📄 ধর্মত্যাগ এবং ইসলামি যাকাতব্যবস্থা
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর কিছুকাল পরেই আবু বকর সম্মুখীন হন নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষার—ধর্মত্যাগ বিদ্রোহ তথা “আর-রিদ্দাহ”। নবি -এর মৃত্যুর খবর প্রচারিত হতে না হতেই কিছু গোত্র যাকাত প্রদানের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহ খুব সম্ভবত নবিজির মৃত্যুর ফলেই উস্কানি পায়। তবে এই ধর্মত্যাগের অর্থ পৌত্তলিকতায় ফেরত যাওয়া নয়। কেউ কেউ নবুওয়তের মিথ্যা দাবি করেছিল বটে। কিন্তু সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য ছিল মদীনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া (আত-তাবারি)। আবু বকর তা মেনে নেননি। এই আন্দোলন ছিল ইসলামের প্রতি হুমকি, মুসলিমদের ঐক্যের প্রতি হুমকি এবং ধর্মের দৃঢ়তার প্রতি হুমকি। মুসলিমদের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতি এটি হুমকি কিভাবে হয়, তাতো বোঝা গেল। কিন্তু ধর্মের দৃঢ়তায় এটা কিভাবে প্রভাব ফেলে, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজনা। আবু বকর রা.-এর দৃষ্টিতে ইসলাম অভিজ্ঞতা ও বিধানমালা হিসেবে মেনে নিতে হবে। যাকাতকে অন্য কোনোটি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এই মতের পক্ষে আবু বকর রা. প্রমাণ চয়ন করেন কুরআনের সেসব আয়াত থেকে, যেখানে যাকাত ও নামাজের কথা একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাকাত পরিশোধে অস্বীকার কারীকে তিনি ইসলামের অপরিহার্য মূল্যবোধে ফাটল ধরানোর অবৈধ প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করেন। কারণ এরা নিজেদের সুবিধামত কিছু অংশকে গ্রহণ করে বাকি অংশ প্রত্যাখ্যান করছে। তা ছাড়া নবিজির মৃত্যুর আগে তাঁর কাছে এই গোত্রগুলো যে অধিকার করেছিল, এই বিদ্রোহ সেটার ব্যত্যয়। এই সব কারণে তা গ্রহণযোগ্য。
বিদ্রোহীরা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও খলিফা আবু বকর রা. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কি সঠিক কাজ করেছেন? নবিজী ﷺ তো তাঁর অনুসারীদের বলে গিয়েছেন যে, কাফিররা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ -এর সাক্ষ্য দেওয়ার আগ পর্যন্ত যেন তাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়। শুধু এই কথাটি বলার মাধ্যমে তারা নিজেদের রক্ত ও সম্পত্তি নিরাপদ করে ফেলতে পারবে। তাহলে তো প্রশ্নটির উত্তর নেতিবাচক হওয়ার কথা। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে উমর রা. আবু বকরের রা. বিরোধিতা করেন, “যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ সাক্ষ্য দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনি কী করে যুদ্ধ করবেন?” আবু বকর রা. বললেন, “নামাজের সাথে যারা যাকাতের পার্থক্য করে, তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করার কসম করছি।”
দুজনের মাঝে বিতর্ক কিছুক্ষন চলমান থাকে, কিন্তু উমর রা. পরে আবু বকরের রা. মত মেনে নেন, “আল্লাহর কসম! যখন দেখলাম আবু বকর রা. এগিয়ে গিয়ে বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর, তখন আমার উপলব্ধি হলো এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশনা।” (সহীহ বুখারি: ১৩৩৫)।
সঙ্গত কারণেই পরস্পরের চরিত্রের ব্যাপারে সচেতন থাকায় এই দুই ব্যক্তিত্বের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া সৃষ্টি হয় এবং এই বিষয়টি-সহ অন্য অনেক ব্যাপারে তাঁদের মাঝে ঐকমত্য ত্বরাম্বিত হয়। আবু বকর রা. বিশেষভাবে তাঁর কোমল চরিত্র এবং নমনীয়তার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের আগে যেমন, পরেও তেমন। পক্ষান্তরে উমর রা. ছিলেন কঠোর মানসিকতার এবং ইসলামের পক্ষে লড়ার জন্য সদা প্রস্তুত। নরম চরিত্র ও কোমল প্রকৃতির কারণে আবু বকর রা. মুসলিম বিরোধীদের বিরুদ্ধে পারতোপক্ষে সামরিক কার্যক্রম পরিহার করাটিকেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এমন স্বভাবের একজন খলিফাহ যেখানে যুদ্ধের জন্য অবিচলতা জাহির করছেন, সেখানে যুদ্ধ তো একেবারেই অনিবার্য। আর আবু বকরের রা. যে ধর্মানুভূতি, তাতে সে সিদ্ধান্ত বেশ না করে পারে না। সামরিক সহয়তার ব্যাপারে আবু বকর রা.-এর অন্য অবলম্বনকে এভাবেই বুঝেছিলেন উমর।
মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে প্রথম খলিফার এই সিদ্ধান্তকে নানারকম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত:
