📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 যাকাত

📄 যাকাত


যাকাত হলো একটি বার্ষিক প্রদেয়, যা ইসলামি শিক্ষার একটি কেন্দ্রীয় বিধান। এটি একটি ফরজ ইবাদত। ইসলামের বাকি চারটি প্রধান খুঁটির সাথে এটি সম্পর্কিত (বাকি চারটি হলো: কালিমার সাক্ষ্য, নামাজ, রমজান মাসের রোজা এবং সামর্থ্যবানদের জন্য হজ)। যাকাতের বৈশিষ্ট্য অনেক। তবে এই পর্যায়ে আপাতত এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এর খুবই বিশেষ এক দ্বৈত চরিত্র রয়েছে: একটি হলো ইবাদত হিসেবে, যার ফলে তা ধর্মের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত; দ্বিতীয়টি আর্থিক প্রদেয় হিসেবে, দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ক্ষেত্রেই এটির কিছু অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আয় বণ্টন ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের নিরীক্ষণে যাকাতের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আলোচিত হবে।

যাকাতের প্রকৃতিগত কারণেই পুঞ্জীভূত সম্পদ ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকবে, যদি না তা কমপক্ষে এই হারের মুনাফায় বিনিয়োগ করা থাকে:
(যাকাতের হার)/(১ - যাকাতের হার)

যেমন, যাকাতের হার ২.৫% হলে সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে ২.৫৬৪১% হারে, যাতে এর মূল্যমান অপরিবর্তিত রাখা যায় (মুদ্রাস্ফীতি নেই ধরে নিয়ে)। সম্পদ বিনিয়োগ না করা হলে এর প্রান্তিক মূল্য হিসাব করতে হবে নিম্নলিখিত উপায়ে:

NTV = ΣW (1-Z)ᵀ

যেখানে:
NTV = মোট প্রান্তিক মূল্য
W = পুঞ্জীভূত সম্পদ
Z = যাকাতের হার
T = বছরসংখ্যা

ভোক্তার আচরণবিধিতে তাই (রাশি রাশি) সম্পদ জমা করাকে যৌক্তিক হিসেবে দেখা হয় না। তাই যাকাতের মাধ্যমে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাঝে সমন্বয় সাধিত হয়। সমাজে অলস পুঁজির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। এমনকি যাকাত পরিশোধ না করার লক্ষ্যে যদি কেউ সম্পদ (না জমিয়ে) ভোগ করতে থাকে, তাতেও আয়ের সে অংশটুকু অর্থনৈতিক কার্যক্রমের চলমান চাকায় ঢুকে পড়ে। এতে করেও (রাশি রাশি) সম্পদ জমানোকে নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য এবং মধ্যমপন্থা নীতি সম্পর্কে যা কিছু বলা হলো, ভোগের প্রভাবকে দেখতে হবে সেটার আলোকে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 লাভ ও সুদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

📄 লাভ ও সুদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি


আগেও আলোচিত হয়েছে যে, ইসলামে লাভ বা মুনাফা স্বীকৃত হলেও সুদ নিষিদ্ধ। বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাকে লাভ ও ঝুঁকি সমানভাবে ভাগাভাগি করতে হবে। নির্ধারিত হারের সুদে এই ভাগাভাগির ঝুঁকি থাকে না। তাই এটি উপার্জনের মাধ্যম হিসেবেও অবৈধ। পক্ষান্তরে, লাভ বৈধ। তাই সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগির আলোকে, নির্ধারিত সুদের ভিত্তিতে নয়।

এর আলোকে সমীকরণ (৪) হবে এরকম:
(সর্বাধিককরণ করতে হবে) V = U(C,T, H, Sa, Sb, Z,R), F(P)...... (৫)
শর্ত হলো Y
যেখানে Z = যাকাত
R = সময়কালের শুরুতে পুঞ্জীভূত সঞ্চয়ের ওপর আসা লভ্যাংশ
(অন্যান্য সংকেতের অর্থ আগের মতোই)

মোটকথা, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ভোক্তার নীতিমালার রূপরেখা এরকম:
➡ ১. ভোক্তা যে উপযোগ সমষ্টির সর্বাধিককরণ করতে চায়, তা দুটি প্রধান উপাদান দিয়ে গঠিত: পণ্য ও সেবা ভোগ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ এবং ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যয়ের উপযোগ।
➡ ২. উপযোগের উভয় উপাদান একত্রে অর্জন করা সম্ভব। ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যয় করতে গিয়ে পণ্য ও সেবা ভোগকে বিসর্জন দিতে হবে, এমন কোনো শর্ত ইসলামি শিক্ষায় নেই। তবে আয়ের পরিমাণের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা এবং মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণ করতে হবে।
➡ ৩. উদ্বৃত্ত সম্পদের একাংশ সঞ্চয় করা ইসলামি শিক্ষায় কাম্য, যা নির্ভরশীল উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। সঞ্চয়ের অন্যান্য খাতে মধ্যমপন্থার ধারণা প্রযোজ্য হবে।
➡ ৪. যাকাতের বিধানটি ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণকর্মের অনুভূতিকে উদ্বুদ্ধ করে। সেইসাথে ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণে খরচ করার জন্য একটি প্রবহমান আর্থিক উৎস লাভ করে ইসলামি রাষ্ট্র। তা ছাড়া এর মাধ্যমে অলস সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে আসে এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাঝে বৈষম্য কমে আসে।
➡ ৫. সম্পদের প্রান্তিক মূল্যমান রক্ষা করার জন্য হলেও সঞ্চয়কে বিনিয়োগ করা উচিত। বিনিয়োগ হতে হবে মুনাফা ভাগাভাগির ভিত্তিতে, নির্ধারিত হারের সুদের ভিত্তিতে নয়। ফলে সঞ্চয়কারীদের দীর্ঘমেয়াদে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করা হয়।
➡ ৬. ক্রেডিট বিক্রয় কোনো উদ্যোগ কার্যক্রমের দ্বারা সুদমুক্ত উপায়ে অনুমোদিত হতে হবে। ব্যাংক ঋণও দিতে হবে একই শর্তের ভিত্তিতে। একচেটিয়া আধিপত্যও ইসলামি শিক্ষায় ধিকৃত। চাহিদা-আকর্ষণ ধাঁচের অর্থনীতিতে যে মুদ্রাস্ফীতিমূলক চাপ রয়েছে, এহেন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তার কিছু কিছু দূরীভূত করা সম্ভব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00