📄 উত্তরাধিকার আইনের বাস্তবায়ন
অন্যান্য উত্তরাধিকার পদ্ধতিতে মৃতের সকল সম্পদ হয় পরিবারের জ্যেষ্ঠতম পুরুষ সদস্যের কাছে হস্তান্তরিত হয়, অথবা পুরো সম্পদই মৃতের লিখে যাওয়া উইল অনুযায়ী বণ্টিত হয়। ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সকল আত্মীয়কেই সম্পদে অধিকার দেওয়া হয়েছে। আর মৃতের উইল/ওসিয়ত কার্যকর হবে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ সম্পদের ওপর। এর বেশি হতে হলে সকল উত্তরাধিকারীর নিরঙ্কুশ সমর্থন লাগবে। কুরআনের আয়াত এবং সুন্নাহর ব্যাখ্যা মিলিয়ে এই ব্যাপারগুলো খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতগুলো যদিও আপাতদৃষ্টে দীর্ঘ, কিন্তু পুরো চিত্রটার সারাংশ তুলে ধরার জন্য সেগুলো উদ্ধৃত না করলেই না। সাধারণ মূলনীতি হিসেবে কুরআন বলেছে, "পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ রয়েছে; এবং পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ রয়েছে; তা কম হোক বা বেশি, একটি নির্ধারিত অংশ।” (সূরা নিসা, ৪: ৭)। ইয়াতিম ও অভাবীদেরও ঐচ্ছিকভাবে কোনো অংশ প্রদান করা যায়। কুরআন বলে, "সম্পত্তি বণ্টনের সময় যদি আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম ও মিসকিন হাজির হয়, তখন সেখান থেকে তাদেরকেও কিছু দিবে এবং তাদের সাথে সদালাপ করবে।” (সূরা নিসা, ৪: ৮)। ভাবুন তো, আপনার নিজের সন্তান ইয়াতিম ও দুর্বল অবস্থায় পড়ে গেলে আপনার কেমন লাগত? "তারা যেন ভয় করে যে, অসহায় সন্তান রেখে গেলে তারাও তাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হতো। সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয়ে করে এবং সংগত কথা বলে। যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের সম্পদ গ্রাস করে, তারা তো আগুন দিয়ে নিজেদের উদর পূর্ণ করছে; তারা অচিরেই জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে।” (সূরা নিসা, ৪: ৯-১০)।
উত্তরাধিকারী সন্তান ও পিতামাতার প্রাপ্য অংশ নির্ধারিত করা হয়েছে এভাবে: “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন-একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার সমান। কিন্তু যদি শুধু নারী হয় দুইয়ের অধিক, তবে তাদের জন্যে সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ; আর যদি কন্যা একজন হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক সম্পদ। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের সন্তান থাকে। যদি সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিশ হয়, তবে মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। যদি মৃতের একাধিক ভাই-বোন থাকে, তবে তার মা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ-(এসব বণ্টন হবে) তার ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা, ৪: ১১)।
দাম্পত্যসঙ্গীদের মাঝে উত্তরাধিকারের ব্যাপারে কুরআন বলে চলে, “তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক তোমাদের জন্য-যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি সন্তান থাকে, তবে তোমাদের জন্য তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ-(এসব বণ্টন হবে) তাদের ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি তোমাদের স্ত্রীদের কোনো সন্তান-সন্ততি না থাকে, তাহলে তোমরা যা রেখে যাবে তাদের জন্য তার এক-চতুর্থাংশ। কিন্তু যদি তোমাদের সন্তান-সন্ততি থাকে, তাহলে তোমাদের ওসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে তাদের জন্য এক-অষ্টমাংশ।” (সূরা নিসা, ৪:১২)
অন্যান্য আপন ভাইদের মাঝে যে সৎভাই দুর্বলতর অবস্থানে থাকতে পারে, তার জন্যও জোর দেওয়া হয়েছে আলাদা করে: "আর যদি পুরুষ বা স্ত্রীলোকের সন্তান না থাকে এবং বাবা-মা'ও জীবিত না থাকে, কিন্তু সৎভাই বা এক বোন থাকে, তাহলে তারা প্রত্যেকেই ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। তবে ভাই-বোন একজনের বেশি হলে, রেখে যাওয়া সম্পত্তির তিন ভাগের একভাগে তারা সবাই শরিক হবে। (এসব বণ্টন হবে) তাদের ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর, যদি তা কারও জন্য ক্ষতিকর না হয়। এটি আল্লাহর নির্দেশ। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সহনশীল." (সূরা নিসা, ৪: ১২)।
উত্তরাধিকার আইন সম্পূর্ণ করে কুরআন উপসংহার দেয়: "যদি কোনো ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তার একটিমাত্র বোন থাকে, তাহলে সে (ভাইয়ের) পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ পাবে। আর যদি বোন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায়, তাহলে ভাই হবে তার ওয়ারিশ। দুজন বোন যদি (নিঃসন্তান ব্যক্তির) ওয়ারিশ হয়, তাহলে তারা পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি ভাই-বোন কয়েকজন হয়, তাহলে (প্রত্যেক) পুরুষ পাবে দুজন নারীর সমান। আল্লাহ তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট বিধান বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বিভ্রান্ত না হও। আর আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে জানেন।” (সূরা নিসা, ৪: ১৭৬)।
ওপরের আয়াতসমূহ থেকে লক্ষণীয় যে,
➡ ১. বণ্টনের আগে মৃতের সম্পত্তি থেকে ঋণ বাদ দিতে হবে,
➡ ২. আয়াতগুলোতে উল্লেখ করা আছে যে, মৃতের ওসিয়ত বাস্তবায়ন করার পরে সম্পদ বণ্টন করা হবে। নবি ওসিয়তকে এক-তৃতীয়াংশের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। সকল ওয়ারিশের সর্বসম্মত মত না থাকলে, এর বেশি করা যাবে না। হাদীসে আছে, “এক-তৃতীয়াংশও অনেক।” (সহীহ মুসলিম: ১৬২৮)
➡ ৩. ছেলের ভাগ মেয়ের ভাগের দ্বিগুণ। অবশ্য মাথায় রাখতে হবে যে, স্ত্রী ও পরিবারের আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের ওপর। স্ত্রীর আর্থিক সম্পদ স্বামীর থেকে আলাদা এবং সে ধনী হলেও পরিবারের আর্থিক ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নয়।
➡ ৪. সম্পদ অনেকজন উত্তরাধিকারীর মাঝে বণ্টিত হয়। এর ফলে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়াকে প্রতিরোধ বা বিদূরিত করা হয়। অধিক সংখ্যক মানুষের মাঝে বিন্যস্ত করা যায় সেই সম্পদকে।
দানশীলতার প্রতি উৎসাহ, যাকাতের বিধান প্রয়োগ এবং উত্তরাধিকার বণ্টনের আদেশমালা হলো এমন তিনটি উপাদান, যা আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।