📄 মানুষ হিসেবে খলিফা উমর
উমরের জীবনী আবু বকরের থেকে ব্যাপকভাবে আলাদা। উমরের ব্যক্তিত্বে আবু বকরের কোমলতা, স্বভাবজাত নম্রতা, অমায়িকতা বা স্নেহশীলতা ছিল না। সাহস, শারীরিক শক্তি, নির্ভীকতা ও বীরত্বের কারণে উমর ছিলেন ভীতি ও সম্মানের পাত্র। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে মুসলিমরা তাঁকে ভয় পেত এবং ইসলাম গ্রহণের পর সমীহ করত। ইসলাম গ্রহণের ক্রমের বিচারে তিনি শুরুর দিককার মুসলিম নন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ধর্ম আবির্ভাবের প্রায় ছয় বছর পর। এখানেই শেষ না। তিনি নবি মুহাম্মাদ-কে ঘৃণা করতেন এবং মক্কার সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য তাঁকে দায়ী মনে করতেন। আপন পরিবারের সদস্য-সহ নও-মুসলিমদের তিনি শাস্তি দিতেন। কিন্তু নবি উমরের ইসলাম-গ্রহণের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ছিলেন। তিনি দুআ করেন, "হে রব, দুই উমরের যে-কোনো একজনের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন, আম্র বিন হিশাম বা উমর বিন খাত্তাব।” সেই সৌভাগ্য লাভ করেন উমর বিন খাত্তাব। যেই উমরের উদ্দেশ্য ছিল নবিজিকে হত্যা করা, সেই উমরই একদিন তাঁর কাছে এসে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”-এর সাক্ষ্য দেন। উমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনি খুবই হৃদয়কাড়া এক ঘটনা, যা বহুল পরিচিত (উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য: সীরাত ইবনু হিশাম)। ইসলাম গ্রহণের পর উমর হয়ে ওঠেন ধর্মটির শক্তিশালীতম সমর্থকদের একজন। নবিজির পর ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নেতা যদি না-ও হন, তবুও উমর শ্রেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে একজন তো অবশ্যই। তাকওয়া, যুহুদ, ন্যায় ও সুবিচারের প্রতি অটলতার ক্ষেত্রে তিনি আদর্শস্বরূপ। তাঁর বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা মুসলিমদের কাছে খুবই শ্রদ্ধেয়।
খলিফা উমরের জীবনের যে প্রধান একটি নিয়ামক তাঁর রাষ্ট্রীয় নীতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে থাকতে পারে, তা হলো ইসলামে তাঁর বিলম্বিত প্রবেশ। প্রথম দিককার বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত না হতে পারার কারণে তাঁর মনে হয়তো এক প্রকার অনুশোচনাবোধ ছিল। আগেভাগে ইসলাম গ্রহণ করা ব্যক্তিদের প্রতি তাঁর অনুরাগের মাঝে এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। বিশেষত প্রথম খলিফা আবু বকর -এর প্রতি, যিনি নবি ও তাঁর বার্তার প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রথম পুরুষ। উমরের ভাষ্য, 'ইসলামে আবু বকর সবসময় আমার চেয়ে এগিয়ে থাকতেন। এমনকি যেদিন আল্লাহর রাস্তায় অর্ধেক সম্পদ দান করে দিয়ে তাঁকে পেছনে ফেলে দেব বলে ভেবেছিলাম, সেদিনও দেখি আবু বকর নিজের পুরো সম্পদ দান করে দিয়েছেন।' (সুনানুত তিরমিযি: ৩৬৭৫)
অগ্রবর্তীদের প্রতি সম্মান-প্রদর্শনের চিন্তা থেকে মুসলিমদের নৈতিক ও আর্থিকভাবে বিচার করার ক্ষেত্রে উমরের একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় 'ইসলামে অগ্রবর্তিতা'। দ্বিতীয় খলিফা বা আমিরুল মুমিনীন হওয়ার পরও তা অপরিবর্তিত থাকে। মুসলিমদের ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যান্য মানদণ্ডের পাশাপাশি "ইসলামে অগ্রবর্তিতা" এবং নবি -এর প্রতি নৈকট্যকে প্রধান দুটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। আগে ইসলাম গ্রহণকারীরা পরবর্তীদের চেয়ে উত্তম, তাই তাঁদের পাওনা হবে বেশি। এর সপক্ষে উমরের বলা একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি, "নবিজির বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ও নবিজির পাশে থেকে যুদ্ধকারীকে আমি সমান মনে করি না” (মুসনাদুল বাযযার, মাজমাউয যাওয়াইদ: ৯৭৭২)। যেমন- উমরের এক ছেলে একবার