📄 ভূমিকা
সুপথপ্রাপ্ত খিলাফত, খিলাফতে রাশিদা বলতে এমন একটি যুগকে বোঝায়, যার পরিচিতিমূলক চিহ্ন হলো ধর্মানুরাগ এবং কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগ。
এই যুগের পর উমাইয়্যা শাসনামল থেকে এসকল ঐশী শিক্ষা ও ইসলামি আদর্শের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য ক্রমেই শিথিল হতে শুরু করে। রাশিদাহ যুগের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। একদিকে আছে নবি ﷺ-এর মৃত্যুর অল্প কিছুকাল পরই বিপুল পরিমাণে ধর্মত্যাগের ঘটনা, দুজন বিশেষ মর্যাদাবান সাহাবির রাষ্ট্রপ্রধান থাকাকালীন আততায়ীর হাতে নিহত হওয়া, একজন এক মুসলিমের হাতে ও অপরজন এক অমুসলিমের হাতে, তৃতীয় আরেক সাহাবি একদল মুসলিম বিদ্রোহীর হাতে খুন হওয়া, মুসলিম উম্মতের মাঝে বড় আকারের বিভেদ, যা আল-ফিতনাতুল কুবরা নামে পরিচিতি। আরেকদিকে রয়েছে এত বিশাল পরিসরে সামরিক বিজয়, যা ইতিহাসে অভূতপূর্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তৎকালীন বৃহত্তম দুটি সভ্যতার ওপর সামাজিক কর্তৃত্ব। তাই এই যুগটি যথার্থই বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে। ধর্মশাস্ত্রীয় দিক বিচারে, ইসলামি আইনশাস্ত্র তথা ফিকহ-এর একটি সুসংলগ্ন কাঠামোর প্রথম সাক্ষী এই যুগটিই। পরবর্তী শতাব্দীগুলোকেও এটি প্রভাবিত করতে থাকে। বিচারিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চিন্তা থেকে শুরু করে প্রথিতযশা চারটি মাযহাবের চিন্তাপদ্ধতির ওপর এর রয়েছে বিশাল অবদান। আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তায় এসকল ঘটনার প্রভাব এবং প্রাসঙ্গিকতা। এ ছাড়াও আলোচিত হবে পরবর্তী ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার সুসংহত গঠনের পেছনে সুপথপ্রাপ্ত খলিফাগণের অবদান।
অর্থনৈতিক ফিকহ প্রথমবারের মতো দেখা যায় খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে। নবি ﷺ-এর যুগে যেসব জরুরি আর্থ-সামাজিক সমস্যার অস্তিত্ব ছিল না বা থাকলেও ছোট পরিসরে ছিল, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই এর প্রয়োজনীয়তার উদ্ভব (Khallaf, 1942)। বোঝাই যায় যে, এর উত্তর ছিল ইসলামি সংবিধান তথা শরীয়তের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। কুরআনি আদেশমালা ও সুন্নাহর আদর্শ থেকে বিচ্যুতি আসা যাবে না। ওহির আগমন সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া এবং নবি-এর মৃত্যুর পর যখন বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তখন এই লক্ষ্যে অটুট থাকাটা কঠিন বটে। কিন্তু খলিফাগণ কার্যত সে-সময়কার অর্থনীতিবিদ ও আইনবিদ। তাঁরা সেই দায়িত্ব পালন করে দিয়ে গেছেন। উম্মতকে দিয়ে গেছেন কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজস্ব বিচারে সিদ্ধান্ত বের করতে পারার অতি-প্রয়োজনীয় জ্ঞান। এর মাঝে রয়েছে বিভিন্ন মাত্রার জটিলতাসম্পন্ন বৈচিত্র্যময় সব পরিস্থিতি।
📄 খিলাফত
সময়টা ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ। মুসলিমদের জীবনে তখন চলে আসে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন-নবি-এর মৃত্যু। অবশ্য নবি মুহাম্মাদের মৃত্যু শুধু অবশ্যম্ভাবীই না, প্রত্যাশিতও ছিল। কারণ কুরআন মুসলিমদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, তিনি একজন মানুষ ও রাসূল মাত্র। তাঁর আগে আরও অনেক রাসূল গত হয়েছেন। সতর্ক করে দিয়েছে যে, তাঁর মৃত্যুর পর ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই পারে। (সূরা নিসা, ৩: ১৪৪)। তারপরও মুসলিমরা মারাত্মকভাবে ধাক্কা খান এ ঘটনার পর। এক ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও পরবর্তীকালে দ্বিতীয় খলিফা উমর কিছু সময়ের জন্য ধরে নিয়েছিলেন যে, নবিজি এখন মৃত্যুবরণ করতে পারেন না। অল্প কিছু সময়ের জন্য নবি মারা যাওয়ার 'গুজব' প্রচারের দুঃসাহস যারা দেখাবে, তাদেরকে হুমকিও দিয়ে বসেন তিনি (আত-তাবারি)। তখন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও নবিজির শ্বশুর আবু বকর ঘোষণা দেন যে, নবিজি সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন। কুরআনের ওই আয়াতটি তিনি শুনিয়ে দেন এবং ঘোষণা করেন: 'যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করত, তারা জেনে রাখুক মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহর উপাসনা করে, তারা জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব এবং চিরস্থায়ী।' (সহীহ বুখারি: ৪৪৫২) উমর পরে বলেছিলেন যে, সেদিন আবু বকরের মুখে উক্ত আয়াতটি শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছিল যেন প্রথমবারের মতো সেটি শুনছেন। (প্রাগুক্ত) ঘটনাটির ধাক্কাটা প্রবল বটে, কিন্তু তার সাথে রয়েছে চিরন্তন এক আশা।
