📄 রাষ্ট্রীয় ব্যয়
সরকারি অর্থের ব্যয়ের অংশের দিকে মনোনিবেশ করা যাক এবার। আয়ের উৎসের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের খাত বিভিন্নরকম হতে দেখা যায়। যাকাত এবং খুমুস ব্যয়িত হতো কুরআনের বিধান অনুযায়ী। জিযিয়ার রাজস্ব ছিল সাধারণ। কারণ কুরআন ও সুন্নাহতে এর খরচের কোনো পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। শুল্ক মাশুল বা উশর প্রবর্তিত হয়েছিল খলিফা উমরের শাসনামলে। তাই এর অর্থ ব্যয় করা হয় সাধারণ রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিশাল পরিমাণ আয়ের উৎস হলো খারাজ。
দ্বিতীয় খলিফার আমলে সরকারি খরচের একটি পর্যালোচনা থেকে সেটাকে তিন প্রকারে ভাগ করা যায়: সামাজিক কল্যাণমূলক ও ভাতা সংক্রান্ত ব্যয়, চলমান ব্যয় (Current expenditure) এবং বিনিয়োগ ব্যয় (Investment expenditure)। প্রথম প্রকারটি ওপরে বর্ণিত হয়েছে, তাই পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। দ্বিতীয় প্রকারটি দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যেসব রাষ্ট্রীয় ব্যয় রয়েছে, সেগুলোর সাথে সম্পর্কিত। মুসলিম সৈনিক, গভর্নর, স্থানীয় কোষাধ্যক্ষ, বিচারক ও কেরাণীদের প্রদেয় ভাতা এর অন্তর্ভুক্ত। বিনিয়োগ ব্যয়গুলো আরও স্থায়ী প্রকৃতির: সেতু নির্মাণ, রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও নদী খনন, এবং পুঁজির মুখাপেক্ষী উদ্যোক্তাদের সহায়তা (আবু উবাইদ)। জনগণের সুবিধা ও রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে উমর এতই কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন যে, ফুরাত নদী পর্যন্ত পুরো রাস্তায় কোনো খচ্চর একবার হোঁচট খেলেও তিনি সেটার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করতেন।
📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসন
উমর-এর পূর্বসূরিদের যুগে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে। উমর-এর আমলে রাষ্ট্র অনেক বেশি প্রশস্ত হয়ে যায়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড হয়ে ওঠে জটিলতর। প্রাদেশিক গভর্নরদের এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার কারণে তারা রাজধানী থেকে আদেশ আসার অপেক্ষা না করেই নিত্যদিনকার প্রাদেশিক বিষয়-আশয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে, ট্যাক্স নির্ণীত ও নির্ধারিত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে। কোনো গভর্নর নতুন কর আরোপ বা করের হার পরিবর্তন করতে পারবেন না। কিন্তু প্রাদেশিক গভর্নররা কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব প্রাদেশিক বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদ্বৃত্ত অংশটুকু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, মিশরের রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ নির্ধারিত ছিল প্রদেশের রাস্তা মেরামত, সেতু নির্মাণ এবং খাল খননের কাজের জন্য (Kettani, 1979)1
যাকাতের আয় প্রথমে প্রদেশের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে। তারপর বাকিটা পাঠিয়ে দিতে হবে মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। তাই উমরের শাসনামলের ইসলামি প্রশাসনকে বলা চলে একটি কেন্দ্রশাসিত উদার সরকারব্যবস্থা। গভর্নররা ছিলেন উমরের অব্যাহত নজরদারির অধীনে। ক্ষমতার যে-কোনো অপব্যবহারকে চরমভাবে শাস্তি প্রদান করা হতো। কোনো গভর্নর তার পদাধিকার বলে অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হয়ে থাকলে সেটার জবাবদিহিতার নীতি প্রবর্তন করেন দ্বিতীয় খলিফা। দায়িত্বের মেয়াদকাল শেষে কখনো গভর্নরকে ব্যাখ্যা করতে হতো যে, দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নিয়ে অবসরের তারিখের মধ্যে তার সম্পদে কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে থাকলে সেটা কেন ঘটেছে। বিদেশী বা প্রভাবশালী স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে গভর্নরদের কোনো আর্থিক উপহার দেওয়া হলে সেটাকে বিবেচনা করা হতো রাষ্ট্রের প্রতি উপহার হিসেবে। এমনকি সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করা হলেও। যেমন- জনৈক প্রশাসক একবার তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া উপহার এবং রাষ্ট্রকে প্রদত্ত উপহারের মধ্যে পার্থক্য করেন। উমর তাকে তিরস্কার করে জানিয়ে দেন যে, সব উপহারই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। রাগান্বিত খলিফার প্রশ্ন, "তিনি যদি গভর্নর না হয়ে বাপ-মায়ের ঘরে বসে থাকতেন, তাহলে কি এসব উপহার তাকে দেওয়া হতো!" (আস-সুয়ুতি)।
