত করে দেন, যার ফলে পরবর্তীকালে ইসলামি সামন্ততন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সম্ভবত বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক কারণের ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকবে। তাঁর মতে:
➡ (ক) ভূমিগুলো ব্যক্তিদের দেওয়া হচ্ছে ভাড়ার ভিত্তিতে, মালিকানার ভিত্তিতে না। এই ভাড়া আরোপিত হয়েছে ভাগাভাগির মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, যেখানে পূর্ণ মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকছে।
➡ (খ) নতুন এই পদ্ধতির ফলে তত্ত্বাবধায়কের ব্যক্তিগত প্রণোদনাকে কাজে লাগানো যাবে। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং এ থেকে রাষ্ট্রের প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
➡ (গ) ব্যক্তিদের হাতে ভূমি অর্পণ করলে রাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় কমবে। কারণ সেই ভূমির ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রকে এখন আর খরচ করতে হচ্ছে না।
➡ (ঘ) ব্যক্তিগত প্রণোদনার প্রবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস করার ফলে যে অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, এর ফলে এই ভূমি থেকে প্রাপ্ত মোট আয়ের পরিমাণ বাড়বে (মুহাম্মাদ, ১৯৮৬)। এই উৎস থেকে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের যে বিপুল বৃদ্ধি ঘটে, তা থেকে উক্ত যুক্তির স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। আগে এই রাজস্বের পরিমাণ যেখানে ছিল ৪,০০০,০০০ থেকে ৯,০০০,০০০ দিরহাম এর মধ্যে, তৃতীয় খলিফার আমলে তা ৫০,০০০,০০০ দিরহাম পর্যন্ত উঠে যায় (আল-মাওয়ারদি)।

আরেকদিকে এই নতুন নীতির ফলে নানাবিধ প্রতিকূল ফলাফল দেখা দেয়:
➡ (ক) এর ফলে যে পরিস্থিতির দুয়ার খুলে যায়, সেটাকে অনেকে স্বজনপ্রীতি বলে অভিযোগ করেন,
➡ (খ) ব্যবহার করার অধিকার হস্তান্তরিত করতে গিয়ে গৃহীত প্রকল্পে জমিগুলো অনেকটাই উমাইয়্যাদের মালিকানায় চলে যায়,
➡ (গ) রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও মালিকানার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ক্রমেই ব্যক্তিদের হাতে হস্তান্তরিত করতে থাকে, সেহেতু এর ফলে সরকারি খাত সংকুচিত হয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত খাতের ভিত্তি প্রসারিত হতে থাকে, এবং
➡ (ঘ) উমাইয়্যা শাসনামলে ৮২ হিজরি সনে যে অভ্যন্তরীণ গণ্ডগোল দেখা দেয়, তখন রাষ্ট্রীয় তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস নিবন্ধন নথিগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলাফল হয় মালিকানার মিথ্যে দাবি এবং ব্যক্তিদের এমনসব ভূমিতে মালিকানা দাবির ক্ষমতা, আদতে যেগুলোর মালিক তারা নয় (আল-মাওয়ারদি)।

আধুনিক অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করলে বলা যায় যে, খলিফা উসমান ছিলেন রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ভূমিকার বিপরীতে বরং ব্যক্তিগতকরণের পক্ষপাতি। অপরদিকে, দ্বিতীয় খলিফা উমর ছিলেন ব্যক্তিগতকরণের বিপরীতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকার পক্ষে।

ওপরে যেমনটি বলা হলো, খলিফা উসমানের শাসনকাল শেষ হয় একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। পথভ্রষ্ট বিদ্রোহীরা তাঁর বাসভবন অবরোধ করে এবং ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে শহীদ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00