📄 বাজার কাঠামো
কুরআন ও সুন্নাহতে বাজার সংক্রান্ত যেসব নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহারে আসা যায়: ইসলামি বাজারব্যবস্থা একটি যথাযথ মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজার এবং দাম নির্ধারিত হবে জোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে (Tuma, 1965)। ইসলামি বাজারব্যবস্থার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো আছে বা থাকা উচিত (ইবনুল উদ্বুওয়্যাহ, ১৯৩৯, ইবনু তাইমিয়্যা, ১৯৮৩):
➡ ১. একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা: সুন্নাহয় সব ধরনের একচেটিয়াপনাকে নিষেধ নিন্দা করা হয়েছে। নবি বাজারের বাইরে গিয়ে পণ্যবাহীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম: ১৫১৮) যাতে বাজারে পণ্যসামগ্রীর ওপর কারও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হয়। আরও বর্ণিত হয়েছে, “ক্রয় করার ইচ্ছা ছাড়া মূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দাম হাঁকানোকে রাসূল নিষেধ করেছেন।” (সহীহ মুসলিম: ১৫১৬)। অবশ্য দাম বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য না থাকলে খাবার বা পণ্য মজুদ করা সবসময় অপরাধ নয়। যেসব শর্তে মজুদকরণ পাপাচার হিসেবে গণ্য হবে, সে ব্যাপারে ফকিহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (আয-যুহাইলি, ১৯৮৯): (ক) মজুদকৃত বস্তুটি ওই ব্যক্তির ও তার নির্ভরশীলদের এক বছরের চাহিদার চেয়ে বেশি হলে। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত এসব পণ্য মজুদ করে রাখা যাবে। (নয়তো, তা পাপাচার বলে গণ্য হবে)। (খ) মূল্য বৃদ্ধি করা কিংবা দাম বাড়ার পর সেগুলো বিক্রি করার উদ্দেশ্যে মজুদ করলে। (গ) মজুদ বস্তুটির বাজারে আকাল থাকলে। (ঘ) অতএব উল্লেখ্য যে, একাধিপত্য বা মজুদ করার কাজটি স্বয়ং পাপাচার নয়। বরং মজুদকারীর উদ্দেশ্য এবং মজুদ করার ফলাফল থেকে নির্ধারিত হবে যে, সে পাপাচারী কি না। যেমন, কোনো পণ্যের একজনই উৎপাদক বা বিক্রেতা আছে। নিজের এই একাধিপত্যকে বাজারে প্রভাব ফেলার উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করলে এই একচেটিয়া ব্যবসা পাপাচার হবে না।
➡ ২. বাজার-দর নির্ধারণ: মূল্য নির্ধারিত হবে বাজারের শক্তিসমূহ তথা চাহিদা ও জোগানের মাধ্যমে। এর দলীল গৃহীত হয়েছে সুন্নাহ থেকে। জনগণ নবি -কে মূল্য নির্ধারিত করে দিতে বললে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আল্লাহ তাআলাই মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন। তিনিই নিয়ন্ত্রণকারী, প্রাচুর্য বা সংকীর্ণতা প্রদানকারী এবং রিযিকদাতা। আমি আমার প্রতিপালকের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে চাই, যাতে তোমাদের কোনো লোক এ দাবি করতে না পারে যে, আমি তার জান-মালের ওপর হস্তক্ষেপ করেছি।” (সুনানুত তিরমিযি: ১৩১৪) এটা সাধারণ নিয়ম। সকল ফকিহ এটি গ্রহণ করে নিলেও কেউ কেউ কিছু শর্ত দিয়েছেন। যেমন ইবনু তাইমিয়্যা (১২৬২-১৩২৮) ব্যাখ্যা করেছেন, নবি এই কথাটি বলেছেন বাজার স্থিতিশীল থাকা সাপেক্ষে। কিন্তু ন্যায়ানুগ লেনদেন না হলে বাজার যদি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্র সেক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে মূল্য নির্ধারণ করে দেবে। (ইবনু তাইমিয়্যার অর্থনৈতিক চিন্তাকে পরের অধ্যায়গুলোতে পর্যালোচনা করা হবে)।