নবিজির মৃত্যু এক অনিবার্য সমস্যার জন্ম দেয়, আসন্ন শতাব্দীগুলোতেও মুসলিমরা যার মুখোমুখি হতে থাকবে-খিলাফত, তথা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবি *-এর প্রতিনিধি কে হবে? আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে নবিজির জায়গায় আর কেউ বসতে পারবে না, সেটা সর্বজনবিদিত। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকায় কেউ-না-কেউ তো তাঁর উত্তরসূরি হবে। আর সেটা সবসময় সর্বসম্মতিক্রমে হয়নি। নবিজির মৃত্যুর দিনটি থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত খিলাফতকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। এমনকি কামালপন্থি তুর্কিরা ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে সর্বশেষ উসমানী খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মাজিদকে অপসৃত করে খিলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেওয়ার পরও এ বাস্তবতার ব্যত্যয় ঘটেনি (Hitti, 1963)। নবিজি যেদিন মারা যান, খিলাফত-সংক্রান্ত বিতর্ক স্পষ্টতই সেদিন থেকেই শুরু হয়। নবি -এর দেহ মুবারাক দাফন করার আগে খিলাফতের অধিকার নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয় মুসলিমদের দুটি দল-মদীনার আনসার এবং মক্কার মুহাজিরগণের মাঝে। যার সমাপ্তি ঘটে নবিজির ঘনিষ্ঠতম সহচর আবু বকর -এর কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। মুহাজির কুরাইশ আবু বকর হন প্রথম উত্তরসূরি বা খলিফা। এরপর গিয়ে মুসলিমরা নবিজির দেহ দাফন করার মতো ফুরসত লাভ করে।
চৌদ্দশ বছরের বেশি সময় ধরে যত খিলাফত এসেছে ও গিয়েছে, সবগুলোর মাঝে খিলাফতে রাশিদা মুসলিম-মানসে সবচেয়ে উঁচু মর্যাদার অধিকারী। আল-খিলাফাতুর রাশিদা অর্থই সঠিক পথপ্রাপ্ত খিলাফত। মুসলিমদের দৃষ্টিতে ধর্মানুরাগ ও উচ্চ আত্মিক মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কিত একমাত্র খিলাফতব্যবস্থা এটিই। খিলাফতে রাশিদার স্থায়িত্ব ৬৩২ থেকে ৬৬১ সাল পর্যন্ত এবং এর ভেতর রয়েছেন চারজন সুপথপ্রাপ্ত খলিফা-আবু বকর (৬৩২-৩৪), উমর (৬৩৪-৪৪), উসমান (৬৪৪-৫৬) এবং আলি (৬৫৬-৬১)। চারজনই নবিজির ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং সর্বশেষজন অর্থাৎ আলি তাঁর আপন চাচাত ভাইও। এদের সকলেই আবার বৈবাহিক সূত্রে নবিজির আত্মীয়। আবু বকর ও উমর নবিজির শ্বশুর এবং উসমান ও আলি তাঁর জামাতা। একমাত্র আবু বকর ছাড়া বাদবাকি সকলে নির্মমভাবে শহীদ হন। উমর ও আলি নামাজ পড়া অবস্থায় আততায়ীর হাতে শহীদ হন এবং উসমান -কে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় হত্যা করা হয়। সকল খলিফাই ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন, যদিও পর্যায় ও মাত্রায় ভিন্নতা রয়েছে।
সুপথপ্রাপ্ত খিলাফতের যুগ ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্ববহ সময়কাল। এ সময়ে ঘটেছে
➡ (ক) নবি -এর মৃত্যুর ফলে মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা,
➡ (খ) গোত্রীয় বিদ্রোহ, যেটিকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে হয়েছে,
➡ (গ) ইসলামের দ্বিগবিজয়, যা পূর্ব দিকে খুরাসান, উত্তরে জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া, পশ্চিমে মিশর ও উত্তর আফ্রিকার উপকূল, এবং দক্ষিণে ইয়েমেন ও হাদরামাউত পর্যন্ত পৌঁছে যায়,
➡ (ঘ) ইসলামি সমাজে অভূতপূর্ব দ্রুত ও নাটকীয় পরিবর্তন, এবং যুগটির শেষের দিকে
➡ (ঙ) রক্তপাত পর্যন্ত গড়ানো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
মোটকথা, বিশাল ইসলামি রাজ্যের সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে গভীর বিভেদ পর্যন্ত হরেক রকম ঘটনার সমন্বয় ঘটেছে এই যুগে। আমাদের আলোচ্য হলো ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে সেসব ঘটনার প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা এবং ইসলামি অর্থনৈতিক ধ্যানধারণার বিকাশে সুপথপ্রাপ্ত খলিফাগণের অবদান। ফিকহের ভেতর অর্থনৈতিক বিষয়-আশয়ও অন্তর্ভুক্ত। আগেই বলা হয়েছে যে, খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগেই এর প্রথম উদ্ভব ঘটে। নবি -এর জীবদ্দশায় দেখা দেয়নি বা দিলেও একই মাত্রায় না, এরকম নতুন আর্থ-সামাজিক সমস্যার উত্তর খোঁজার লক্ষ্যেই এর জন্ম। অর্থনৈতিক ফিকহের বিকাশে বিভিন্ন খলিফা কয়েক উপায়ে ও বৈচিত্র্যময় মাত্রায় অবদান রেখেছেন, যা নিচে দেখানো হয়েছে।