আপত্তি জানান যে, তাঁর বাবা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অন্য একজনের চেয়ে তাঁকে কম ভাতা দিয়েছেন। উমর জবাব দেন, তার বাবার (উমর নিজে) তুলনায় ওই ব্যক্তিটির বাবা নবিজির কাছে বেশি প্রিয় ছিলেন। নবিজির অন্যান্য স্ত্রীর চেয়ে আয়িশা *-কে ২০০০ দিরহাম বেশি দেওয়ার কারণও নবি-এর সাথে আয়িশার অধিক নৈকট্য, যদিও আয়িশা সেই অতিরিক্ত অর্থ ফিরিয়ে দেন (প্রাগুক্ত)। আরেকবার কিছু মুসলিম অভিযোগ করে যে, পদ-পদবী বা গোত্রীয় ইতিহাসে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব না থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ তাদের চেয়ে বেশি ভাতা পেয়েছে। খলিফা তখন এহেন বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে ইসলামের অগ্রবর্তিতাকে বিবেচনা করার কথা উল্লেখ করলে অভিযোগকারীরা শান্ত হয় (প্রাগুক্ত)। পক্ষান্তরে, আবু বকরের ভাতা বণ্টননীতি ছিল একেবারেই আলাদা। তিনি সবাইকে সমানভাবে দিতেন। বলতেন, “ইসলামের অগ্রবর্তিতা আল্লাহর কাছে বিবেচ্য এবং তিনিই এর পুরস্কার দেবেন। কিন্তু ভাতার দেনা-পাওনা ইহজীবনের সাথে এবং এর উদ্দেশ্য মানুষের জীবনধারণে সহায়তা করা।” (প্রাগুক্ত)।
উমর-এর চিন্তাশক্তি বিশেষ প্রশংসার দাবিদার। তিনি এমনসব ফলাফল আগেভাগে অনুমান করতে পারতেন, যা খুবই অল্প মানুষই পারত। আর তিনি এমনসব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে জানতেন, যা অন্যান্য বিচক্ষণ ব্যক্তিদের বুঝে উঠতেই কষ্ট হতো। কিছু রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি নবি ও মুসলিমদের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। পরে দেখা গেল ওহি নাযিল করে উমরের মতটিকেই সমর্থন করা হয়েছে। বদরের যুদ্ধে (মুসলিম ও মক্কাবাসীদের মাঝে প্রথম যুদ্ধ) যেসব নেতৃস্থানীয় মক্কাবাসীকে বন্দি করা হয়েছিল, তাদের ব্যাপারে ঘটনাটি এর এক উদাহরণ। বন্দিদের মাঝে ছিল মক্কার বড় বড় ধনী ব্যক্তিরা। নতুন ইসলামি সমাজের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার কথা ভেবে তাদের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। উমর দ্বিমত করে বলেন যে, এদেরকে ছেড়ে দিলে তারা আরও শক্তি ও ক্ষমতা সঞ্চয় করে পুনরায় মুসলিমদের সাথে লড়াই করতে আসবে। এর বদলে বরং তাদের হত্যা করে ফেলা উচিত, যাতে শত্রুপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ওহির বার্তায় এই মুক্তিপণ গ্রহণকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করা হয়: "তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ, আর আল্লাহ চান তোমাদের পরকালের কল্যাণ." (সূরা আনফাল, ৮: ৬৭)। আরেকটি উদাহরণ হলো মদজাতীয় পানীয়ের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে উমরের দৃষ্টিভঙ্গি। কুরআনে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ধাপে ধাপে। শুরুতে মুসলিমদের বলা হয়েছে মাতাল অবস্থায় নামাজে না আসার জন্য। কিন্তু উমর এই আংশিক নিষেধাজ্ঞায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, যাতে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কালক্রমে পরিপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেই অবতীর্ণ হয় আয়াত। তা ছাড়া যে অল্প কয়জন ব্যক্তি নামাজের আহ্বান "আযানে"র ব্যাপারে আগে থেকে ভেবেছিলেন, উমর তাদের মাঝে একজন। এর মাধ্যমে অন্যান্য ধর্মের থেকে ইসলামি আহ্বান-পদ্ধতি এক অনন্যতা লাভ করে। এখানেই শেষ না। নবি -এর স্ত্রীদের পর্দা এবং সাধারণভাবে পুরুষদের থেকে তাঁদের আলাদা থাকার সুপারিশও উমরই করেন। পরবর্তী সময়ে ওহি নাযিল হয় সেই সুপারিশের সমর্থনে। ইসলামি ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের কৃতিত্বও খলিফা উমরকেই দেওয়া হয়। নবি -এর মদীনায় হিজরতের বছরকে এই পঞ্জিকার সূচনাকাল হিসেবে ধরেন তিনি (আস-সুযুতি)। এই ক্যালেন্ডারের সাহায্য নিয়ে মুসলিমরা বিভিন্ন ঘটনাকে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন, অতীতে যে কাজটি পঞ্জিকার অভাবে অসম্ভব ছিল। দ্বিতীয় খলিফার মননের এই গুণাবলি সাধারণভাবে ইসলামি ফিকহ এবং বিশেষভাবে ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে অবদান রাখে। এর ফলে যথার্থই উমরের চিন্তনশক্তির প্রমাণ মেলে। দ্বিতীয় খলিফার শাসনাধীনে রাষ্ট্রের সীমা সম্প্রসারণের ওপর আলোকপাত করার পর তার অর্থনৈতিক চিন্তার অভিনবতা নিম্নে পর্যালোচিত হলো।