➡ ৩. মুদ্রাস্ফীতি: স্ফীতির প্রবাহ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছেই সহজলভ্য রাখতে হবে। বাজারের বাইরে ক্রেতার সাথে দেখা করা এবং বাজারে পৌঁছানোর আগেই চুক্তি চূড়ান্ত করে ফেলাকে নবি নিন্দা করেছেন (সহীহ মুসলিম: ১৫১৮)। বিক্রেতাকে বাজারে এসে চুক্তির আগে বাজারদর জেনে নেওয়া সুযোগ দিতে হবে। সেইসাথে ক্রেতাকেও এমন দামে পণ্য কেনার সুযোগ দিতে হবে, যেটা দালাল বা মিডিল-ম্যান দ্বারা প্রভাবিত নয়। যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে যাবে, তখন অন্য ক্রেতাদের উচিত নয় সেই চুক্তি পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে আরও বেশি দাম হাঁকানো (সহীহ মুসলিম: ১৫১৬)। চুক্তি সম্পাদন করার আগে ক্রেতা-বিক্রেতা বাজারের প্রচলিত দর অনুসরণ করতে বাধ্য।
➡ ৪. দ্রব্যের পরিমাণ না জেনে ভবিষ্যৎ চুক্তি করার নিন্দা: এর কারণ হলো বিক্রেতা সেই চুক্তি রক্ষা করতে পারবে কি না, এই ব্যাপারে সে অনিশ্চিত। যে পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা হবে, তাকে ঘিরে থাকা অনিশ্চয়তাই ভবিষ্যৎ চুক্তিকে নাকচ করে দেয়। পক্ষান্তরে, পরিমাণ জানা থাকলে বা সে ব্যাপারে সমঝোতায় আসা গেলে ভবিষ্যৎ চুক্তি অনুমোদিত হতে পারে। যেমন, ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে চুক্তি হলো যে, বিক্রেতা ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল জুড়ে করা কোনো কারবার থেকে প্রাপ্ত মোট উৎপাদন ক্রেতার কাছে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করবে (জমির ফসল, নির্দিষ্ট সময়কালে ধরা মাছ, এক ডুবে প্রাপ্ত ফল, কোনো প্রাণীর শাবক ইত্যাদি)। এই চুক্তি অবৈধ (আল-গিযিরি, ১৯৭২)। কারণ চুক্তিতে যে উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে, তার পরিমাণ নিশ্চিতভাবে জানা নেই। পক্ষান্তরে, চুক্তির বিষয়বস্তু যদি হয় ভবিষ্যতের কোনো উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ (নির্দিষ্ট মাপের ফসল, মাছ ইত্যাদি), তাহলে চুক্তিটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে। নবি যেটির নিন্দা করেছেন, সেটিকে বলে "প্রবঞ্চনার বিক্রয়”, বা “বাই আল-গারার” (প্রাগুক্ত)।
উল্লেখ্য, বাজারের শক্তিসমূহ এবং দামের ওপর তাদের প্রভাবের ব্যাপারে যে খলিফাগণ সচেতন ছিলেন, ইসলামি ইতিহাসে তার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। খলিফা উমরের শাসনামলে (৬৩৪-৬৪৪) মাদীনায় একবার ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জোগানের ঘাটতির কারণে দাম খুবই বেড়ে যায়। দ্বিতীয় খলিফা তখন মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। বরং মিশরে নিযুক্ত তার প্রশাসককে নির্দেশ দেন আরও জোগান পাঠাতে, যাতে দাম কমে আসে। তিনি তা-ই করেন (Tuma, 1965)। আরেকটি উদাহরণ হলো যখন খলিফা মানসুর ৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তার নতুন শহর বাগদাদের জন্য একটি স্থান বেছে নিচ্ছিলেন। মানসুর এমন একটি স্থান চাচ্ছিলেন, যেখানে জনগণ জীবিকা উপার্জন করতে পারবে, যেখানে দাম চড়া বা জোগান সংকীর্ণ হবে না। কারণ তিনি যদি এমন জায়গায় বসবাস করেন যেখানে ভূমি বা সাগরপথে জোগান এসে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দাম বেড়ে গিয়ে জনগণের কষ্ট হতে থাকবে (প্রাগুক্ত)। বাজারশক্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধানদের এই সচেতনতা থেকে বোঝা