রাষ্ট্রের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রিত হতো বিভিন্ন স্থানীয় কোষাগার এবং একটি কেন্দ্রীয় কোষাগারের মাধ্যমে। প্রতিটি প্রদেশে একটি করে স্থানীয় কোষাগার স্থাপিত হতো, যার প্রধান ছিলেন একজন করে কোষাধ্যক্ষ (Treasurer)। এই কোষাধ্যক্ষ রাষ্ট্রপ্রধানের দ্বারা নিয়োগকৃত এবং গভর্নর ছাড়া অন্য কেউ হতেন। কোষাধ্যক্ষরা প্রদেশের আয় ও ব্যয়ের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। রাজধানীতে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনায় একটি কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপন করা হয়। এর প্রধান ছিলেন একজন কোষাধ্যক্ষ, রাষ্ট্রনেতা নিজে নন। কেন্দ্রীয় কোষাগারের কাজ ছিল দুই রকম: মদীনা ও এর পার্শ্ববতী অঞ্চলসমূহের স্থানীয় কোষাগার হিসেবে ভূমিকা পালন করা এবং স্থানীয় কোষাগারসমূহের মাঝে সমন্বয়কের কাজ করা। যেসব কোষাগারে উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকবে, তারা উদ্বৃত্ত অংশটুকু কেন্দ্রীয় কোষাগারে পাঠিয়ে দেবে, যাতে কোনো স্থানীয় কোষাগারে ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা যায়। অথবা কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হতো ঘাটতিবিশিষ্ট কোনো স্থানীয় কোষাগারে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।
এ ছাড়াও উমর তার শূরার পরামর্শে রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রেশন দপ্তর তথা দিওয়ান প্রবর্তন করেন (প্রাগুক্ত)। সম্ভবত সিরিয়া ও ইরাকের বিজিত ভূমিতে আগে থেকে অস্তিত্বমান নথিব্যবস্থাও এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাতা রেজিস্ট্রেশন ও খারাজ রেজিস্ট্রেশন। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে মানুষ, তাদের নাম, গোত্র, স্থান এবং তারা কতটুকু ভাতা পাবে, সেসবের নিবন্ধন। আর দ্বিতীয়টির মাঝে রয়েছে খারাজ ভূমিসমূহের জরিপ, তাদের মালিক, উর্বরতার মাত্রা, উৎপাদ, আরোপিত খারাজের পরিমাণ এবং সরকারি অর্থের কতটুকু সেই ভূমিতে খরচ হয়েছে-রাষ্ট্রের অর্থায়নের প্রধান উৎসের এক বিস্তারিত নিবন্ধন。
দশ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে ইসলামি সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক কাঠামোকে অভূতপূর্ব সেবা দেওয়ার পর মর্মান্তিকভাবে খলিফা শাহাদাতবরণ করেন। ৬৪৪ সালে একদিন নামাজের জামাতে ইমামতি করার সময় এক পারসিক দাস বিষমাখা ছুরি দিয়ে তাকে হত্যা করে। ঘাতকের পরিচয় জানার পর তিনি আল্লাহর শুকরিয়া জানান যে, কোনো মুসলিম তাকে ছুরি মারেনি (প্রাগুক্ত)। করে থাকলে সেটা মুসলিমদের মাঝে বিভেদের আশঙ্কা হিসেবে দেখা দিত। অবশ্য তাঁর মৃত্যুর বছর দশেক পর বিভেদ চলেই আসে। খলিফা উমরের আকস্মিক মৃত্যু এক সফল মুসলিম নেতার শাসনকালের অবসান ঘটায়।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারির (২৫৯৭) হাদীসে রাসূলুল্লাহ একজন যাকাত-সংগ্রাহকের ব্যাপারে এই কথা বলেছেন। প্রশাসক ও সরকারি কর্মচারীদেরকে প্রদানকৃত উপহার, যেগুলো সাধারণত ঘুষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেগুলো রাসূলুল্লাহ-এর যুগ থেকেই অবস্থা বিবেচনায় বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান ছিল। বেশ কয়েকটি হাদীসে এই প্রসঙ্গে আলাপ করা হয়েছে। দেখুন, ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার, সহীহ বুখারির ২৪৫৬ হাদীসের ব্যাখ্যা। - সম্পাদক