📄 খলিফা উমরের আমলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণ
ইসলামি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের ব্যাপারটি নিশ্চয় নবি -এর পরিকল্পনায় ছিল। বাইজেন্টাইন ও পারস্য বিজয় এবং অন্যান্য ভূমির ওপর আরবদের শাসনকর্তৃত্বের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন তিনি (সীরাত ইবনু হিশাম)। তাঁর ওফাতকালে একটি সেনাদল দক্ষিণে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রারত ছিল। ওফাতের আকস্মিক খবর পেয়ে মদীনার শহরতলিতে থামতে হয়েছিল তাদের। নবিজির পরিকল্পনা অনুযায়ী পরে আবু বকর সেই দলটিকে পুনরায় অভিযানে প্রেরণ করেন। আবু বকর -এর যখন মৃত্যু হয়, ততদিনে মুসলিমরা ইরাক ও সিরিয়ার দক্ষিণে প্রাথমিক বিজয় অর্জন করতে শুরু করেছে। কিন্তু ইসলামি বিজয়রথ অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছে যায় উমরের শাসনামলে। দ্বিতীয় খলিফা তাঁর খিলাফত শুরু করেন পূর্বসূরিদের শুরু করে দিয়ে যাওয়া কাজটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে—সিরিয়া ও ইরাক আক্রমণ। সফলভাবে তা সম্পাদিত হয়। বাইজেন্টাইন ময়দানে পরপর কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধের পর দামেশকের পতন ঘটে ৬৩৬ সালে। জেরুসালেম আত্মসমর্পণ করে ৬৩৮ সালে। সিজারিয়ার পতন ঘটে ৬৪১ সালে এবং অ্যাস্কালন শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে ৬৪৪ সালে। এরই মাঝে মুসলিম সেনাদল মিশরে প্রবেশ করে ৬৪০ সালে হিলিওপোলিসের সন্নিকটে বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে। এরই ফলে পতন ঘটে ব্যাবিলনের। ব্যাবিলন পতনের প্রায় এক বছর পরে আলেকজান্দ্রিয়ারও পতন ঘটে। সেখানে মিশরের পৌর মেয়র প্যাট্রিয়ার্ক সাইরাস ও মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আসের মাঝে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৬৪১ সালে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অবশ্য একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়নি। আনাতোলিয়া ও বলকান এলাকা বাইজেন্টাইনদের হাতেই রয়ে যায়। পারস্য ময়দানেও একইরকম সাফল্য লাভ করে মুসলিমরা। কঠিন প্রতিরোধের পরও মুসলিমরা ৬৩৬ সালে কাদিসিয়্যার যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। আর ৬৪২ সালে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। এই ৬৪২-এর বিজয়টিকে বলা হয় "সব বিজয়ের বড় বিজয়"। এর ফলে ইরাকে পারস্য প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটে। পারস্যরাজা বাধ্য হন প্রাক্তন পারসিপোলিস তথা তৎকালীন ইস্তাখারে পালিয়ে যেতে (আত-তাবারি)। পারস্যবাসীদের চরম প্রতিরোধের ফলে উমর আর পারস্যের ভেতর এগোতে চাননি। আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন, "যদি আমাদের আর তাদের মধ্যে একটা বাধা তৈরি হয়ে যেত।” অবশিষ্ট পারস্য প্রতিরোধকে চুরমার করে পারস্যরাজাকে হত্যা করা হয় ৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়্যা খিলাফতের সময়ে।
ইসলামি রাষ্ট্র তথা সাম্রাজ্যের এই সম্প্রসারণের হাত ধরে ইসলামি সমাজে আসে বিবিধ পরিবর্তন। এর ফলে অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে নতুন করে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় খলিফার অবদান ছিল বিশেষ প্রশংসার দাবিদার।