যায়, দর নির্ধারণে তারা জোগান ও চাহিদার ভূমিকা বুঝতেন। তাই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন এখানে নেই। এমনকি বাজারের অবস্থা অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে যখন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করাও হয়েছে (ইমাম ইবনু তাইমিয়্যার মতো ফকিহগণের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে), তখনো সে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাজারশক্তিকে নাকচ করে দেওয়া হয়নি। তুমার ভাষ্যমতে, মূল্যের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসকল হস্তক্ষেপ ইতিবাচক বাজার কাঠামো বা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু বাজার যখন স্থিতিশীল থাকবে, তখন দাম নির্ধারিত হবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারশক্তি অনুযায়ী।
তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো লেনদেনকৃত পণ্য ও সেবার পরিমাণ ও মানের ব্যাপারে বাজারে যেসব তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সঠিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা। তথ্য নির্ভরযোগ্য না হলে লেনদেনকারী পক্ষগুলো ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। ফলে তারা এমন চুক্তি করে বসতে পারে, যা তাদের ক্ষতির কারণ হবে এবং জুলুমের পথ খুলে দেবে। তা ছাড়া বাজারকে যদি জোগান ও চাহিদা এবং দক্ষতা ও কার্যকারিতা সহকারে সক্রিয় থাকতে হয়, তাহলে বাজারের প্রতি আস্থা থাকতে হবে। রাষ্ট্রের নজরদারি এই আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লেনদেন বাড়াতে সহায়তা করবে। ইসলামে জবাবদিহিতা, ব্যবসা পরিচালনা এবং জনগণের দায়িত্বের বিষয়গুলো চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কিভাবে মুসলিম ফকিহগণের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তা আমরা সামনে দেখব। এর ফলে এক বিশেষায়িত শাস্ত্রের উদ্ভব হয়, যা পরবর্তীকালে পরিচিতি লাভ করে হিসবাহ বা জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নামক একটি স্বতন্ত্র দফতর হিসেবে।
📄 রাষ্ট্রের অর্থায়ন
ইসলামের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়। নবি -এর জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় আয় সীমাবদ্ধ ছিল মূলত পাঁচটি প্রকারের মধ্যে: ফাই, গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ, যাকাত, জিযিয়া এবং ব্যক্তিগত দান-সদাকা। ব্যক্তিগত ঐচ্ছিক দানকে শুধু উৎসাহিত করা হয়েছে। বাকি চার প্রকারের আয় এবং সেগুলো খরচ করার পদ্ধতি কুরআন থেকে নির্ধারিত। তা ছাড়া কখনো এসব আয়ের সংজ্ঞায়ন তথা সেগুলোর ব্যয়ের খাত সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তাও কুরআনের আয়াতে ও হাদীসে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। মূলত যুদ্ধজয়ের ফলে ইসলামি ইতিহাস জুড়ে এসব আয়ের প্রকৃতি ও আকৃতি বাড়তে থাকে। প্রয়োজন ও নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে যুক্ত হতে থাকে আয় ও ব্যয়ের নতুন নতুন ধরন। এর শুরুটা উল্লেখযোগ্যভাবে হতে দেখা যায় দ্বিতীয় খলিফা উমরের শাসনামলে (৬৩৪-৬৪৪)। যুদ্ধ ও দেশজয় যত প্রশস্ত হতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে আয়ের ধরন। এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে, যা যথাস্থানে আলোচিত হবে।