➡ প্রথমত, ওপরে যে ধর্মীয় প্রভাবকের কথা বলা হলো, আবু বকরের চোখে এই বিদ্রোহীরা ধর্ম হিসেবে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধকে খণ্ডিত করার চেষ্টায় লিপ্ত।
➡ দ্বিতীয়ত, আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজন ছিল, বিশেষত ইসলামি রাষ্ট্রের এই পরিবর্তনমূলক সময়ে। আর বেদুইনদের স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন একটি সুসংগত রাজনৈতিক সত্তার হাতে (আন-নববী ও মিহান্না, ১৯৮২)।
আরবদেরকে আসন্ন পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে এটির দরকার ছিল। আগেই বলা হয়েছে যে, ভূমিপ্রকৃতির কারণেই মরুভূমির বিশালতার মাঝে বেদুইনরা ছিল বাঁধনছাড়া। পরিবার ও আত্মীয় ছাড়া আর কারও প্রতি বিশেষ আনুগত্য ছিল না তাদের। অথবা হিট্টির ভাষায় বললে, বেদুইনরা কখনো নিজেদের আন্তর্জাতিক ধাঁচের সামাজিক প্রাণী হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। গোত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে কোনো সাধারণ কল্যাণের প্রতি আত্মনিবেদনমূলক আদর্শ ইতিপূর্বে তারা বিকশিত করেনি নিজেদের মাঝে। (Hitti, 1963)। তাই রাষ্ট্রের আদেশের প্রতি বেদুইনদের বাধ্যগত করানোটা আবু বকর -এর দৃষ্টিতে ছিল একটি দরকারি পদক্ষেপ। এতে বেদুইনের বদমেজাজ পরিশিলীত হবে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের নতুন গঠন-কাঠামোর ভেতর নিজেকে খাপ খাওয়ানোর মতো প্রশস্ততর আনুগত্যবোধ লাভ করবে। এটা সত্য যে, বেদুইনরা নবি ও নবিজির ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আবু বকর নবি নন। বেদুইনদের চোখে পূর্ণ আনুগত্যের দাবিদার হলেন ওই ব্যক্তি নবি, যিনি আসমানি বার্তা থেকে উৎসারিত এক বিশেষ আত্মিক মুজেযার অধিকারী। তাঁর কোনো নির্বাচিত উত্তরসূরি সেই আনুগত্য পেতে পারে না। যে বেদুইন দুআ করেছিল, "হে আল্লাহ, শুধু আমাকে আর মুহাম্মাদকে রহম করেন, আর কাউকে রহম করবেন না", (সহীহ বুখারি: ৬০১০) তার দৃষ্টান্তটি এখানে আবারও প্রণিধানযোগ্য। তাই আরব মন-মানসে সম্পূর্ণ নাগরিক অর্থে রাষ্ট্রের ধারণাটা প্রোথিত করা আবু বকরের কাছে প্রয়োজনীয় ছিল (আন-নববী এবং মিহান্না, ১৯৮২)।
তৃতীয়ত, ধর্ম-নির্দেশিত সম্পদ বণ্টন ও সমাজকল্যাণের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে যাকাতের বিশেষ ভূমিকাকে জোরদার করার জন্য যুদ্ধ ছিল অনিবার্য। যাকাত একটি সুবিদিত কর, যা থেকে প্রাপ্ত আয় কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত খাতসমূহেই ব্যয় করতে হবে। এর প্রাপক 'দরিদ্র, মিসকিন, যাকাত সংগ্রাহক, ইসলামের প্রতি যেসব অমুসলিম/কাফিরকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তকরণ, ঋণগ্রস্ত, মুজাহিদ এবং মুসাফির'। (সূরা তাওবা, ৯: ৬০)। যাকাতের এই পুনর্বণ্টনমূলক ভূমিকা এবং সেই পদ্ধতিকে কার্যকর করার জন্য দায়িত্বশীল হিসেবে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজনীয় ছিল। এই ব্যাপারটিকে দেখতে হবে পরেরটির সাথে সমন্বিত করে।
ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয় ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। খলিফা আবু বকর তাতে বিজয়ী হন। তিনি পুনরুদ্ধার করেন মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক আধিপত্য, মুসলিমদের রাজনৈতিক ঐক্য, ধর্মের সুদৃঢ়তা এবং যাকাতের প্রতিষ্ঠা। বিদ্রোহীদের যাকাত প্রদানে বাধ্য করার মাধ্যমে খলিফা ইসলামি করব্যবস্থার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠিত করেন: ইসলামি কর তথা যাকাত উত্তোলনে রাষ্ট্র যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে, ব্যক্তির মতের এখানে কোনো স্থান নেই। ফলে করের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান পরিপূর্ণ হয়, কিন্তু সহজ পদ্ধতিতে। কারণ এই যাকাত সংগ্রহ করা হয় ফসল উত্তোলনের সময় কিংবা মূলধনের মালিকানার এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর। ইতিমধ্যেই কুরআন ও সুন্নাহতে যাকাত বিষয়ে যথেষ্ট বর্ণিত হয়েছেই। তাই যাকাতের হার আগে থেকেই জানা থাকছে। এর সমমানের অন্যান্য বিষয়ও জ্ঞাত, কারণ যাকাতের সীমা ও হার বিভিন্ন। এভাবে প্রাথমিক যুগ থেকেই দারিদ্র্য বিমোচনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে যাকাত। খলিফা আবু বকর ইন্তেকাল করেন ৬৩৪ সালে।